আমরা যারা কবিতা পড়ি, কেউ কেউ টুকটাক লিখি বা কেউ সাহস করে প্রকাশ করি, তাদের বিষয়ে আশেপাশের অনেকেই চাহনি বদল করেন। কবিতা নাকি কেউ পড়ছেন না আজকাল? কবিতা সবাই পড়বে কিনা বা কবিতা সবার জন্য কিনা তা ভাবনার বিষয়। শিল্পের শক্তিশালী এই মাধ্যমকে যারা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির দোহাই দিয়ে, বর্তমান ট্রেন্ড-এর কথা বলে বায়ে ফেলতে চান, তারা হয়তো জানেন না; পৃথিবী পরিবর্তনের ধারায়, যুদ্ধ বা বিপ্লবে কবিতার ভূমিকা আসলে কি ছিল। এই যে আজকে আমরা সভ্য, আমরা বেশ আধুনিক, সেটা তো কবিতার হাত ধরেই এতদূর এসেছে। যুক্তিতর্ক যাই হোক, জীবন আমূল বদলেছে কিন্তু আধুনিক কবিতার সাথে হাটি হাটি পায়ে; পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তি মাত্রই তা জানেন।
আর আধুনিকতাবাদ  কোনো মৌলিক চিন্তাশক্তির ফলাফল নয়; এটি আসলে পাশ্চাত্যের  কতগুলো সাহিত্যান্দোলনের সামষ্টিক রূপ। আধুনিকতাবাদী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে ১৯১০ থেকে ১৯২০ সালের দিকে। বিশেষ করে খ্যাতিমান লেখক জয়েস, কাফকা, কনরাড, ভার্জিনিয়া উলফ, ই এম ফস্টার, হেমিংওয়ে, ফকনার; কবিদের মধ্যে ইয়েটস, রবাট ফ্রস্ট, টি এস এলিয়ট ও অডেন। এঁদের হাত ধরেই জগত অনুভূতিতে আধুনিক হয়েছে। আর কবিতা তার মধ্যে অগ্রগণ্য। প্রতিটি শব্দ যদি হ’য়ে ওঠে চিত্রকল্প তবেই না কবিতার সার্থকতা। তারপর অন্তমিল, ছন্দের বুনন, শব্দ-চয়ন তো আছেই। তবে ছন্দহীন টানা গদ্যের শেষে অন্তমিল কোনো কবিতার পর্যায়ে পড়ে না। সেটাকে নিতান্ত পদ্যের পর্যায়েও ফেলা যায় না। পদ্যেও কিন্তু ছন্দ থাকে, তবে কবিতার মতো ভাবানার বিশালতা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্পের বালাই নেই সেখানে। আছে শুধু গল্প-উপন্যাসের মতো ধারা বর্ণনা। বাংলা কবিতার পথিকৃৎ মূলতঃ জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে; যারা পঞ্চপান্ডব নামে খ্যাত। এঁদের হাতেই ইউরোপীয় আধুনিকতার আদলে  আধুনিক বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন হয়। বাংলায় আধুনিকতার গোড়াপত্তন হয় ১৯২৫ সালে;যা ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার সমবয়সী।
আমরা যদি আধুনিকতাবাদ বিভাজন করতে যাই, তাহলে তাতে পাওয়া যায় বাস্তবতাবাদ, প্রতীকবাদ, চিত্রকল্পবাদ, পরাবাস্তববাদ, অস্তিবাদ, ইন্দ্রজাল বাস্তবতা, বাস্তবরূপবাদ, আকৃতিবিন্যাসবাদ এমন কিছু বিষয়। মূলত এর সবই পশ্চিমের কোনো না কোনো সাহিত্য-শিল্পীর সৃষ্টি; এবং যথাযথভাবে যা আন্দোলনে রূপলাভ করেছিল ঐ সময়ে। আর এর ফলে বাংলা সাহিত্যে তার আঁচ লেগেছিল প্রকট আকারে। মানুষের মানবিক জীবনব্যবস্থার যুক্তিশীল, বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযাত্রার মধ্য দিয়েই আধুনিক চেতনার বিকাশ ঘটে। বাংলা কবিতায় আধুনিকতাবাদের চর্চায় সফলদের মধ্যে পঞ্চপান্ডব ছাড়াও শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, বিনয় মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হেলাল হাফিজ ও নির্মলেন্দু গুণের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে যা বোঝায় বা যে কালের সাহিত্যকে বোঝায়, তা নিহিত ছিল সমকালের ইংরেজি সাহিত্যের মধ্যে। ইংরেজি কবিতার আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন ভিক্টোরীয় যুগের কবি হপকিনস। ইতিহাস বলে, অষ্টাদশ শতকের রোমান্টিকতা এক অন্যরূপ লাভ করে বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতায়। সাহিত্য ইতিহাস আমাদেরকে নিশ্চিত করে যে, এসবকিছুর মূলে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে ইউরোপের জীবনব্যবস্থায় যেমন পরিবর্তন এসেছিল, তেমনি শিল্পসাহিত্যে এসেছিল জোয়ার। মানবিক জীবনবোধের কতগুলো বিশ্বাস, এই মহা সংকটকালে যা অবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছিল। কাব্যে বন্দনা আর স্তুতির পরিবর্তে উচ্চারিত হল বিদ্রোহ, মনোবিকার, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং দারিদ্র ও অন্যান্য পার্থিব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াদি। সমাজের নানা সমস্যা, জীবনের জটিলতা, মৃত্যু চেতনা অথবা জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তিবোধের বিচিত্র চিত্র প্রতিপাদ্য হলো কবিতার। এভাবে একটি ‘যুদ্ধ’ পুরাতন সংস্কৃতিকে বাতিল করে জন্ম দিল আধুনিক সংস্কৃতির; আধুনিক জীবনবোধের।
পৃথিবী আজকাল যান্ত্রিকতার দিকে অনেকখানি এগিয়ে গেলেও কবিতাকে নির্বাসিত করা যায়নি। বর্তমানে কবিতা মানবীয় ইচ্ছাকে অতিক্রম করে মানব স্বভাবের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে প্রকৃতির মত।কবিতার উদ্দেশ্য, পরিধি, গঠন, কৌশল, ছন্দ, আবৃত্তি ইত্যাদি কারণে দশকে দশকে বদলে গেছে কবিতা। কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে নিয়মিত। রবীন্দ্রনাথের জীবিতাবস্থায় ত্রিশের কবিরা কবিতা বদলে দিয়েছেন। এই রেশ কাটতে না কাটতেই হাজির হয়েছেন চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের কবিরা। প্রতিটি দশকেই কবিতার উন্নতি অনেক স্পষ্ট হয়েছে। দশকওয়ারি এই বিবর্তনধারায় বাংলা কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে।
তিরিশের দশকের বাঙালি কবিরা এলিয়টের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কবিতা রচনা শুরু করেন। এ কারণে দীর্ঘ দিন বাঙালি কবির কাছে আকাশ মানেই ছিল বিধ্বস্ত নীলিমা, বাতাস মানেই অসুস্থ বিকারগ্রস্ত পঙ্গু মানুষের ঘামের গন্ধে বিষাক্ত, বিষন্ন। জীবনানন্দের রাত্রি কবিতায় দেখি –
'হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল/…থামে ঠেস দিয়ে লোল নিগ্রো হাসে/ নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।'
অনেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি বলে মনে করেন। আবার অনেকে মনে করেন রবীন্দ্রনাথকে, কেউ কেউ আরও পরবর্তী ত্রিশের কবিদেরই মনে করেন প্রথম আধুনিক কবি। প্রথম আধুনিক বাংলা কবিতা পাই মাইকেলের কাছ থেকেই। সেজন্য বলা যায়, তিনিই আধুনিক বাংলা কবিতার জনক।
এখন সাধারণ মানুষের পঠিত কবিতা মানেই আধুনিক কবিতা। তবে এটা সবাই জানি, বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আজও সমভাবে পঠিত এবং প্রাসঙ্গিক। তবে রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে আধুনিক কবিতা লেখা শুরু করলেও আধুনিক কবিতা পূর্ণতা পায় ত্রিশের কবিদের হাতেই। এর আগে গোবিন্দচন্দ্র দাস থেকে নজরুল ইসলাম পযর্ন্ত ছন্দের দিকে দৃষ্টি রেখেই কবিতা রচনা করেছেন। একই সালে (১৮৯৯) জন্মগ্রহণ করলেও নজরুলের চেয়ে ভিন্ন ধারায় কবিতা লিখেন জীবনানন্দ দাশ। 'বনলতা সেন' যেমন জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ, তেমনি নজরুলের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নি-বীণা'।
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি! (বিদ্রোহী/কাজী নজরুল ইসলাম)
'অগ্নি-বীণা'র ১৮ বছর পর প্রকাশ পায় 'বনলতা সেন'। আর আধুনিক কবিতার স্রষ্টাদের মধ্যে জীবনান্দ দাশ প্রধান পুরুষ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর কবিতায় একদিকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় প্রকৃতি ও পুরাণ হয়ে উঠেছে রূপময়; অন্যদিকে আধুনিক নগর জীবনের হাতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, বিষাদ ও সংশয়ের চিত্র দীপ্যমান। আবার লোকজ শব্দের প্রয়োগে এবং ধীরলয়ের ছন্দের বন্ধনে তাঁর কবিতা (‘নির্জন স্বাক্ষর’ ও ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’) ভিন্ন স্বাদযুক্ত ও মন্থর গতি সম্পন্ন। যেমন:
তুমি তা জান না কিছু না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে পথের পাতার মত
তুমিও তখন আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার! [নির্জন স্বাক্ষর: ধূসর পাণ্ডুলিপি]
চল্লিশের দশকে নজরুলের পর আরো বেশ কয়েকজন আধুনিক কবিকে আমরা পাই। ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব ও সৈয়দ আলী আহসান তাদের মধ্যে প্রধান। আবার সৈয়দ আলী আহসান ভাঙা গদ্য ও টানা গদ্য কবিতা লিখেছেন। এদিকে সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর কবিরাও ভাগ হয়ে গেছেন। হাসান হাফিজুর রহমান, সুফিয়া কামাল আল মাহমুদ প্রমুখ কবিরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবি হিসাবে স্বীকৃতি পান। বলা হয়, ত্রিশের কবিদের পর বাংলা কবিতায় সবচেয়ে জনপ্রিয় চার কবি হলেন শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আল মাহমুদ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দুজন এ বাংলার, দুজন ও বাংলার; শামসুর রাহমান শুরুতে মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে তিন ছন্দেই লিখেছেন; কিন্তু তিনি শামসুর রাহমান হয়ে উঠেছেন মুক্তক অক্ষরবৃত্তে কবিতা লিখেই। শামসুর রাহমানের অধিকাংশ কবিতা মুক্তক অক্ষরবৃত্তে সাজানো। তিনি মুক্তিযুদ্ধের এবং শহরের আধুনিক কবি হিসাবেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। তিনি মাত্রাবৃত্ত ছন্দ, স্বরবৃত্ত, গদ্য ছন্দ কিংবা সনেট-সবর্ত্রই সাবলীল; কিন্তু মুক্তক অক্ষরবৃত্ত তার স্বাভাবিক ছন্দ। শামসুর রাহমানের পর গুরুত্বপূর্ণ কবি আল মাহমুদ। একইভাবে তিনিও শুরু করেছিলেন ছন্দোবদ্ধ কবিতা লিখে। রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, হুমায়ুন আজাদ একই সময়ের অন্যতম প্রধান কবি। আর হেলাল হাফিজ প্রেমে ও দ্রোহে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছেন একটি মাত্র বইয়ে।
মানুষ আধুনিক হয়েছে কবিতার সাথে কাঁধ মিলিয়ে; এবং এখনো ভালবাসা ও বেদনার কথা একটু ভিন্নভাবে বলে নিজেকে আরও অনেকটা সাবলীল করে চলেছে। বেঁচে থাক কবিতা, ভালোবাসা বাড়ুক স্বপ্নের ভাঁজে ভাঁজে।