আমি যখন স্কুলে পড়ি, এগারো বা বারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের ‘দুইবোন’ উপন্যাসটি কিনেছিলাম। আর সেটি সম্ভবত আমার প্রথম বই কেনা। এর আগে কবিগুরুর সাথে আমার পরিচয় হয়েছে পাঠ্যবইয়ে তাঁর লেখা কবিতা পড়ে। আমার বয়স এখন আটাশ। এ যাবত রবীন্দ্রনাথের লোকপ্রিয় লেখাগুলো আমি প্রায় সবই পড়েছি। তাতে আমি যা বুঝেছি, তিনি তাঁর লেখায় হয়তো জীবনের অন্ধকার দিকটিকে এড়িয়ে গেছেন; তবে যা বলেছেন তা প্রেম বা বিরহ যাপনে সভ্য ও আধুনিক হতে শেখায় আমাদের। আধুনিকতা সম্বন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর বিশুদ্ধ আধুনিকতাটা কী, তাহলে আমি বলব, বিশ্বকে ব্যক্তিগত আসক্ত ভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদগতভাবে দেখা, এই দেখাটাই উজ্জ্বল, বিশুদ্ধ; এই মোহমুক্ত দেখাতেই খাঁটি আনন্দ। আধুনিক বিজ্ঞান যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে আধুনিক কাব্য সেই নিরাসক্ত চিত্তে বিশ্বকে সমগ্রদৃষ্টিতে দেখবে, এইটেই শাশ্বতভাবে আধুনিক। কিন্তু একে আধুনিক বলা নিতান্ত বাজে কথা। এই যে নিরাসক্ত সহজ দৃষ্টির আনন্দ, এ কোনো বিশেষ কালের নয়; যার চোখ এই অনাবৃত জগতে সঞ্চরণ করতে জানে এ তারই।’
আমি মনে করি, আমাদের সমসাময়িক বিদেশী সাহিত্যকে নিশ্চিত প্রত্যয়ের সঙ্গে বিচার করা নিরাপদ নয়। তবে একথা সত্য যে, আধুনিক ইংরেজি সাহিত্য সম্বন্ধে আমি যেটুকু অনুভব করি সে আমার সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতা থেকে, তার অনেকখানিই হয়তো অজ্ঞতা। এ সাহিত্যের অনেক অংশের সাহিত্যিক মূল্য হয়তো যথেষ্ট আছে, কালে কালে তার যাচাই হতে থাকবে। আমি যা বলতে পারি তা আমার ব্যক্তিগত বোধশক্তির সীমানা থেকে। আর সেটা রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সাথে মিলিয়ে এর মিল বা অমিল বের করে! জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সভ্যতার মধ্যে পার্থক্যের রূপ অনুধাবন করেন। জীবনের আশি বছর পেরোনোর পর তিনি তার দেখা সভ্যতার রূপ মূল্যায়ন করেছেন। সভ্যতার রূপ-দর্শন প্রারম্ভিক জীবনে এবং রূপ দেখা ও উপলব্ধি শেষ জীবনে। সভ্যতার কথা বলতে গিয়ে তিনি মূলত পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের রূপ-দর্শনের কথা বলেছেন। পাশ্চাত্যের সভ্যতার কথা বলেছেন ইউরোপকে কেন্দ্র করে। প্রথম জীবনে ইংরেজি সাহিত্যের ভেতর দিয়ে পাশ্চাত্যের সভ্যতার পরিচয় উদঘাটন করার প্রয়াস পেয়েছেন। তখনকার ইংরেজি ভাষার ভেতর দিয়ে ইংরেজি সাহিত্যের যে মার্জিতমনা বৈদগ্ধের পরিচয় পাওয়া যায় সে কথা বলেছেন। বার্কের বাগ্মিতায়, মেকলের ভাষাপ্রবাহের তরঙ্গভঙ্গে, শেক্সপিয়রের নাটক আর বায়রণের কাব্যে তিনি ইউরোপের সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন। নবীন বয়সে তিনি ব্রাইটের বক্তৃতা শুনে মনে করেছিলেন সেটাই বুঝি 'চিরকালের ইংরেজের বাণী'। প্রসঙ্গক্রমে তিনি প্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সভ্যতার কথাও বলেছেন। তিনি জাপান সফরকালে দেখেছেন, কিভাবে জাপান যন্ত্রচালনার মাধ্যমে সর্বতোভাবে সম্পদশালী হয়ে উঠেছে। তিনি রাশিয়ার অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে সে দেশের 'মুর্খতা ও দৈন্য ও আত্মবমাননা' দূর হয়ে যেতে দেখেছেন। এই সভ্যতা জাতিবিচার করেনি, বিশুদ্ধ মানব সম্বন্ধের প্রভাব সর্বত্র বিস্তার করেছে। তিনি পারস্যের কথা বলেছেন। পারস্য একদিন ইউরোপীয় জাতির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছিল। কিন্তু এই নিদারুণ আগ্রাসন থেকে মুক্ত করে পারস্য আত্মশক্তির পূর্ণতা সাধনে সাফল্য লাভ করেছে।
কবিগুরু ভারতবর্ষ ও চীন দেশের সম্পর্কে  বলেছেন, ইংরেজের সভ্যশাসনের জগদ্দল পাথর নিয়ে তলিয়ে পড়ে রইল নিরুপায় নিশ্চলতার মধ্যে, চৈনিকদের মতন এত বড় প্রাচীন জাতিকে ইংরেজ স্বজাতির স্বার্থসাধনের জন্য বলপূর্বক অইফেল বিষে জর্জরিত করে দিলে এবং তার পরিবর্তে এক অংশ আত্মসাৎ করলে। সভ্যতার স্বরূপ দর্শনে স্পেনের প্রজাতন্ত্র সরকারকে ইংরেজ কিভাবে কৌশল প্রয়োগে নির্জীব করে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ সেই চিত্রও দেখেছিলেন। সভ্যতায় এই সংকট রবীন্দ্রনাথকে বিমর্ষ করে তুলেছিল। তারই প্রেক্ষিতে তিনি বলেছেন, 'ইংরেজকে একদা মানবহিতৈষীরূপে দেখেছি এবং কী বিশ্বাসের সঙ্গে ভক্তি করেছি। ইউরোপীয় জাতির এই শোচনীয় ইতিহাস আমাকে জানতে হলো।' রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় তার মোহমুক্তি। ভারতবর্ষ যে ইংরেজ সভ্যতা মুক্তির বদলে শক্তি দিয়ে পরাভূত করেছে এই সত্যের মধ্যেই রয়েছে তার মোহমুক্তির রূপ। তিনি বলেছেন, 'পাশ্চাত্য জাতির সভ্যতা তারা শক্তি দিয়ে দেখিয়েছে, মুক্তিরূপে দেখাতে পারেনি।'
নবআধুনিক পশ্চিমা সমাজে একসময় যৌনকাতরতা, ক্ষুধা, আর্থিক মন্দার ভেতরে যন্ত্রণাকাতর জীবনের উচ্চাকাক্সক্ষা নতুন করে দেখা দিল। সামাজিক-রাজনীতিক-আর্থিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিটি পর্যায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যন্ত্রসভ্যতার প্রতি অনাস্থা পশ্চিমা দুনিয়ায় মানব অস্তিত্বে সংকট ঘনীভূত করে এবং সৃষ্টি করে একরাশ নৈরাশ্য। সাহিত্যিক না হলেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নিজের বিশেষ আগ্রহ থেকে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন Tagore and His India তে উল্লেখ করেছেন যে, খোদ ভারতেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত প্রচারণায় গলদ রয়েছে। তাঁকে পুরাণের খোলস থেকে বের করে আনাকে নিজের প্রধান কাজ বলে তিনি মনে করেছেন। রবীন্দ্রনাথের আন্তর-জটিলতা ও অসঙ্গতি সম্পর্কে অমর্ত্য সেন সচেতন ছিলেন। তিনি চেষ্টা করেছেন তাঁর সর্বোচ্চ মৌলিকতা তুলে ধরতে। কিন্তু ‘আধ্যাত্মবাদী’ ও ‘প্রতি-আধুনিক’ হিসেবে তাঁর ইমেজের কাছে বাকি সবকিছু ম্লান হয়ে যায় বলে তার ধারণা। রবীন্দ্রনাথকে রেনেসাঁ-পুরুষ হিসেবে তুলে ধরতে তিনি ১৯৯৫ সালে Rabindranath Tagore: The Myriad-Minded Man রচনা করেন। সেখানে তিনি দেখান যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র ইত্যাদি তাঁর সৃষ্টিশীলতার পূর্ণ প্রকাশ নয়। তাঁর দু’হাজারের বেশি গান এবং আড়াই হাজারের মতো ছবি রয়েছে যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যমাত্রা তুলে ধরে। মজার ব্যাপার হলো, যখন ‘গীতাঞ্জলি’ প্রতীচ্যে অভ্যর্থনা পেয়েছিল তখন তাঁর গদ্যরচনা সম্পর্কে কোনো খোঁজ ছিল না। কিন্তু এখন অনেকেই মন্তব্য করেন যে, তাঁর গদ্যরচনা সহজেই নোবেল পুরস্কার নিশ্চিত করতে পারত। তাঁর অন্যান্য অর্জন সম্পর্কে মানুষ এখন জানতে পারছে। কমিটি তাঁকে নোবেল পুরস্কার দিয়েছিল যে বিবেচনায় সে সম্পর্কে একস্থানে বলা হয়েছে:...because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West. তাঁর সাহিত্য বিষয়ক অর্জনের বাইরে কমিটির পর্যবেক্ষণে আরো ধরা পড়েছিল যে, সভ্যতার দুই অংশ, পূর্ব-পশ্চিম ব্যাপকভাবে বিভক্ত, কিন্তু এই দুর্বল যোগাযোগের মূলে যে ঔপনিবেশিক কারণ বিদ্যমান সে সম্পর্কে তারা খুব সচেতন ছিলেন না। দৃশ্যত, তিনি প্রথম প্রাচ্যবাসী যিনি নোবেল পেয়েছিলেন।
‘প্রাচ্যের বার্তাবাহক’ হিসেবে সারাবিশ্বে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয় দাঁড়িয়ে যায় ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর। তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিপরীতমুখি দৃষ্টিভঙ্গি নানা ধরনের পঠন-পাঠন ও প্রতর্কের জন্ম দেয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ভাবনার বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি করেছিল এবং সেই কারণে মতাদর্শ হিসেবে প্রাচ্যবাদ তাঁর ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্তি ও ভিত্তি লাভ করেছিল। নোবেল বিজয়ী হিসেবে সম্মান প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ভ্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবনের ফলে তাঁর সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে ভুল উপসংহার টানা হয়েছে। ভারতের বাইরে রবীন্দ্রনাথকে প্রাচ্য বা এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে ধরে তাঁর বহুমাত্রিকতাকে শুধুমাত্র ‘আধ্যাত্মিক’, ‘মরমি’ ও ‘প্রতীচ্য বিরোধী’ মতবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সংকীর্ণ সীমারেখার মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলেছে। এই ধারণার বিপ্রতীপে বিগত একশ বছরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নে যে অস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে প্রাচ্যবাদ হতে পারে তা পর্যবেক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এশিয়ার অন্যান্য দেশের ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে নোবেল প্রাপ্তির পরে। এরপর থেকেই প্রতীচ্যে তাঁকে প্রাচ্যের বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯১৬ ও ১৯২৪ সালে যখন তিনি যথাক্রমে জাপান ও চীনে গেলেন তখন তাঁর কবি পরিচয়ই মুখ্য ছিল। জাপানে তাঁর লব্ধ অভিজ্ঞতায় তিনি আরো ভালোভাবে পূর্ব-পশ্চিমের বিভাজন বুঝতে পেরেছিলেন। জাপানেই তিনি প্রথম ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সার্থক সমন্বয়ের স্বরূপটি উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে কথা তিনি অনেককে বলেছেন। জাপানি সমাজের এই রূপটি তিনি তাঁর Nationalism প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। এশিয়া পশ্চাৎপদ কারণ তা অচলায়তন আঁকড়ে থাকতে পছন্দ করে, প্রগতির পথে বিচরণে তার অনিহা, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন না যে জাপান পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করে আধুনিক হয়েছে। তিনি ভিতর থেকে আধুনিক হওয়া ও বাইরে থেকে আধুনিক করার মাঝে এক ধরনের পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ১৯২৪ সালের বিতর্কিত চীন সফর নিয়ে চীনা বুদ্ধিজীবীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তাঁরা মেনে নেন যে চীনা সাহিত্যের ওপর রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের ভিত্তিতে প্রাচ্য-সভ্যতায় রবীন্দ্রনাথের অবদানের পুনঃমূল্যায়ন শুরু হয়। বিশ্বে তাঁর বহুমাত্রিক প্রাসঙ্গিকতা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করতে থাকে। শুরুতে রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র মরমি হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা ছিল ১৯৬১ সালের পর থেকে তা থেকে পাঠকের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে আসতে থাকে। তাঁর কবিতার মূল্য তাঁর শিক্ষাদর্শ ও মানবিক দর্শনের চেয়ে বেশি নয় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে থাকে। অমর্ত্য সেনের মতে, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের মূলে ছিল মানবিকতা, স্বাধীন মতের প্রতি আস্থা ও যুক্তিবাদিতা।
মূলত ঔপনিবেশিক শাসন সূত্রে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সম্পর্কিত ধারণা পেয়েছিলেন। যেখানে রবীন্দ্রনাথের দেশের মানুষ তাকে বাস্তববাদী জীবনসূত্রে দেখতে আগ্রহী সেখানে প্রাচ্যবাদ তাঁকে মূল্যায়নের সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ নয়। তাছাড়া পশ্চিমে তাঁর সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে পশ্চিমারা সেইসব লেখা বেশি পড়ে। একদা আশীষ নন্দী বলেছিলেন যে সব বাঙালি বুদ্ধিজীবীই রবীন্দ্র-পণ্ডিত। এর কারণ রবীন্দ্রনাথ বাঙালিদের কাছে এক আইকনের নাম। ২০১১ সালে The Guardian পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছিল যে, আর কোনো ভাষাভাষির মানুষ তাদের কোনো লেখককে এত সম্মান করে না যতটা বাঙালি করে রবীন্দ্রনাথকে। এর বিপরীতে পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতি এক ধরনের ঔদাসিন্য দেখানো হয়েছে। অক্সফোর্ড বা পেঙ্গুইনের উদ্ধৃতি অভিধানে রবীন্দ্রনাথের কোনো উদ্ধৃতিই স্থান পায়নি। ইয়েটস ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র মুখবন্ধে লিখেছিলেন, as the generations pass, travellers will hum them on the highway and men rowing upon rivers... কিন্তু ইংরেজের আচরণে তা নির্মম পরিহাসের মতো মনে হয়। এই ইয়েটসই ১৯৩৬ সালে The Oxford Book of Modern Verse— এ রবীন্দ্রনাথের ৭টি কবিতা যুক্ত করেছিলেন।
১৮৭৮ সালের অক্টোবরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমে ব্রিটেনে যান। সেবার সেখানে তিনি মাস চারেক ছিলেন। এরপর তিনি ১১—১২ বার ব্রিটেনে যান। আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, কানাডা এবং ইউরোপের ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও গ্রিসে কবি ভ্রমণ করেন। কোনো কোনো দেশে একাধিকবার।ইউরোপের সাহিত্য শুধু পাঠ নয়, কবি ভিক্তর উগো, শেলি, আর্নেস্ট মায়ার্ন, অদ্রে দ্য ভের, পিবি মার্সন, মুর, মিসেল ব্রাঙনিং, ক্রিস্টিনা রসেটি, সুইনবার্ন, হুড, টি এস এলিয়ট এবং জার্মান ভাষায় হাইনরেখ হাইনে ও গ্যেটের কিছু লেখার অনুবাদ করেন।
রবীন্দ্রনাথের রচনা পরবর্তীকালের একাধিক নোবেল বিজয়ী–ইয়েটস, রঁমা রল্যা, আঁদ্রে জিদ, জেনোভিয়া ইমেনেজ, আইভান বুনিন ওস্যঁ-জন পার্স অনুবাদ করেন। ১২৯৪ সালের বৈশাখে ‘সাহিত্য ও সভ্যতা’য় বলেন, ‘দূর হইতে ইংলন্ডের সাহিত্য ও সভ্যতা সম্বন্ধে কিছু বলা হয়তো আমার পক্ষে অনধিকার চর্চা। এ বিষয়ে অভ্রান্ত বিচার করা আমার উদ্দেশ্য নয় এবং সেরূপ যোগ্যতাও আমার নাই। আমাদের এই রৌদ্রতাপিত নিদ্রাতুর নিস্তব্ধ গৃহের এক প্রান্তে বসিয়া কেমন করিয়া ধারণা করিব সেই সুরাসুরের রণরঙ্গভূমি ইউরোপীয় সমাজের প্রচণ্ড আবেগ, উত্তেজনা, উদ্যম, সহস্রমুখী বাসনার উদ্দাম উচ্ছ্বাস, অবিশ্রাম মথ্যমান ক্ষুব্ধ জীবন-মহাসমুদ্রের আঘাত ও প্রতিঘাত–তরঙ্গ ও প্রতিতরঙ্গ–ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি, উৎক্ষিপ্ত সহস্র হস্তে পৃথিবী বেষ্টন করিবার বিপুল আকাঙ্খা! দুই-একটা লক্ষণ মাত্র দেখিয়া, রাজ্যের আভ্যন্তরীণ অবস্থার মধ্যে লিপ্ত না থাকিয়া, বাহিরের লোকের মনে সহসা যে কথা উদয় হয় আমি সেই কথা লিখিয়া প্রকাশ করিলাম এবং এই সুযোগে সাহিত্য সম্বন্ধে আমার মত কথঞ্চিৎ স্পষ্ট করিয়া ব্যক্ত করিলাম।’
ইন্দিরা দেবী চৌধুরীরানীকে এক পত্রে রবীন্দনাথ বলেছেন, ‘‘সেই ছেলেবেলায় যখন আরব্য-উপন্যাস পড়তুম, সিন্ধবাদ নানা নূতন দেশে বাণিজ্য করতে বাহির হত, ভৃত্য-শাসিত আমি তোষাখানার মধ্যে রুদ্ধ হয়ে বসে বসে দুপুর বেলায় সিন্ধবাদ সঙ্গে ঘুরে বেড়াতুম, তখন যে আকাঙ্খাটা মনের মধ্যে জন্মেছিল সেটা যেন এখনো বেঁচে আছে–এই বালিচরে নৌকো বাঁধা দেখলে সেই যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছেলেবেলায় যদি আরব্য-উপন্যাস রবিনসন ক্রুসো না পড়তুম, রূপকথা না শুনতুম, তা হলে নিশ্চয় বলতে পারি ঐ নদীতীর এবং মাঠের প্রান্তরে দূর দৃশ্য দেখে ঠিক এমন ভাব মনে উদয় হত না–সমস্ত পৃথিবীর চেহারা আমার পক্ষে আর-এক রকম হয়ে যেত।’’ আর একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন: ‘ছেলেবেলায় রবিনসন ক্রুসো পৌলভর্জিনি প্রভৃতি বইয়ে গাছপালা সমুদ্রের ছবি দেখে মন ভারী উদাসীন হয়ে যেত–এখানকার রৌদ্রে আমার সেই ছবি দেখার বাল্যস্মৃতি ভারী জেগে ওঠে। এর যে কী মানে আমি ঠিক ধরতে পারি নে, এর সঙ্গে যে কী একটা আকাঙ্খা জড়িত আছে আমি ঠিক বুঝতে পারিনে–এ যেন এই বৃহৎ ধরণীর প্রতি একটা নাড়ীর টান।’
ইউরোপীয় সাহিত্যের ডাডায়িজম্ সম্পর্কে সাহিত্যে নবত্ব-তে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘জল যাদের ফুরিয়েছে তাদের পক্ষে আছে পাঁক। তারা বলে, সাহিত্যধারায় নৌকা চলাচলটা অত্যন্ত সেকেলে; আধুনিক উদ্ভাবনা হচ্ছে পাঁকের মাতুনি–এতে মাঝিগিরি দরকার নেই–এটা তলিয়ে-যাওয়া রিয়ালিটি। ভাষাটাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে, অর্থের বিপর্যয় ঘটিয়ে ভাবগুলোকে স্থানে অস্থানে ডিগবাজি খেলিয়ে, পাঠকের মনকে পদে পদে ঠেলা মেরে, চমক লাগিয়ে দেওয়াই সাহিত্যের চরম উৎকর্ষ। চরম সন্দেহ নেই। সেই চরমের নমুনা ইউরোপীয় সাহিত্যের ডাডায়িজম্। এর একটি মাত্র কারণ হচ্ছে এই, আলাপের সহজ শক্তি যখন চলে যায় সেই বিকারের দশায় প্রলাপের শক্তি বেড়ে ওঠে। বাইরের দিক থেকে বিচার করতে গেলে প্রলাপের জোর আলাপের চেয়ে অনেক বেশি এ কথা মানতেই হয়। কিন্তু তা নিয়ে শঙ্কা না করে লোকে যখন গর্ব করতে থাকে তখনই বুঝি, সর্বনাশ হল বলে।’
১৩১৯ সালে পথের সঞ্চয়-এ ‘কবি ইয়েটস্’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইংলন্ডের বর্তমানকালের কবিদের কাব্য যখন পড়িয়া দেখি তখন ইহাদের অনেককেই আমার মনে হয়, ইহারা বিশ্বজগতের কবি নহেন। ইহারা সাহিত্যজগতের কবি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের সঙ্গে সুইনবর্নের তুলনা করিয়া দেখিলেই আমার কথাটা বোঝা সহজ হইবে। যাঁহারা জগতের কবি নহেন, কবিত্বের কবি, সুইনবর্ন তাঁহাদের মধ্যে প্রতিভায় অগ্রগণ্য। কথায় নৃত্যলীলায় ইঁহার এমন অসাধারণ নৈপুণ্য যে, তাহারই আনন্দ তাঁহাকে মাতোয়ারা করিয়াছে। ধ্বনি-প্রতিধ্বনির নানাবিধ রঙিন সুতায় তিনি চিত্রবিচিত্র করিয়া ঘোরতর টকটকে রঙের ছবি গাঁথিয়াছেন; সে-সমস্ত আশ্চর্য কীর্তি, কিন্তু বিশ্বের উপর তাহার প্রশস্ত প্রতিষ্ঠা নহে।’ ৬ জানুয়ারি, ১৯৩৫ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ইংরেজি সাহিত্যে একদা আমরা বিদেশীরা যে নিঃসঙ্কোচ আমন্ত্রণ পেয়েছিলুম আজ কি তা আর আছে? একথা বলা বাহুল্য প্রত্যেক দেশের সাহিত্য মুখ্যভাবে আপন পাঠকদের জন্য, কিন্তু তার মধ্যে সেই স্বাভাবিক দাক্ষিণ্য আমরা প্রত্যাশা করি যাতে সে দূর নিকটের সকল অতিথিকেই আসন জোগাতে পারে। যে সাহিত্যে সেই আসন প্রসারিত সেই সাহিত্যই মহৎ সাহিত্য, সকল কালেরই মানুষ সেই সাহিত্যের স্থায়িত্বকে সুনিশ্চিত করে তোলে, তার প্রতিষ্ঠাভিত্তি সর্বমানবের চিত্তক্ষেত্রে।
‘নবযুগের কাব্য’-এ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বালক-বয়সেই ইংরেজি সাহিত্যের আঙিনায় যাওয়া-আসা শুরু করেছি। ভাষার আভিধানিক বেড়াটা যেমনি পার হয়েছি অমনি ওখানকার ফলের বাগান থেকে ফল পাড়বার আনন্দে বেলা কেটেছে। যেটুকু বাধা পেয়েছি তাতে ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি বরঞ্চ ঔৎসুক্য বাড়িয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের পথে এই সর্বজনীনতার আহ্বান পেয়েছিলুম একে সমতলতা বললে অসংগত হবে। এর মধ্যে বাঁকচোর উঁচুনিচু যথেষ্ট ছিল। লেখকদের মধ্যে ব্যক্তিগত বৈষম্যের অভাব ছিল না। কিন্তু রূঢ়ভাবে কোনো দেউড়ি থেকে কোনো দ্বারী ঠেকিয়ে রাখেনি।
ইন্দিরাদেবী চৌধুরানী দেবীকে এক পত্রে শেলি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘শেলিকে অন্যান্য অনেক বড়োলোকের চেয়ে বিশেষরূপে কেন ভালো লাগে জানিস? ওর চরিত্রে কোনোরকম দ্বিধা ছিল না, ও কখনো আপনাকে কিম্বা আর কাউকে বিশ্লেষণ করে দেখে নি–ওর একরকম অখণ্ড প্রকৃতি। শিশুদের, এবং অনেক স্থলে মেয়েদের, এই জন্যে বিশেষরূপে ভালো লাগে তারা সহজ স্বাভাবিক, তারা নিজের মনের বিতর্ক কিম্বা থিয়োরি-দ্বারা নিজেকে ভেঙে চুরে গড়ে নি। শেলির স্বভাবের যে সৌন্দর্য তার মধ্যে তর্ক বিতর্ক আলোচনার লেশ নেই। সে যা হয়েছে, সে কেবল নিজের ভিতরকার এ অনিবার্য সৃজনশক্তির প্রভাবেই হয়েছে।’ আর নভেলের আয়তন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের আলোচনায় বলেন, ‘বঙ্কিমবাবুর নভেলগুলি ঠিক নভেল যত বড়ো হওয়া উচিত তার আদর্শ। ভাগ্যে তিনি ইংরাজি নভেলিস্টের অনুকরণে বাংলায় বৃহদায়তনের দস্তুর বেঁধে দেন নি, তা হলে বড়ো অসহ্য হয়ে উঠত, বিশেষত সমালোচকের পক্ষে। এক-একটা ইংরাজি নভেলে এত অতিরিক্ত বেশি কথা, বেশি ঘটনা, বেশি লোক যে, আমার মনে হয় এটা একটা সাহিত্যের বর্বরতা। সমস্ত রাত্রি ধরে যাত্রাগান করার মতো। প্রাচীনকালেই ওটা শোভা পেত। তখন ছাপাখানা এবং প্রকাশক সম্প্রদায় ছিল না, তখন একখানা বই নিয়ে বহুকাল জাওর কাটবার সময় ছিল।’ ১৩৪০ সালে ‘সাহিত্যের মাত্রা’য় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘পশ্চিম-মহাদেশের এই কায়াবহুল অসংগত জীবনযাত্রার ধাক্কা লেগেছে সাহিত্যে। কবিতা হয়েছে রক্তহীন, নভেলগুলো উঠছে বিপরীত মোটা হয়ে। সেখানে তারা সৃষ্টির কাজকে অবজ্ঞা করে ইনটেলেকচুয়েল কসরতের কাজে লেগেছে। তাতে শ্রী নেই, তাতে পরিমিতি নেই, তাতে রূপ নেই, আছে প্রচুর বাক্যের পিণ্ড।
রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ত্রিশকে ছুঁইছুঁই করছে তখন তিনি চাচ্ছেন সরল সুন্দর মধুর উদার লেখা। তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’র মতো বই পড়ে কী সুখ তিনি বুঝতে পারেন না। ত্রিশ পেরিয়ে তিনি বলছেন, সমগ্র মানুষ যেখানে মুক্তিলাভ করেছে সেই সুবৃহৎ অনাবরণের মধ্যে অশ্লীলতা নেই। শেক্সপীয়র, রামায়ণ বা মহাভারত অশ্লীল নয়। কিন্তু এমিল জোলা ও ভারতচন্দ্র অশ্লীল–কেননা সেখানে মানুষ কেবল আংশিকভাবে অনাবৃত। দু-এক বছর পরে তিনি বলছেন, শেক্সপীয়রের ‘ওথেলো’ দ্বিতীয়বার পড়তে তাঁর কিছুতেই মন উঠে না। তার কারণ, ওথেলোর মধ্যে যেটুকু করুণা আছে তা তাঁকে আকর্ষণ করে, কিন্তু নাটকের শেষ অংশের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা তাঁকে বিমুখ করে। শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের কাল, আধুনিকতা আর রুচি বিষয়ক একটি উক্তি দিয়ে। তিনি তাঁর ‘আত্মপরিচয়ে’ বলছেন, ‘রুচির প্রমাণ তর্কে হতে পারে না। রুচির প্রমাণ কালে। কালের ধৈর্য অসীম, রুচিকেও তার অনুকরণ করতে হয়।’