৮৪.
যুগযন্ত্রণা বিদ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ দেখেছিলেন "অদ্ভুত আঁধার এক  এসেছে এ পৃথিবীতে আজ l"
আজকের কবি মনোজ ভৌমিক (দুর্নিবার কবি) বলছেন
"সেদিন যে কুকর্ম অন্ধকারে চলিত,
আজ প্রকাশ্য দিবালোকে ছুটিছে।"


কবিরা ভাবজগতে বিচরণ করেন এটা যেমন সত্য, তেমনই সমসাময়িক যুগযন্ত্রণাকেও তাঁরা অস্বীকার করতে পারেন না l যুগে যুগে তাই দেখি কবিতার মধ্যে এসেছে সেই যুগের সমস্যা নিয়ে কবির ভাবনার কথা l প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ হয়ে আধুনিক, অত্যাধুনিক যুগেও তার ধারা অব্যাহত l


সমস্যা যুগে যুগে নতুন নতুন রূপে এসেছে l আয়োজনের স্বল্পতার ব্যথা যতটা না কবিদের উদ্বেলিত করেছে তার চেয়েও বেশী কবিরা ব্যথিত হয়েছেন মানবিকতার পতনে, মনুষ্যত্বের অপমানে l সুকান্ত, নজরুল রবীন্দ্রনাথ হয়ে সাহিত্যের জগতে আজও কবিদের লেখনীতে এই প্রতিবাদ ধ্বনিত l
আলো এবং অন্ধকার - মানব জীবনের দুটি ভিন্ন দিকের রূপক l আলো জ্ঞানের রূপক, সুশাসন, সভ্যতার দিশারী l ভালবাসা, সৌভ্রাতৃত্ববোধ, সজীবতা, সুবিচার এর ব্যবস্থাপক l
অপরদিকে অন্ধকার অজ্ঞানতার রূপক l মানব জীবনে যা কিছু অনাকাঙ্খিত তার সমধর্মী l মানবিকতার পতন, মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনা, কৃত্রিমতা অন্ধকারের সহোদর l


অন্য সকল প্রাণীর মতো মানুষ যখন এই পৃথিবীতে প্রথম এলো, সেও ছিলো অসহায় l তারপর তার অধ্যবসায়, জ্ঞান, বুদ্ধি, আরও এগিয়ে যাবার বাসনা মানুষকে ক্রমে অগ্রগতির পথে নিয়ে গেছে l যুগে যুগে কতো মহাপুরুষ, চিন্তা নায়কেরা এসেছেন l তাঁদের অমোঘ বাণী মানব সভ্যতাকে নতুন নতুন দিশা দিয়েছে l বিজ্ঞান প্রযুক্তি সাহিত্য শিল্পকলা সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে l
কিন্তু সমান্তরালভাবে চলেছে একশ্রেণীর মানুষের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস l তাই আদিম যুগ থেকে অদ্যাবধি মানবচরিত্রের এই অন্ধকার দিক সভ্যতাকে, মানুষের বেঁচে থাকাটাকে দুর্বিষহ করেছে, কলঙ্কিত করেছে বারে বারে l কবি সাহিত্যিকদের লেখায় তার প্রতিফলন দেখি l


বর্তমান দিনে প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের লোভ এত চরম হয়েছে যে সে তার বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলেছে l সভ্যতার আলো ম্লান হয়ে গেছে l অভিমানাহত কবি বলছেন মানবমনের এই পতন কৃত্রিম আলো দিয়ে আলোকিত করবার দরকার নেই l অন্তঃস্থলে যে অন্ধকার আছে বাইরেও তার প্রকাশ হোক l ভন্ডামির আলো দিয়ে মনুষ্যত্বহীনতার এই অন্ধকার গোপন করার প্রয়োজন নেই l "প্রগাঢ় অন্ধকার নেমে আসুক পৃথিবীর বুকে l" এই অনাচার, অন্ধকার অনুন্নত অতীতে ছিলো l আবার নেমে আসুক ধরণীর কোলে l অন্তঃসারশূন্য এই কৃত্রিম আলো, এই শঠতা কবির অসহ্য l


কবি বিষাদের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন, কিছু মানুষের লোভ, প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রতিনিয়ত কিভাবে সাধারন আপামর মানুষের বেঁচে থাকাটাকে দুর্বিষহ করে তুলছে l জল স্থল অন্তরীক্ষে চলছে বিজয়ের অভিযান l পৃথিবী তার সজীবতা হারিয়েছে l যথেচ্ছভাবে সবুজ প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে l রুক্ষতায়, ধূলিধূসরতায় পৃথিবী আবৃত হয়েছে l বড় বড় অট্টালিকা আকাশ ছুঁয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন l মানুষের চাওয়ার যেন শেষ নেই l আমিত্ববোধ গ্রাস করেছে মানবজাতিকে l সমষ্টি চিন্তা, আত্মীয় পরিজনদের প্রতি কর্তব্য, সব অবহেলিত আজ l ধর্মকে রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে l ক্ষমতার স্বার্থে এক গোষ্ঠীর মানুষকে অপর একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে l হিংসাকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে l অন্ধকার বর্বর আদিম যুগে যে নৃশংসতা ছিলো, আজকের এই উন্নত জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগেও সেই কুকর্ম প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসমক্ষে সংঘটিত হচ্ছে l মানুষ হিংস্র শ্বাপদ প্রাণীদের থেকেও বিপজ্জনক হয়েছে l নারীদের শ্লীলতাহানি হচ্ছে l কিন্তু বিচার নেই l অপরাধীদের শাস্তি নেই l দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁক গলে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে l নতুন অপরাধ উৎসাহিত হচ্ছে l মহাভারতে এক দ্রৌপদী  পুরুষদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন l আর আজ পথে পথে নিত্য এজাতীয় ঘটনা ঘটে চলেছে l কিন্তু প্রশাসনের কোনো হেলদোল নেই l


সভ্যতার নামে এই অনাচার কবি দেখতে চান না l তিনি চান এই ভন্ডামি, এই শঠতার অবসান l আলো যদি তার অর্থ হারায়, সেই আলোকে নিভিয়ে দিতে চান কবি l বরং ধরিত্রীর বুকে নেমে আসুক নিকষ অন্ধকার l
মুখ ও মুখোশের ব্যবধান ঘুচে যাক l সভ্যতার এই নগ্ন রূপ দেখতে চান না কবি l আলোটা নিভিয়ে চির ঘুমে ঘুমিয়ে পড়তে চান তিনি।


যুগযন্ত্রণার ছবি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি l
কবিকে শুভেচ্ছা l