১৪৩.
"সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শতকর্মে রত
তুই শুধু ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মত
মধ্যাহ্নে মাঠের মাঝে একাকী বিষন্ন তরুচ্ছায়ে
দূর বনগন্ধবহ মন্দগতি ক্লান্ত তপ্ত বায়ে
সারাদিন বাজাইলি বাঁশী।"
(এবার ফিরাও মোরে - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)


আসরের নতুন সংযোজন বিশিষ্ট কবি আবিদ আনোয়ার মহাশয়ের "আমি কার খালু" কবিতাটিতে পাই আত্মানুসন্ধানের এক প্রয়াস l
জগৎসংসার একটি হাটের মতো l জীবনসংগ্রামে রত মানুষজন l জীবনের শুরু হয় l হাট বসে l জীবনভর এই হাটে বিকিকিনি চলে l প্রতিটি মানুষ এখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা l নিজ নিজ ভূমিকা সম্বন্ধে সচেতন l সকলেই নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত l বিক্রেতা চান তাঁর জিনিসের জন্য সর্বোচ্চ দাম l আর ক্রেতা চান সস্তা দরে তাঁর সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র l পরস্পরের সুবিধাজনক শর্তে বিনিময় চলে l জীবন এগিয়ে চলে সামনের পানে l দিনভর হাট চলে যেমন করে মানবজীবন অতিবাহিত হয় l প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণের পর ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন l এই বিশাল জগতে প্রতিটি মানুষ তার নিজের জায়গা খুঁজে নেবার চেষ্টা করেন এবং খুঁজেও পান l বৈষয়িক এই জগতে মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক যে লেনদেনের সম্পর্ক সেই সম্পর্কে মানুষ আবদ্ধ হন l কোথাও ক্রেতা, আবার কোথাও বিক্রেতা - নিজ ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করে জীবন অতিবাহিত করেন l জীবনের যখন যবনিকাপাত হয়, দিনাবসানে হাট ভেঙে যায়, অন্ধকার টেনে ধরে দিগন্তের ফিকে লালসালু, মানুষ ফিরে যান তাঁর নিজের আবাসে l
কিন্তু একজন অনুভবী ব্যক্তিত্ব, সংসারের বৈষয়িক কাজকর্মের মধ্যে যিনি আবদ্ধ নন, যিনি খুঁজে বেড়ান জীবনের প্রকৃত অর্থ, কেন এই ধরায় আসা, জগদীশ্বরের সঙ্গে কি তাঁর সম্পর্ক, তাঁর সঙ্গে মিলনের সূত্রটাই বা কি - এমন নানা প্রশ্নে জর্জরিত একজন কবি l তিনি আত্মপরিচয় সন্ধানে উন্মুখ l জগৎসংসার যখন শতকর্মে ব্যস্ত, কবি তাঁর নিজ সম্পর্কের অর্থ খুঁজছেন l তাঁর আত্মীয় খুঁজছেন l তিনি সম্পর্কে যাদের আত্মীয় তাদের সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন l তাঁর পরমাত্মীয়কে খুঁজছেন l
তিনি খুঁজে চলেছেন, ডেকে চলেছেন l কিন্তু সাড়া পান নি l জগৎসংসারের কোলাহলে তাঁর আন্তরিক ডাক চাপা পড়ে যাচ্ছে l জগতের কোণে কোণে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন l কানফাটা চিত্কারের মধ্যেও সকলে নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে চলেছে l বিক্রেতা তার সুবিধামতো দর হেঁকে চলেছে l ক্রেতারা নিজ নিজ প্রয়োজনমতো জিনিসপত্র ক্রয় করে চলেছেন l সাহেব থেকে ভিখিরি - কেউ বাদ নেই l সকলেই নিজ নিজ মোক্ষলাভে ব্যস্ত l
শুধু কবি দিকভ্রান্ত l তিনি জানেন না এই পৃথিবীতে তিনি কেন এসেছেন l তিনি হয়তো কাউকে হারিয়ে ফেলেছেন l তাকেই খুঁজছেন l নাকি নিজেকেই খুঁজছেন ? তিনি কোথা থেকে এসেছেন এব্যপারেও নিশ্চিত নন l তাঁর প্রকৃত আত্মপরিচয় সম্বন্ধেও তিনি সন্দিহান l
তিনি খুঁজছেন এমন একজন মহানুভব ব্যক্তিকে যিনি এই জীবন শেষ হবার পুর্বে তাঁকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় ঠিকঠাক বলে দিবেন l
জীবনের অন্য সব ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া, যা পেয়ে একজন সাধারণ মানুষ খুশি হন, নিজের জীবনকে সার্থক মনে করেন, কবির এই পাওয়াটুকুতে পরিতৃপ্তি নেই l তিনি খুঁজে চলেন মহত্তম কিছু, জীবনের পরমার্থ l তাঁর চারপাশে মানুষজন নিজেদের কর্মব্যস্ততা নিয়ে চলে, জীবনরূপ হাটে সারাদিন ধরে বিকিকিনির শেষে সন্ধ্যা নামে l অন্ধকার ঘিরে ধরে চারিদিক l সন্তুষ্ট মনে মানুষজন ওপারে পারি দেয় l কিন্তু কবির মনে সন্তুষ্টি থাকে না l তিনি খুঁজে চলেন তাঁর জীবনরহস্যের সমাধান l বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে তাঁর অস্তিত্বের বন্ধনের সূত্র l আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের পথ l
সহজ বর্ণনার প্রেক্ষাপটে গভীর অর্থবাহী কবিতাটি
পাঠককে আলোকিত করে  l
কবিকে জানাই সশ্রদ্ধ স্বাগতম l