৭৬.
করুণরসের কবিতা ! জীবন কিছু দিলো না বধূটিকে l অনেক দুঃখে কঠোর সিদ্ধান্ত l
দুইভাবে কবিতাটিকে বিশ্লেষণ করা যায় l এক, ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে ঘটেছে l এবং দুই, যেভাবে ঘটতে পারত l
কবিতাটির বর্তমান রূপে এটি বাস্তবতার এক অসাধারণ চিত্রণ হয়েছে l কতটা গ্লানিতে জীবন ভরে গেলে একজন নারী শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ নেয়, তার উপস্থাপনে এক সমাজচিত্র পাই যা দেখায় সংসারে কতো জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে কিছু নারীকে জীবন অতিবাহিত করতে হয় l ভালো রচনা l
কিন্তু অন্য এক বিচারে বলা যায়, কবি সাহিত্যিকদেরও কিছু সামাজিক দায় আছে l সেই দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে মনে হয় আর একটু বাড়তি কিছু করার সুযোগ ছিল l জীবন থেকে চরিত্র নেয়া হয়েছে l কিন্তু সেই চরিত্র গতি হারিয়েছে, দিশা পায় নি l  
মানুষের জীবনে বিপদ কতো আকারে আসে l প্রথমে স্বামী, তারপর তার সঙ্গদোষে সন্তান l
কষ্টের আয়, কেড়ে নেয় মাতাল সন্তান l
শেষ ভরসা সেটিও যায় l
জীবনের আকর্ষণ চলে যায় l
নিষ্ঠুরতা কতো বিচিত্ররূপে আঘাত হানে l
কিন্তু হেরে যাওয়া কেন ? কার স্বেচ্ছামৃত্যু ? অন্যের দোষে মায়ের নিজের কেন ? এখানেই দ্বিতীয় বিচারে ওঠে প্রশ্ন l
এখন নারীসমাজকে তার নিজের জন্যও বাঁচার পাঠ নিতে হয় l
স্বামী যদি দায়িত্বহীন হয়, ছেলে যদি কুলাঙ্গার হয়, নিকুচি করেছে অমন সংসার l সবাইকে ত্যাগ করে মেয়েদের নিজের জন্য বাঁচা অভ্যাস করতে হবে l
কবিতাটি ভালো লেগেছে l একেবারে বাস্তব চিত্র l সেই বিচারে কবিতাটি রচনা হিসেবে উৎকৃষ্ট l
কিন্তু বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে, কল্পনাকে আশ্রয় করে, আত্মনির্ভর, দৃঢ়চেতা, ব্যক্তিত্বময়ী মহিলার চিত্র আঁকার অবকাশ ছিল l সেই মহিলাই তো প্রেরণা হয়  অন্যের কাছে বাঁচার l কাব্যিক সত্য তো সেটাই l  
পুরুষ যদি অযোগ্য হয়, তার জন্য নারী কেন কষ্ট পাবে ? নিজের যোগ্যতায় সে নিজের বাঁচার পথ খুঁজে নিবে l আর নিজের দোষে যে মরছে, সে মরুক গা l মৃত্যু হলে তার হোক l
তার জন্য যে দায়ী নয়, সে কেন স্বেচ্ছামৃত্যু চাইবে !
কবিতার শেষে এই কাব্যিক সত্য সৃষ্টি হয় নি l বাস্তব সত্যের কাছে পরাজিত হয়েছে l পুরো বাস্তব হয়েছে l পরাবাস্তব হয় নি l
পরাবাস্তব কি ? বাস্তব নয়, কাল্পনিক l rational নয়, irrational l Conscious নয়, Unconscious l
বাস্তব থেকে যতটুকু নেবার নিলাম l এরপর কবির কল্পনা, আত্মচেতনা, দর্শন, স্বপ্ন, কল্যাণভাবনা, সৌন্দর্যচেতনা সবের সংমিশ্রণে এক কল্পজগতের, ভাবজগতের নির্মাণ l নাই বা হলো সত্যের সঙ্গে তার শত শতাংশ মিল l
বাস্তব এবং স্বপ্ন পরস্পর বিরোধী দুটি জগৎ l এই দুই জগতের মিলনের প্রয়াসই পরাবাস্তবতা l conscious এবং unconscious দুটি ভিন্ন জগৎ l unconscious সত্তা prominent হয়ে যখন conscious world এর rational জগৎটাকে challenge করে, তখনই পরাবাস্তব শিল্প তৈরী হয় l এক চোখ বন্ধ করে সেই বন্ধ চোখ দিয়ে খোলা চোখের জগৎটাকে দেখা l নিজের ভেতরে, uncinscious mindকে সক্রিয় করে তোলা ও তার চোখে বিষয়টিকে দেখা l
নারীশক্তির পরাজয় না দেখিয়ে এখানে নারী প্রত্যাঘাত করতে পারত l একা সরে গিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করতে পারত l
যা হয় তা যেমন সত্য, যা হতে পারত, কবিকল্পনায় তার রচনা ও উপস্থাপন মহত্তর কাব্যিক সত্য  
l মেয়েটি সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজে বেঁচে, একই সমস্যাগ্রস্ত অপরকে বাঁচার পথ দেখিয়ে অনুপ্রাণিত করতে পারত l
যাই হোক, কবির এটা স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে তিনি তাঁর চরিত্রকে কি ভাবে দেখতে চান l আর কবিতা সাহিত্যেরও অনেক ধারা আছে l নিরেট বাস্তব দিয়েও মহৎ সাহিত্যের বহু নিদর্শন আছে l সমাজকে তার প্রকৃত চিত্র চিনিয়ে দেওয়া l এও এক সামাজিক দায় l
কবিতাটির প্রকাশভঙ্গি, শব্দচয়ন সুন্দর l আবেগ আছে l হৃদয়স্পর্শী l পাঠে সাবলীলতা আসে l
ভালো একটি কবিতার জন্য কবিকে অভিনন্দন !