৬৬.
উৎসব মানুষের জীবন যাপনের এক অনুসঙ্গ l জীবিকার্জনের জন্য সারা বছরের অর্থকরী শ্রমের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে রয়েছে নানা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন l নারী পুরুষ, শিশু বৃদ্ধ, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই এই আনন্দানুষ্ঠানের অংশীদার l এক একটি উৎসব মানব সভ্যতার বহুধা বিস্তৃত সংস্কৃতি ও ইতিহাস চেতনার সাক্ষ্য বহনকারী l প্রতিটি উৎসব বৈশিষ্ট্যে, আনুষ্ঠানিকতায় ও তার নিজের বার্তায় সমুজ্জ্বল l


ঈদুল ফিতর অর্থাৎ "রোযা ভাঙার দিবস" ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি l দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা।
ঈদ শব্দের অর্থ উৎসব l দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখা বা সিয়াম সাধনার পর এই দিনটি মুসলিম ধর্মালম্বীরা নানা ধর্মীয় কর্তব্যপালনসহ খুব আনন্দর সাথে পালন করেন l  
এদিন ছুটি থাকে l আত্মীয় পরিজন বিদেশে থাকলে এসময় বাড়ি আসে l ফলে বাড়ীর সকল সদস্যের আনন্দ দ্বিগুণ হয় l ঈদের নামাজের পর কোলাকুলি করা, পরিবার এবং বন্ধুদের নিয়ে ভ্রমণ, চিরাচরিত মিষ্টি খাবার, সুগণ্ধি ব্যবহার, নতুন জামাকাপড় পরা, উপহার দেওয়া ইত্যাদি চলে l
ঈদের দিনে সেমাই সবচেয়ে প্রচলিত খাবার।  ঈদ অধিকাংশ পরিবারে ঈদের সময়েই নতুন পোশাক কেনা হয়। পত্র-পত্রিকাগুলো ঈদ উপলক্ষে ঈদ সংখ্যা নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে।  
ঈদ উৎসবের এই পটভূমিতে একটি পরিবারে এক শোকাবহ ঘটনা ঘটে l সেটিই এই কবিতার বিষয় l সকাল থেকেই সকলের মন খুশিতে ভরে আছে l এর মাঝে একটি শিশু সেনাবিভাগে কর্মরত তার বাবার বাড়ি আসার অপেক্ষায় চঞ্চল l তার নতুন লাল রঙের জামা কেনা রয়েছে কিন্তু সেটা সে এখনও গায়ে দেয় নি l তার চোখ সেঁটে রয়েছে ফটক দরজায়, কখন তার বাবা এসে পৌঁছান তার অপেক্ষায় l সময় কেটে যায় l বেলা হয়ে যায় l কিন্তু বাবা এসে পৌঁছান না l ঈদ উপলক্ষ্যে সিরনি কাবাব সেমাই পায়েস - সব রান্না হয়েছে l কিন্তু সেগুলি আজ বিস্বাদ লাগে শিশুর l তেতো লাগে l শুধু বাবার আসার অপেক্ষা l বাবা তো আসে না ! এদিকে সময় বয়েই চলে l মা বিষয়টি লক্ষ্য করেন l এমন খুশির দিনে তার মুখটা ভার কেন, প্রশ্ন করেন l শিশু উত্তর দিতে গিয়ে দেখে তার মায়ের চোখের কোনগুলোও লাল l অর্থাৎ তিনিও স্বামীর আসবার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিষন্ন l শিশু বলেই ফেলে, সে যেমন ভোর থেকে  তার বাবার অপেক্ষায় রয়েছে, তার মাও নিশ্চয় একই কারনে আড়ালে চোখের জল ফেলেন l মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন l তার বাবা এবছর ঈদের দিনে যে তাদের ফাঁকি দিয়েছেন, কথা দিয়েও এসে পৌঁছান নি, এ বিষয়ে নিশ্চিত হন তিনি l
এইভাবে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে, আশায়, হতাশায় খুশির ঈদের সারাটা দিন পার হয়ে যায় l সন্ধ্যা আসে l
ঈদের চাঁদ তার মনোরম স্নিগ্ধ কিরণ আশীর্বাদ-স্বরূপ জগতের সব মানুষের মাথায় বর্ষন করে l এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ l আশা-আশঙ্কার শীতল স্রোত  বয়ে যায় ঘরের লোকেদের হৃদয়ের ভিতর l ছুটে গিয়ে দরজা খোলে l একজনের স্বামী, একজনের পিতা যুদ্ধে বীরগতিপ্রাপ্ত হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন l তাঁর মৃতদেহ ভেতরে আসে l ঈদের চাঁদ শহীদের মুখে আলো ছড়ায় l
লাল জামা যেটা পড়া হয় নি তার ওপর আলো ছড়ায় l খুশির ঈদের সন্ধ্যায় কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা পরিবার l
  
এক বধূর কাছে তার জীবনসঙ্গী, এক শিশুর কাছে তার বাবা ঈদের চাঁদের মতো ভরসা ও আশ্রয়ের স্থল l খুশির ঈদের এরকম এক দিনে, যখন শোকাবহ ঘটনাটি ঘটে যায়, শহীদের দেহ এসে পৌঁছয় বাড়িতে, ঈদের চাঁদের হাসিও ম্লান হয় l তার চোখে অশ্রু আসে l


হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীকে শান্তির পাঠ দেয় ঈদের চাঁদ l
যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার কথা বলে l যুদ্ধ সর্বদাই বিপদ ডেকে আনে - সতর্ক করে l যুদ্ধে শুধু ক্ষয়, মানবতা ধ্বংস হয় l


সুন্দর ছন্দময় কবিতাটি l খুশির ঈদের দিনে জগৎবাসীকে চির খুশির চাবিকাঠি শান্তি ও সহযোগিতার পথ অনুসরণের বার্তা দিয়েছেন কবি l
"ঈদের চাঁদ" কবিতার কবি রিঙ্কু রায় (আবৃত্তিকার) কে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই l