৮৫.
সৃষ্টির শুরুতে মানুষ ছিলো একা l তারপর সে সমাজ তৈরী করল l সমাজ তৈরির প্রাথমিক শর্ত ছিলো পরস্পরকে সাহায্য করা l তারপর আমরা আজকের দিনে এসে পৌঁছেছি l এমন এক সমাজব্যবস্থার মধ্যে এসে পড়েছি যখন পরস্পরকে সাহায্য করার প্রশ্নে আমরা হাজার বার চিন্তা করি এবং হাজারতম চিন্তার শেষে সিদ্ধান্ত নেই, "live myself. Let others live themselves." অর্থাৎ নিজে বাঁচ l অপর ব্যক্তি নিজের ঝামেলা নিজে সামলাক l
মানুষের জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার নিরাপত্তা l তার নিজের নিরাপত্তা l পরিবারের নিরাপত্তা l বন্ধু সহকর্মীদের নিরাপত্তা l আধুনিক নাগরিক জীবনে পদে পদে সঙ্কট l সমাজ এখন আগের সেই অবস্থায় নেই যখন বয়স্ক মানুষজন তাঁদের বয়সের অধিকারে সমাজে একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন l তাঁদের কথার গুরুত্ব ছিলো l কোনো ঘটনায় তাঁরা যা বলতেন সেটাই শিরোধার্য ছিলো l সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁরা দৃঢ় অবস্থান নিতেন এবং তার মর্যাদাও পেতেন l একটা ন্যায়পরায়নতার পরিবেশ ছিলো l
কিন্তু সমাজ এগুতে এগুতে এত এগুলো, ক্ষমতার কেন্দ্র পাল্টে গেলো l এখন পথে ঘাটে দাপট তাদের যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত l যুবক বয়সী ছেলেরা, কিংবা তার থেকেও বয়সে কম, দলে দলে এক একটি এলাকার দখল নিয়ে বসে আছে l তাদের পকেট ভর্তি কি সব l অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাসক দলের অনুগ্রহপুষ্ট l ওই এলাকার হর্তা কর্তা বিধাতা তারাই l তারা যা করবে সেটাই আইন l তারা যদি কোনো অন্যায় করে, তার বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না l থানাপুলিশ করা যাবে না l যদি কোনো নিরীহ গোবেচারা মানুষ তা করতে গেছেন, এমন শিক্ষা তিনি পাবেন, নিজের শিক্ষায় গোটা এলাকাটাকে শিক্ষিত করে ছাড়বেন l কথায় বলে, কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে l ঠেকে শেখা ঐ লোকটিকে দেখে অনেকে শিখবেন l
ভবিষ্যতে কেউ আর ঐ কাঁচা কাজটি করতে যাবেন না l অতএব, চুপচাপ থাকো l ভগবান অন্ধ করে পাঠালে ভালো, বধির করে পাঠালে ভালো, নাহলে নিজের থেকে চোখ কান বন্ধ করতে হবে l আপনি বাঁচলে বাপের নাম l
পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো, যখন কোনো অপরাধ হয়তো সংঘটিত হয় নি, কোনো মানুষ হয়তো পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়েছেন, বা কোনো মহিলা রাতবিরাতে কোনো অসুবিধায় পড়েছেন, সেক্ষেত্রেও তাদের সাহায্য করতে আসতে মানুষ ভয় পান, পাছে পুলিশ, কোর্ট-কাচারির ঝামেলায় পড়ে যাবেন, এই ভয়ে l ফলে সমাজে তৈরী হয়েছে এক অ-সামাজিক  পরিবেশ যেখানে কেউ কারো নয় l সবাই একা l শুধু নিজ নিজ পরিবার এর মধ্যে আবদ্ধ l
ঠিক এই বিষয়টি কবি শ. ম. শহীদ তাঁর "ঝুট-ঝামেলা" কবিতাটিতে সুন্দরভাবে মেলে ধরেছেন l লিমেরিকধর্মী দুটি স্তবকে তিনি বিষয়টিকে এনেছেন l মানুষ এখন কোনো ঝুট ঝামেলায় যেতে চান না l যদি কোনো অপ্রীতিকর বা হিংসার ঘটনা চোখের সামনে ঘটে, কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, মানুষ তার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয় l এমনকি বিপদাপন্ন মানুষকে সাহায্য করতেও তিনি ভয় পান, পাছে আইন প্রশাসন উল্টো তাঁদেরই নাস্তানাবুদ করে l শান্তিপ্রিয় সুশীল সমাজ সব রকমের ঝুট ঝামেলা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখেন l
এর মাঝেও কিছু মানুষ পরের উপকারে এগিয়ে আসেন l ঝামেলা বহন করেন l কিন্তু পুলিশ প্রশাসন তাঁদের ভালো চোখে দেখেন না l সর্বদা সন্দেহ করেন l পুলিশের কাজই হলো সন্দেহ করা l এবং এই কাজটির জন্য তাঁরা বেছে নেন পৃথিবীর যতো পরোপকারী মানুষজনদের l তাঁদের পুরস্কৃত করেন জেলে পুরে দিয়ে l সেই ভালোমানুষদের পরিজনদের এর জন্য বহু ঝামেলা পোহাতে হয় l কারাবাসের কারণে পরিবারের সম্মানহানি হয় l কিছু লোক হয়তো তখনও তাঁদের ভালমানুষির জন্য তাঁদের প্রশংসা করেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক জেলবন্দী এই রবিনহুডদের নিন্দা করেন l
ছন্দে সুরে বাস্তবতার কথামালা l বর্তমান সমাজ পরিস্থিতির নিপুণ চিত্রকল্প l
কবিকে অশেষ শুভেচ্ছা l