৮৭.
কবি বিভাংশু মাইতি তাঁর "জ্বলছে পৃথিবী" কবিতায় তুলে ধরেছেন সমসাময়িক পৃথিবীর যুগপৎ পরস্পরবিরোধী দুটি সত্তাকে যা পৃথিবী সমন্ধে আমাদের ধারণাকে বাস্তবানুগ করে l প্রচারের আতিশয্যে, ভুল সংবাদ এর দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে অনেক সময় আমরা দিন দুনিয়ার প্রকৃত চিত্রটি পাই  না l এক মোহের বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয় l কিন্তু যে দিকটিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা চলে, প্রতিবাদী শক্তি সেই দিকটিকে উন্মোচিত করে l এক অপ্রিয় সত্যের সম্মুখীন হই আমরা l সঙ্কট মোচনে প্রয়াস চলতে থাকে l


কোনো দেশ একা নয় l গোটা পৃথিবীর চিত্র আজ মোটামুটি এক l দুটো দুনিয়া l একটি প্রদর্শনের l অপরটি বাস্তবের l প্রচারে, বক্তৃতায় এক পৃথিবীকে তুলে ধরা হচ্ছে l দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে, এই পৃথিবীর সব কিছু সুন্দর l দেশ এগিয়ে চলেছে l সভ্যতা এগিয়ে চলেছে l মানুষের মুখে সফলতার হাসি l পৃথিবী মহাকাশে গেছে l মানুষ হাসছে l তাদের প্রাথমিক চাহিদা পূরণ হয়েছে l উচ্চতর চাহিদাও পূরণ হয়ে চলেছে l মুখে মুখে মোবাইল, ঘরে ঘরে টিভি l ইন্টারনেটের সুতোয় গোটা বিশ্ব জুড়ে গেছে l বিজ্ঞান নব নব শাখা বিস্তার করে বিশেষিকৃত জ্ঞানের দ্বারা মানবসেবার নতুন নতুন ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে l প্রযুক্তির  জগতে নিত্য নতুন আবিষ্কার হয়ে চলেছে l মানুষ চাঁদে পা দিয়েছে l মঙ্গলগ্রহে বসতি স্থাপনের প্রচেষ্টা চলছে l দেশে দেশে মহাকাশ চর্চা বিকাশ লাভ করছে l শ্রীহরিকোটা থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন হচ্ছে l নাসা মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে l কৃষি উৎপাদন বেড়েছে l শিক্ষার হার বেড়েছে l চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত হয়েছে l মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে l শিল্পের প্রসার হয়েছে l যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে l নানা মাধ্যমে ফলাও করে এই উন্নতির সংবাদগুলি পরিবেশিত হচ্ছে l এই সংবাদগুলিকে ভিত্তি করে, তার সঙ্গে নিজস্ব প্রচার মাধ্যমে উন্নত দেশ দুনিয়ার প্রদর্শন চলেছে l শাসকদল তার কৃতিত্ব নিচ্ছে l নেতানেত্রীরা মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন সাফল্যের দাবী করে l তাঁদের গৃহীত নানা ব্যবস্থায় মানুষ কতটা উপকৃত হয়েছেন, সর্বক্ষেত্রে দেশের কি উন্নতি হয়েছে, কতটা নিঃস্বার্থভাবে তাঁরা কাজ করে চলেছেন - তার বিবরণী চলেছে ঘণ্টার পড়া ঘন্টা, বক্তার পর বক্তা l এক ধরনের সাহিত্য সংস্কৃতি সঙ্গীত নাটক শিল্পকলায় এই উন্নয়নের মহিমা গাওয়া হচ্ছে l  


আর অপর দুনিয়াটি হল বাস্তবের l এই দুনিয়ার খবরাখবর হঠাৎ হঠাৎ মেলে l মানুষের সঙ্গে মানুষের সংঘাত l স্বার্থের সংঘাত l যাদের রয়েছে প্রচুর, তাদের আরও প্রয়োজন l যাদের হাতে রয়েছে ক্ষমতা, প্রশাসন, তাঁরা লালসার দ্বারা চালিত l প্রতি মুহূর্তে তাঁরা পৃথিবীতে দূর্বল মানুষকে শোষণ, লাঞ্ছনা করে চলেছেন l মানুষের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত l শাসক বদলায় l কিন্তু শাসনের চরিত্র, শোষণের ধারাবাহিকতা একই থাকে l শান্তির পরিবেশ নেই l চারিদিকে যেন আগুন জ্বলছে l হিংসার আবহ l একশ্রেণীর মানুষকে অপর একটি শ্রেণীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে l উন্মত্ত হিংসায় পৃথিবীতে একের পর এক রক্তক্ষয়ের ঘটনা ঘটে চলেছে l অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে l


এই দুই পৃথিবী এক পৃথিবীর মধ্যে সহাবস্থানে আছে l প্রচারে আছে শুধু আলোর দিকটা l অন্ধকার দিকটাকে সুকৌশলে অন্ধকারে রাখা হয়েছে l কখনো ফাঁক ফোকর গলে এই অন্ধকার পৃথিবীর সংবাদ বাইরে আসে l তখন কিছুদিন বেশ হৈ চৈ হয় l তারপর আবার যে কে সেই l


শুধু যাঁরা প্রতিবাদী, সত্যান্বেষী  তাঁরা এই ভুল প্রচারের ফানুসটাকে ভূমিগত করেন l সত্য উন্মোচন করেন l মানুষের মন থেকে লোভ, লালসা, হিংসা, ঘৃণা এগুলি বিতাড়িত না হলে যে সভ্যতার প্রকৃত উন্নতি হতে পারে না, সেই সত্য মেলে ধরেন l রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা এবং আচরণের মধ্যে যে অসঙ্গতি, সমাজের নানা স্তরে যে অসদ্ভাবনা বিরাজমান, সেই সত্য নানা সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তাঁরা জনসমক্ষে নিয়ে আসেন l তাঁরা মানুষের অত্যাচারের কথা, শোষণের কথা বলেন l  এই প্রতিবাদের পথ সর্বদা সহজ হয় না l অনেক ঝুঁকি থাকে l প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি প্রতিবাদের পথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন l সেই প্রতিরোধ অতিক্রম করে প্রতিবাদীরা তাঁদের স্বর তোলেন l কতো মহামানবের আবির্ভাবে হয় l মানুষের মনের পরিবর্তনের জন্য তাঁরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন l
এরকম বহু বহু মানুষের প্রয়োজন অনুভূত হয় l মানবতার মুক্তির জন্য মানুষ গড়ার কারিগর প্রকৃত নেতার প্রয়োজন l
সুন্দর মননশীল কবিতাটির জন্য কবিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই l