১৬৫.
বিগত ০৮/০৯/২০১৭ তারিখ আসরে "কবি ও কবিতার আমি" নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলাম l তারপর ০৪-১০-১৭ তারিখ কবি স্বপ্নময় স্বপন রচিত "আমি আমার কাব্য নই" কবিতাটির আলোচনা প্রকাশ করেছিলাম l প্রবন্ধে বর্ণিত বিষয়গুলিই কবিতাটিতে যেন সমর্থিত হয়েছিল l
সেখানে প্রশ্ন ছিল, কবি তাঁর কবিতায় যখন উত্তম পুরুষে কথা বলেন, সর্বদা কি নিজের কথাই বলেন ?
উত্তর ছিল না-বাচক l তাই কবিতাভেদে দেখি কবির ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হয়ে যায় l কবিতার 'আমি' সর্বদা কবি স্বয়ং থাকেন না l কবি এক একটি কবিতায় এক একটি শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন । যখন যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তার স্বর শোনা যায় কবির কণ্ঠে l নিজের ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করে সমষ্টিগত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন কবি ।
সমাজের দর্পণ হল সাহিত্য l সেই সমাজের প্রতিনিধি হয়ে কবি উত্তম পুরুষে কথা বলেন l উত্তম পুরুষের ব্যবহারে কবি এইভাবে আত্ম থেকে নৈরাত্মতে ভ্রমণ করেন l মহত্ত্বর মানবসত্তার সাথে সম্মিলনের স্বপ্নে  নিজেকে ভেঙে ব্যক্তি থেকে 'আমি' পর্যায়ে পৌঁছাতে হয় কবিকে l কবি স্পষ্ট উচ্চারণে চিরকালীন মানব-অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেন কবিতায়।


কবি হায়শান সাবিত (ছন্নছাড়া) রচিত "কবিতা লিখিনি" রচনাটিতেও একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শুনি একটু ভিন্নভাবে, কবির নিজস্ব ভঙ্গিতে l কবি সরাসরি বলছেন তিনি কখনো কবিতা লেখার প্রয়াস করেন নি l তাঁর রচনা তাঁর একার প্রয়াস নয় l তিনি একজন দ্রষ্টা l জীবনকে যেমনটা দেখেছেন, তেমনই রূপরেখা এঁকে গেছেন l তাঁর ডাইরির পাতাগুলিতে কবিতা নয়, তিনি জীবনকে এঁকে গেছেন l এগুলি তাঁর নিজের কথা নয় l কবিতায় যাঁদের জীবনী তিনি লিখেছেন, তাঁরা যেমনটা বলে গেছেন, কবি ঠিক তাঁদের কথাগুলি দিয়েই ডাইরীর পাতা পূরণ করেছেন l কবিতা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনপঞ্জি লিখে গেছেন তিনি l সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে, তাঁদের জীবন-অভিজ্ঞতাকে আয়ত্তের মধ্যে এনে, সেগুলিকে ভাষায় রূপ দিয়ে তিনি খাতার পাতায় স্থানান্তরিত করেছেন l তাঁর মনগড়া কল্পনা নয়, তিনি জীবনকে খুঁজেছেন, নিজেকে খুঁজেছেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে l তাদের অতি সাধারণ দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে l তাঁদের সুখ-দুঃখ,আনন্দ-বেদনার মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজেছেন l সেই একাত্মবোধ থেকে তাঁর লেখা বেরিয়ে এসেছে l জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে জীবনযাপনের যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তাঁর লেখা দিশা পেয়েছে l
কবির কাছে কবিতা লেখাটা এখানে মুখ্য বিষয় নয় l তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, কবিতা তাঁর আসেই না l তিনি জানেনই না কবিতা লিখতে l তুলনায় তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করেছেন তাদের সঙ্গে সহাবস্থানের কারণে, সাধারণ মানুষের সেই জীবনসংগ্রামের গাথাকে কাগজ কালিতে চিত্রায়িত করা l বিশ্বস্ততার সঙ্গে, আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি সেই কাজটি করে যেতে চান l কবিতা লেখার ব্যপারে তিনি ততটা আগ্রহী নন l
কবি শুধু জীবনকে চেনেন l যে জীবন প্রতিনিয়ত তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা দান করে, তাঁকে সর্বদা কিছু না কিছু নতুন জিনিস শেখায়, সেই জীবনকে তাঁর ডায়েরীর পাতায় তিনি তুলে আনেন l একটি কবিতা লেখার থেকে এই কাজটি কবির কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ l তাই তিনি কখনো কবিতা লেখার প্রয়াস করেন নি l শুধু জীবনকে এঁকে গেছেন l
কবিতা সাহিত্যে বাস্তবতা এবং কল্পনা উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে l যুগভেদে, কবিভেদে তাঁর সার্থক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় l "কবিতা লিখিনি" রচনাটিতে কবি হায়শান সাবিত(ছন্নছাড়া) বাস্তবতার প্রতিই তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করেছেন l কবি স্পষ্ট করেছেন, কবিতার মধ্যে কবির কথা নয়, কবিতায় যাঁদের কথা বলা হচ্ছে সেই সাধারণ মানুষের কথাই স্থান পায় l যখন যে মানুষকেন্দ্রিক কবিতা, তখন তার কথা l কবিতার চরিত্রের পরিবর্তন হলে, কথার চরিত্র পাল্টায় l কবি শুধু জীবনকে তুলে ধরেন তাঁর রচনায়, কবিতা লেখেন না তিনি l
এক অনন্য ভঙ্গিতে কবি তাঁর কবিতা লেখার কাজটিকে কবিতা লিখছেন না বলে উপস্থাপিত করে এক ভাবগত paradox সৃষ্টি করেছেন l


কবিকে তাঁর রচনার জন্য জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন !!!