৯৬.
কবি ড. প্রীতিশ চৌধুরী "মোনালিসার হাসি"  কবিতাটির নামকরণের মধ্যে দিয়ে একশ্রেণীর কবিতাকে ঘিরে কবি ও আলোচকদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে যে বিতর্ক চলে আসে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন l


কবিতার সম্মেলন হচ্ছে l নবীন প্রবীণ সব কবিরা একত্রিত হয়েছেন l কবিতা পাঠ চলছে l তার আস্বাদ গ্রহণ করছেন উপস্থিত সকলে l কাব্যরসের আবহে পরিবেশ বেশ কাব্যময় l এর মধ্যে চলে আসে কবিতা ও অকবিতা নিয়ে চিরকালীন বিতর্ক l কোনটি কবিতা হয়েছে, কোনটি কবিতা হয় নি অর্থাৎ অকবিতা হয়েছে - এই নিয়ে বিতর্ক l এক অঘোষিত যুদ্ধ l লক্ষণরেখা নিয়ে বিতর্ক l কার যে কোথায় সীমা তাই নিয়ে দ্বন্দ্ব l


কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে কবি-আলোচকগন সহমতে পৌঁছুতে পারেন না l কবিতার কিছু বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ হয় l তাও যুগে যুগে পাল্টায় l কবিরা সর্বদা নতুনত্বে বিশ্বাসী l পুরোনোর চর্বিতচর্বণ তাঁদের পছন্দ নয় l তাই কবিতা সাহিত্য চর্চার  ক্ষেত্রে বারে বারে এসেছে নতুন ধারা l পুরনোকে অস্বীকার করে নতুন পথে হেঁটেছে কাব্য ও সাহিত্যচর্চা l পথ যখনই নতুন, শৈলী যখনই চেনা ছকের বাইরে, তখনই কবিতা একশ্রেণীর পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে l কবিতার গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট ট্যাগ l কবিতা-অকবিতার প্রসঙ্গ এসেছে l


এই তথাকথিত দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট অকবিতার পক্ষে "মোনালিসার হাসি" প্রসঙ্গ এনে কবি ড. প্রীতিশ চৌধুরী এই শ্রেণীর কবিতার যে শক্তি তার স্বরূপ প্রকাশ করতে চেয়েছেন l কবিতা যেমন মনের ভাব, হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশ করে, এই তথাকথিত অকবিতাগুলিও তাই করে l শব্দের শৃঙ্খলে হৃদয়ের গভীর থেকে আসা আবেগকে নদীর ধারার মতো প্রবহমান করে l সমকালের কিছু পাঠক, কিছু আলোচক যদি সেই কবিতার পাঠোদ্ধার করতে না পারেন, তাই বলে দুর্বোধ্যতার যুক্তিতে সেই রচনাকে অকবিতা বলা সমীচীন নয় l কালের বিচারে সেই কবিতার অনেক বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা ও আলোচনার পর তার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হতে পারে l সেই কবিতার পরতে পরতে যে রহস্য ছিল, কাল মহাকাল নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ব্যাখ্যা করে কবিতাটিকে এক মহত্তম মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে l


এখানেই রয়েছে "মোনালিসার হাসি" শিরোনামের তাৎপর্য l 'মোনালিসা' একটি বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম। ইতালীর শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৬ শতকে এই ছবিটি অংকন করেন। মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসি   ব্রিভ্রম ও মোহ তৈরী করেছে, যুগে যুগে সেই রহস্য উন্মোচনের প্রয়াস চলেছে l চিত্রকলার ইতিহাসে এই চিত্রকর্মটির মতো আর কোনটি এত আলোচিত ও বিখ্যাত হয়নি। এর একমাত্র কারণ মোনালিসার সেই কৌতূহলোদ্দীপক হাসি যা পরবর্তীতে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে l মোনালিসার হেঁয়ালিপূর্ণ ছবির পেছনে যে মায়া রয়েছে তাতে মনে হতে পারে সে হাসছে। দর্শক যদি তার মুখের দিকে সরাসরি না তাকান তাহলে বুঝতে পারবেন না চেহারার কোন অংশে বেদনা ভেসে আছে l  শিল্পবিশেজ্ঞরা গত ৫০০ বছর ধরে ধাঁধায় বয়েছেন।
ছবিটির ভৌত কাঠামোই অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিত্ব ও রহস্যকে উপস্থাপন করেছে।


সত্যি বলতে, নারীর হাসিতে এই রহস্য এর কোন কূল-কিনারা খুজে পাওয়া যায় না। এই রহস্য চির-রহস্য, সৃষ্টির মুলধারে আছে এই রহস্য। এই হাসি যুগ যুগ ধরে পুরুষের চিত্তকে ব্যাকুল বিহবল করে আসছে।
আবার এই রহস্যময়ী নারীকে লিওনার্দো স্থাপিত করেছেন প্রকৃতির পটভূমিতে l ছবির পেছনের দৃশ্য হল-একটি পাহাড়, তার পেছনে পর্বতমালা l প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন নয়। ইউরোপীয় রেনেসাসের সময় শিল্পীদের এই বিশেষ উপলব্ধি ঘটে আর লিওনার্দোর মধ্যে তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।


ছবিটিতে আলো-আঁধারের খেলা দেখানো হয়েছে অত্যন্ত নিপুনভাবে। তা এতই নিখুঁত যে দেখে মনে হয় ছবিটি একেবারে জীবন্ত। বলা হয়ে থাকে ভিঞ্চিই প্রথম শিল্পী যিনি ছবিতে আলোছায়ার খেলা এনেছেন।
এইসব কিছু মিলিয়ে "মোনালিসা" হয়ে উঠেছে বিশ্বের একটি শ্রেষ্ঠ চিত্র।
আসলে মোনালিসা হচ্ছে নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক, যে সৌন্দর্য যুগ যুগ ধরে দেশে-দেশে পুরুষ চিত্তকে আকর্ষন ও আবিষ্ট করে রেখেছে।


যেমনটা 'মোনালিসা' চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে হয়েছে, বহু অকবিতাও দুর্বোধ্যতার রহস্য ভেদ করে পাঠকমনে চিরস্থায়ী মর্যাদার স্থান পাবে l


কবি ড. প্রীতিশ চৌধুরীকে সুন্দর একটি কবিতার জন্য অভিনন্দন জানাই l