১৪২.
কবি মোঃ মাজেদ হোসেন "নাফের জলে" কবিতাটিতে মায়ানমারে সংঘটিত নৃশংসতম হত্যকাণ্ডের জন্য তাঁর মনের গভীর বেদনা ব্যক্ত করেছেন এবং হত্যাকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা বর্ষণ  করেছেন l সেখানে নাফ নদীতে মৃত শিশুর দেহ ভেসে উঠছে l বিশ্ব মানবতা দেখছে সেখানে একজন শিশু জন্ম নিয়েও বাঁচার স্বাধীনতা পায় নি l কোথাও মা-কে মেরে ফেলা হয়েছে l শিশু মায়ের নিষ্প্রাণ দেহ ঘিরে বসে আছে l অবুঝ শিশু জানে না যে মা আর ফিরে আসবে না l টুকরো টুকরো মানব দেহ ছড়িয়ে আছে যত্র তত্র l কাদার ভিতর থেকে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে লাশের সারি। এমন সব হৃদয় বিদারী দৃশ্য l মানবতা কেঁপে উঠছে l  
নিজ গৃহে পরিত্যক্ত রোহিঙ্গা জনজাতির ওপর নৃশংস অত্যাচারের বর্ণনা আছে কবিতাটিতে l আর আছে অত্যাচারীদের জন্য অভিশাপ l
সমস্যাটির গভীরে গেলে বলতে হয়, রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উলেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত । বিভিন্ন সময় বার্মা সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী।
ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা "কুরুখ" (Kurukh) নৃগোষ্ঠী প্রথমে পূর্ব ভারত হয়ে রাখাইন প্রদেশে বসতি স্থাপন করে l ক্রমান্বয়ে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এ সকল নৃগোষ্ঠীর শংকরজাত হলো এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বস্তুত রোহিঙ্গাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে।
কৃষিকাজের জন্য আরাকানের কম জন-অধ্যুষিত এবং উর্বর উপত্যকায় আশপাশের এলাকা থেকে বাঙ্গালী অধিবাসীদের অভিবাসন করার নীতি গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। অভিবাসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সস্তা শ্রম যা আরাকানের ধান ক্ষেতের কাজে লাগত। আরাকান ও বাংলার মাঝে কোন আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছিল না এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোন বিধি-নিষেধও ছিল না। ১৯ শতকে হাজার হাজার বাঙ্গালী কাজের সন্ধানে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকানে গিয়ে বসতি গড়েছিল।
রোহিঙ্গারা আজ নয়, শত সহস্র বছর ধরে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত l এর কারণ অনেক l প্রধানতম কারণ তাঁদের দুর্ভাগ্য l ইতিহাস তাঁদের সঙ্গে সুবিচার করে নি l বিভিন্ন সময়ে এই জনজাতি বিভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন l প্রতিটি অবস্থানই তাঁদের জন্য ক্ষতির বার্তা নিয়ে এসেছে l
তাঁরা তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মায়ানমারের আরাকান প্রদেশে বসবাস করছেন l অথচ তাঁদের নাগরিকত্ব নেই l নিজভূমে পরবাসী হয়ে আছেন l
মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের মূল শত্রু হলো বার্মা অধিবাসী মগ জনজাতি যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী l আর রোহিঙ্গারা হলেন ইসলাম ধর্মের অনুসারী l এই বিরোধ ধর্মকে কেন্দ্র করেও শুধু নয় l এর সঙ্গে আছে ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, নৃতত্ত্ব l বার্মার বৌদ্ধরা মঙ্গোলয়েড l কিন্তু রোহিঙ্গারা অস্ট্রোলয়েড l বিগত শতকগুলিতে বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনা ঘটে গেছে মায়ানমার-এর ভূখণ্ডে বা ভারতবর্ষে বা এই অঞ্চলগুলিতে, যে ঘটনাগুলি রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে গেছে l প্রথমত বৌদ্ধ শাসকেরা চিরকাল রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বৈমাত্রেয় ব্যবহার করে গেছেন l তাঁদের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে l গণহত্যার শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে l বারে বারে l বিতাড়িত করা হয়েছে তাঁদের l বাধ্য হয়ে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে, ভারতে l মায়ানমারে তাঁদের নাগরিক অধিকার দেয়া হয় নি l ভারত বাংলাদেশেও তাঁরা বাঞ্ছিত নন l
কিছু ঘটনা রোহিঙ্গা জনজাতির এই সমস্যাকে জটিলতর করেছে l দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যখন জাপান বৃটিশ অধ্যুষিত মায়ানমার আক্রমণ করল, রোহিঙ্গা জনজাতি বৃটিশদের সমর্থন করেছিলেন l বৃটিশরা পরাজিত হয়েছিল এবং মায়ানমার জাপানের দখলে গেছিল l বিজয়ী জাপানী সেনা  রোহিঙ্গাদের ওপর করেছিল অবর্ণনীয় অত্যাচার l আর যে বৃটিশদের সহায়তা করেছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, সেই বৃটিশ শাসক অনুগত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে করেছিল সভ্যতার নিকৃষ্টতম পরিহাস l ব্রিটিশরা এমন একটি কাজ করে যা রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিশাল ক্ষতি করে l এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। তারা মায়ানমারের ১৩৯ টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এর ফলে যেটা হলো, যে ভূখণ্ডে ৩০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করে আসছেন, সেই ভূখণ্ডে তাঁদের নাগরিকত্বের অধিকার অস্বীকার করা হলো l সেই ক্ষতি আজও পূরণ হয় নি l রোহিঙ্গারা আজও পৃথিবীর কোনো দেশের নাগরিক নন l বৌদ্ধদের অত্যাচারে তাঁরা মায়ানমার ত্যাগ করে বাংলাদেশে যাচ্ছেন, ভারতে যাচ্ছেন আশ্রয়ের সন্ধানে l সেখানেও কিন্তু তাঁরা স্বাগত নন l উভয় সরকার-ই তাঁদের push back করে আবার মায়ানমার-এই পাঠাতে উদগ্রীব l
আর একটি ঘটনা l ১৯৪৭ সাল l বিশ্ব জুড়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান l সেই সঙ্গে ভারত উপ-মহাদেশে l ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির সময় রোহিঙ্গারা এক ভুল করে বসেন। পাকিস্তানের ভাবী  প্রেসিডেন্ট জিন্নাহের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। আর শুরু হয় রোহিঙ্গাদের কপাল পোড়া। যে ভূখণ্ডে তাঁরা বংশানুক্রমে তিন হাজারেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসছেন সেই ভূখণ্ডের দাবি ছেড়ে কেন তাঁরা পাকিস্তানের অংশ হতে চাইলেন, বিষয়টি দুর্বোধ্য l তাঁদের এই কাজটা আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠিরা মেনে নিতে পারেন নি। রোহিঙ্গাদের   কপালে “বেঈমান” তকমা লেগে যায়। এদিকে জিন্নাহ শেষমেশ রোহিঙ্গাদের পাকিস্তানের সাথে থাকার বিষয়ে অস্বীকৃতি জানান। দু নৌকাই ডুবে যায় রোহিঙ্গাদের l তখন তাঁরা নিজেরাই রোহিঙ্গা মুসলিম পার্টি গঠন করে আরাকান স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। ফলে তাঁদের গায়ে সন্ত্রাসবাদী, উগ্রপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা সেঁটে যায় l তাঁরা একপ্রকার ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যান বার্মার সরকারের কাছে। ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুইবার তাঁদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।
রোহিঙ্গাদের ওপর এই নিপীড়ন ধারাবাহিকভাবে চলছে l শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে l এই অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য তাঁরা লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় প্রতিবেশী দেশগুলিতে আশ্রয় নিয়েছেন l কিন্তু এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় l প্রতিবেশী দেশগুলির সমস্যা বেড়েছে এতে l বাড়তি জনসংখ্যার চাপ পড়েছে l কিন্তু তারপরেও রোহিঙ্গা জনজাতির ওপর মায়ানমারের বৌদ্ধ শাসকদের অত্যাচারের মাত্রা কমে নি l তাঁদের মূল উদ্দ্যেশ্য হলো মায়ানমারকে রোহিঙ্গা-মুক্ত করা l এই কাজে যদি তাঁরা সফল হন, তাহলে তার ফল ভুগতে হবে প্রধানত বাংলাদেশকে l আর কিছুটা ভারত ও অন্য প্রতিবেশী দেশকে l ১৫ লাখের মতো এই বাড়তি জনসংখ্যা বাংলাদেশ কি করে সামলাবে সেটা চিন্তার বিষয় l বাংলাদেশ, ভারত প্রভৃতি দেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ পড়বে l
যে ভূখণ্ডে একটি জনজাতি হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছেন, সেই দেশে তাঁদের নাগরিকত্ব কি করে থাকে না ! বৃটিশরা তাঁদের তালিকাভুক্ত করেন নি, তার জন্য আজও রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন বলা হবে ?
বিশ্বের শান্তিকামী রাষ্ট্রগুলি, রাষ্ট্রসঙ্ঘ উদ্যোগ নিক  মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে যেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ৩৫০০ বছর ধরে বংশানুক্রমে বসবাস করে আসছেন, সেখানে তাঁদের নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে l স্বাধিকার, আত্মমর্যাদা নিয়ে যাতে তাঁরা নিজভূমে বসবাস করতে পারেন, সে ব্যপারে উদ্যোগ জরুরি l মানবাধিকার সংগঠনগুলিরও উদ্যোগ নেবার প্রয়োজন আছে l বিশ্ব জনমত বিষয়টির এরকম স্থায়ী সমাধান চায় l


সমসাময়িক একটি নৃশংস ঘটনা নিয়ে কবিতায় তাঁর মানবিক স্বর স্পষ্ট করার জন্য কবিকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা l