১১০.
ঈশ্বর অর্থাৎ ভগবান l নানা ধর্মে কতো বিভিন্ন তাঁর নাম l আমরা ঈশ্বরকে স্বশরীরে কেউ দেখি নি l কিন্তু যাঁরা আস্তিক, তাঁরা ঈশ্বরকে মানেন, নাস্তিকেরা মানেন না, আর সন্দেহবাদীরা দুটো পথই খোলা রাখেন l
যুগ যুগ ধরে ঈশ্বরকে নিয়ে অনন্ত তর্ক চলেছে l এক পক্ষ বলছেন, "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর l" অর্থাৎ, ঈশ্বর বিশ্বাসের বিষয়, তাঁকে প্রমাণ করা যায় না, বস্তুত প্রমাণের প্রয়োজনই হয় না l এই জগৎ, বিশ্ব ব্রম্ভাণ্ড যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই ঈশ্বর l তাঁর আবার প্রমাণের কি প্রয়োজন ? ইত্যদি l
যুক্তিবাদীরা তা মানেন না l বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিশ্ব-ব্রম্ভাণ্ড সৃষ্টির অন্য তত্ত্ব উপস্থিত করে l নাস্তিকেরা প্রমাণ চান l হাতে হাতে l
সন্দেহবাদীরা সংশয় বাড়িয়ে যান উভয়পক্ষেই l
এ গেল এক দিক l এরপর আছে ঈশ্বরের নানা ব্যবহার এবং অপব্যবহার, সুবিধা এবং অসুবিধা l ঈশ্বরের অনেক প্রতিনিধি l সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছনো যায় না l এজেন্ট লাগে l তাদের ফিস্ কমিশন, সম্মান দক্ষিণা ইত্যাদি দিতে হয় l আছে নানা সংস্কার, আচার অনুষ্ঠান l ভক্তের প্রতি ঈশ্বরের যে দয়া, ভক্তকে সহ্যশক্তির কতটা পরীক্ষা দিতে হবে, দুঃখের পাহাড় কতোটা অতিক্রম করতে হবে, তা নিয়ে আছে নানা মত l
কবি আর্যতীর্থ রচিত "নিজস্ব ঈশ্বর" কবিতাটি ঈশ্বরকে নিয়ে এরকম নানা ভাবনায় পুষ্ট l কবিতার শুরুতেই ঈশ্বরের নামে আমাদের যে সুবিধাগুলি হয় তার বিবরণী পাই l
যার কেউ নেই, নিঃসহায়, ঈশ্বরে বিশ্বাস তাঁর বিরাট সহায় l এরকম একজন ঈশ্বরকে উপদেষ্টা  হিসাবে ভেবে নিলে পরে কোন অসুবিধা হলে তার দায়ভার ঈশ্বরের ঘাড়ে ন্যস্ত করা যায় l অনেক কাজে মানুষের দিক থেকে বাধানিষেধ আসে l যাঁরা বুদ্ধিমান, সেই কাজের সঙ্গে ঈশ্বরের নাম জুড়ে দিয়ে, ধর্মের নামে সেই কাজ হচ্ছে এই অজুহাত দাঁড় করিয়ে সেই বাধা দূর করেন l ধর্মের নামে কিছু অপরাধমূলক কাজও এভাবে ছাড় পেয়ে যায় l
অনেক সময় ঈশ্বরের নামকে বিকল্প সমাধান হিসাবে ব্যবহার করা হয় l যদি এমনি লক্ষ্য অর্জন হল তো ভালো, না হলে ঈশ্বরের ইচ্ছাকে অজুহাত হিসাবে খাড়া করে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করা হয় l এভাবে বহু অনিশ্চয়তার ঝামেলা থেকে মুক্তি মেলে l কখনো ভাগ্য সঙ্গ না দিলে এই পথে অনেক স্বস্তি মেলে l ভগবানকে মানত করতে হয় l এই মানতের টাকার অঙ্ক যতো বেশি হয়, ঈশ্বরের ততো কাছে মানতের বিষয়টি পৌঁছয় l কাজটি হয়ে যাবার সম্ভাবনা ততো বাড়ে l মন্দিরে প্রতিমা দর্শনের জন্য যখন লম্বা লাইন পড়ে, শুধু পয়সার জোরে অনেকে সেই লাইন ডিঙিয়ে আগে মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পান l অর্থাৎ আজকের ভোগবাদী দুনিয়ায় পয়সা ছাড়া ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না l ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে গেলে অর্থের ওপর ভর করেই পৌঁছতে হয় l


কখনো বা যে সংসার ভেঙে যাচ্ছে, বা ভেঙে গেছে, ঈশ্বরের ওপর প্রবল বিশ্বাস এমন সংসারে যেন খুঁটির কাজ করে l যেখানে কোনো আশা নেই, এমন পরিস্থিতিতে শুধু ঈশ্বরে ভরসা কারো জীবন রক্ষা করে l যে মানুষ জীবনে ঠকে গেছে, ব্যর্থ হয়েছে, জীবনের সকল সহায় সম্পদ যে হারিয়ে ফেলেছে, অলৌকিকভাবে জীবনের সব অন্ধকার কেটে গিয়ে এমন মানুষও আবার জীবনে বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পান  l যখন অন্য সব কিছুতে বিশ্বাস চলে গেছে, ঈশ্বরে সামান্য বিশ্বাসও বেসামাল পথে মানুষকে সাহারা দেয় l নিকটাত্মীয় কারো সম্বন্ধে কোনো সংবাদ যেখানে নেই সেখানে  অন্তত ঈশ্বরকে  ভরসা করে তাকে দেখাশোনা করে সুস্থ রাখার আর্জি তো করা যায় ! ঈশ্বর তো মুখের ওপর সেই দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করেন না !
অতি সাধারন মানুষের ঈশ্বরের ওপরে বিশ্বাস এইভাবে জোড়াতালি দিয়ে বহু মানুষকে, তাদের সংসারকে বাঁচিয়ে রাখে l প্রকারান্তরে বলা যায় এই ছাপোষা মানুষগুলোই যেন তাদের  ঈশ্বরবিশ্বাসে ঈশ্বরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন l তাঁরাই যেন ঈশ্বরকে চোখে চোখে দেখে রেখেছেন, মনে রেখেছেন l


বোঝা কঠিন কে যে কাকে সৃষ্টি করেছেন - ঈশ্বর মানুষকে ? নাকি মানুষ ঈশ্বরকে ? মানুষ যেমন খুশি, নিজের পছন্দমতো ঈশ্বর গড়ে নিয়েছেন l দেশভেদে, জাতিভেদে, গোষ্ঠীভেদে ঈশ্বরের কতো রূপ, কতো মহিমা ! এব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করলে, তার কোনো সদুত্তর নেই l একটাই উত্তর l সবই নাকি সেই ঈশ্বরের ইচ্ছা, তাঁরই লীলা l


কবি আর্যতীর্থ "নিজস্ব ঈশ্বর" কবিতায় তাঁর অনন্য স্বচ্ছ প্রকাশভঙ্গিতে ঈশ্বরকে ঘিরে আধুনিক মানুষ যে পরিস্থিতিগুলির সম্মুখীন হন তার সহজ সরল বর্ণনা রেখেছেন l কোনো আধ্যাত্মিক গভীরতা নয়, দৈনন্দিন জীবনে ধর্মভীরু আধুনিক মানুষ যা করেন বা করতে বাধ্য হন, ঈশ্বরকে নিয়ে যে বিপণন চলে, কবিতাটিতে আছে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা তার অকৃত্রিম লেখাজোখা l
কবিকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা l