"অশ্লীল উল্লাস" কবিতায় কবি রাবেয়া রাহীম নর নারী সম্পর্কে বিশ্বাস-এর ভূমিকা তুলে ধরেছেন l কিভাবে দুটি মানুষ কাছে আসার পর তাদের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, বিশ্বাসভঙ্গ হলে তাদের জীবনে তার কি প্রভাব পড়ে, সামগ্রিকভাবে সমাজব্যবস্থায় নরনারী সম্পর্কের জটিলতা কি আকার নেয়, দৃঢ় ভাষায় দৃপ্ত ভঙ্গিতে কবি তা বলবার প্রয়াস করেছেন l
যে কোনো সম্পর্কের বুনিয়াদ হলো বিশ্বাস l এই বিশ্বাস একদিনে সৃষ্টি হয় না l যখন দুটো সত্তা ভৌগোলিকভাবে পাশপাশি আসে, মানসিকভাবে পাশাপাশি আসতে তাদের আরো কিছু সময় লাগে l সত্য অনুভবে হোক, কিংবা মিথ্যাকে আশ্রয় করেই হোক, একজন অন্যজনকে আকৃষ্ট করবার জন্য কিছু কেরামতিও করে l নিজের সম্মোহনী শক্তিকে সুকৌশলে ব্যবহার করে l একচিত্তে যেন ওত পেতে থাকে, নিশিদিন, অপরজনকে বশীভূত করার জন্য, ভালোবাসার জালে তাকে আবদ্ধ করার জন্য l এইভাবে সে তার কাঙ্খিত ব্যক্তিকে পেতে চেষ্টা করে l নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে l নানা কৌশলে, অভিনয়ে, ছলা কলায় নিজের চাওয়াকে সাকার করে তোলার জন্য সে আগ্রাসী হয় l

এইভাবে অনেক সাধনা, আরাধনা, কত ধরনের ত্যাগের প্রাপ্তি হিসাবে অন্যজনের বিশ্বাস মেলে l এক নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে l এই শুভ্র, কোমল, পবিত্র, মায়াবী সম্পর্ক ঈশ্বরের দান l এক নারী ও এক পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক এই বিশ্বাস ও নির্ভরতার যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা পৃথিবীর পবিত্রতম সম্পর্ক l এই সম্পর্কে বিধাতার অনুমোদন ও আশীর্বাদ উভয়ই থাকে l


কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু সহজ সরল কাঙ্খিত পথে চলে না l ঈশ্বরের সৃজন এই পৃথিবীতে সকলেই ভালোবাসার কদর করতে জানে না l কিছু নশ্বর পাপী আছে যারা এই পবিত্র সম্পর্কের অপমান করে l অনেক সাধ্য সাধনার পর এই যে পারস্পরিক বিশ্বাস, নির্ভরতা, ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করে নেবার পর অনেকেই বিশ্বাসভঙ্গ করে l সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে বিশ্বাস নামক পবিত্র শব্দটিকে পদদলিত করে l যার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয়, সে ক্ষোভে, অভিমানে, অপমানে নরক যাতনা ভোগ করে l আর যে বিশ্বাসভঙ্গ করল, যেন একটা যুদ্ধ জয় করেছে, সেই আনন্দে অশ্লীল উল্লাসে মেতে ওঠে l


আলোচ্য কবিতায় কবি রাবেয়া রাহীম কবিতায় উল্লিখিত নারীটির চোখে পুরুষজাতিকে বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক হিসাবে  উপস্থিত করেছেন l নানাবিধ ছলে, এক ভীষণ সম্মোহনী শক্তির বলে, ওত পেতে সে যেন এক নারীকে শিকার করে l ভালোবাসা তার কাছে শুধুই অভিনয়, অন্তরের অনুভব নয় l সে শুধু তার কামনা, লালসা চরিতার্থ করবার জন্য এক নারীকে ফাঁদে ফেলে l তাকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখায় l ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়ে এক সুন্দর সংসার রচনার স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে প্রলোভিত করে l  তার এই আগ্রাসী আচরণে, তার পাতা ফাঁদে নারী জড়িয়ে যায় l পুরুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে l পুরুষের নানা ছলা কলায় তার বিশ্বাস দৃঢ় হয় l নারী তার সর্বস্ব সেই পুরুষকে অর্পণ করে l যে সম্পর্কগুলিতে পুরুষ সত্যই প্রতারক, বিশ্বাসঘাতী, ভালবাসা যেখানে শুধুই অভিনয়, নারীর নিজস্বতা লুণ্ঠন করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, এই সম্পর্ক সেই নারীর জীবনে অভিশাপে পরিণত হয় l তার দিক থেকে যে ভালবাসা ছিল আন্তরিক, ঈশ্বরের আশীর্বাদস্বরূপ, সেই সম্পর্কের পতনে, পুরুষসঙ্গীর বিশ্বাসঘাতকতায় সেই নারীর জীবনে অন্ধকার নেমে আসে l জীবন নরকতুল্য হয় l সর্বস্ব খুইয়ে নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হয় l


অনেক সাধনা, আরাধনা, ত্যাগের পরিণতিতে প্রাপ্ত সম্পর্ক, যা সেই নারীর চোখে ছিল শুভ্র, কোমল, মায়াবী ঐশ্বরিক দান, একের বিশ্বাসহীনতায় তার নিষ্ঠুর অবসানে ক্ষোভে, অভিমানে সেই নারীর জীবনে নরকের যন্ত্রণা নেমে আসে l তার মন হরণকারী ডুবুরি প্রেমিক আজ ফেরার l রেখে গেছে শুধু অবিশ্বাস l সমগ্র পুরুষজাতির প্রতি অবিশ্বাস l এই প্রতারণায় আহত নারীটির কাছে জীবন এখন অর্থহীন l কিছুই নেই তার জীবনে এখন l প্রাণহীন দেহে আছে শুধু সেই প্রতারণা ও বিশ্বাসহীনতার স্মৃতি, যা তাকে প্রতিমুহূর্তে দগ্ধ করছে l
যেন তার প্রেমিকের পাপ তাকেও স্পর্শ করেছে l ভালবাসা ঈশ্বরের দান l সেই ভালবাসাকে অপমান করার অর্থ ঈশ্বরকে অস্বীকার করা l এমন নশ্বর, নাস্তিক পুরুষের সঙ্গদোষের পাপ লেগেছে সেই নারীর l একের বিশ্বাসহীনতায় সমগ্র পুরুষজাতিকে সে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে l যেন বিশ্বাস হারিয়ে এক ভ্রমের জগতে, এক চোরাবালিতে সে আটকে গেছে l


ভালবাসায় বিশ্বাসের স্থান নিয়ে গভীর ভাবনায় পূর্ণ  কবিতাটির জন্য কবি রাবেয়া রাহীমকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা !!!