৯৭.
কবি রীনা বিশ্বাস (হাসি) "সোনালী" কবিতাটিতে এঁকেছেন দারিদ্র্যপীড়িত এক পরিবারের করুন ছবি l সোনালী এক অবোধ বালিকা l আশ্রয় তার সেতুর নীচে
প্লাস্টিক নির্মিত ঘরে l সেখানে তার মা এবং তার বাস l অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের নিশ্চিত সংস্থান নেই তাদের l দুবেলা খাবার জোটে না l কোনোদিন হয়তো একটু পান্তা ভাত l স্বল্পাহারে, অনাহারে তাদের দিন কাটে l অত্যন্ত মরমী ভাষায় দরদী কবি এক অসহায় পরিবারের করুন ছবি কবিতাটিতে মেলে ধরেছেন l


দারিদ্র্য মানবজীবনে এক অভিশাপ স্বরূপ l মানুষের কতো চাওয়া পাওয়া এই দারিদ্র্যের পদতলে চাপা পড়ে যায় l শিশুকাল থেকে রূপ রঙ রসে পূর্ণ এই জগতের সঙ্গে আত্মীকরণ শুরু হয় l কিন্তু যাদের দুবেলা ঠিকমতো করে খাবারটুকু পর্যন্ত জোটে না, ক্ষুধার জ্বালায় পেট জ্বলে যায়, তাদের কাছে পৃথিবীর বৈচিত্র্যপূর্ণ এই সম্ভার বিদ্রুপের মতো ঠেকে l শিশু তার সমস্ত প্রাথমিক চাহিদার পূরণের জন্য চেয়ে থাকে তার পিতামাতার দিকে l দারিদ্র্যক্লিষ্ট পিতামাতা যখন সেই চাহিদাটুকু পূরণ করতে পারে না, তখন সেই শিশু জীর্ণ দেহে, অপরিচ্ছন্ন বেশে, দারিদ্র্যক্লিষ্ট মুখে শুকনো হাসির আভা নিয়ে সামান্য কিছু খাবারের প্রত্যাশায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় l সচ্ছল মানুষজনের ওপর, তাদের দয়াপরবশতার ওপর বিশ্বাস রেখে ক্ষুধার্ত দেহে অনেকগুলি বাড়ি পরিভ্রমণ করে সে l কিন্তু মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর l বড়ই স্বার্থপর l শুধু নিজেরটুকু জোটাতেই সে গলদঘর্ম l অপরের জন্য ভাবার অবকাশ তার মেলে না l দারিদ্র্যপীড়িত শীর্ণ শিশুর দর্শন তাদের মনে দয়ার উদ্রেক করে না l সহমর্মিতাহীন এই জগতে অসহায় মানুষ তার অসুবিধায়, তার বিপদে পাশে কাউকে পায় না l ধর্ম থাকে তার নিজের জায়গায় l কতো মহাপুরুষের মহৎ কতো বাণী মোটা পুস্তকে বন্দী হয়ে থাকে l সমাজকল্যাণকর কতো প্রকল্প চলে l আর তার সঙ্গে সহাবস্থান করে চলে মানুষের দারিদ্র্য, বুভুক্ষু মানুষের মিছিল, অনাহার ক্লিষ্ট শিশুদের হাড় জির্জিরে অবসন্ন শরীর l শৈশব হারিয়ে যায় দারিদ্র্যের যুপকাঠে l
শিশুরা ফুলের মতো l নিষ্পাপ, সরল l দিন দুনিয়ার যত  কেরামতি তাদের বুদ্ধির অগোচর l খিদে পেলে তারা জানে শুধু খেতে l শীত গ্রীষ্মে তাদের চায় পোষাক l ঘুম পেলে তারা ঘুমায় l এই নিয়ে তাদের জগৎ l তার জন্য তারা ভরসা করে তাদের পিতামাতাকে l পিতামাতা যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, অবোধ বুভুক্ষু শিশু বৃহত্তর সমাজের কাছে তার চাহিদা নিয়ে হাজির হয় l সেখানেও যখন প্রত্যাখ্যাত হয়, শিশু ফিরে আসে তার ঘরে l ঘর বলতে একটু আশ্রয় l সেতুর নীচে প্লাস্টিকের আবাস l মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু l ঝড়ে বৃষ্টিতে রোজ ভাঙে l আবার গড়তে হয় l সেখানে শিশু তার মাকে কিছু বলতে চায় l জানাতে চায় তার অধিকার l খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান - তার প্রাথমিক প্রয়োজন, তার অধিকার l এগুলি সে কেন পাবে না ? তার কী অপরাধ ? উৎসবে সে নতুন পোষাক পায় না l ভালো করে ঘুমানোর জন্য সে পায় না একটি নরম বিছানা l খিদে পেলে পায় না পর্যাপ্ত আহার l আরো তো অনেক চাওয়া থাকে l কিন্তু এই প্রাথমিক চাহিদাটুকু তার কেন পূরণ হয় না ? মা-কে প্রশ্ন করতে চায় শিশু l কিন্তু দারিদ্র্যের ছাপ সেখানেও l মায়ের মলিন মুখ l হাসি অস্তমিত l একই দুঃখ, যন্ত্রণার রেশ সেখানেও l মায়ের এ হেন রূপ দেখে অবোধ শিশুর কথা হারিয়ে যায় l অভুক্ত অপরিচ্ছন্ন সোনালী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার দারিদ্র্য, তার অসহায়তা, তার ক্ষুধাকে যেন বাধ্য হয়ে ভবিতব্য বলে স্বীকার করে নেয় l মায়ের মুখে শুধু একটুকু হাসি দেখবার জন্য সোনালী ব্যাকুল হয় l  


মন ছুঁয়ে নেয়া রচনা l সোনালী কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয় l হতদরিদ্র বুভুক্ষ শ্রেণীর প্রতিনিধি l দেশের বিশাল সম্পদের অসম বন্টনের কারনে এক অসাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে l দারিদ্র্যের শিকার সোনালীর মতো শত সহস্র শিশু ও তার পরিবারকে  প্রতিদিন নিশ্চিত অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে l অসহায়ভাবে তারা এই অবস্থাকে ভবিতব্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে l যে প্রশ্নটি সোনালী তার মা-কে করতে চেয়েও করে নি রূপক আকারে কবি সেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন সমাজপতি, দেশনায়কদের উদ্দেশ্যে - শিশু চায় তার অধিকার l খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার l  এগুলি সে কেন পাবে না ? তার কী অপরাধ ? খিদে পেলে কেন সে  পায় না পর্যাপ্ত আহার ? সে কেন পোষাক পায় না ? ঘুমানোর জন্য সে কেন পায় না একটি নরম বিছানা ? এই প্রাথমিক চাহিদাটুকু তার কেন পূরণ হয় না ?


১৮-০৬-২০১৭ তারিখ এই আসরে এম. এ. মতীন রচিত  "ক্ষুধার্ত" কবিতাটি আলোচনা করেছিলাম l সেই কবিতায় পৃথিবী জুড়ে ক্ষুধা সমস্যার যে প্রকোপ তার উল্লেখ ছিলো এবং এই প্রসঙ্গে কিছু পরিসংখ্যান ব্যবহৃত হয়েছিল l আজ কোনো পরিসংখ্যান নয় l কবি যে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে কবিতাটি লিখেছেন তার সাপেক্ষে মানবিক পরিসরের মধ্যেই আলোচনাটিকে সীমিত রাখলাম l
দুঃখী মানুষের জীবন যন্ত্রণার কথা মরমী ভাষায় মেলে ধরার জন্য কবিকে জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভকামনা l