১৯০.
সুখের কামনা সকল মানুষের l এই সুখ সে কামনা করে তার প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে l তার কাছ থেকে কিছু প্রতিশ্রুতিও থাকে l ব্যক্তিভেদে এই প্রতিশ্রুতি ভিন্ন রকমের হতে পারে l অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় l অনেকক্ষেত্রে তা হয়ও না l কিন্তু জীবন থেমে থাকে না l চাওয়া পাওয়ার মধ্যে কিছু বোঝাপড়া হয় l যে স্বপ্ন বপন করা হয়েছিল, তার কিছু কাটছাঁট হয় l এভাবে বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্নের সন্ধি স্থাপিত হয় l
সবক্ষেত্রে প্রেম ভালোবাসা সৎ থাকে না l যেখানে এরকমটা থাকে, সেখানে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, বিশ্বাস ভঙ্গ, স্বপ্ন ভঙ্গ অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে সম্পর্ক চ্যুতিও হতে পারে l ধর্মসাহিত্যে, গল্পকথায়, কাব্যে, উপন্যাসে কিছু প্রেম ভালোবাসার নিদর্শন থাকে l সেই সম্পর্কগুলিতে কিছু বঞ্চনা, বিশ্বাসভঙ্গের প্রসঙ্গ থাকে l কিন্তু বহু বোধ্য ও দুর্বোধ্য কারণে এই সম্পর্কগুলিকে প্রশ্নাতীতভাবে যুগ যুগ ধরে মান্যতা দেওয়া হয়েছে l কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ঐ পথ অনুসরণ করা বারণ l তাকে পার্থিব গন্ডির মধ্যে থেকে তার প্রেমলীলা সম্পাদন করতে হয় l
একজন সৎ প্রেমিক যিনি প্রকৃতই তার প্রিয়াকে ভালোবাসেন, তিনি যদি বাস্তববাদী হন, আবেগ যদি তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তিনি এটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন যে তাঁর প্রিয়ার সমস্ত ইচ্ছা, কামনা তার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয় l যদিও প্রেমালাপের সময় আবেগঘন মুহূর্তে অনেক আকাশ পাতাল কথা, প্রতিশ্রুতি চলে আসে l কিন্তু বাস্তবে যে সেগুলি অসম্ভব, ঠান্ডা মাথায় তা মগজে খেলে l তাই একজন সৎ প্রেমিক তার প্রিয়াকে উপযুক্ত সময়ে এই বাস্তবতার পাঠ দেয় l সাধ্যমতো তাদের মিলিত স্বপ্ন পূরণে চিরকাল আন্তরিক থাকার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয় l নিয়মিত ছোট ছোট ইচ্ছা, অভিলাষা পূরণের মধ্যে দিয়ে জীবন যাপনের স্বপ্ন থাকে l আর বর্তমান জীবনে যদি স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে, তাহলে যন্ত্রণাময় এই জীবনের দহন অন্তে ফিনিক্স পাখির মতো নবজীবন লাভ করে আবার সুখ যাপনের প্রয়াস করার স্বপ্ন থাকে l
"সুখ এক স্পর্শ" কবিতায় এক সৎ, আন্তরিক, বাস্তববাদী প্রেমিকের প্রেমভাবনা কবি সোমাদ্রি এভাবেই মেলে ধরেছেন l


উপকথার অবিনাশী এক আগুনপাখির নাম ফিনিক্স । উপকথামতে ওই আগুনরঙা ফিনিক্স পাখিটি নাকি ৫০০ বছর বেঁচে থাকত । তারপর জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পাখিটি দারুচিনি, গন্ধরস প্রভৃতি সুগন্ধী উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি করত একটি নীড়, তারপর সে নীড়ে ধরিয়ে দিত আগুন l নীড়সহ ফিনিক্স পাখিটি পুড়ে ছাই হয়ে যেত l এখানেই সব শেষ নয়, কারণ ভস্মীভূত ছাই থেকে আবার জেগে ওঠে আরেকটি অগ্নিবর্ণ ফিনিক্স পাখি। নতুন পাখিটি তারপর সে ছাই জড়ো করে হেলিওপোলিস নামে প্রাচীন মিশরের একটি নগরে যেত সেখানকার সূর্য দেবতাকে শ্রদ্ধা জানাতে l  


যুগ যুগ ধরে মানবীয় শিল্পে ফিনিক্স পাখির ছাপ পড়েছে l এমন কী উত্তরাধুনিক বিমূর্ত শিল্পেও l
আমাদের পূর্বপুরুষরা এমন এক বিচিত্র পাখির কল্পনা কেন করেছিল ? আশ্চর্য আগুনপাখিটির উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন মিশর থেকে শুরু করে প্রাচীন চিনের উপকথায় l ফিনিক্স পাখি কিসের প্রতীক? পাখিটি পুর্নজন্ম, নিরাময়, ধ্বংসের পরও বেঁচে থাকার আকাঙ্খা এবং অমরত্ম তথা দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। পাখিটি কখনও আহত হলে নিজেই সারিয়ে তুলতে পারে। সূর্যর অস্ত যাওয়া ও উদয় হওয়া মানবজীবনের জীবন-মৃত্যুর রূপকও বটে। তবে জীবনদাতা সূর্য ও ফিনিক্স পাখি উভয়ই শান্তির প্রতীক। মানুষ সারা জীবনই অমৃতসুধা খুঁজেছে। মিশরে ফিনিক্সপাখিটি সূর্য দেবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তার প্রতীক। সূর্যই পৃথিবীতে সম্ভব করেছে জীবন, যে জীবণ কল্যাণকর। আমরা জানি পৃথিবীর সৃষ্টি সূর্যের অবস্থানের জন্যই সম্ভবপর হয়েছে। কোনওদিন সূর্য ধ্বংস হলে পৃথিবীও ধ্বংস হবে। প্রাচীন মিশরের মানুষ চায়নি সূর্য ধ্বংস হোক।
কবিতাটিতে ফিনিক্স পাখির উল্লেখের মধ্যে দিয়ে এই অবিনশ্বরতার কথাই বলা হয়েছে l অবিনশ্বর  প্রেমের কথা l
সুন্দর প্রেমের কবিতার জন্য কবিকে জানাই অভিনন্দন !