বিজ্ঞান কবিতা কি ? কবিতা আবার বিজ্ঞান হয় নাকি ?


বিজ্ঞান একটা পৃথক বিষয়। কবিতাও তাই। দুটোরই পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানকে যে কবিতা ধারণ করতে পারে সে বিষয়টি সহজ হলেও অনেক কবিই জানতে বা মানতে চান না। এর পূর্বে কবিতা বিজ্ঞান নামে প্রবন্ধ লিখেছি। তারপরও অহরহ বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় অনেকেই প্রশ্ন তোলেন কবিতায় আবার বিজ্ঞান কি ? কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরাট অংশ জুড়ে বিস্তৃত। বর্তমানে কবিতা চর্চার ক্ষেত্রেও একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। পূর্বেও ছিল হয়ত এতটা প্রকট ছিলো না। অনেকেই মাঝে মাঝে আলোচনার ফাঁকে বলেন কবিতার এখন দুর্দিন। কিন্তু প্রশ্ন করতে চাই সুদিন ছিল কখন ? সুদিনে কী ভাল কবিতা লেখা হয় ? রবীন্দ্রনাথ সর্বগ্রাসী হলেও পাঁচতারকার (পঞ্চপান্ডব) দৌরাত্মে অস্থির ছিলেন। তখনও বলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ কল্পলোকের কবি। পরীদের ভাষায় কবিতা লেখেন। আর পাঁচতারকার সমালোচনার তীর খুব ঢাক পিটিয়েই কবিকে বিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে নজরুলের সাথেও কবিকে বিরোধে ফেলে শনিবারের চিঠি আর রবিবারের লাঠি সংকলনের জন্ম হয়েছে। পাঁচ তারকার সুর ধরে কবিতা বিচ্ছিন্ন হবার যে দাবী উঠেছে; তা নিছক কোনো খেয়ালী মানসিকতা নয়। সেটি পরবর্তীতে এসে প্রমাণিত হয়েছে। কবিতা যদি বিচ্ছিন্ন না হয় তাহলে একই বিষয়বস্তুতে একই রকম বর্ণনা পাঠককে কিভাবে আনন্দ দিবে। পাঁচতারকা রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনায় ফেলেছেন ঠিকই। কিন্তু নিজেদের অজান্তেই তারা রবীন্দ্রে আচ্ছন্ন ছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথ পাঁচতারকা ঝড়ে ভেঙ্গে না গিয়ে বরং উৎসাহ ও সাহসিকতার সাথে কাজ করে গেছেন। যা তার পরবর্তী সৃষ্টিকর্মে প্রমাণ মেলে। এখনো যে রবীন্দ্র বলয় মুক্ত হয়েছে সাহিত্য তা কিন্তু নয়। জীবনানন্দ বা বিষ্ণুদে বা বুদ্ধদেব মুক্ত কবিতা লেখা হচ্ছে তা নয়। কিন্তু সমস্ত বলয় মুক্ত হয়ে অগ্রজদের অনুপ্রেরণা হিসাবে রেখে পৃথক ধ্যান ধারণায় একই বিষয়বস্তুতে প্রচুর মৌলিক কবিতা লেখা হচ্ছে সেটি কিন্তু সত্য। বিচ্ছিন্নতা সর্বকালেই প্রয়োজন। বলা যায় যে, যে কবিতা বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে সৃষ্টি তাই বিজ্ঞান কবিতা। এটি সময়ের দাবীতে কবিতার মৌলিক চাহিদা। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছেন -বৈজ্ঞানিক ও কবি উভয়েরই অনুভূতি অনির্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না। সুতরাং কবিতা বিজ্ঞান আশ্রিত হলে দোষ কি ? বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এবং রামেন্দুসুন্দর ত্রিবেদী বিজ্ঞান আশ্রিত সাহিত্য রচনা করেছেন। কবি হাসনাইন সাজ্জাদীও বিজ্ঞান কবিতার রূপ রেখা দিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছেন ফেব্রুয়ারী-২০১৪ বই মেলায়।
বিশশতকে কোয়ান্টাম ফিজিক্স, নিউরো-সায়েন্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ন্যানো প্রযুক্তি মানুষের ধারণাকে পরিবর্তন করেছে। বিজ্ঞান যেখানে বস্তুবাদ ও নিউটেনিয়ান মেকানিক্সের আবরণে বন্দী ছিল সেই বিজ্ঞান চেতনা নির্ভর হয়ে পড়লো। কবিতা চেতনাতেই সৃষ্টি। কোয়ান্টাম ফিজিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ওয়ার্নার হেইসেনবার্গ। তিনি তার Philosophical Problem of Quantum Physics গ্রন্থ প্রকাশ করে বললেন-  প্রকৃতির নিয়ম সংক্রান্ত গবেষণা এখন আর শুধু মৌলকণা সমূহ নিয়ে আলোচনা করে না। এখন তা আলোচনা করে এই কণা সমূহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নিয়ে অর্থাৎ আমাদের মনের বিষয়বস্তু নিয়ে। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী এরউইন শ্রডিঞ্জার ১৯৫৮ সালে তার Mind and Matter বই প্রকাশ করে প্রাচ্যের দার্শনিক মতামতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। একই সাথে ফ্রিজিয়ফ কাপরা -এর The Tao of Physics গ্রন্থ এবং বিজ্ঞানী গ্যারি জুকাভ-এর The Dancing Wu Li Masters গ্রন্থ আরো এগিয়ে নিয়ে যায়। নোবেল বিজয়ী রিচার্ড ফেনম্যান ১৯৫৯ সালে বললেন-‘ পরমাণুর পর পরমাণু সাজিয়ে বস্তু উৎপাদন সম্ভব।’ তারপর এটি কাজ করতে থাকে। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী এরিক ড্রেক্সলার ১৯৮৬ সালে প্রকাশ করলেন ‘ইঞ্জিন অব ক্রিয়েশন’ অর্থাৎ সৃষ্টির যন্ত্র। আর এটমিক লেবেলে কাজ করার জন্য ড্রেক্সলার দিলেন- STM (Scanning Tunnelling Microscope)যা প্রথম ন্যানো ডিভাইস। কবিতার সাথে দর্শন এক সূত্রে গাঁথা। কবিতায় দর্শন থাকতেই হবে। না থাকলে কবিতা সৃষ্টির কোনো মানেই নেই। দর্শন চোখে দেখা যায় না। এটা কবিতার ছন্দের মত অদৃশ্য অনুভব। কোয়ান্টা পদ্ধতিতে কবিতার ধ্যান করলে কল্পনা শক্তির সাথে শব্দ সমন্বিত রূপে তরঙ্গায়িত হয়। সৃষ্টি হয় নতুন শিল্প। কবিতার উচ্চমাত্রা, মধ্যমাত্রা ও নিম্নমাত্রা নির্ধারিত হয় এই ধ্যান বা মনের মন্ত্রের কল্পনার ইমেজ প্রকাশের উপর। যেখানে ইমেজ যতটা নিখুঁত হয় সেখানে কবিতা ততোটা মাত্রা সম্পন্ন হয়। এজন্য ভাল কবিতার জন্য সুস্থ ধ্যান করা অবশ্যই জরুরী। আর তার জন্য পড়তে হবে বিভিন্ন বিষয়। রুশ বিজ্ঞানী ইভান পাভলভ-এর কনডিশনড রিফ্লেক্স মতবাদ মতে দু’ধরনের উদ্দীপকের সাথে কোনো অবস্থাকে (Response) যুক্ত করলে পরে আসল উদ্দীপককে সরিয়ে নিলেও নকল উদ্দীপকের প্রভাবে একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। পাভলভ -এর কনডিশনড রিফ্লেক্স মতবাদের মত কবিতার ব্যাকরণ জানা থাকলে কবিতায় ছন্দ, অলংকার ও শব্দ স্বাভাবিক উদ্দীপক হিসাবে মনের ইমেজের সাথে সমন্বিত রূপ পরিগ্রহ রূপে কাজ করবে। তখন মনেই হবে না নিয়ম বা ব্যাকরণ, ছন্দ, অলংকার কবিতায় কোনো কঠিন বিষয়। এখানে মনের কল্পনা শক্তিই মূল চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে। বিজ্ঞান কবিতা / ছড়া/ পদ্যে কোথাও সরাসরি ম্যাসেজ আবার কোথাও অলংকার বা রূপক হিসাবে কাজ করছে।
মানুষের মস্তিস্কই অনেক বড় বিজ্ঞান। বরং এক বিস্ময়কর বিজ্ঞান। একটি কবিতা যদি মানুষের যাপিত জীবনের কথা বলে তাহলে তা প্রথমেই মস্তিস্কের কাজ। মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার কাজটি প্রথমে কবির মস্তিস্কেই হয়েছে। মানুষের পুরো শরীরকে ৬ ভাগ করা হলে -হাত (Superior Extremity - আপার লিম্ব), পা (Lower Extremity - লোয়ার লিম্ব), বক্ষ (Thorax / থোরাক্স), মাথা ও গলা (Head & Neck), মস্তিস্ক (Brain)। মস্তিস্কই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ড. স্মিথ  বলেছেন- মানুষকে বুঝতে হলে প্রথম ব্রেনকে বুঝতে হবে। দার্শনিক এরিস্টটল ছাত্রদের বলেছেন- হার্ট হচ্ছে চিন্তা ও চেতনার কেন্দ্র; আর ব্রেন হচ্ছে রেডিয়েটর বা রক্ত ঠান্ডা করার যন্ত্র মাত্র। দার্শনিক প্লিনি প্রথম ব্রেনকে বুদ্ধি ও উপলব্ধির কেন্দ্র বলে চিহ্নিত করেন। ব্রেনই মানুষের হার্ট ও দম মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রেনই মানুষের প্রাণ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জীবনের ধারণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।  ব্রেন নিজেকে মেরামত করার ক্ষমতা রাখে। ব্রেনের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কাজ পরিচালিত করতে পারে। মানুষের চেতনা থাকুক বা ঘুমে থাকুক ব্রেন চলমান। ব্রেনকে থামানো যায় না। ব্রেন দেহের সকল অঙ্গের যোগাযোগ সাধন করে হরমোন ও রিসিপ্টরের মাধ্যমে। জার্মানীর ম্যাক্স ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. ম্যানফ্রেড ইগান বলেছেন- ব্রেনের কোন কোন কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন সংগঠিত হতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ সময়। অর্থাৎ দ্রুতগামী গাড়ির নীচে পড়া থেকে বাঁচার জন্যে এক পা পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া ও তা কার্যকরী করার জন্যে ১ লক্ষ নিউরণের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দরকার হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এক সেকেন্ডের কম সময়ে। তাহলে মানুষের মস্তিস্কের গোপন গলিতে কি আছে ? মস্তিস্কের নিউরণের গেরোর বা সিনাপটিক সংযোগ হচ্ছে দশ লাখ কোটি। আর মহাবিশ্বের ছায়াপথে মোট গ্রহ আছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার কোটি। মানুষের এই নাজুক ও স্পর্শকাতর আর প্যাঁচানো মস্তিস্কের কোষ নিয়ে সহজের ভেতর ঘটছে জটিলতা। দশলাখ কোটি কোষের প্রতি কোষেই ৩০০ কোটি জোড় (বেজপেয়ার) জীবন থাকে। আর এই জীবন জোড়ের জিনোম রহস্যের খোঁজে ২০০১ সাল থেকে সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে চলছে গবেষণা। মানুষের মস্তিস্ক আকাশের চেয়েও বড়, জটিল, গভীর আর দ্রুতগতি সম্পন্ন। ব্রিটিশ গণিতবিদ, গাণিত্যিক, পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক রজার পেনরোজের বলেছেন -যদি পুরো জগতকে বিবেচনায় ধরি, মানব মস্তিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অতি নগণ্য একটা অংশ মাত্র। তবে মস্তিস্কই হলো সবচেয়ে সুশৃংখল। এই শৃঙ্খলা আসলে জটিলতার ফল। মানুষের মস্তিস্কের জটিলতার কাছে গ্যালাক্সি একটা জড়পিন্ড মাত্র। গ্যালাক্সির চেয়েও জটিল মানুষের মস্তিস্ক। মস্তিস্কের প্যাঁচানো কোষে নিউরণ কিভাবে ইন্দ্রিয়কে সক্রিয় রাখে সে মহিমা সম্পর্কে জানতে বিশ্বের ১৩৫টি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এক সঙ্গে দি হিউম্যান ব্রেইন প্রজেক্ট নামের প্রকল্পের মাধ্যমে তৎপর হয়েছে। এটি আবিস্কৃত হলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক নতুন দিক উন্মোচিত হবে নিঃসন্দেহে। কেননা মানব মস্তিস্কইতো পৃথিবীর অনেক বড় বড় সব বিষয় আবিস্কার করছে। সব কিছু জড়িয়ে আছে মানুষের শরীর এবং চাওয়া পাওয়া। মানুষের দেহই এক রহস্যজনক বিজ্ঞান। দেহের বাহ্যিক দিক কলা। ভেতরের অংশ বিজ্ঞান। মন হচ্ছে আত্মা। আর রুহ্ বা আত্মা বা মন হচ্ছে অনুভূতির উৎস। মানুষের মন হচ্ছে নার্ভাস এ্যাকশনের স্নায়ুবিক কার্যকলাপের শাব্দিক রূপ। যা মস্তিস্কের মধ্যে। ব্রেনের মধ্যে ফোরবেন ২টি সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার, মিডব্রেন, হইন্ডব্রেন-সেরিবেলাম, পনস্ ও মেডুলা নিয়ে গঠিত। গ্রেম্যাটার-ধূসর বর্ণের অংশ যা মস্তিস্কের স্নায়ু, রক্তনালী ও সার্পেটিং সেল দিয়ে গঠিত। ব্রেনে গ্রেম্যাটার থাকে বাইরের দিকে আর হোয়াইট ম্যাটার থাকে ভেতরে। হোয়াইট ম্যাটার- মস্তিস্কের সাদা অংশ যা স্নায়ুতন্ত্র রক্তনালী ও সার্পেটিং সেল দিয়ে গঠিত। স্পাইনাল কর্ডে হোয়াইট ম্যাটার থাকে বাইরে আর গ্রেম্যাটার থাকে ভেতরে। ক্রেনিয়াল নার্ভ-১২ জোড়া- অলফেক্টরী (সেনসরী নার্ভ) নাক থেকে ঘ্রাণ ব্রেনে পৌঁছায়। অপটিক (সেনসরী নার্ভ) দেখার কাজ করে। অকুলোমটর (মটর নার্ভ) চক্ষু পেশির উপর কাজ করে। ট্রকলিয়ার (মটর নার্ভ) চোখের একটি পেশির উপর কাজ করে। ট্রাইজেমিনাল (মিশ্র নার্ভ) চোখ, মাড়ি ও দাঁতে কাজ করে। এ্যাবডুসেনস (মটর নার্ভ) চোখের একটি পেশির উপর কাজ করে। ফেসিয়াল (মিশ্র নার্ভ) মুখের বিভিন্ন অংশে কাজ করে। ভেস্টিবিউলো কশলিয়ার (মিশ্র নার্ভ) কশলিয়ার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং শ্রবণে সাহায্য করে। গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল (মিশ্র নার্ভ) জিহবা, ফ্যারিংক্স প্যারেটিভ গ্রন্থি। ভেগাস (মিশ্র নার্ভ) দেহের বিশাল অংশ জুড়ে কাজ করে। এক্সেসরি (মটর নার্ভ) জিহবার সাথে যুক্ত এবং কাঁধ ওাানামা করতে সাহায্য করে। হাইপো গ্লোসাল জিহবার নড়াচড়ায় সাহায্য করে। ব্রেনের উপর যে পাতলা পর্দার আবরণ থাকে তাকে মেনিনজেস বলে। বাইরে থেকে ভেতরে ডুরামেটার, অ্যারাকনয়েড মেটার, পায়ামেটার। অ্যারাকনয়েড ও পায়ামেটারের মাঝখানের অংশ হচ্ছে অ্যারাকনয়েড স্পেস এখানে সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড তরল এবং কিছু রক্তনালী ও স্নায়ু থাকে। ৩১ জোড়া স্পাইনাল কর্ডের সারভাইকাল ৮টি, থোরাসিক ১২টি, লাম্বার ৫টি, সেক্রাল ৫টি ও ককসিজিয়াল ১টি। করোটির স্নায়ুর সংখ্যা মোট ১২ জোড়া। স্নায়ু কলার গঠন ও কার্যগত একক। নার্ভাস টিস্যু (Nerovous Tissue) -এর গঠন ও কার্যকরী একককে নিউরণ বলে। মস্তিস্ক নিউরণ সেল ও গ্লিয়াল (এষরধষ) সেল দ্বারা গঠিত। একটি নিউরণ সেলের বিপরীতে আছে দশটি গ্লিয়াল সেল। আর নিউরণের সংখ্যা প্রায় একশ বিলিয়ন। অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি নিউরণের মাঝখানে সংযুক্তি সার্কিটের ফাঁককে বলা হয় সাইনাপস। এই সাইনাপসের সংখ্যা প্রায় একশ ট্রিলিয়ন। ব্রেনের মধ্যে প্রায় প্রতিসেকেন্ডে একলক্ষ কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন ঘটে। ব্রেন ২০-২৫ ওয়াট বিদ্যুতের সাহায্যে ইলেকট্রো -কেমিক্যাল পদ্ধতিতে কাজ সম্পন্ন করে। একটি নিউরণ ১০ হাজার নিউরণের সাথে সংযুক্ত। মস্তিস্কের ভেতরটা পুরো একটা তারের জালি। এই তারজাল অত্যন্ত উন্নতমানের। মস্তিস্কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অত্যন্ত দ্রুত বার্তা পৌঁছাতে পারে। মস্তিস্কের ওজন মানুষের সম্পূর্ন দেহের ওজনের মাত্র দুই শতাংশ। ব্যবহার করে দেহের মোট শক্তির ২০ শতাংশ। এর বেশী করলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যাবে। আরো বেশী ব্যবহার করলে মস্তিস্কের অতিরিক্ত অক্সিজেন প্রয়োজন হবে। আর মানুষ তা করতে অক্ষম। কেননা কাজ করতে হলে শক্তির চাহিদা রয়েছে। মানুষ যে পরিমাণ অক্সিজেন নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে গ্রহণ ও তাপমাত্রা গ্রহণ করে তার ২০ ভাগ মগজের কাজে লাগে। আর শরীরে উৎপাদিত রক্তের ১৫ ভাগই মগজের চাহিদা পূরণ করে। অন্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের মগজ বড়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ভেতরে মাথার ওজন বেশী হলেও সে তুলনায় মগজের ওজন খুবই কম। মস্তিস্ক মানুষের শরীরের মোট ওজনের ৩ শতাংশ বা দেড় কেজি। বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কাজে লাগিয়েছেন বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। মানুষ ভেদে মস্তিস্কের এই সংযোগ রক্ষাকারী সুক্ষè তারজালির বিন্যাস ভিন্নরকম। মানুষ চাইলেই এর উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু নার্ভাস এ্যাকশনে স্মৃতিশক্তি পদ্ধতি মেনে বৃদ্ধি করা যাচ্ছে। পরিবেশের কোন উদ্দীপনায় ঘটিত তাৎক্ষণিক স্নায়ুজনিত প্রতিক্রিয়াকে প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলে। এ ক্রিয়ার আবেগ মস্তিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে স্নায়ুর রজ্জুর অভ্যন্তরে কর্মপ্রেরণায় রূপান্তরিত হয়। মস্তিস্কের কোষ স্নায়ুতন্ত্রের একক। বাইরের আঘাত থেকে শক্ত করোটি ও ভেতরে ব্রেনকে ৩ স্তর বিশিষ্ট ঝিল্লির আবরণ দ্বারা রক্ষা করে। ঝিল্লির পর্দার ফাঁকে সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড তরল বর্জ্য পদার্থ পরিস্কার করে আর ফ্লুইডের অক্সিজেন ও স্নায়ুর পুষ্টি জোগায় এবং স্পাইনাল কর্ডকে সচল রাখে। স্পাইনাল কর্ড ও ব্রেনের সমন্বিত কার্যক্রমে গঠিত হয়েছে মানুষের নার্ভাস সিস্টেম। করোটিতে তরল পদার্থে ভাসমান থাকে মস্তিস্ক। মানুষ মাত্র এর ১০ ভাগ কাজে লাগায়। দুই নিউরণের মধ্যবর্তী বাদামের মত ফাঁক সাইনাপসের (Synapse) মধ্যেকার রাসায়নিক নিঃসরণকে নিউরো ট্রান্সমিটার বলে। স্মৃতি হচ্ছে মস্তিস্কের নিউরণের ক্রিয়া প্রক্রিয়ার ফল। ব্রেনের ১০০ বিলিয়ন নিউরণ সেনসরী, মটর ও এসোসিয়েশন সেন্টারে ভাগ করা। সাইনোপসে ১ সেকেন্ডের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগের কম সময়ে সংকেত পাঠায়। মস্তিস্কের বাম সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার (Cerebral Hemispheres) বেশী উন্নত। মস্তিস্কের ৩টি ভাগ- প্রোজেন, মেজেন সেফালন ও রম্বেন সেফালেন। প্রোজেন সেফালন সবচেয়ে বড় অংশ। মস্তিস্ক তার কাজের জন্য নিউরোপেপটাইড নামক এ্যামাইনো এসিডের উপর নির্ভর করে। পুরুষের ১টি হেমিস্ফিয়ার আর নারীর ২টি হেমিস্ফিয়ার। পুরুষরা ১টি হেমিস্ফিয়ার আর নারীরা ২টি হেমিস্ফিয়ার কাজে লাগায়। এ জন্য ২টার সংযোগ সাধনে সময় বেশী লাগে। এ কারণে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে একটু বিলম্ব হয়। নারী পুরুষের মস্তিস্কের গড় ওজন ১.৪ কেজি। প্রতিটি নিউরণে সংকেত পাঠানোর বাহুকে এক্সন এবং সংকেত গ্রহণের বাহুকে ডেনড্রাইট বলে। তথ্য বেশী ধারণ করে নারী আর সিদ্ধান্ত দ্রুত দেয় পুরুষ। পুরুষের মস্তিস্কের উপরি ভাগ সমতল। নারীদের মস্তিস্ক কক্ষ বহুল ও বিভাজন সুষ্পষ্ট। মস্তিস্কের ডান ও বাম দিকের তথ্যের সমন্বয় সাধন করে করপাস ও ক্যালোসাম (Corpus Callosum) নামক স্নায়ুতন্ত্রের সমষ্টি মস্তিস্কের টেম্পোরাল লোবে ভাষা ও তথ্য সংগ্রাহক গ্রন্থি থাকে। বাম দিকের অংশ সঙ্গীত, কাব্য ও গণিত শাস্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনে সক্ষম। আর সেরিব্রাল কটেক্সের সেরিব্রাম এর লিম্বিক সিস্টেমে মানুষের আবেগের উৎস থাকে। এর সাথে সেরিব্রাল কটেক্সের ভূমিকায় প্রেম ও আবেগ জাগ্রত হয়। ব্রেন নার্ভাস সিস্টেম ও ইন্ডোক্রাইন (হরমোন) সিস্টেমে দেহ, পরিবেশ ও বায়োফিডব্যাক পরস্পরকে প্রভাবিত করে তথ্য সংগ্রহ ও কর্মের নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এখানে মানুষের অঙ্গ পতঙ্গের যে সংকেত সেটি রহস্যময়। বৈজ্ঞানিক ভাবে যত প্রমাণই হোক সত্য হচ্ছে সংকেত কেউ দেখতে পায় না। কিন্তু সংকেত হচ্ছে। আর হচ্ছে বলেই মানুষ চলাচল করছে। সংকেত কোন রকম বিপর্যয় ঘটলে মানুষ অসুস্থ হয় এবং মারাও যেতে পারে বা যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্টোক -এর মত হঠাৎ অসুখের কথা খুবই পরিচিত। ব্রেন দেহকে ক্ষতিকর অবস্থা থেকে মেরামত করতে কেমিক্যাল ম্যাসেঞ্জার প্রেরণ করে মুখোমুখি হয়। এই কেমিক্যাল মেসেঞ্জার মেরামত না করতে পারলে বা ফিডব্যাক লুপকে সঠিক পথে পরিচালিত না করতে পারলে দেহে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। দেহ বিপদগ্রস্ত হয় আর ব্রেনের সার্কিটে জ্যাম বাধে। মেডিটেশন করেও ব্রেনের ক্ষতিকর অংশ মেরামত করা যায়। আর খাদ্য ও পুষ্টির মধ্য দিয়ে মস্তিস্কের গতি ও ক্ষমতা বাড়ানো যায়। প্রতিদিন একজন মানুষের চলাফেরায় প্রায় ৫০০ ক্যালরী ব্যয় হয়। আর সেই সাথে মানসিক শক্তি সমান্তরাল না হলে বিপদ। মস্তিস্কের বিভিন্ন কাজের উপর প্রভাব পড়ে এ ধরনের খাদ্যের মধ্যে যেমন-কফি, যবের গুঁড়ো, অঙ্কুরিত গম, শিম, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, গরুর মাংস, মাছ। মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ায় যে সব খাদ্য- আঙুরের জুস, কালোজাম, অঙ্কুরিত গম, কফি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেটুস পাতা, মাছ, ডিম, পনির, মুরগির মাংস ইত্যাদি। অবশ্য ধারণা করা হচ্ছে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ন্যানো প্রযুক্তিতে মানুষ ট্যাবলেট খেয়ে বেঁচে থাকবে। খাবার লাগবে না। মানুষের মস্তিস্কই সকল প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু। ব্রেনকে ভাগ করে আলোচনা করা হলে দেখা যায় যে -
সেরিব্রাম : মস্তিস্কের সবচেয়ে বড় অংশ। ডান ও বামে দুটি অংশ সাদা স্নায়ুর গোছা দ্বারা সংযুক্ত। ভেতরের সাদা পর্দাথ উপরে ধূসর পর্দাথ দ্বারা আচ্ছাদিত। বিভিন্ন লোবে বিভক্ত খুলির হাড়ের নামে এগুলোর নাম। সাদা পদার্থের বলয়ের মাঝখানে ধূসর পিন্ডকে সেরিব্রাল নিউক্লি বলে। এর দুই বলয় একে অপরের পরিপূরক। সেরিব্রাম দেহের বহু জটিল রোগের কাজ করে। এর মটর তৎপরতা বা পেশী পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করে সমুখ ভাগের করটেক্সের অভ্যন্তরে নার্ভ সেন্টার সমূহ। এ মটর এলাকায় ক্ষতি হলে সংযুক্ত পেশী নিশ্চল হয়ে যাবে। সেরিব্রাল কটেক্সের সেনসরি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে শ্রবণ, দর্শন, স্পর্শ ও পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা সংগৃহীত তথ্যাবলী। সেনসরি এলাকা না থাকলে কোনো বস্তু কেমন তা দেখতে পেতো না, কোনো স্বর শুনতে পেতো না, ঠান্ডা -গরম বুঝতে পেতো না। করটেক্সের মেমোরি ছড়িয়ে থাকে। এ জন্য কিছু অংশ ক্ষতি হলে স্মৃতি কার্যক্রম কিছুটা কমে যায়। তবে ড. পেনফিল্ড মস্তিস্কে ইলেক্টয়েড স্থাপন করে বিভিন্ন অংশে স্পর্শ করে রোগীর দীর্ঘ সময়ের ভুলে থাকা স্মৃতি ফিরিতে এনেছেন।


সেরিবেলাম : মস্তিস্কের লঘু অংশ সেরিব্রাম অসিপিটাল লোবের নিচে অবস্থিত। এতেও ধূসর ও সাদা পদার্থের প্রলেপ নিউক্লি এবং দুটি বলয় সংযুক্ত ভেরমিস দ্বারা। এটিও নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় সাধনের কাজ করে থাকে। তবে বাইরের অঙ্গ স্নায়ুতন্তু গুলো এখান থেকে সরাসরি সাড়া প্রদানকারী অঙ্গে যায় না। বরং এসোসিয়েশন সেন্টার ঘুরে যায়। সেরিবেলামে না থাকলে গতি ও তৎপরতা সুষমবণ্টন ঝুকিপূর্ণ হতো। সেরিবেলাম ক্ষতি হলে পেশী তৎপরতায় সমন্বয়ের অভাব ঘটে।
ব্রেন স্টেম : ব্রেন স্টেম (Brain stem) ব্রেনের উচ্চতর কেন্দ্রগুলোকে সংযুক্ত করেছে স্পাইনাল কর্ড-এর সাথে। এর প্রধান অঙ্গ হচ্ছে মেডুলা অবলঙ্গটা (Medulla Oblongata), পনস (Pons), মিডব্রেন (Thamanus), থালামাস (Thamanus) ও হাইপো-থালামাস  (Hypothalamus) ।
মেডুলা অবলঙ্গটা : মেডুলার সাদা পদার্থের অভ্যন্তরে রয়েছে ধূসর পদার্থ । মাথা, গলা ও কাধের সকল সচেতন তৎপরতা নিয়ন্ত্রণকারী ৪টি ক্রানিয়াল নার্ভকেন্দ্র সহ এর অভ্যন্তরে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসমূহ। এর মধ্যে কার্ডিয়াক কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে হার্ট বিট, ভাসো কনস্ট্রিকটর কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে রক্তবাহী নালীর পরিধি, শ্বাসকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে দমের হার ও গভীরতা। আরও বিভিন্ন কেন্দ্র রয়েছে যা গলাধঃকরণ, বমি, পাকস্থলীর তৎপরতা এবং হজমকারী জারক নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। সব ধরনের ইচ্ছা নিরপেক্ষ ক্রিয়ার (Involuntary Reflex Action) উৎস হচ্ছে এই মেডুলা।


মিড ব্রেন : মিড ব্রেন উপরের সেরিব্রামের সাথে নিচের সেরিবেলাম ও পনসের (pons) সাথে সংযোগ সাধন করছে। দেখতে অনেকটা মেডুলা ও পনসের মতোই। এখানেও রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রের গোছা, যা ব্রেইন থেকে স্পাইনাল কর্ডে নেমে গেছে এবং উপরে সেরিব্রাল করটেক্সে  উঠে গেছে। দুটি ক্রানিয়াল-নার্ভ-এর উৎসসহ এখানে অবস্থিত কর্পোরা কোয়াড্রিগেমিনায় (Corpora Quadrigemina) রয়েছে দর্শন ও শ্রবন সমন্বয় কেন্দ্র। ব্রেনের এই অংশ কোন্ দিক থেকে একটা বিশেষ শব্দ আসছে তা নিরুপণ করে দেয়।
থালামাস: থালামাস মিড ব্রেনের কিছুটা উপরে সাদা পদার্থ দ্বারা আচ্ছাদিত ধূসর পদার্থ। এটি হচ্ছে প্রধান রিলে কেন্দ্র এবং ব্রেনের নিম্ন এলাকা ও স্পাইনাল কর্ড থেকে আসা প্রতিটি ম্যাসেজ এখানে প্রক্রিয়াজাত হয়ে সেরিব্রাল করটেক্সে প্রেরিত হয়।
  
হাইপোথালামাস: হাইপোথালামাস ব্রেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। থালামাসের নিচেই হাইপোথালামাস অবস্থিত। পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের সাথে মিলিতভাবে দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত বেঁচে থাকার উপযোগী প্রাণ রাসায়নিক পরিবেশের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় থাকা নিশ্চিত করে হাইপোথালামাস। কারণ তাপমাত্রার যে কোন ওঠানামার ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল হাইপোথালামাস। এটি ক্ষুধা, ব্যথা ও তাড়নার ব্যাপারে সংবেদনশীল হবার কারণে খাবার গ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এতে অবস্থিত তৃষ্ণাকেন্দ্র রক্তে পানির পরিমাণ নিরূপণে বেশ সংবেদনশীল। তাই শরীরে পানির প্রয়োজন হলেই মানুষের তৃষ্ণা অনুভূত হয়। এখান থেকেই ঘুম ও জাগৃতির প্যাটার্ন নিয়ন্ত্রিত হয়, হার্ট বিট, অন্ত্রের সংকোচন প্রসারণ ও মূত্রথলি শূন্যকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। এই হাইপোথালামাস নার্ভাস সিস্টেম ও ইন্ডোক্রাইম সিস্টেম অর্থাৎ শরীরের স্নায়ুভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও হরমোন ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে যোগসূত্র হচ্ছে। কোন দৈহিক সম্পর্ক সজাগ হলেই হাইপোথালামাস রাসায়নিক নিঃসরণের মাধ্যমে পিটুইটারি গ্ল্যান্ডকে সক্রিয় করে তোলে। পস্টেরিয়র পিটুইটারি রক্তে দুটি হরমোন ছাড়ে যা তেরী হয় হাইপোথালামাসে। অক্সিটাসিন (Oxytocin) গর্ভবতীর রক্তে প্রচুর পরিমাণে নিঃসরণ হলেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার প্রক্রিয়ার সূচনা করে। স্তনে দুধ উৎপাদনের পেছনেও এই হরমোনের ভূমিকাই মুখ্য। এন্টিডিউরেটিক (Antidiuretic) হরমোন শরীর থেকে কিডনীর মাধ্যমে যাতে অতিরিক্ত পানি নিঃসরণ না হয় তা নিশ্চিত করে। দুটি হরমোনই তৈরী হয় হাইপোথালামাসে। এন্টিরিয়র পিটুইটারি ৬টি পৃথক হরমোন নিঃসরণ করে হাইপোথালামাসের নির্দেশে। এগুলোর বেশির ভাগই অন্যান্য গ্ল্যান্ডকে তাদের নিজস্ব হরমোন উৎপাদন বা বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু প্রোল্যাকটিন দুধের ক্ষরণ ঘটায় এবং গ্রোথ হরমোন, সেল বিভক্তি. ঘাড় বৃদ্ধি ও প্রোটিন সিথেসিস ঘটায়। এ দুটি হরমোন সরাসরি শরীরের টিস্যুতে ক্রিয়া করে। হাইপোথালামাস হচ্ছে আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী ব্রেনের লিম্বিক সিস্টেম (Limbic System) -এর অংশ বিশেষ হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampas) ও ব্রেন সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত এলাকার সাহায্যে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। বলা যায় হাইপোথালামাস মন ও দেহের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। এখানে আবেগের যে কোন পরিবর্তন লিপিবদ্ধ হয় আর তা দৈহিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। মানুষ কোনো ভয়ের কিছু দেখে যে অনুভূতি লিপিবদ্ধ করে সে ভয়ের প্রকাশ ঘটাতে পারে হার্ট বিট, মুখমন্ডল ফ্যাকাসে রূপ ধারণ করে শরীর ঘেমে এবং আর্তচিৎকারের মাধ্যমে।
হাইপোথালামাসের মাধ্যমেই আবেগ দেহের উপর ঐ মুহূর্তে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
সেনসরি অর্গান : ব্রেনের গুরুত্বপূর্ষ একটি কাজ হচ্ছে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। বাইরের কোন পরিবর্তন সম্পর্কে ইন্দ্রিয় মানুষকে সংকেত দিলেই মানুষ তা অনুভব করে। ইন্দ্রিয় যা অনুভব করছে, তা হচ্ছে পরিবর্তন। মানুষ কোনো অনুভতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তা সহজেই এক সময় সচেতনভাবে অনুভব করে না। অর্থাৎ এর সাথে খাপ খাইয়ে বা মিলিয়ে নেয়। কিন্তু এ অবস্থায় কোন পরিবর্তন হলে দেহের প্রাণ রাসায়নিক ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যে দেহকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয় তথ্য সংগ্রহ করে এবং নার্ভাস সিস্টেমের মাধ্যমে ব্রেনে প্রেরণ করে। মানুষ এসব ইন্দ্রিয়ে কিছুই অনুভব করেনা। ইন্দ্রিয় শুধু স্নায়ুর মাধ্যমে তরঙ্গ পদার্থের মাধ্যমে ব্রেনে তথ্য প্রেরণ করে। ব্রেন এ তথ্যের প্রকৃতি নিরূপণ করে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয় তথ্য সংগ্রহ করে এবং নার্ভাস সিস্টেমের মাধ্যমে ব্রেনে প্রেরণ করে। কিন্তু মানুষ ইন্দ্রিয়ে কিছুই অনুভব করেনা। ইন্দ্রিয় শুধু স্নায়ুর মাধ্যমে তরঙ্গাকারে ব্রেনে তথ্য প্রেরণ করে। ব্রেন এই তথ্যের প্রকৃতি নিরূপণ করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। পঞ্চইন্দ্রিয় ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে ১২ জোড়া ক্র্যানিয়াল নার্ভ রয়েছে। এর মধ্যে ১০ জোড়ার উৎপত্তি হচ্ছে ব্রেন স্টম থেকে। মটর নার্ভ গিয়েছে ব্রেন থেকে পেশী বা গ্ল্যান্ডে। সেনসরি নার্ভ তথ্য ব্রেনে নিয়ে যায়। আর মিশ্রিত নার্ভ-এ রয়েছে সেনসরি ও মটর তন্তু। ক্র্যানিয়াল নার্ভ যেহেতু সচেতন কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে তাই এর কোন ক্ষতি দেহের কিছু নির্দিষ্ট পেশী ব্যবহারে মানুষের সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ব্রেন ও দেহের মধ্যে যোগাযোগ : মানুষের দেহের সব ইন্দ্রিয় ব্রেন বা স্পাইনাল কর্ডের সাথে স্নায়ুতন্তু দ্বারা সংযুক্ত থাকে। যখন কোনো ইন্দ্রিয় কোন তথ্য পায় তখন স্নায়ুতন্ত্রতে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করে। স্নায়ুতন্তুর মাধ্যমে এই তরঙ্গ গন্তব্যে যাত্রা করে। কখনো তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা ইচ্ছানিরপেক্ষ ক্রিয়ার (Reflex Action) মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করে; কখনও সচেতনভাবে ব্রেন তা অনুভব করে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ব্রেনে প্রতিনিয়ত এত বিপুল পরিমাণ তথ্য যাচ্ছে যে তা সম্পর্কে সচেতন থাকাও সম্ভব নয়, আর তার প্রয়োজনও পড়েনা। এটি মানব দেহের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
নার্ভাস সিস্টেম  : নার্ভাস সিস্টেম বলে পরিচিত দেহাভ্যন্তরের যোগাযোগ পদ্ধতি আসলে একাধিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযুক্ত রূপ।
ক)  সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (Central Nervous System) ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ডের সমন্বয়ে গঠিত।
খ)  পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম (Peripheral Nervous System) সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ও দেহের অঙ্গ ও পেশীর সাথে যোগাযোগ স্থাপনকারী স্নায়ুসমূহ নিয়ে গঠিত।
গ) অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম হচ্ছে পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম এর একটা অংশ। অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেম আপনার সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই আভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহের কার্যাবলী মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আবার দু’ভাগে বিভক্ত প্যারিসিম্পেথেটিক ব্রাঞ্চ এবং সিম্পেথেটিক ব্রাঞ্চ (Parasympathetic Branch and Sympathetic Branch) প্যারাসিম্পেথেটিক ব্রাঞ্চ সাধারণ বিশ্রাম ও দেহের পুণনির্মাণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। আর সিম্পেথেটিক ব্রাঞ্চ জরুরী যেমন মার অথবা পালাও (Fight or Flight) কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। উভয় কাজই পরিচালিত হয় স্বত:স্ফূর্তভাবে আপনার সচেতনতার অজ্ঞতাসারে।
এন্ডোক্রাইন সিস্টেম : যে কোনো সময় দ্রুত সাড়া দিতে পারাটাই নার্ভাস সিস্টেমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে এন্ডোক্রাইন সিস্টেম (Endrocrine System) ধীরে ও সময় নিয়ে সম্পন্ন করতে হয় এমন কাজই করে। এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ডগুলো হরমোন উৎপাদন করে এবং রক্তে ছেড়ে দেয় এবং রক্তের মাধ্যমেই তা শরীরের সর্বত্র প্রেরণ করে। যখনই এই হরমোন তার গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন তা সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের কারণ হয়। স্নায়ু তরঙ্গ দ্বারা প্রেরিত বার্তার চেয়ে হরমোনের ক্রিয়া হয় ধীরে। দৈহিক বৃদ্ধি, সাবালকত্ব অর্জন ও প্রজনন প্রক্রিয়ার মত দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন নিয়ন্ত্রিত হয় হরমোন দ্বারা। হরমোন উৎপাদন সতর্কতার সাথে নিয়ন্ত্রণের জন্যে রয়েছে চমৎকার ফিডব্যাক প্রক্রিয়া। যা পরিচিত বায়ো ফিডব্যাক লুপ (Bio-feed-back loop) নামে। এর কার্যকারিতা গড়ে ওঠেছে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড ও হাইপোথালামাসের মাঝে স্থাপিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উপর। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড অন্যান্য গ্ল্যান্ডগুলোকে প্রয়োজনীয় হরমোন উৎপাদনের নির্দেশ পাঠালেও এটি সক্রিয় হয়ে ওঠে হাইপোথালামাস প্রেরিত স্নায়ু সংকেত দ্বারা।
নিউরণ : ব্রেন ও নার্ভাস সিস্টেম গঠিত হয়েছে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিউরণ সেল দ্বারা। নিউরণই হচ্ছে ব্রেনের ক্ষুদ্রতম একক। এর আকার আকৃতি নির্ভর করে এর অবস্থান ও দায়িত্বের উপর। তবে প্রত্যেক নিউরণরই রয়েছে একটি নিউক্লিয়াস ও তার চারপাশে বেষ্টিক সেল দেহ। আর এ নিউরণ সেল থেকে তারের মতো চারদিকে চলে গিয়েছে অসংখ্য স্নায়ুতন্ত্র যা পরিচিত এক্সন (Axon) ও ডেনড্রাইট (Dendrite) নামে। নিউরণমূলত তিন ভাগে বিভক্ত।
১. সেনসরি নিউরণ : এটি ইন্দ্রিয় থেকে বা রিসিপটর থেকে ব্রেন বা স্পাইনাল কর্ডে তথ্য নিয়ে আসে।
২. মটর নিউরণ : এটি ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ড থেকে তথ্য ও নির্দেশ নিয়ে গ্ল্যান্ড পেশীতে পৌঁছে দেয়। এরা পেশী ও অঙ্গগুলোকে কাজ করতে উৎসাহ দেয়।
৩. এসোসিয়েশন নিউরণ : এটি ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ডে অবস্থান করে সেনসরি ও মটর নিউরণের মাঝে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। বেশিরভাগ নিউরণই পাওয়া গেছে ব্রেন ও স্পাইনাল কর্ডে। এদের  তন্তুগুলো হতে পারে অনেক লম্বা। যেমন স্পাইনাল কর্ড থেকে পায়ের আঙ্গুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে তন্তু। প্রতিটি অঙ্গ ও পেশীতে গিয়ে পৌছেছে এই তন্তু। শত শত তন্তু একত্রে গোছা আকার ধারণ করে স্নায়ু বা নার্ভ গঠন করে।
তথ্য প্রেরণ : স্নায়ুতন্ত্র ব্রেনের সাথে, পেশীর সাথে, গ্ল্যান্ডের সাথে এবং একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু তারা একে অপরকে স্পর্শ করেনা। নিউরণের এক্সন যে তন্তু নিউরণ থেকে তথ্য প্রেরণ করে, তাকে এক্সন বলে এবং অন্য নিউরণের ডেনড্রাইট যে তন্তু তথ্য গ্রহণ করে, তাকে ডেনড্রাইট বলে -এর মধ্যে অতি সূক্ষè ফাঁক থাকে, একে বলে সাইনেপস। য়খন স্নায়ুতে বৈদ্যুতিক চার্জ গঠিত হয় তখন এক নিউরণ থেকে অপর নিউরণে অথবা পেশীতে তথ্য প্রেরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। একটা বৈদ্যুতিক স্নায়ু সংকেত নিউরণে এক্সন দিয়ে যাত্রা শুরু করে সাইনোপস পর্যন্ত পৌঁছায়। সাইনেপটিক নোবে পৌঁছানোর সাথে সাথে সেখান থেকে একটি নিউরো-ট্রান্সমিটার পরবর্তী নিউরণের ডেনড্রাইট বা পেশীতে পৌঁছে তথ্য প্রদান অব্যাহত রাখে। এভাবেই চলে দেহাভ্যন্তরে তথ্য আদান প্রদানের রিলে। স্নায়ু তন্তু দিয়ে তথ্য প্রতি ঘন্টায় ২২৫ মাইল গতিতে ভ্রমণ করে। একটি সংকেত ব্রেন থেকে পায়ে পৌঁছাতে লাগে সেকেন্ডের ৫০ ভাগের ১ ভাগ সময়। তথ্য ইন্দ্রিয় থেকে ব্রেনে যাক, ব্রেনের এক সেল থেকে অন্য সেলে যাক বা নার্ভাস সিস্টেম থেকে পেশীতে যাক, তথ্য প্রেরণ প্রক্রিয়া এই একই রকম।
নিউরো-ট্রান্সমিটার : অদম্য রানার। মানুষের যারা নিরলসভাবে দেহ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্ত থেকে বাণী বহন করে ব্রেনে পৌঁছাচ্ছে এবং ব্রেন থেকে কমান্ড পৌঁছে দিচ্ছে পায়ের আঙ্গুলের মতো দূরবর্তী প্রান্তে। এই রানাররা হচ্ছে নিউরোট্রান্সমিটার অণু। এই নিউরোট্রান্সমিটার অণুগুলো প্রতিটি দেহ কোষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। ব্রেনের সকল চিন্তা, আশা, স্বপ্ন, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, করণীয়, বর্জনীয় সকল নির্দেশ প্রতিটি সেলে পৌঁছে দিচ্ছে এই নিইরোট্রান্সমিটার। আবার দেহাভ্যন্তরের ও পারিপার্শি¦কাতার সকল তথ্য ব্রেনের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এই নিউরোট্রান্সমিটার। এ পর্যন্ত ৩০ ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার আবিষ্কৃত হয়েছে। চমৎকার ব্যবস্থা থাকলেও দেহ কখনও কখনও রোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। মানুষের সুসংহত মানসিক প্রস্তুতির অভাব কিন্তু মনের শক্তি অসীম, বস্তু বিনাশ প্রাপ্ত হয়, কিন্তু তথ্য অবিনাশী, দেহ কোষ মরে যায়। কিন্তু এর অভ্যন্তরের তথ্য ডিএনএ বেঁচে থাকে নতুন দেহ কোষে। চিন্তা সর্বত্রগামী, চিন্তার রয়েছে বস্তুগত ভিত্তি। কারণ প্রতিটি নিউরোট্রান্সমিটার এক একটি বিশেষ ধরণের চিন্তা বা তথ্যকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর নিউরোট্রান্সমিটার একটি বিশেষ ধরণের রাসায়নিক অণু। তাই মন ও চিন্তার শক্তি সবকিছুকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। মানুষ মন ও চিন্তার শক্তিকে সৃজনশীল ও ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে চিন্তা যেমন বস্তু সৃষ্টি করছে, চিন্তা তেমনি সুখ ও সাফল্য সৃষ্টি করবে।
ব্রেনওয়েব : মানুষের মনের প্রতিটি কাজ করে ব্রেন। ব্রেন সক্রিয় থাকলে প্রতিনয়ত খুব মৃদু বিদ্যুৎ তরঙ্গ বিকিরিত হয়। বিজ্ঞানীরা এটাকেই ব্রেন ওয়েভ বলেছেন। ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাফি (ই ই জি) যন্ত্র দ্বারা এ ওয়েভ বা তরঙ্গ মাপা যায়। মানুষের মানসিক চাপ, সতর্কতা, তৎপরতামূলক পরিস্থিতিতে ব্রেনের বৈদ্যুতিক বিকিরণ বেড়ে যায়। তখন ব্রেন ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ১৪-২৬ সাইকেল পর্যন্ত। একে বলা হয় বিটা ব্রেন ওয়েভ। মানুষ চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম কালে একটু তন্দ্রা ভাব সৃষ্টি হলে ব্রেনের বৈদ্যুতিক তৎপরতা কমে যায়। এ অবস্থায় ব্রেন ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ৮-১৩ সাইকেল। একে বলে আলফা ব্রেন ওয়েভ। থিটা ব্রেন ওয়েভ আলফার চেয়ে কিছুটা ধীর। থিটার ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে সেকেন্ডে ৪-৭ সাইকেল। আর নিদ্রাকালীন ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে সেকেন্ডে ০.৫-৩ সাইকেল পর্যন্ত। এটাকে বলে ডেল্টা ব্রেন ওয়েভ। ব্রেন ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি সেকেন্ডে ২৭ বা এর উপরে উঠে যায় মানুষ হঠাৎ উত্তেজিত হলে। আর তখন এটাকে বলে গামা ব্রেন ওয়েভ। বিশ্রাম বা তন্দ্রাকালীন সময়ে ব্রেন ওয়েভ ১৩ থেকে নেমে ৪ সাইকেলে আলফা বা থিটা লেভেলে পৌঁছায় তখন চেতন মনে এই ফ্রিকোয়েন্সিকে আলফা বা থিটা লেভেলে নামাতে পারলে যে কেউ যে কোন বিষয়ে ধ্যানাবস্থায় যেতে পারবে।
মানুষ চিন্তার জিন নিয়ন্ত্রণ করবে : সুইজারল্যান্ডের বাসেলে ডিপার্টমেন্ট অব বায়োসিস্টেমস এ জৈব প্রযুক্তি ও জৈব প্রকৌশল অধ্যাপক মার্টিন ফুসেনেগারের নেতৃত্বে  গবেষকদল চিন্তা নিয়ন্ত্রিত জিনে নেটওয়ার্কটি উদ্ভাবন করেন। মানুষের চিন্তা-নির্দিষ্ট মস্তিষ্ক তরঙ্গকে জিন প্রোটিনে রূপান্তর করণ নিয়ন্ত্রণের কাজে সক্ষম করে অনুপ্রেরণা হিসেবে ‘মাইন্ডফ্লেক্স’ নামে কম্পিউটার গেম একটা বলকে বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবার দিকে চালিত করতে মস্তিষ্ক তরঙ্গকে বেছে নেয়। খেলোয়াড় একটা বিশেষ হেডসেট ধারণ করে কপালে একটা সেন্সর থাকে তা মস্তিষ্ক তরঙ্গকে রেকর্ড করে খেলার পরিবেশে ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাম (ইইজি) স্থানান্তর করা হয়। ইইজি একটা ফ্যান নিমন্ত্রণ করে ফলে সেটার পক্ষে একটা ছোট বলকে চিন্তা নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত পথ দিয়ে চালিত করা সম্ভব হয়ে উঠে। রেকর্ডকৃত মস্তিষ্ক তরঙ্গগুলোকে বিশ্লেষণ করা ও বিনা তারে ব্লুট্রুথের মাধ্যমে একটা কন্ট্রেলারে স্থানান্তরিত করে তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্র সৃষ্টিকারী ফিল্ড জেনারেটরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্র আবেশন প্রবাহসহ একটি ইমপ্ল্যান্ট যোগায় এবং আক্ষরিত অর্থে সেই ইমপ্ল্যান্টে আলো জ্বলে উঠে। প্রায় ইনফ্রারেড পর্যায়ে আলো বিকীরণকারী একটি ইন্টিগ্রেটেড এলইডি বাতি জ্বলে উঠে এবং জিনগতভাবে রূপান্তরিত কোষ সম্বলিত একটি কালচার চেম্বারকে আলোকিত করে। প্রায় ইনফ্রারেড আলোয় কোষগুলো আলোকিত হয়ে উঠামাত্র সেগুলো কাক্সিক্ষত প্রোটিন উৎপাদন শুরু করে দেয়। ফুসেনেগার বলেন- প্রথমবারের মতো আমরা মানবমস্তিষ্ক তরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে সেগুলো বিনা তারে একটি জিন নেটওয়ার্কে স্থানান্তরিত করতে এবং চিন্তার ধরণ অনুযায়ী একটা জিনের অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। চিন্তার শক্তি দিয়ে জিন অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা ছিল একটা স্বপ্ন যার পেছনে আমরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছুটে চলেছিলাম।’ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জিন অভিব্যক্তি কথাটার একটা বিশেষ অর্থ আছে। এটা বলতে বুঝায় জিনের প্রোটিনে রূপান্তর লাভ। ফুসেনেগার ধারণা করেন যে- চিন্তা নিয়ন্ত্রিত ইমপ্ল্যান্ট দিয়ে একদিন স্নায়ুবিক রোগব্যাধি- ক্রনিক মাথাব্যথা, পিঠে ব্যথা ও মৃগীরোগ নিরাময় করা সম্ভব হবে।  প্রাথমিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট মস্তিষ্ক তরঙ্গ নির্ণয় এবং সঠিক সময়ে ইমপ্ল্যান্টের মধ্যকার কতিপয় উপাদান সৃষ্টির কাজ সূচনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। ইনফ্রারেড আলোয় প্রতিক্রিয়াশীল হয় এমন আলোক সংবেদনশীল অপটোজিনেটিক মডিউল তৈরি বিশেষ ধরনের অগ্রগতি। জিন সংশোধিত কোষের ভেতরকার সংশোধিত আলোক সংবেদনশীল প্রোটিনের গায়ে আলো লেগে তা আলোকিত হয়ে উঠে এবং কৃত্রিম সঙ্কেতের একটা প্রবাহ সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে উৎপন্ন হয় এসইএপি। আলো সংবেদনশীল জিন তৈরিতে ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করা হয়েছে এ কারণে যে, সাধারণত তা মানবদেহ কোষের জন্য ক্ষতিকর নয়। এই আলো টিস্যুর গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং ইমপ্ল্যান্টের কাজ চোখে দেখতে পাওয়াকে সম্ভব করে তোলে।
সার্জিক্যাল রোবট : মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করবে সার্জিক্যাল রোবট। যন্ত্রকৌশলে গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ডেভিড কোম্বার ন্যাশভিলে বিজ্ঞান সম্মেলনে ডিজাইনের সিংহভাগ কাজ করে এমন কার্যোপযোগী রোবটের নমুনা উদ্ভাবন ও চালু অবস্থায় প্রদর্শন করেন। রোবট যন্ত্রটি হলো ১.১৪ মিলিমিটারের একটি নিকেল টাইটানিয়াম নিডল যা যান্ত্রিক পেন্সিলের মতো কাজ করে। এককেন্দ্রিক বাঁকানো কয়েকটি টিউব নিডলের অগ্রভাগ বাঁকা  মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে। অস্ত্রোপচারের জন্য রোবটকে করোটি বা মাথার খুলি ফুটো করতে হবে না। রোবটটি রোগীর গাল বা গন্ডদেশ দিয়ে মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাটিতে পৌঁঁছবে। এ কাজে অবশ্য থ্রি-ডি প্রিন্টিং ব্যবহার করা হলে খরচও কম পড়বে। কারোর মৃগীরোগ যদি মারাত্মক আকার ধারণ করে তাহলে মস্তিষ্কের সে ক্ষুদ্র জায়গায় খিচুনির উৎপত্তি হয় এটি ধ্বংস করার জন্য মাথার খুলি ছিদ্র করে মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছাতে হয়। অর্থাৎ একটা ইনভেসিভ পদ্ধতি যা বিপদাশঙ্কা থাকে এবং সেরে উঠতে সময় লাগে। এর চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে কাজটা করার গবেষকদল পাঁচ বছর চিন্তাভাবনা করে বের করেন- মৃগীরোগ বা খিচুনির সঙ্গে মস্তিষ্কের যে অংশটা যুক্ত সেটি হলো হিপোক্যাম্পাস। এটি মস্তিষ্কের নিচের দিকে অবস্থিত। এ অবস্থায় এমন একটা রোবট উদ্ভাবন করা যেতে পারে যা গাল দিয়ে বিশেষ নিডল ঢুকিয়ে সেটিকে তল দেশ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেবে। যাতে টার্গেট এলাকার অনেক কাছে পৌঁছানো এবং মাথার খুলি ছিদ্র করার কোন দরকার হবে না। আর এ জন্য এমন একটা নিডল তৈরি করা দরকার যে বাঁকা পথে নিখুঁতভাবে নিয়ে যেতে পারে এবং রোবটিক প্লাটফর্ম যা এমআরআই স্ক্যানারের দ্বারা সৃষ্ট শক্তিশালী চৌম্ব^ক ক্ষেত্রের ভেতর কাজ করতে পারে। চাপযুক্ত বায়ুর সাহায্যে একটি রোবটিক প্লাটফর্ম নিডলের অংশগুলোকে একই সময় এক মিলিমিটার সামনে পেছনে আগ-পিছু করতে পারবে। নিডলটা মিলিমিটার সমান ক্ষুদ্র পরিসরের বাঁকের মধ্যে ঢুকানো থাকে যার ফলে শল্যচিকিৎসক উপর্যুপরি এমআরআই স্ক্যান করে এর অবস্থানের তথ্য বের করতে পারেন। কোম্বার জানান- পরীক্ষাগারে এই ব্যবস্থার নির্ভুলতা যাচাই করে দেখেছেন এবং এ ধরনের অস্ত্রপচারের জন্য এটাই যথেষ্ট। প্রকল্প প্রধান যন্ত্রকৌশলের সহযোগী অধ্যাপক এরিক বার্থ বলেন- সার্জিক্যাল রোবট উদ্ভাবনের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে মৃত মানুষের উপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে দেখা। অস্ত্রোপচার করে এমন রোবটের ব্যবহার হতে আরও এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। প্রকৌশলীরা নিউরোলজিক্যাল সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক জোসেফ নেইমাতের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মৃগী রোগীর শল্যচিকিৎসা হিসাবে তাদের রোবটের আদর্শ প্রয়োগ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। জানতে পারেন যে, মৃগী রোগের কিছু কিছু শল্যচিকিৎসক করোটির নিচের দিকে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস এলাকাটি টার্গেট করে থাকে। গাল দিয়ে এগোলে তারা শটকাট পথে মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে পৌঁছতে পারে। এতে করোটি বা মাথার খুলি অক্ষত থাকে। ছিদ্র করতে হয় না বলে জটিলতাও কম থাকে এবং ভাল হতে কম সময় লাগে। তবে গন্ডদেশ দিয়ে মস্তিস্ক পৌঁছার এই কৌশলটা একেবারে অভিনব বা আনকোরা কোন ধারণা নয়। লোবেক্টমি করার পূর্বে চিকিৎসকের মৃগী রোগীর খিচুনির উৎপত্তিস্থলটা চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য মস্তিষ্কের কার্যকলাপ মনিটর করার জন্য মস্তিস্কের পেছনের দিকে ইলেকট্রোড স্থাপন করার দরকার হয়। অনেক চিকিৎসক এই ইলেকট্রোড স্থাপনের কাজটা করে গন্ডদেশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে। কিন্তু শল্যচিকিৎসায় যে নিডল চিকিৎসক ব্যবহার করে থাকে সেটি সরল সোজা এ জন্য গন্ডদশ দিয়ে মস্তিস্কের খিচুনির উৎসস্থলে পৌঁছা সম্ভব হয় না। এ কারণেই অস্ত্রোপচারের জন্য মাথার খুলি ফুটো করতে হয় এবং এই ছিদ্রপথে নিডল নামাতে হয়। তবে নতুন উদ্ভাবিত রোবটের অভিনবত্ব ও কৃতিত্ব এখানেই। এই রোবটের সঙ্গে ব্যবহৃত নিডল বাঁকানো এবং সেটি টিউবের মধ্যে স্থাপিত বলে বাঁকানো পথ ধরে টার্গেট অঞ্চলে পৌঁছতে অসুবিধা হয় না। পথের বাধা এসে দাঁড়ালে সহজেই  অতিক্রম করতে পারবে। এসব কাজে রোবটকে সাহায্য করে এমআরআই স্ক্যানার। এভাবে গন্ডদেশ দিয়ে নিডল মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিই বদলে দিয়েছে।
মেধাবী ব্রেন যাদের তাদের কথা বললে প্রথমে আলোচনা করতে হয় মানুষের স্মৃতির স্তর ভেদ নিয়ে। মানুষের স্মৃতিকে তিন স্তরে ভাগ করলে দেখা যায় যে- ১). ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য স্মৃতি (Sensory Register Memory)। ২). স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি (Short-term Memory)। ৩). দীর্ঘস্থায়ী  স্মৃতি (Long-term Memory)। মনের আচরণ পঞ্চ ইন্দ্রিয় তথা স্পর্শ , নাসিকা , কান , চোখ ও জিহবা দ্বারা । অন্যের কোন কথা বা কাজের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট হলেও তার প্রভাব পড়ে। অবচেতন মনে মানুষ প্রভাবিত হয় সাধারাণত-পঞ্চ ইন্দ্রিয় তথা স্পর্শ, নাসিকা, কান, চোখ ও জিহবা দ্বারা, অন্য মানুষের যে কোন কথা বা কাজের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট হলেও তার প্রভাব পড়ে। ৬ষ্ঠ ইন্দ্রিয় দ্বারা অন্য মানুষের চিন্তা তরঙ্গ দ্বারা। কেননা মানুষের ব্রেন হচ্ছে চিন্তার ট্রান্সমিটার ও রিসিভার। এছাড়া ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা দ্বারা। আর ইতিহাসের সব বিখ্যাতজনরা গাধা থেকে বিখ্যাত হবার গল্প ও কম নয় বিশ্ব ইতিহাসে। একবার পড়ে বা শুনে মনে রাখা বা প্রয়োজনের সময় তা বলতে পারা নিঃসন্দেহে এক বিরাট গুণ। বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে আইনস্টাইন, টমাস আলভা এডিসন, মাইকেল এঞ্জেলো, মহাকবি হোমার, বোপদেব গোস্বামী, স্যামুয়েলসন জনসন, জেনারেল জর্জ প্যাটন, ভাস্কর অগাস্ত রঁদা, লর্ড কর্কবান প্রমুখ মনীষীরা জন্মসূত্রে নয় বরং অর্জন করেই জগত বিখ্যাত হয়েছেন। মানুষ ভেদে প্রতিভাবানদের কোন কিছু মনে রাখার কৌশল হচ্ছে- আগ্রহ, মনোযোগ, অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস। ১৯৬৮ সালে মনস্তাত্তিক আলেকজান্ডার লুরিয়া রাশিয়ান রিপোর্টার সোরসোভস্কির অসাধারণ স্মরণশক্তির উপর গবেষণা করে দেখেছেন সোরসোভস্কি চিত্রকল্প ও সংযোগ -এর অসম্ভব লম্বা তালিকা, সংখ্যা ও নাম মনে রাখতে পারতেন। সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের ভাতিজা তৃতীয় নেপোলিয়ান নাম মনে রাখার সহজ কৌশল রপ্ত করেছেন। কারও সাথে পরিচয়ের প্রথমেই তার নাম জেনে নিতেন। নাম ঠিকমতো শুনতে না পেলে বা বুঝতে না পারলে বলতেন-‘মাফ করবেন, আপনার নাম আর একবার বলেন।’ প্রয়োজনে নির্র্দ্বিধায় নামের বানান জেনে নিতেন। নতুন পরিচিতদের সাথে কথা বলতে বলতে মনে মনে তার নাম কয়েকবার উচ্চারণ করতেন। নামের সাথে তিনি সে লোকের চেহারা, কথা বলার ধরণ, গলার স্বর মনে গেঁথে নিতেন। আর গর্ব করে বলতেন-যার সাথে একবার আমার পরিচয় হয়, আমি তার নাম কখনো ভুলি না। নেপোলিয়ান একা থাকলে সেই ব্যক্তির নাম একটি কাগজে লিখে রেখে বারবার নামটি দেখে চেহারা ভিজুয়ালাইজ করতেন। নামটি মনে গেঁথে গেলে কাগজটি ছিঁড়ে ফেলতেন। এভাবে কয়েক হাজার পরিচিত ব্যক্তির নাম মনে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সিংহল প্রদেশের রাজার কন্যা প্রাচীন ভারতের খনা লিখতে জানতেন না। কিন্তু অংক শাস্ত্রে তাঁর পান্ডিত্য ছিলো। ভারত বর্ষের উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের সভা-পন্ডিত মালাবার প্রদেশের চুঙ্গীগ্রামের বিখ্যাত জ্যোতিষ বরাহ খনার শ্বশুর এবং স্বামী জ্যোতিষ মিহির রাজার অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে খনা সে উত্তর বলে দিতেন। ইতিহাস বলে খনার অসাধারণ প্রতিভা সহ্য করতে পারেনি স্বামী ও শ্বশুর।  এক সময় স্বামী কর্তৃক জিভ কাটার ফলে মৃত্যু বরণ করেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী শ্রী চৈতন্য দেবের মনে রাখার কৌশল ‘কান টানলে মাথা আসে’। টোলের ছাত্রদের বলতেন স্মৃতিতে গেঁথে আছে এমন কোন পুরোনো তথ্যের সাথে নতুন তথ্যটি আটকে দাও। পুরোনো তথ্যটা  হচ্ছে কান আর নতুন তথ্যটা হচ্ছে মাথা। কানের সাথে মাথা আটকে দিলে কান টানলেই মাথা আসবে, আর পুরনো তথ্য ধরে টানলে নতুন তথ্যটি চলে আসবে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি হচ্ছে মেমোরী পেগ বা মেমোরী হুক। বাংলাদেশের জাদু শিল্পী অসাধারণ স্মরণ শক্তি জুয়েল আইচ-মনে রাখার জাদু দেখাচ্ছেন। একবার মাত্র শুনে গ্যালারির শতাধিক দর্শকের নাম একের পর এক স্বাভাবিক ভাবে বলে দিলেন নির্ভুল ভাবে। শুধু নাম নয়, বংশ পদবী মনে রেখে যাদের নাম বলছেন তারা অবাক হয়ে ভাবলো এ হচ্ছে জাদু। এ ধরনের ঘটনা জুয়েল আইচের পক্ষেই সম্ভব। বাংলাদেশে বহু আরবী ভাষার অর্থ না বুঝে পবিত্র কোরআন শরীফের মত বিশাল কিতাব খুব স্বাভাবিক ভাবে মুখস্থ বলতে পারে এমন হাফেজের সংখ্যা নিশ্চয়ই কয়েক হাজার হবে। আর এ হাফেজদের বেশীর ভাগ সাধারণ মেধামান সম্পন্ন। আর অনেকেই জন্মগতভাবেই এ ধরণের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন- শ্রী চৈতন্যদেব ১৫ শতকে, পশ্চিমা ধ্র“পদী সঙ্গীতের রাজা মোজার্ট ১৮ শতকে মাত্র ৫ বছর বয়সে একবার দেখে বা শুনে তা হুবহু উপস্থাপন করে বিস্ময় সৃষ্টি করতেন। বিশ শতকে রাশিয়ায় সোরসোভাস্কি দেখিয়েছেন অসাধারণ স্মৃতি শক্তির। তিনি ১০ বা ১৫ বা তার চেয়ে বেশী অর্থহীন শব্দ, সংখ্যা ও দুর্বোধ্য গাণিতিক ফর্মূলা খুব সহজে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দিয়ে মনে গেঁথে নিতে পারতেন। আর তা বহু বছর পরও ঠিক পূর্ব নির্দিষ্ট ক্রম অনুসারে বলতে পারতেন। ১৯৭৬ সালে মাত্র সাড়ে ৪ বছর বয়সে দক্ষিণ কোরিয়ার কিম উঙ ইয়ং স্মৃতিশক্তি প্রদর্শণ করে সারা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। কিম শুধু নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও আরও তিনটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন এবং সে প্রায় তিনশত শব্দ একবার শুনে মুুখস্থ বলে দিতে পারত। ভারতের শকুন্তলা দেবী শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত কম্পিউটারের মত তড়িৎ গতিতে যে কোন গণনা ও ক্যালকুলেশনের সমাধান করে দিতে পারেন। এজন্য তিনি ভারত ছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকায় হিউম্যান কম্পিউটার অভিধায় অভিহিত হয়েছেন। বাঙ্গালীর কবি আর বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামও ছিলেন অসাধারণ স্মৃতি শক্তির অধিকারী। তাঁর কাব্য ও গানে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মুসলিম ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণ ও মিথের সার্থক প্রয়োগ লক্ষণীয়। মনে রাখার বিষয়টি কেবল জন্মগত প্রতিভার ব্যাপার নয় বরং তা ইচ্ছে করলে অর্জনও করা যায়। গ্রীক কবি হোমারের স্মৃতিশক্তি শৈশবে ছিল খুব দুর্বল। জীবনের প্রথমে ভবঘুরে এবং পরে অন্ধ হয়ে যান। অন্ধ হবার পর এক চামড়ার দোকানে বসে বসে শ্রোতাদের ট্রয় যুদ্ধের কাহিনী আবৃত্তি করে শোনাতেন। পুরো কাহিনীটাই স্মৃতিতে গেঁথে রেখেছেন। স্মৃতিতে রাখা কাহিনী থেকেই রচিত হয় বিখ্যাত মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’ ও ‘অডিসি’। ইংরেজি ভাষায প্রথম অভিধান প্রণেতা ড. স্যামুয়েল জনসনেরও শৈশবের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল ছিল। জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম ‘লাইভস অব দি পোয়েটস’ লিখেছেন ৭৫ বছর বয়সে। তার স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর পর ৭৮ বছর বয়স পর্যন্ত স্মৃতি অক্ষুন্ন রেখেছেন। বিশ শতকের সেরা বিজ্ঞানী জার্মানীর আইনস্টাইন। ইঞ্জিনিয়ার বাবা, মা ছিলেন গান পাগল আর মা’র আগ্রহে আইনস্টাইনকে ৬ বছর বয়সেই বেহালা শিখেছেন। স্মৃতিশক্তির অভাবের কারণে শিক্ষা জীবনের শুরুতে ৯ বছর চলে যায়। স্কুলে ভর্তি আরও পরে আর ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবার ফেল করে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় পাস করে ভর্তি হন। এন্ট্রাস পরীক্ষা পাস করেছে দু’বার পরীক্ষা দিয়ে। স্মৃতিশক্তির স্বল্পতার কারণে ডিগ্রী লাভের পর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে অস্বীকার করেন। এই আইনস্টাইন স্কুলে চাকরির চেষ্টা করেও তার চাকরি হলো না। ইন্টারভিউ বোর্ডে কোনো প্রশ্নের উত্তর মনে করতে পারে না। নিজেই স্মৃতিশক্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় অন্তর থেকে পরিবর্তনের তাগিদ অনুভব করলেন। পরবর্তী দু’বছরের চেষ্টায় স্মৃতিশক্তির অসাধারণ উন্নতি অর্জন করেছে। আর পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে গবেট (!) আইনস্টাইন পদার্থ বিজ্ঞানে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার। স্মৃতি শক্ষি বিষয়ে বলেছেন- আমার ছেলেবেলা ও বর্তমানের মাঝে তুলনা বুঝা যাবে। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসেন ছিলেন ছোট বয়সে স্বল্পস্মৃতি সম্পন্ন মোটা মাথার ছাত্র। নিজেই বলেছেন- ‘ছেলেবেলায় আমার কিছুই মনে থাকত না। ফলে স্কুল থেকে রিপোর্ট আসতে লাগল। মা চাইতো আমি  স্কুলে সেরা ছাত্র হই। কিন্তু পড়া কিছুই মনে থাকতো না বলে কয়েক মাসেই আমার স্কুল জীবন সাঙ্গ হয়ে যায়। আমি যেদিন স্কুল ছেড়ে আসি সেদিন মায়ের চোখ থেকে টপ টপ করে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ছিল। সে দৃশ্য মনে পড়লে আজও আমার কষ্ট লাগে। এখন আমি পাতার পর পাতা মুখস্থ রাখতে পারি। এই মনে রাখার ক্ষমতাটা যদি ছেলেবেলায় আমার থাকতো।’ এই বিজ্ঞানী বিশ শতকের সবচেয়ে প্রতিভাধর আবিষ্কারক বৈদ্যুতিক বাতি, গ্রামেফোনসহ ১২৫টি সামগ্রী উদ্ভাবন করে বিশ্বকে বিস্মিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন স্মৃতিশক্তির স্বল্পতার কারনে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত বর্ণমালাই শিখে শেষ করতে পারেনি। ছেলেবেলার পাঠ শিখতে আরও দু’বছর অতিক্রান্ত হয়। পরে তিনি যে কোনো বক্তৃতা একবার শুনে হুবহু তা মনে রাখতেন। পরবর্তী সময়ে যে কোন বিতর্কে পূর্ববর্তী বক্তার বক্তব্য আক্ষরিক মনে থাকায় সে বক্তব্য খন্ডন করতে কোন অসুবিধা হত না। জর্জ প্যাটন ছোটবেলায় স্মৃতিশক্তির স্বল্পতা ও অমোনোগিতার জন্যেই এক ক্লাসে তিনবার ফেল করার পর তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সফল মার্কিন সেনানায়ক। অসাধারন স্মৃতিশক্তি। বিখ্যাত ভাস্কর অসাস্ত রঁদা’র পিতা দুঃখ করে বলতেন, ‘পুত্র বলতে পেয়েছি এক ইডিয়টকে’। রঁদার স্মৃতিশক্তি কম থাকায় স্কুলে শিক্ষকরা বলত ‘ভুলো গবেট’। পরবর্তীতে স্মৃতিশক্তি খুবই উন্নত করেছেন যে অতীতের বহু ঘটনা তিনি হুবহু বলে দিতে পারতেন। বিখ্যাত ইটালীয় চিত্রশিল্পী মাইকেল এঞ্জেলো শৈশবে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ায় পরবর্তী জীবনে নিজের অদম্য চেষ্টায় স্মৃতিশক্তি বাড়াতে হয়েছে। শেষ জীবনেও স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। ইমাম গাজ্জালী ছোটবেলায় স্মৃতিশক্তি খুব কম থাকায় সবকিছু নোট খাতায় লিখে সাথে রাখতো। একবার মরুভুমিতে ডাকাত দলের পাল্লায় পড়লে গাজ্জালী সবকিছুর বিনিময়ে লেখার খাতাগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করেন। ডাকাত দলের সর্দার এ কথা শুনে বেশ মজা পেয়ে জোর করে খাতা গুলো কেড়ে নিয়ে গেল; গাজ্জালী তখন ডাকাত দলের পেছনে পেছনে খাতার জন্যে ছুটতে ছুটতে বললেন- আমার সকল জ্ঞান তোমরা নিয়ে যেওনা। শুনেই ডাকাত সর্দার কৌতুক করে বললো-‘যে জ্ঞান ডাকাতে নিয়ে যেতে পারে, সে জ্ঞান দিয়ে কি হবে ? গাজ্জালী এরপর কোনদিন খাতায় নোট করেননি। বিখ্যাত এই মুসলিম দার্শনিক অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হয়ে রচনা করলেন বড় বড় অনেক গ্রন্থ। দ্বাদশ শতাব্দীতে পন্ডিত বোপদেব গোস্বামী কয়েকটি গ্রন্থ প্রণেতা ও শ্রুতিধর হিসেবে বিখ্যাত। শৈশবে পন্ডিতমশাই ব্যাকরণ মনে রাখতে না পারায় টোল থেকে তাড়িয়ে দেন এবং বলেছেন- ‘তোর মত নিরেট গাধার কোন স্থান আমার টোলে নাই। তুই আর টোলে পড়তে আসবি না। ’ ছোট্ট বোপদেব টোল থেকে বিতাড়িত হয়ে মনের দুঃখে বাড়ি না গিয়ে শান বাঁধানো নদীর ঘাটে বসতেই দেখলো যে, মেয়েরা পানি ভর্তি করে কলসী নিয়ে ঘাটে ওঠে বাঁধানো ঘাটের যে পাথরের উপর কলসী রাখছে, সেখানে অনেকটা ক্ষয় হয়ে গর্ত হয়ে গেছে। বোপদেব চিন্তা করলো মাটির কলসীর ঘষায় কঠিন পাথর ক্ষয় হয়ে যায় তাহলে কেন ব্যাকরণ মুখস্থ রাখতে পারব না। পরবর্তীতে গাধা (!) বোপদেব ৩ দিন ৩ রাত পড়ে ব্যাকরণ মুখস্থ করে ফেললেন। ঘুচে গেল গাধা বোপদেব। বাঙ্গালী জাতির পিতা এই আমাদের সুজলা সুফলা বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এক অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। কাউকে একবার দেখলে তার চেহারা দীর্ঘ সময়ের পরও ভুলতেন না। বরং পরিচিত কাউকে দেখলে দীর্ঘ অদেখার পরও তার সমস্ত রেকর্ড বলে দিতে পারতেন। এছাড়া যে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকের সাথে দেখা হলে ঐ এলাকার সমস্ত পরিচিতদের নাম ধাম তার চৌদ্দ গোষ্ঠীর খোঁজ খবর জিজ্ঞেস করতেন। পৃথিবীতে অনেক রকম আশ্চর্য কীর্তি আছে। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর মুখস্ত দেয়া ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চের ভাষণ। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের এক অমর কবিতা। এতো গুছানো আর শ্র“তি মধুর স্বদেশ প্রেম ও বিপ্লবের আবেগ আপ্লুত কবিতা। প্রতিটি বিপ্লবীকে স্বদেশের চেতনা এক মুহূর্তেই মন্ত্রমুগ্ধের মত গ্রাস করেছিল। ৭ই মার্চের সেই ভাষণ শুধু কোনো জননেতার একটি ভাষণই নয় বরং কালজয়ী এক কবিতা; যে কবিতাই একটি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। আজো সেই কালজয়ী ভাষণ শুনলে বিপ্লব জেগে ওঠে যে কোনো সাধারণ মানুষের মনে। শরীরের লোম দীপ্ত হয়। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী যাকে দ্বিতীয় আইনস্টাইন বলা হয় পদার্থ বিজ্ঞানী স্যার স্টিফেন হকিং ৫০ বছর ধরে মোটর নিউরণ ডিজিজ নিয়ে হুইল চেয়ারে জীবন কাটাচ্ছেন। যান্ত্রিক কম্পিউটারের সঙ্গে জীবনের সব লেনদেন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে থেমে নেই তার কোনো গবেষণা কাজ। শরীরের চেয়েও মানুষের মন বা মানসিক শক্তি ও সাহস কত বেশী জোরালো তিনিই প্রমাণ করেছেন বা করে যাচ্ছে।
মানুষের দেহই এক বিস্ময়কর বিজ্ঞান। এই দেহের বিভিন্ন অঙ্গ এবং এসব অঙ্গের ক্রিয়াকলাপের সাথে সংযুক্ত যেমন- অগ্নাশয়, অন্ত:নাসারন্দ্র, অন্ত:শ্বসন, অস্থি, আইরিস, আর্টারী, অ্যালভিয়াস, অস্থি সন্ধি, ইনটেসটিন, এনাটমি, এনজাইম, এন্টিটক্সিন, এনডোক্রিন গ্রন্থি, এবডোমেন, এপ্রিগ্লেটিস, কলা (টিস্যু), কলাতন্ত্র, কর্ণিয়া, কঙ্কাল তন্ত্র, কব্জাসন্ধি, কার্পাল অস্থি, কিডনী, কৈশিক নালী, কোরয়েড, ক্রোমোজম, কোষ, কোষ গহবর, কোষ প্রাচীর, কোষ বিদ্যা, কোষীয় শ্বসন, জীন, টার্সাল অস্থি, টিবিয়া-ফিবুলা, জাইগোট বা জাইগোস্পোর, ডিম্বাণু, তরুণাস্থি, দেহকোষ, ধমনী, পদাঙ্গুলাস্থি, পরিপাক, প্লাজমা, প্লাসেন্টা, পিউপিল, প্যাটেলা, ফিজিওলজি, ফিমার, ফুসফুস, বহি:নাসারন্দ্র, বহি:শ্বসন, বাইওপসি, বাওম্যানস ক্যাপসুল, বিজারণ, ব্রংকাই, ব্রংকাইটিস, ব্রংকিওল, ভলিউটিন, ভাইরাস, ভিটামিন, মধ্যচ্ছদা, মরফোলজি, মিথস্ক্রিয়া, মিথোলজীবিতা, মুখবিবর, মেটাকার্পাল অস্থি, মেটাটার্সাল অস্থি, যকৃত, রক্ত, রক্তকণিকা, রক্ত সঞ্চালন, রেচন, রেচনতন্ত্র, রেটিনা, রেডিওআলনা, লসিকা, লসিকা প্রবাহ, লাইসোজোম, শ্বসনতন্ত্র, শ্বাসনালী, শিরা, শুস্কতা, সমন্বয় ও পরিচালনতন্ত্র, স্পঞ্জি অস্থি, সাইটোপ্লাজম, সাইটোপ্লাজমিক মেমব্রেন, স্নায়ুতন্ত্র, স্কেলরা, স্পোর, স্পার্ম, হরমোন, হিমোগ্লোবিন, হিস্টোলজি, হৃদপিন্ড, ত্বকতন্ত্র, পেশীতন্ত্র, পরিপাক তন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, অন্ত:ক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র, অস্থিমজ্জা, গলবিল, অন্ননালী, পাকস্থলী, অনুচক্রিকা, থ্রম্বোসিস, হিমোফিলিয়া ইত্যাদি। এসব বিষয়ের কারুকাজের উপরই মানুষের ভাল-মন্দ ও সুস্থ -অসুস্থ থাকা নির্ভর করে। মানুষের চিকিৎসায় বর্তমানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার মানুষকে অল্প সময়ে সাশ্রয়ী ও উন্নত সেবা প্রদান করছে। কবিতায় এসব অনুষঙ্গ কাজ করবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। একজন কবিকে জানতে হয় পৃথিবীর চলমান ও অতীত ইতিহাস। কবিতার বিষয়বস্তুতে পৃথিবীর তাবৎ বিষয় অন্তর্ভুক্ত। কবিতার বিষয়বস্তুর কোনো নির্দিষ্টতা নেই। সবকিছুই কবিতায় অন্তর্ভুক্ত হয় বা হতে পারে। যা ছিল যা আছে আর যা হবে সবই কবিতায় অন্তর্ভুক্ত হয় বা হতে পারে। তাই বিজ্ঞানতো সবার আগেই হওয়া উচিত। কারণ বিজ্ঞানের আর্শীবাদের দিক চিন্তা করলে মানুষ এর সুবিধা থেকে দূরে থাকতে পারবে না বা থাকতে পারার কোনো যুক্তি নেই।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকলিন হসপিটাল ইন ম্যাসাচুসেটসের গবেষকদল দিয়েছে চমৎকার সব তথ্য। মানুষ যে সব কষ্টের স্মৃতি বহন করে তার একটা সমাধান খুুঁজেছেন। তাতে গবেষকরা বলেছে কম্পিউটারের মেমোরির মতো ইলেকট্রিক শক বা ব্রেইন ওয়াশ পদ্ধতি নয় সরাসরি চেতনা নাশক অক্সিজেনের সাথে জেনোন গ্যাস ব্যবহার করে প্রেম ভালোবাসা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এবং প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া সমস্ত আপন পর দুঃখ একেবারে মুছে ফেলা যাবে। গবেষকরা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়ে প্রাথমিক ভাবে সফল হয়েছেন। পরীক্ষায় দেখা গেলো যে ইঁদুরেরা ভয়ের স্মৃতি ভুলে যাচ্ছে। এখন মানুষেরাও শ্বাস নেয়ার সময় অক্সিজেনের সঙ্গে জেনোন গ্যাস গ্রহণ করবেন এবং একই সময়ে কষ্টের স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করবেন। পুরোনো যে কোনো স্মৃতি মনে করার সময় মানুষের মস্তিষ্ক যখন সেই স্মৃতিগুলোকে আবার নতুন স্মৃতি হিসেবে তৈরি করতে শুরু করবে তখনই জেনোন গ্যাস প্রয়োগ করে সেই নতুন স্মৃতি তৈরি হবার পদ্ধতিটাই আটকে  দেয়া হবে। তাতে মানুষকে আর অতীতের দুর্বহ কষ্টগুলো মাথা কুটে কুঁরে কুঁরে খাবে না। এই গবেষণায় এডওয়ার্ড জি মেলোনি বলেছেন, “কষ্টের স্মৃতি কমিয়ে আনতে জেনোন গ্যাসের কার্যকারিতার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার (পিটিএসডি) চিকিৎসায় যুগান্তকারী আবিষ্কার হতে পারে এটি।” মানুষের উপর এর প্রভাব কি হবে তাই দেখার অপেক্ষা। চিকিৎসার ব্রেষ্ট ক্যানসারের মেলানোমা কোষের বৃদ্ধি প্রতিরোধে সক্ষম বলে জানিয়েছে। খ্রীষ্টপূর্ব ১৪ বছরে গ্রিক লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার বলেছেন-মৌমাছির বিষ ব্যবহার করলে টাকে চুল গজাতে পারে। আর ৭৮০ খ্রীষ্টাব্দে ইউরোপের সম্রাট চার্লেমাগনের ঘাড়ের ব্যাথার সময় ডাক্তাররা মৌমাছির হুল ফোটাতো। এদিকে চীনের ব্যাঙের বিষ দ্বারা যকৃত, ফুসফুস ও অগ্নাশয়ের ক্যানসার এবং কিউবায় ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় কাঁকড়া ও বিছার বিষ ব্যবহার করা হয়। অথচ মানব শরীরে মৌমাছি হুল ফোটালে মেলিটিন থাকার জন্য প্রচন্ড জ্বালা করে। অতিরিক্ত বিষ শরীরের কোষের ঝিল্লি নষ্ট করে এবং রক্ত জমাট বাঁধিয়ে হৃদপিন্ডের পেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু ক্যানসার কোষের উপর একই প্রতিক্রিয়া করে। অথচ দীপাঞ্জন পান-এর পরীক্ষায় বলা হয়েছে বিষের প্রোটিন ও পেপটাইডকে পৃথক করে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধে ব্যবহার করায় সাফল্য এসেছে। সম্প্রতি বার্লিন টেকনিস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মনোবিজ্ঞানী ও মেডিকেল ডাক্তারদের যৌথ দল মৃত্যু নিয়ে অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গবেষনার পর গত ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ তারিখ সকালে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা প্রমাণ করতে পেরেছে মৃত্যুর পরও জীবনের কিছু ধরণ আছে। গত চার বছর যাবৎ ৯৪৪ জনের উপর গবেষণা করে দেখেছে যে একজন মানুষকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে এপিনেফ্রিন এবং ডাইমেথিলট্রিপ্টামিন ঔষধের মিশ্রণের পদ্ধতিতে কোন প্রকার ক্ষতি ছাড়াই মেরে ফেলা হয় আবার মৃত সেই ব্যক্তিকে ২০ মিনিট পরে জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অটোপালস মেশিন হিসেবে পরিচিত কার্ডিওপাল্মোনারী রিসাইটেশন (সিপিআর) মেশিনের সহযোগিতায় অস্থায়ীভাবে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো সেই ঔষধ এর মিশ্রণকে ‘ওজোন’ এর মাধ্যমে ফিল্টার করে পুনরায় জীবন ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১৮ মিনিট সময় লেগেছে। যখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করে মানুষের এই মস্তিস্কের কোষে ক্যালসিয়াম আয়রণ এক জাতীয় রাসায়নিক চুন ঢুকে পড়ে। তখন মানুষের অঙ্গ পতঙ্গ চেতনাহীন হয়ে যায় এবং মানুষ ঘুম যায়। কেবল হৃদপিন্ড, রক্ত চলাচল, পাকস্থলীর কাজ চলতে থাকে। এই জন্য ঘুমের মধ্যে মানুষ ঘ্রাণ শক্তি টের পায়। তবে হৃদস্পন্দন কিছুটা কমে যায়। ভারতীয় হিমাচলের লাহুল স্পিতি অঞ্চলে গবেষক সঞ্চয় কুমারের নেতৃত্বে গবেষকদল পোটেনশিলা নামক গাছের সুপার অক্সাইড ডিসমিউটেজ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবনী শক্তি বাড়িয়ে তোলার জন্য বয়স প্রতিরোধকারী ক্রিমের সংমিশ্রণে মানবদেহের বার্ধক্যজনিত কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে। এখন তা বাজারজাত করার পালা।
সম্প্রতি ইলাইফ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের জৈবচিকিৎসা প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পরিচালনা করেন জৈবচিকিৎসা প্রকৌশল, রাসায়নিক প্রকৌশল এবং বস্তু বিষয়ক বিজ্ঞানের অধ্যাপক অতুল পারিখ। গবেষকরা ফ্লুয়োরেসেন্ট রঞ্জক ব্যবহার কওে বিশেষ ধরনের মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পৃথিবীর বুকে আদিমতম বা একেবারে প্রথম প্রাণকোষগুলো কিভাবে বেঁচে ছিল এবং আদিম যুগের প্রাণকোষের আচরণ সম্পর্কে জানতে এক গবেষণায় সাবানের ছোট ছোট বুদ বুদ পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে যে কোনো পদার্থকে ভেতরে বের হতে ও ঢুকতে পদার্থের পর্দাকে পূর্ণগঠন করতে পারে।  বুদবুদের এ আচরণ কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বুদবুদ সৃষ্টি করে শরীরের ভেতর ওষুধ ও অন্যান্য উপাদান বয়ে নিয়ে যাবে। চর্বিজাতীয় পদার্থের থলেগুলো হচ্ছে দেহকোষগুলোর অভ্যন্তরে রুদ্ধ কক্ষ যা পানিতে দ্রবীভূত পদার্থকে দেহকোষের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে এবং অভ্যন্তরে বেশিরভাগ কাঠামো এমন চর্বিজাতীয় পর্দায় বেষ্টিত যেভাবে দেহকোষে থাকে। পানি থলেগুলোকে পরিবেষ্টনকারী পর্দাকে  অতিক্রম করে যেতে পারে তবে লবণ, চিনি বা প্রোাটিনের মতো দ্রবীভূত পদার্থগুলো পারে না। পর্দার এক দিকের তুলনায় অপরদিকে দ্রবীভূত পদার্থ বেশিমাত্রায় থাকলে পর্দার ওপাশের পানি পর্দা ভেদ করে সেই দ্রবীভূত পদার্থকে ঘন অবস্থা থেকে তরল করে দেবে। চর্বি জাতীয় পদার্থের একটা থলেকে হাল্কা দ্রবণের মধ্যে রাখা গেলে ভেতরে পানি ঢুকে থলেটা ফুলে উঠবে। এ অবস্থাকে উল্টে দিলে থলেটা চুপসে যাবে। তবে আগের অবস্থায় থাকলে থলেটা স্ফীত হয়ে শেষ পর্যন্ত ফেটে যাবে। আধুনিক সময়ে জীবিত কোষগুলো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এমন সব জটিল ধরনের প্রোাটিন তৈরি করছে  যা বাড়তি পানি বা লবণ দেহকোষের ভেতরে দিতে এবং কোষ থেকে বের করতে পারে। পর্দা বিভিন্ন চর্বি জাতীয় পদার্থের মিশ্রণে তৈরি এবং অভিন্ন মিশ্রণ তৈরি করতে পারে। তা না হলে সঠিক পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় ভাবে পর্দার মধ্যে স্বতন্ত্র থলের মতো জিনিসে পরিণত হতে পারে। বাইরের দ্রবণ যখন কোষ বা থলের ভেতরকার দ্রবণের সমপরিমাণ ছিল তখন পর্দাগুলো ছিল তুলতুলে ও সুষম মিশ্রণে আর বাইরের দ্রবণের ঘনত্বকে যখন তরল করে তখন কোষ বা থলেগুলো প্রত্যাশিতভাবেই ফুলে ওঠে। কিন্তু পর্দাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই সামঞ্জস্যহীন থলেতে পরিণত হয়ে বড় হয়ে বিস্ময়কর  বৃত্তাকার পথে ছত্রখান হয়। এক পর্যায়ে পর্দার গায়ে ক্ষণস্থায়ী ছিদ্র তৈরি করে কিছু কিছু উপাদান বের হয়ে ছিদ্রগুলো পুনরায় জোড়া লাগে। এ থলে বা কোষ সমূহ শুধুমাত্র পানি, লবণ ও চর্বিজাতীয় পদার্থে তৈরি এবং জটিল আচরণ করতে সক্ষম যা পরিবেশকে বুঝতে পারে ও সে অনুযায়ী সাড়া দিতে পারে। শত শত কোটি বছর এমন অদ্ভূত আচরণে হয়ত একদম প্রথমদিকে প্রাণ কোষগুলো পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। আধুনিক প্রাণকোষের ভেতরে থলে বা কোষ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করতে বা কৃত্রিম কোষ ও মডেল প্রোটোসেল তৈরির কাজে সাহায্য করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ বয়ে নিয়ে টিউমার চিকিৎসায় সহায়তা করবে। পৃথিবীর একদম শুরুতে প্রাণকোষ সমূহ কিভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করেছিল তা বের করতেই গবেষকদল কৃত্রিম কোষ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে- এর মধ্য দিয়ে ঘনীভূত উপাদান হিসেবে মজুদ রাসায়নিক শক্তি কাজে লাগানোর উপায়ও উদ্ভাবিত হবে।
কবিরা অনুষঙ্গ হিসাবে এসব আবিস্কারকে কবিতায় ধারণ করছে বা করবে। কবিতায় নান্দনিকতার পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞানের ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষের দেহই এক বিস্ময়কর বিজ্ঞান। তাহলে কবিতা মানুষের কথা বললে কবিতাই বিজ্ঞান। পৃথিবীর শুরুতে মানুষের সৃষ্টির আগে পৃথিবীর সৃষ্টি আজ থেকে ১৫০০ কোটি বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। আজ থেকে ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী ও অন্যান্য ভূ-সদৃশ্য গ্রহের গঠন পূর্ণ রূপ পায়। ধারণা করা হয় বড় রকম সংঘাতে ইউরেনাসের অক্ষ একপাশে কাত হয়ে যায়। নেপচুনকে ট্রাইটান নিজের দিকে আর্কষণ করে টেনে নেয়। ৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর উপর প্রাণের প্রথম প্রকাশ আর চাঁদের উপর প্রধান লাভা প্রবাহের সমতল ভূমি তৈরি সমাপ্ত হয়েছে। ১২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর উপর প্রথম উদ্ভিদের বিকাশ। ৯০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম বহু কোষী জীবের (স্পঞ্জ) আর্বিভাব। ৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে উপর শক্ত খোলস যুক্ত জীবের উদ্ভব।  ৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর ডাঙ্গায় জীব জগতের বিস্তার। তাহলে এই পৃথিবী সৃষ্টিই এক বিজ্ঞান। মানুষের জন্যই পৃথিবী সৃষ্টি। মানুষ না থাকলে এ সুন্দর পৃথিবীর কোনো মূল্য নেই। পৃথিবী যদি মহাবিস্ফোরণের সৃষ্টি তাহলে পৃথিবী সৃষ্টিই বিজ্ঞানের প্রথম ধাপ। আর মানুষ সৃষ্টি বিজ্ঞানের দ্বিতীয় ধাপ। এই মানুষ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এক অদৃশ্য অথচ যৌক্তিক কারণ রয়েছে। সৃষ্টির রহস্যে নিরন্তর পৃথিবীর সব কিছু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। অদৃশ্যে এক নিয়ন্ত্রক নির্দেশক কাজ করছে। আর এ মানুষ পৃথিবীকে স্বাচ্ছন্দে উপভোগ করতে প্রথম ধাপেই পাথর ঘষে আগুন আবিস্কার করেছে। মানুষের সৃষ্টি বিজ্ঞানের এটিই প্রথম আবিস্কার। পৃথিবীর রূপ সৌন্দর্য নান্দনিক হতে পারে। কিন্তু মহাবিস্ফোরণের তাপ শীতল হয়ে প্রাণীর বসবাসের উপযোগী হতে সময় লেগেছে প্রায় ১১’শ কোটি বছর। তাহলে এর চেয়ে বড় ও রহস্যের বিজ্ঞান কি ? ভোলা নাথ বলেছিল- কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত। পৃথিবীর কৃষি বিজ্ঞানের চেয়ে মহত্তর বিজ্ঞান কি ? যা খেয়ে মানুষ বাঁচে। আর মানুষের জন্যই এই পৃথিবী। কৃষি যুগ মানেই তো বৃক্ষযুগ। পৃথিবী সৃষ্টি, মানব সভ্যতা ও সাহিত্য শুরু সময় বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পৃথিবীর শুরুতে মানুষের বসবাসের যুদ্ধটাই বেশী করতে হয়েছে। এ সময়টাতে প্রথমে মানুষের মধ্যে দর্শন তারপর বিজ্ঞান কাজ করেছে। তারও অনেক পরে সভ্যতা বিকশিত হতে শুরু করলে ধীরে ধীরে সভ্যতার নগরী গুলো গড়ে উঠতে থাকে; তখন মানুষের মনের ভাবের পরিবর্তন ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হতে থাকে। সে দিক থেকে নিম্নরূপ ভাবে সাহিত্যকে আলোচনা করা যায়।
আদিম যুগ (৫০০০-৫০০ খ্রিষ্টাব্দ):এ সময়টাকে পৃথিবীতে প্রাণী বা মানুষ সৃষ্টির শুরু হিসাবে দু’ভাগ করা যায়:
১। প্রাগৈতিহাসিক যুগ : এটি পৃথিবীতে মানব সভ্যতার প্রথম যুগ। তখনো মানুষের কাছে পৃথিবটা একটা ঘোর। কীভাবে বাঁচবে বা কীভাবে বাঁচতে হয় এসব ধারণাও খুব কম ছিল। মানুষ তার চিন্তার জগত তৈরী করতে পারেনি।
২। প্রাচীন যুগ : এ সময়ে সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য গবেষণালব্দ তথ্য বিশ্লেষণ ও পূর্ণবিন্যাস করে ঐতিহাসিক অবকাঠামো বিনির্মাণ সাহিত্য ও ইতিহাস রচয়িতাদের এক রকম দায়িত্ব। কেননা মানুষের এ সময়টা বন-বাদাড়ের জীবন বা বন্য জন্তুর সঙ্গে বসবাস। বন্য জন্তুর সঙ্গে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রকৃতি হতে প্রাপ্ত বস্তু হতে জীবন ধারণ।
মধ্যযুগ (৫০০০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ) : সাহিত্যে মূল বিষয় গুলো এ সময়ে রচিত।
ক) পদাবলী যুগ : চর্যাপদের ২৪ জন কবির ৫০ বা ৫১ টি পদাবলী। বড়–চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস -এর নাম উল্লেখ্যযোগ্য। এখানে চন্ডীদাস নামে ৪ জনের নাম পাওয়া যায়।
খ) মঙ্গলকাব্য যুগ : মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বিজয় গুপ্ত, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর -এর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।  
গ) ভক্তি ও প্রণয় কাহিনীর যুগ : শ্রী চৈতন্যদেবের রচিত কাব্য। ইরানী ও আরবী, ফার্সী সাহিত্য হতে প্রেমরসের নির্যাসে রচিত কাব্য।
৯৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ : এ সময়টি সাহিত্যে ক্ষেত্রে অনেকেই ৬০০-৬৫০ থেকে শুরু হয়েছে বলে মত দেন। চর্যাপদ হচ্ছে প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্য নিদর্শন। চর্যা শব্দের অর্থ হচ্ছে আচরণ। চর্যাপদকে চর্যাগীতি, চর্যাগীতিকোষ বা বৌদ্ধ গান বা দোহা বা দোহাকোষ যা বাংলা ভাষার আদি ছবি বলা হয়। চর্যাপদের ভাষা নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের নাম দেন ‘‘চর্য্যাচর্য্যাবিনিশ্চয়”, সরোজবজ নাম দেন ‘‘দোহা”, কৃষ্ণাচার্য নাম দেন ‘‘দোহাকোষ” ইত্যাদি। বৌদ্ধ সহজিয়াগণ তাত্ত্বিক সাধনার সাথে দেহকে একত্রিত করে কায়িক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা করেছেন। এ সময় কারো মতে ২৩ কারো মতে, ২৪ জন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের মোট ৫০ বা ৫১ টি চর্যাপদ পদ আকারে পাওয়া যায়। এগুলো ছিলো গানের সংকলন বা গীতবিতান বা ভজন তত্তের প্রকাশ। প্রথম এই চর্যাপদ বই আকারে প্রকাশ হয় ১৯৫৬ সালে। চর্যাপদ গুলো সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষায় রচিত। এরা পদ (কবিতা) রচনা করতো বলে নামের সাথে পাদ যুক্ত করে ডাকা হয়। লুইপার পদটি চর্যাপদের প্রথম লেখা পদ।
অন্ধকার যুগ (১২০১-১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ) : ১২০১-১৩৫০ সালের এই দেড়শত বছরের সময়কে সাহিত্যে অন্ধকার যুগ বলা হয়। কেননা এ সময়ে বাংলায় রচিত কোন সাহিত্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে এ সময়ে বাঙ্গালা-আসামী-উড়িষ্যার ছন্দ তুলনামূলকে দেখা যায় যে এ সময়েও কাব্য রচনা হয়েছিল। এ সময় তুর্কী আক্রমণে এ অঞ্চলের মানুষ দিশেহারা হলে জনজীবন হয় ভীষণভাবে বিপর্যস্ত। তাই সাহিত্য রচনা কঠিন ছিল। যদিও ধারণা করা হয় সে সময়ে শূন্যপুরাণ ও সেক শুভোদয়া রচিত হয়। বৌদ্ধধর্মীয় পূজা বিষয়ক এবং এক অলৌকিক শক্তিধর মুসলমান রাজা লক্ষণ সেনের দরবারের গল্প এবং অশুদ্ধ বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত। কিন্তু এগুলোর রচনার সময়কাল নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। বেশীর ভাগ তাত্ত্বিক মনে করেন এগুলো ষোড়শ-অষ্টাদশ শতাব্দীর যে কোন সময়ে রচিত। এ সময়ে কেউ কেউ ধারণা করেন ধর্মমঙ্গলের আদি কবি ময়ূর ভট্ট হয়ত সন্ধি যুগের কবি।
মধ্যযুগ (১৩৫০-১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ) : নব্যযুগের পূর্বের  যুগই মধ্যযুগ। এ যুগের যুগপ্রবর্তক হিসাবে শ্রী চৈতন্যদেবকে মনে করা হয়। মধ্যযুগ মূলত: দুইপর্বে বিভক্ত যেমন- ১৩৫০-১৫৭৫ পর্যন্ত গৌড়ীয় বা স্বাধীন পাঠান কাল অন্যটি ১৫৭৫-১৮০০ পর্যন্ত সময়ে শ্রী চৈতন্যদেবের পরবর্তী যুগ বা মুঘল যুগ। প্রাচীন যুগে ব্যক্তিজীবন মধ্যযুগে এসে র্ধমীয় জীবনে পরিণত হলো। ধর্ম হলো মুখ্য বিষয় আর মানুষ হলো গৌণ। ধর্মের প্রভাবে মানুষ দিশেহারা তখন। এ যুগের প্রথম রচিত গ্রন্থ হচ্ছে ১৪০০-১৪৫০ খিষ্টাব্দে বড়ু চন্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। এর কাহিনী মূলত শ্রী কৃষ্ণের প্রেমে রাধা পাগল হন। এর ভেতর দিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আকুল রূপকে আবিস্কার করা হয়। এটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ হয় ১৯০৯ সালে পশ্চিম বঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়াল ঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্য পুঁথি আকারে আবিস্কার করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে বসন্তরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এটিই প্রথম একক বা সম্পূর্ণ কোন গ্রন্থ। এটি ১৩ খন্ড বা সর্গে বিভক্ত যথা : শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা জন্ম খন্ড, তাম্বুল খন্ড, দান খন্ড, নৌকা খন্ড, ভার খন্ড, ছত্র খন্ড, বৃন্দাবন খন্ড, কালিয়দমন খন্ড, যমুনা খন্ড, বাণ খন্ড, বংশী খন্ড, বিরহ খন্ড হিসাবে বিভক্ত। ভিন্ন সর্গে বিভক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মের পাশাপাশি কিছুটা লোকসাহিত্যও প্রচলিত ছিল। এ সময়ে বৈষ্ণব সাহিত্য মঙ্গলকাব্য, শাক্তপদ, অনুবাদ সাহিত্য, নাথ সাহিত্য, জীবনী সাহিত্য, লোক সাহিত্য ইত্যাদি ধারা প্রচলিত ছিল। মঙ্গলকাব্যে মনসাদেবী-বেহুলা-লখিন্দর কাহিনী, চন্ডীমঙ্গলে দেবী পূজার কাহিনী, অভয়ামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর কাব্যে সুন্দর পতি বা সুন্দর নারী পাবার আরাধনা, ধর্মমঙ্গলে লাউসের কাহিনী, কালিকামঙ্গলে দেবী কালির গুণকীর্তন এবং এ সময়ে সংস্কেত ভাষায় রামায়ণ বা মহাভারত সহ পৃথিবীতে ইলিয়াড ও ওডেসি সহ মোট চারটি মহাকাব্য রচিত হয়। বাল্মীকি সংস্কৃত ভাষার আদি কবি, তিনি সংস্কৃত ভাষায় রামায়ন রচনা করেন। আর বাংলা ভাষার আদি কবি কৃত্তিবাস। কৃত্তিবাস রামায়নের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য দেবদেবী স্তুতি মূলক। এ সময় মুসলিম কবি গণও ইউসুফ জোলেখা’র প্রণয়াসক্ত প্রেম কাহিনী, গুলে বকাওলী এবং মধুমালতী হিন্দী, আরবী ও পারসী ভাষায় রচিত হয়। এছাড়া এ সময় অনেক মুসলিম কবিও বৈষ্ণব সাহিত্য রচনা করেন। এ সময় চন্দ্রাবতী কাব্য, পদ্মাবতী কাব্য, মর্সিয়া সাহিত্য (কারবালার কাহিনী), শিবকে উপাসনার নাথ সাহিত্য রচিত হয়। আঠার শতাব্দীর শেষে কবিওয়ালা, শায়ের রচনা ও মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করা হয়। মধ্যযুগে সাহিত্য বিভিন্ন দিক থেকেই বিস্তৃতি লাভ করে।


নতুন কবিতার যুগ (১৮০০ শতক) :
ক) মহাকাব্য যুগ : সফল মহাকাব্য রচয়িতাদের মধ্যে কবি ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল মধুসুদন -এর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।  
খ) রোমান্টিক ও গীতি কবিতার যুগ : বিহারী লাল চক্রবর্তী থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম -এর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।  
গ) আধুনিক কবিতার যুগ : পাঁচতারকা- জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণুদে, প্রেমেন্দ মিত্র -এর নাম উল্লেখ্যযোগ্য।  
আধুনিক যুগ (১৮০১-১৯৪০) : আধুনিক যুগে মানুষের কাছে মুখ্য হলো মানবতা। স্বদেশ ও স্বাধীনতাবোধ, শিল্প বিপ্লব, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার প্রভাবে মানুষ অত্যাধুনিক। আধুনিক যুগের সাহিত্যের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়। কাব্য, নাটক, প্রহসন, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোট গল্প, দর্শন, বিজ্ঞান, ধাঁধাঁ, প্যারেডি, কমেডি সহ ননসেন্স সাহিত্য ব্যাপক শাখায় বিস্তৃত হয়। মানুষের চিন্তা চেতনায় আধুনিকতার উন্মেষ ঘটে। বর্তমানে কবিতার সাথে কথা সাহিত্য বেশ সমান ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মানের দিক থেকেও পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ধর্ম, বিগলিত প্রেমের আখ্যান ছাড়াও পৃথিবীর তাবৎ বিষয়ে তাদের চিন্তা চেতনার পরিধি সমৃদ্ধ করে সাহিত্য চর্চায় ব্রতী।
বুদ্ধিবৃত্তিক বা সচেতন যুগ (১৯৪০-চলমান) : ৪০ দশক থেকে শুরু করে এ সময়ে  বর্তমান সময় পর্যন্ত কেবল শব্দের ঘোরা ফিরানো বা কারসাজি করা হয়েছে সচেতন ভাবে। ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যে উর্বর গ্রন্থ ঋগবেদ। সংস্কেত ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের উর্বর দিক দেহজ কাব্য আর সাহিত্যে লোকধারার কাব্য পালি। মিসরীয় প্রাচীন সাহিত্যে বিষয়বস্তু ধর্ম ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা চীনা প্রাচীন সাহিত্যে বিষয়বস্তু ধর্ম ও লৌকিক কাব্য। হিব্রু প্রাচীন সাহিত্যে বিষয়বস্তু লোক গীতির নিদর্শন। এই সাহিত্যে আরবীয় প্রভাব বেশী পড়েছে। গ্রীক প্রাচীন সাহিত্যে বিষয়বস্তু দেহজ কাব্য। আরবী সাহিত্যেও দেহজ কাব্য গাঁথা। জাপানী প্রাচীন সাহিত্যে বিষয়বস্তু সব প্রকরণেই বাক্ সংযম বা রোজা রাখার মত। জাপানীরা দীর্ঘ কবিতা চোকা, নাগাচিতা, টাংকা, রেংগা কবিতা ছেড়ে অনুকাব্য বা ওয়াকা, হাইকু ও সেনরু লিখছে। আরবী সাহিত্যের কবি ইমরুল কায়েসের কবিতার নির্যাস নিয়ে ইউরোপীয় সাহিত্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও  এস.টি কোলরিজ রোমান্টিসিজমকে পুঁজি করে সমৃদ্ধ হয়েছেন। বাংলা সাহিত্য এখনো শার্ল বোদলেয়ারকে আলোচনায় রাখে। কিন্তু আমাদের জীবনানন্দ দাশ ? লালন ফকির ? বাউল গান ? জসীমউদ্দীন ? শার্ল বোদলেয়রের পরিবর্তে আমাদের এই সম্পদ তো রয়েছে। অথচ বাংলা কবিতা বিজ্ঞানকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে দীর্ঘ সময় থেকে। সেখানে কারো কোনো দৃষ্টি নেই। ত্রিশের পর থেকে কেবলই একই রাস্তায় দিয়া ভূতের আঁছর ধরার মতই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলা কবিতা। বর্তমানে বাংলা কাব্যে কবিরা সব ধরনের রচনায় রীতি সাপেক্ষে বিজ্ঞানকে কবিতায় জায়গা করে দিচ্ছে সচেতন ভাবে।  
অত্যাধুনিক যুগ বা বিজ্ঞান কবিতার যুগ (২০০০-চলমান) : ভাব ও ভক্তির অন্ধত্ব ছেড়ে বস্তুবাদ ও বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষের জন্য রচিত কাব্য / সাহিত্য হবে। এখানে কোনো ধর্মীয় প্রভেদ থাকবে না।  এ সময় শুরু ধরা হয়েছে ১৯৮৮ থেকে চলমান। বর্তমান সময়টি পার করেছে আধুনিক যুগ। এখন মানুষ অত্যাধুনিক যুগে যাত্রা করেছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মানুষকে উন্নতির চরম অবস্থানে নিয়ে গেছে। এই বিশ্বে বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। তাই এই সময়কে অত্যাধুনিক যুগ নামকরণ করা যায়। যুগের নামকরণে অবশ্যই কোন ব্যক্তি মানুষ বা শতাব্দী ধরে দেয়া মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা বহু শতাব্দীর পার করেছে পৃথিবী আরও বহু শতাব্দী পার করবে। আবার নামের ক্ষেত্রেও একই রকম কারো নামে হলে সেই সময়ে সাহিত্য সাধনায় আরো যারা সফল হয়েছেন তাদের অবস্থান খাটো হয়ে যায়। বাংলায় রবীন্দ্রযুগ, সংস্কৃতে চৈতন্য যুগ এবং ইংরেজী সাহিত্যে ভিক্টোরিয়ান যুগ এগুলো থাকাই উচিত না। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতায় মানুষ এখন অত্যাধুনিক। মানুষের জীবন যাপনসহ সব কিছুতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তাই অত্যাধুনিক যুগ হিসাবে এই যুগকে অভিহিত করা যায়। একুশ শতকের শুরু মানেই অত্যাধুনিক যুগ শুরু। যেহেতু সাহিত্য যুগ তাই এর যৌক্তিকতা থাকা উচিত। সাহিত্যিকগণ বর্তমানে তাদের লেখায় বিজ্ঞানকে ধারণ করছেন। বিজ্ঞান মানুষের মাঝে পরিচয় করে দিচেছ সাহিত্যকরা। সুতরাং নতুন যুগকে অত্যাধুনিক যুগ বা কাব্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান কবিতার যুগ বলা সঙ্গত।
কবিতার নানা দিক : কবিতার নানা দিক রয়েছে। বিষয়ের দিক হতে সাধারণত বিষয়গত, গঠনগত (ছন্দবদ্ধ ও গদ্য কবিতা) এই ২টি প্রধান ভাগে ভাগ করে কবিতার শ্রেণী বিন্যাস করা যায়। কবিতার মূল দুটি ভাগের বিষয়গত দিক থেকে বিশ্লেষণ করা হলে বিষয়গত দিক থেকে দেখা যায়-
ক) বিষয়গত (ঝঁনলবপঃরাব) -  কবিতার বক্তব্য ও আদর্শগত দিকই বিমূর্ত কবিতা। কবিতার বিষয় প্রকরণের ভিন্নতায় কবিতা অস্পষ্ট রূপ। আর বিষয়গত দিক থেকে শ্রেণী বিন্যাস করলে দেখা  যায় -
১। মন্ময় কবিতা (ঝঁনলবপঃরাব চড়বঃৎু) - কবির অন্তর অনুভূতির সমন্বয়ে  ব্যক্তিনিষ্ঠ কবিতা। মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ কবিতার মধ্যে শোকগীতি, স্তোত্র কবিতা, ভক্তিমূলক কবিতা, চিন্তামূলক, প্রেম মূলক, নৈসর্গিক কবিতা, পরাবাস্তবিক বা লৌকিক কবিতা, সাধনতাত্তিক কবিতা, গীতকবিতা, অলৌকিক বা আধাত্মিক কবিতা, স্বদেশপ্রীতি কবিতা।
২। তন্ময় কবিতা (ঙনলবপঃরাব চড়বঃৎু) - কবির চারপাশের জগত নিয়ে অনুভূতির সমন্বয়ে বস্তুনিষ্ঠ কবিতা। তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতার মধ্যে মহাকাব্য, গাঁথা কবিতা, মঙ্গলকাব্য, লিপি কবিতা, পত্রকবিতা, রূপক কবিতা, ব্যঙ্গকবিতা, নীতি কবিতা, গণমুখী ছড়া/ কবিতা, কোষ কাব্য, নাট্যকাব্য, প্যারডি বা লালিকা ইত্যাদি।
৩। বিমূর্ত কবিতা (অনংঃৎধপঃ চড়বঃৎু) - আধুনিক সময়েই সবচেয়ে বেশী বিমূর্ত কবিতা লেখা হচ্ছে। কবির বক্তব্য কবি সরাসরি না বলে অন্য একটি বিষয়ের মধ্য দিয়ে বা আশ্রয়ে প্রকাশ করে থাকে। এই কবিতা খুব জটিল ও দুর্বোধ্য। এটি প্রতীকী বা রূপক নয় রবং অন্য একটি চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ। খুব সুক্ষè অনুভূতি লুকিয়ে থাকে।
৪। পরাবাস্তব কবিতা (ঝঁৎৎবধষরংঃরপ চড়বঃৎু) - বাস্তব নয় কিন্তু কল্পনায় আঁকা। ধারণ করা নয় বরং ধারণা করা। দেখা যায় স্পর্শ করা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। যা মনে মনে চিন্তা করা যায় যা বাস্তব থেকে অনেক বেশীদূর যেতে পারে। বাস্তব থেকেও অতিবাস্তবতা।
৫। অলৌকিক কবিতা (গড়ংধলবপ চড়বঃৎু) - লৌকিক নয় অলৌকিক ঘটনা। যা কেরামতি বা বাস্তব সম্মত কিন্তু একেবারেই অলৌকিক একটা বিষয়। স্রষ্টা প্রদত্ত শক্তি। এসব বিষয়ে রচিত কবিতা।
৬। যাদুবাস্তব কবিতা (গধমরপ জবধষরংস চড়বঃৎু) - যাদুমন্ত্র ভিত্তিক ধ্যান ধারণায় লেখা কবিতা। যা ইচ্ছা করে ফুসমন্তরে করার চিন্তা। কিছুটা অলৌকিক বা কিস্তু অলৌকিক নয় একটা ম্যাজিক যেনো, অদ্ভুত ভাললাগার বিষয়।  
খ) গঠন গত কবিতা (ঝঃৎঁপঃঁৎধষ চড়বঃৎু) - গঠনগত কবিতায় ছন্দকে বিবেচনায় রেখে রচিত কবিতা। এই কবিতা ছন্দ বদ্ধ বা গদ্য ছন্দেও রচিত হয়।  
গ) বিজ্ঞান কবিতা (ঝপরবহপব চড়বঃৎু)- বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে ব্যক্তি ও বস্তুর সমন্বয়ে রচিত কবিতা। বিজ্ঞান কবিতা মূলত মন্ময় ও তন্ময় দুটোতেই রচিত হতে পারে। কবি তার ব্যক্তি অনুভূতিতে অথবা পারিপার্শ্বিক দৃশ্যমান বস্তু নিয়ে বিজ্ঞানকে অলংকারিক বিন্যাসে ছন্দিত করবে।  বিজ্ঞান আশ্রিত কবিতা। এখানে বিষয়গত, গঠনগত কবিতা সহ ছন্দবদ্ধ, গদ্য কবিতায় মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ ও তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ দুই-ই হতে পারে। বিজ্ঞান কিছুটা পরাবাস্তব। কেননা কবির স্বপ্ন আর দার্শনিকের তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানী প্রমাণের পথে এগিয়ে যেতে থাকে। ফলাফল এক নাও হতে পারে। অথবা ভাবনার চেয়ে বেশী কিছু বা অন্যরকম কিছু হতে পারে।
কবিতার ধরণ বিষয়গত-মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ কবিতার সংজ্ঞা
শোকগীতি ব্যক্তির জীবনে বা জাতীয় শোককে ঘিরে যে গীতি রচিত হয় তা-ই শোকগীতি। এটি এলিজি বা এপিটাফ। যেমন : কবর, চিত্তনামা ইত্যাদি।
স্তোত্র কবিতা প্রাচীন পুরাণ কাহিনীর মত যা একধরনের সুরের তালে নাচের মুদ্রায় উপস্থাপিত হয়।  পাথরের ফুল, মানব বন্দনা চাঁদসওদাগর ইত্যাদি।
ভক্তিমূলক কবিতা ধর্মীয় বিশ্বাস বা ভক্তি প্রকাশে যে কবিতা রচিত হয় তা-ই ভক্তিমূলক কবিতা। এটা এক ধরনের বন্দনাগীত। বৈষ্ণব পদাবলী, গীতাঞ্জলি, শ্যামাসংগীত, অগ্নিবীণা, গীতিমাল্য ইত্যাদি।
চিন্তামূলক ব্যক্তিজীবনের দর্শন ও অভিজ্ঞাতার সংমিশ্রনে রচিত কবিতাই চিন্তামূলক কবিতা। উর্বশী , জীবনসংগীত ইত্যাদি।
প্রেম মূলক মানব প্রেমের কবিতা
গাঁথা কবিতা গাথা কবিতাকে কাহিনী কবিতা বা গীতিকবিতা বা ব্যালাড বলা হয়। এ জাতীয় কবিতায় গুনকীর্তন বা শ্লোকধর্মী বিষয় অর্ন্তভুক্ত থাকে। যে কোন ধরনের হৃদয়স্পর্শ করে এমন কাহিনী সহজ সরল ভাবে উপস্থাপন করা হয়। নৃত্য গীতি সহযোগে যে কবিতা সেটাই গাঁথা কবিতা। কিংবদন্তী বা কোনো বীরত্বপূর্ণ বা ধর্মীয় বিষয় গীতি গাঁথা। ময়মনসিংহ গীতিকা, গাজী মিয়া পালা সোজন বাদিয়ার ঘাট, নকশী কাঁথা, রাখালী ইত্যাদি।
প্রকৃতি বিষয়ক বা নৈসর্গিক কবিতা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যে সব কবিতা রচিত হয়। নিসর্গের বাস্তব রূপ সৌন্দর্য, ভাঙ্গ গড়ার বর্ণনায় যে কবিতা তাই প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা।
পরাবাস্তবিক বা লৌকিক কবিতা-বাস্তবতার নিরিখে যে সব কবিতা রচিত হয়। বিশেষ করে গণমুখী কবিতা।
সাধনতাত্তিক কবিতা, ভক্তিমূলক কবিতা, ধ্যানস্থ কবিতাকেই সাধনতাত্তিক কবিতা বলা হয়।
গীতকবিতা - গানের সুরাশ্রয়ী কবিতা
অলৌকিক বা আধাত্মিক কবিতা বা কাব্য মোজেজা -মৃত্যু চিন্তা, স্রষ্টার আরাধনা, সৃষ্টির সৌন্দর্যে দর্শন বিশ্লেষণ স্রষ্টা ভাবনায় রচিত কবিতা।
স্বদেশপ্রীতি কবিতা - দেশ, মা মাটিকে ভালোবেসে রচিত কবিতা।
সনেট -গীতিময় একটি মাত্র অষন্ড ভাব, সুর, বা ধ্বনির ধারাবাকিতায় স্বরবৃত্ত, মাত্রাব্ত্তৃ ও অক্ষর বৃত্ত ছন্দে লেখা যায়।
লঘুবৈঠকী কবিতা -মানুষের ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অত্যন্ত লঘু বা কম বা হাল্কা কোনো বিষয় নিয়ে কবিতা।
বিষয়গত-তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতার সংজ্ঞা
মহাকাব্য -১০০ বছরের ইতিহাস ধারণ করে যে কবিতা রচিত হয় (পুরাণ ও বর্ণনাময়)। জাত  বা অথেনটিক মহাকাব্য ও সাহিত্যিক মহাকাব্য।
মঙ্গলকাব্য -দেবদেবীর আরাধনা বা পূজা বা ভক্তিমূলক কবিতা।
লিপি কবিতা -চিঠি নয় কিন্তু চিঠি আকারে লিখিত এক প্রকার গদ্যের ঢংয়ে রচিত কবিতা।
পত্রকবিতা -কাব্যিক ভাষায় চিঠি কবিতা
রূপক কবিতা -উপমা আশ্রিত বক্রোক্তি প্রকাশে রচিত কবিতা
ব্যঙ্গকবিতা/ স্যাটায়ার/ প্রতীকী -সমাজকে তীক্ষ্ম চোখে অসংগতি দেখাতে ব্যাঙ্গাত্বক সুরে রচিত কবিতা
নীতি কবিতা -ন্যায় নীতির বা উপদেশ মূলক কবিতা
গণমুখী ছড়া/ কবিতা -জনগণের সুখ দুঃখ আশ্রিত কবিতা বা ছড়া
কোষ কাব্য গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট আকারের কবিতা
নাট্য কাব্য বা কাব্য নাট্য -নাটকের আধারে কবিতা। কাব্যই নাটকের চেয়ে মুখ্য এবং কাব্যে নাটকীয়তা থাকে
প্যারডি বা লালিকা - কোন বিখ্যাত বা জনপ্রিয় কবিতার অনুসরণে ব্যাঙ্গাত্ব কবিতা
গঠনগত কবিতা-
ছন্দবন্ধ কবিতা স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও  অক্ষরবৃত্ত, মিশ্র বা সমন্বিত ছন্দের কবিতা
গদ্য কবিতা কাব্যিক কবিতা ও গদ্যময় কবিতা
বিজ্ঞান কবিতা-
বিজ্ঞানভিত্তিক কবিতা বিজ্ঞান আশ্রিত কবিতা। এখানে বিষয়গত, গঠনগত কবিতা সহ ছন্দবদ্ধ, গদ্য কবিতায় মন্ময় বা ব্যক্তিনিষ্ঠ  ও তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ দুই-ই হতে পারে।
নান্দনিকতা হচ্ছে মূল আদল। বিজ্ঞান কবিতা নান্দনিকতার সহায়তা নিয়েই কবিতা হিসাবে দাঁড়াবে। শরীরের ভেতরের অংশ এক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। একে খাবার না দিলে মানুষ চলতে পারবে না। তখন মানুষের মনে নান্দনিক শিল্প জাগবে না। বিজ্ঞানের সহায়তা ছাড়া মানুষ সুবিধা পাবে না। নান্দনিকতা বর্তমান সময়ে এসে ঢালবিহীন হয়ে যাবে। কেননা  নান্দনিক গল্প এখানে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। পূর্নিমা চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটির মত। পাঠকদের কথা চিন্তা করে কঠিন শব্দের পাশাপাশি সহজ শব্দের বিন্যাসে নান্দনিক আদলে আঙ্গিক গঠন করলে এক সময় তা পাঠকের আয়ত্বে চলে আসবে। সেই ক্ষেত্রে কবিতায় বিজ্ঞান আশ্রিত শব্দের টীকা ব্যবহার করা যেতে পারে। তাহলে পাঠক আনন্দরস থেকে বঞ্চিত হবে না। কবিতা এক সময় অন্যরূপ ছিলো যেমন-মাটিতে আঁকা, পাতায় আঁকা, গাছে দাগ কাটা, পশুর চামড়ায় চিত্র, শিলা খন্ডে অঙ্কন, পাথরে অঙ্কন, তালপাতায় লেখা থেকে সভ্যতার বিকাশে কবিতা চিঠির মধ্যে স্থান পায়। চিঠিতে মনের কথা লেখা, তারপর ভুলভাল ছড়ার অন্তমিলে লেখা পত্রকবিতা ছিল। বালিশের কভারে ফুল তুলে কবিতা / ছড়া লেখা হতো। দেয়ালে আয়নায় বাঁধানো রুমালে ছবি এঁকে সাথে কবিতা/ ছড়া লেখা হতো। আবার গদ্যের ভাষায়ও সুন্দর সুন্দর দার্শনিক মতবাদ লেখা হতো। বিছানার চাদরেও নকশা ও নাম লেখা হতো। আর হাত রুমালের তো তুলনাই হয় না। ভুলনা আমায়, মনে রেখ, ভাল থেকো, ভালোবাসা জাতীয় কতো ধরনের কথা হাত রুমালে লেখা হতো। দেয়ালে বাধানো ফ্রেমে কবিতা/ ছড়া/ দার্শনিক মতবাদের সাথে জন্ম-মৃত্যু তারিখ, বিয়ের তারিখ, ছেলের মেয়ের নাম লেখা থাকত। গ্রাম প্রেমের শুরু হতো হাত রূমালের লেখা দিয়ে। হাতপাখায় নকশা সহ কবিতা/ ছড়া লেখা থাকত। এখনো শখের বশে ঘরে সাজিয়ে রাখে এসব। নকশী কাঁথা, শীতল পাটিতেও এসব লেখা শোভা বর্ধন করে থাকত এখনো ড্রয়িং রুমের ম্যাট বা কার্পেট, ফ্লাওয়ার ভাস -এ এসব নকশা ও লেখা আছে। কুটির শিল্পের মাধ্যমেও বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসে ছবি বা নাম তৈরীর কৌশলে বানানো হতো। সভ্যাতা বিকাশে ডিজাইন করা এসব একসময় বাজারে চলে আসল। যদিও এখন সভ্যতার আধুনিকতার বাতাসে হাতরুমাল, শীতের চাদর, বৈশাখী শাড়ি, পাঞ্চাবী, বাসন্ত শাড়ী , পাঞ্চাবী, মাথার ব্যান্ড, হাতের ব্যান্ড, বালিশ, চাঁদর, দেয়ালের ছবি, কুটির শিল্প, তৈজসপত্র, ব্যানার ফেস্টুন, পোস্টার সহ নানান জিনিস আরো উন্নত ভাবে মানুষের ব্যবহারে জন্য বিশ্বের বাজারেও বাজারজাত হচ্ছে। এক সময় গ্রামের বয়েসীরা মুখে মুখে ছড়া কাটত এবং খনার বচন বলতো। কবিতার আদি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে খনার বচনে জ্যোর্তি বিজ্ঞান বা অংক শাস্ত্র কাজ করেছে। দেখা যায় ডাক ও খনার বচন গ্রন্থ আকারে লিপিবদ্ধ হয় ১২০০-১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। খনা লিখতে জানতেন না। কিন্তু অংক শাস্ত্রে তাঁর পান্ডিত্য ছিলো। মানুষ সূর্য দেখে দিন রাতের সময় বলতো। কিন্তু কবিতার সে যুগ এখন নেই। কালের বিবর্তনে আর মানুষের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে বিবর্তিত হচ্ছে সবকিছু। কবিতাও সেখানে পিছিয়ে নেই।
বিজ্ঞান মানুষের আর্শীবাদ চিন্তা থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। ভাল মন্দ দুটো শব্দই মানুষের জীবনে ক্রিয়াশীল। ঠিক একই ভাবে বিজ্ঞান আর্শীবাদের পাশাপাশি অভিশাপও। বিশেষ করে আনবিক ও পারমানবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, নিউট্রন বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র, এসিড, রোবট, ক্লোনিং ভীতি মানুষকে কিছুটা হতাশ করেছে। কিন্তু কখন অভিশাপ তা কিন্তু বিবেচনায় রাখতে হবে। মানুষের উপরই তার ভার নির্ভর করে। ডিনামাইট মানুষের ক্ষতি করছে অন্যদিকে বড় বড় স্থাপনা বা পাহাড় মানুষের ব্যবহার যোগ্য করতে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিনামাইট। যা অনেক মানুষের পরিশ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হতো। যেটা এখন হচ্ছে না। বিজ্ঞান এখানে আর্শীবাদ। রোবট নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। নিয়ন্ত্রণে ব্যঘাত হলে মানুষের কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই ডেকে আনে। সে জন্য সঠিক নিয়ন্ত্রণ আয়ত্বে থাকা দরকার। বিমান তৈরী হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য। বিমান দিয়ে কোথাও হামলা করে ধবংসাত্মক কাজ করতে তৈরী করা হয়নি। গাড়ী যোগাযোগ দ্রুততর করার জন্য তৈরী করেছে উল্টো পাল্টা দিক নির্দেশনা দিয়ে একসিডেন্ট করার জন্য তৈরী হয়নি। পরমাণু চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি আজ মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। কিন্তু বোমা বানিয়ে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধে বা এখনো মানুষ হত্যার জন্য পরমাণু আবিস্কার করা হয়নি। মানুষ মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। কিন্তু মানুষ মানুষকে খুন করতে সৃষ্টি হয়নি। ক্লোন পদ্ধতি এখনো অনেকটা গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে মানুষের কল্যাণ হলে অবশ্যই তা সমাদৃত হবে। সবকিছুরই বিপরীত ক্রিয়া এবং ভাল মন্দ দুটি দিকই আছে। এটা নির্ভর করে নির্দেশনার উপর। নান্দনিকতা দিয়ে মহাসেন ঝড় ঠেকানো যায় না। সমুদ্র এখনো মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বৃষ্টি মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নান্দনিকতা দিয়ে আকাশে উড়তে পারবে না। দূরবর্তী দেশ বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কম সময়ে ও নিরাপদে যেতে বিমানই এখন ব্যবহার করতে হয়। রাত-দিন, চন্দ্র-সূর্য মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এখানে নান্দনিক কোনো ব্যপার নয়। আবার এখানে বিজ্ঞানেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে কেবলই রহস্যময় সৃষ্টির কারুকাজ। অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। নান্দনিকতা দিয়ে অসহ্য গরমে এ শহরে ফ্যানের বাতাস খাওয়া যাবে না। সেখানে বিজ্ঞানই কাজ করবে। নান্দনিকতা মনে মনে ভাবনার বিষয়, ছবি আঁকার বিষয়, ফুল দিয়ে টব সাজানোর বিষয়। ছবি আঁকতে রং লাগবে আর টব বানাতে বিজ্ঞানের উপর নির্ভর হতে হবে।
পূর্বে রবীন্দ্র, নজরুল বা অন্যদের বিজ্ঞান লেখা গুলো ইঙ্গিতপূর্ণ। তবে কোনোটা সচেতন ভাবে কোনোটা হয়তো অসচেতন ভাবে ব্যবহার করেন। কিন্তু এক সময়ে এসে তাদের অসচেতন বিষয়েরও বাস্তবায়ন ঘটেছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান বিভিন্ন দিক থেকেই মানুষের জীবন যাত্রাকে সহজ করেছে। তাই বিজ্ঞান সমসাময়িক চাহিদার কারণে কবিতায় বহুল ব্যবহারের বিষয়টি সময়ের প্রয়োজন। বিষয়টি নতুন তাই নতুন পাঠকের কথা চিন্তা করে কঠিন শব্দের পাশাপাশি সহজ শব্দের বিন্যাসে নান্দনিক আদলে আঙ্গিক গঠন করা যেতে পারে। এখানে বিজ্ঞান কোথাও অনেক স্বপ্ল পরিমানে কাজ করলেও প্রাথমিক ভাবে পাঠককে জটিল বিষয়ের মুখোমুখি করলে পাঠক আনন্দরস হারানোর সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে কিছুটা সহজীকরণ করা হতে পারে। শিশুদের কথা চিন্তা করে বিজ্ঞানভিত্তিক ছড়া লেখা প্রয়োজন। তাহলে শিশুরা ৭-৮ বছরে পৃথিবী সম্পর্কে যা আয়ত্ব করতে পারবে। তা দেখা যায় মধ্য আয়ের দেশে শিক্ষার সমন্বয়ের কারণে সেখানে ২৫-৪০ বছর বয়স সময়ে এসে আয়ত্ব করছে। এবং এ জাতীয় লেখা আরো লেখা প্রয়োজন সবার। তবে শিশুদের কথা চিন্তা করে স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞান চর্চার সহজীকরণে বিজ্ঞান ক্লাব, বিজ্ঞান গবেষণাগার, বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ, বিজ্ঞানীদের গল্পকথা আলোচনা, বিজ্ঞান কবিতা/ ছড়া, গল্প পাঠ, বিজ্ঞান ভিত্তিক গানের আয়োজন, বিজ্ঞান ভিত্তিক নাটক মঞ্চায়ন, বিজ্ঞান ভিত্তিক পথসভা, বিজ্ঞাপন প্রচারণা ভিত্তিক বিলবোর্ড, বিজ্ঞানভিত্তিক সিনেমা প্রদর্শন ও অলিম্পিয়ার্ড আয়োজন করা হলে বিজ্ঞান ছড়িয়ে যাবে গ্রাম্য লোকালয়ে। মানুষ আরো সচেতন হয়ে ওঠবে বৈশ্বিক বিষয়ে, জীবন ও জীবিকা বিষয়ে।
চর্যাপদের ধর্মসঙ্গীত ও সামাজিক চিত্র থেকে বাংলা কবিতা বিবর্তিত রূপে মুক্তি পেয়ে শ্রীকীর্তন রূপে রাধা কৃষ্ণের লৌকিক প্রেম কাহিনীতে এসে পৌঁছায়। তারপর নাথ কাব্যের চেতনার পর বৈষ্ণব সাহিত্য এবং মঙ্গলকাব্য, পালাগান, গীতিকবিতা, সাহিত্যের হিন্দু-মুসলিমীকরণ আর সর্বশেষ আধুনিক কবিতার ধারা। রবীন্দ্র বিরোধী পাঁচতারকা ফ্রান্সের কবি শার্ল বোদলেয়ারের চেতনা নিয়ে সুধীনদত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণুদে, বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ বিচিছন্নতার যুদ্ধে মেতে ওঠেছেন। এদের মধ্যে বিষ্ণুদে, বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ তিনটি ধারা পৃথক করতে পারলেও সুধীনদত্ত ও অমিয় চক্রবর্তী কিছুদূর গিয়ে থেমে গেছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রথম পাঁচ তারকাই পথ দেখালেন কীভাবে কাব্য প্রতিভা স্বতন্ত্র করা যায়। পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রধানতম কবিরা বিভিন্নভাবে নান্দনিক আঙ্গিকে গীতিকবিতা, লোকজ উপাদান, নগর জীবন, মরমীবাদ, সুফীইজম, ধর্মচেতনা, আধ্যাত্মিকতা এবং অবচেতন মনে বিজ্ঞানকে আর্শীবাদ না দেখে অভিশাপ রূপে শংকিত কাব্য রচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে কবিতা কেন বিজ্ঞান মুখী হবে এই বিষয়ে অনেক প্রশ্নের অবতারণা হয়েছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় বাংলা কাব্য চেতনা যখন নতুন মাত্রিকতা নিয়ে আর্বিভাব হয়েছে। তখনই দুটি পক্ষ বিপক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এতে একটি পক্ষ অল্প সময়ের ব্যবধানে বিজ্ঞান কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথে সাদরে গ্রহণ করেছে। অন্য পক্ষে বিরোধীতা হচ্ছে কবিতা নান্দনিক বিষয়। এখানে বিজ্ঞানের মিশ্রণ ঘটলে মানুষের মনের যে ছান্দিক প্রকাশ সেটি বাধাগ্রস্ত হবে। মানুষ মনের সুপ্ত স্বপ্ন অতিমাত্রায় বিজ্ঞানের কঠিন ফ্রেমে বাধা পড়বে। কিন্তু বিজ্ঞান কবিতার বই প্রকাশের পর সমালোচনায় এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বরং নান্দনিকতার আদল ঠিক রেখে বিজ্ঞানকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাকরণিক কলায় সিদ্ধ অর্ন্তভুক্তি বা সমন্বয় করেছে যা পাঠককে কবিতার ঘোরে আচ্ছন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। বিজ্ঞানকে ধারণের কতগুলো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তা হলো বর্তমান বিশ্বের উষ্ণায়ণ, বরফস্তর কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূ-কম্পণে ভূ-ত্বকের পরিবর্তন, রাসায়নিকের ব্যবহারে কৃষি জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার, ক্ষতিকর ওষুধ মানব খাদ্যে ব্যবহার, সমুদ্র জলের স্তর হ্রাস, ধুমপান, বনায়ন হ্রাস, গ্রীণহাউজ ইফেক্ট, দূষিত বাতাসের সীসা, মানুষের রোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, আরাম আয়েশ বৃদ্ধি পাওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণ, গ্লোবালাইজেশন, আবাদী জমি হ্রাস, হাইব্রিড পদ্ধতির ব্যবহার, মানুষের চাওয়া পাওয়া সমন্বয় সাধন ইত্যাদি কারণেই বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা কবিতায় অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনটি অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠনের বর্তমান নির্বাহী সভাপতি কবি ও সাংবাদিক শেখ সামসুল হকের অনুপ্রেরণা, সার্বিক সমর্থন ও মনিটরিং -এ ১৯৮৮ সাল থেকে কবি হাসনাইন সাজ্জাদী শুরু করেছেন বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন। কবি হাল ছাড়েননি। ধারাবাহিকভাবে ২০১৪ সালে বিজ্ঞান কবিতার রূপ রেখা দিয়ে যখন বই প্রকাশ করলেন তখন এটি পূর্ণজাগরণের মত সবার নজরে আসলো। অতি সম্প্রতি রীনা তালুকদারের বিজ্ঞান কবিতা শীর্ষক অলংকারিক বিন্যস্ত একক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিজ্ঞান কবিতার প্রথম বই হিসাবে লিখিয়ে সমাজ একটি প্রবন্ধ ও একটি কবিতার বই দিক নির্দেশনা হিসাবে পেয়ে গেছে। আর এই যে ধারাবাহিক সাহিত্য চর্চার বিচ্ছিন্ন আন্দোলন তা সমাদৃত হচ্ছে দ্রুত। সেখানে অলংকারিক বিন্যাসকে সমৃদ্ধ রেখে বিজ্ঞানকে সঠিক সমন্বয় করতে পারলে বিজ্ঞান কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে বিজ্ঞান আরো সহজ হয়ে ধরা দিবে। এক সময় কবিতা বিজ্ঞান মানুষের আয়ত্বে এসে প্রিয় হয়ে ওঠবে। সেখানেই বিজ্ঞান কবিতার সার্থকতা নিহিত। কেননা বিহারী লাল চক্রবর্তী তথা ত্রিশের দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা কবিতা একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ কারণে এটি অবশ্যই বাংলা তথা বিশ্ব সাহিত্যে এক নতুন সংযোজন নিঃসন্দেহে। সব কাজের শুরুতেই বাধা আসে। তাই নান্দনিকতা ও বিজ্ঞানকে দু’ভাগ করে যে বিতর্ক জমে ওঠেছে। তার মুখোমুখি হতে বিজ্ঞানকে নান্দনিকতার প্রলেপ দিয়ে ভালোবাসার আচ্ছাদন দিতে পারলে পাঁচতারকার মত বাক্ তীর বশে চলে আসবে।
বিজ্ঞানী টলেমী ও গ্যালনকে প্রাচীন বিজ্ঞানী হিসাবে মনে করা হয়। এর পর দীর্ঘ একহাজার থেকে বারোশ বছর ইউরোপে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্ধকার যুগ বিরাজ করেছে। এক সময় দার্শনিক প্লেটোর ভাববাদ, প্লোটিনাসের মরমীবাদ ও খ্রিস্ট ধর্মের আগ্রাসী চিন্তা ইউরোপীয় বিজ্ঞান চর্চার প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। এই সময় ধর্ম রাজত্ব করেছে। কবিতা/ সাহিত্যেও ধর্মের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। কবিতাতেও বিজ্ঞানকে অভিশাপ রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার ভারত বর্ষেও প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। বৈদিক ধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা শক্তিশালী রূপ ধারণ করায় এর সাথে দার্শনিক শঙ্করের মায়াবাদী দর্শনের প্রভাবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। আর শঙ্করের এই মায়াবাদ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছে মনে করে আধুনিক বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছেন- শঙ্করের হাতে পরিবর্তিত ও ব্যাখ্যাত বেদান্ত দর্শন, যা বস্তু জগতের অসত্তা শেখায়। তা-ও পদার্থ বিজ্ঞান চর্চা কুখ্যাত করে তোলার জন্য অনেকাংশে দায়ী। কণাদ ও তার দর্শন সম্পর্কে নিন্দাবাদে শঙ্কর যেনো রেয়াত করেননি। এখানে দেখা যায় শঙ্কর পরমাণু বা বস্তু জগতের বিষয়ে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না বা পছন্দ করেননি। কিন্তু পৃথিবীর ভূ-ত্বক এবং চাষবাস এখানে বস্তুবাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার কোনো যুক্তিই নেই। বস্তুবাদী দর্শন ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বলেছেন - প্রকৃত বিজ্ঞান মানুষের অভিজ্ঞতা হতে উদ্ভূত। যে সব বিজ্ঞান এই অভিজ্ঞতা হতে উদ্ভূত নয় তাহা অসার ও ভ্রমাত্মক। অভিজ্ঞতা যেমন বিজ্ঞানের মূলভিত্তি তেমনি বস্তুবাদী দর্শনের মূল ভিত্তি। এ জন্য বস্তুবাদী দর্শন ও বিজ্ঞান ঘনিষ্ঠ। এখানে ১৮৫৯ সালে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের দেয়া (১৮০৯-১৮৮২)-বিবর্তন বাদ (ঞযবড়ৎু ড়ভ ঊাড়ষঁঃরড়হ) বা বিবর্তন তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ডারউইনের পূর্বে ১৮৪৫ সালে প্রাণী বিজ্ঞানী আর্নেষ্ট মেয়ার দিলেন ‘শক্তির রূপান্তর সংক্রান্ত তত্ত্ব’ আর ১৮৩৯ সালে দিলেন শোয়ান ‘‘কোষ বিভাজন ও তার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উদ্ভিদের বা প্রাণীর দেহের উন্নতি ঘটে।” বিজ্ঞান যতই এগিয়ে যায় বস্তুবাদ দর্শনও এগিয়ে যায়। মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আধুনিক বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ১৫৪৩ সালে ধরা হয় যে মধ্যযুগের অবসান। এই সময়েই বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের জ্যোর্তিবিদ্যা বিষয়ক বই De Revolutionibus Orbium Coelestium প্রকাশ করে বিজ্ঞানী ভেসালিয়াস গ্যালনের শরীরতত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করেন। গ্যালনের এই বইটির নাম De Fabrica Corporis Humani কোপারনিকাসের সূর্য কেন্দ্রিক মতবাদ টলেমির খিষ্টধর্মী পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্ব পরিকল্পনা ভেঙ্গে দেয়। এই রেনেসাঁয় আধুনিক বিজ্ঞানের বাতাসে ছড়িয়ে যায় কেপলার, গ্যালিলিও ও নিউটন প্রমুখ বিজ্ঞানীরা। শুরু হয় আধুনিক চিন্তাধারা, পুঁজিবাদ এবং প্রত্যক্ষ দর্শন, সংশয় বাদ, আধুনিক বস্তুবাদ সর্বক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় অচলায়তন ভেঙ্গে দেয়। বিজ্ঞানী থালেসই প্রথম প্রকৃতিকে জানার কথা বললেন। তিনিই প্রথম জানালেন জগতে একটা নিয়মের অস্তিত্ব রয়েছে। এ নিয়মটা কোনো মানুষ বা দেবতার ইচ্ছায় চলে না। এ জন্য প্রাচীনকালের থালেসই প্রথম বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের প্রথম বই লিখেছেন মাইলেটাসের অধিবাসী অ্যানাক্সিমেন্ডার; বইটি ৫৪৭ খ্রিষ্ট পূর্বে প্রকাশ করেন। বইটির নাম ‘প্রকৃতি বিষয়ে’ আর প্রকৃত বিজ্ঞানের যাত্রা এখান থেকেই। অন্যদিকে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের যাত্রা পাথরের ঘর্ষণে আগুনের আবিস্কার থেকে। কিন্তু কৃষিবিজ্ঞান মানুষের সূচনালগ্ন থেকেই শুরু। আধুনিক বিজ্ঞান বৃটিশ দার্শনিক ফ্যান্সিস বেকনের কাছে (১৫৬১-১৬২৬) ঋণী। তিনি পূর্বতন জ্ঞানের সংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরোধিতা করে বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অšে¦ষণের পক্ষে ছিলেন। অন্য দিকে এ্যারিস্টটল বিজ্ঞানী হয়ে ও সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব ও অনেকটা অনুমান নির্ভর ছিলেন। প্রায়োগিক বা বাস্তব দিকের পর্যবেক্ষণ করতেন না। বেকন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা বলেছেন- তা হলো আরোহ পদ্ধতি। এর দুটি শর্ত ছিল-(১) আমাদের জ্ঞানকে বিশ্ব প্রকৃতির সাক্ষাত অনুভব ও পর্যবেক্ষণের উপর দাঁড় করিয়ে তা থেকে অপ্রয়োজনীয় অর্থাৎ আজে বাজে জিনিস ঝেরে ফেলতে হবে। (২) অপর শর্তটি হলো আমাদের পূর্ববর্তী পরস্পরাগত বিশ্বাস এবং মনের মধ্যকার বিমূর্ত ধারণাগুলোকে ত্যাগ করে মনকে পরিশুদ্ধ করে তুলতে হবে। এভাবে আমরা যে জ্ঞান পাবো তা অবশ্যই বিশ্বাস সম্মত। বেকনের এই পদ্ধতি বিজ্ঞানকে এগিয়ে দিয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে মাইলেটাসে বিজ্ঞানের যে সূচনা হয়েছিল এ চর্চা সক্রিয় ছিল প্রায় খ্রিষ্টাব্দ চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত। আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের কার্যকমের মধ্য দিয়ে। তারপরই শুরু হয় বিজ্ঞানের অন্ধকার যুগ। বিজ্ঞান তখন পড়েছিল ধর্মীয় বেড়ির বেড়াজালে। ধর্ম গুরুর দৌরাত্মের শিকলে। যার অবসান ঘটায় লিওন্যার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫১-১৫১৯), কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২), কেপলার (১৫৭১-১৬৩০), উইলিয়াম হারভে (১৫৭৮-১৬৫৭), আইজ্যাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) রেনেসাঁকালীন সময়ে তাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। যদিও ধর্মের প্রতি এদের বিরোধিতা ছিলো না কিন্তু বিজ্ঞানের অনেক কার্যক্রমই ধর্মের মৌলিক অনেক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও পূর্ব ধারণাকে অতিক্রম করে বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করে কবিতাকে জীবনের সাথে সমান্তরাল করতে সময়ের চাহিদা। আর মানুষের জীবনে বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক তুলে ধরে কবিতাকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে অগ্রজ কবিতা থেকে। এটি যুগের প্রয়োজন। কিছু লোক সাহিত্যকেও এমন পিছনের দিকে টেনে সাহিত্যের গতি মন্থর করার ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু কালের প্রয়োজনে যে সত্যকে গ্রহণ করতে হবে তা সকলের সম্মিলিত চেষ্টাতেই সফল হবে। এতে বাধা বিপত্তি থাকবেই। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, কোনো ভালো কাজের সূচনা অল্প লোকের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। ভাঙ্গনের এই যে খেলা সাহিত্যের পিছনের  ইতিহাসেও তা বাদ যায়নি। সাহিত্যেও এমন একটা অন্ধকার সময় বিরাজিত ছিলো। ১৭৬১-১৮৬০ একশত বছরের নীরব প্রস্তুতির সময়ের পুরোহিত ছিলেন কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত। বাংলা সাহিত্য ভারতীয় পুরাণ থেকে উপাত্ত নিয়ে যাত্রা শুরু। এ সময়কে সাহিত্যের সন্ধিযুগের কাল বলা হয়। ইংরেজী সাহিত্যে ১৭৯৮-১৮৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে রোমান্টিক যুগ বলা হয়। ইংরেজী সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের সর্বশেষ কবি জন কীটস (১৭৯৫-১৮২১)। তারপর অস্তিত্ববাদ, ফিউচারিজম ও সুররিয়ালিজম শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এক মোক্ষম সময়। ক্রমে রোমান্টিকসিজম বিরোধ কিছুটা ফিকে হতে শুরু করেছে। ১৮৯৮ সালে স্পেনীয় যুদ্ধের পর স্পেন সাহিত্যের স্বর্ণযুগে দারিয়োর প্রভাব স্পেন-আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। চিলির আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রেম ও বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) লাতিন আমেরিকায় কবিতায় প্রেমের ভাষা পুনরুদ্ধার করেন। একই সময়ে কবিতায় আধুনিকতা আনেন কবি শার্ল বোদলেয়ার, ফ্রেদরিক গার্সিয়া লোরকার, কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ (১৮৮১-১৯৫৮), স্পেনের যুদ্ধ সমাজ তন্ত্র বা কমিউনিস্টদের কাছে ছিল বিশেষ গুরুত্বের। ফ্যসিবাদীদের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের যুদ্ধ ভিন্ন এক গুরুত্ব বহন করেছিল। ইংরেজী সাহিত্যের কবিতার আধুনিক ঝড় উঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে এবং চূড়ান্ত ভাবে আধুনিক রূপ পায় বিশের দশকে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এর ঢেউ লাগে ত্রিশের দশকে। বিশ্বব্যাপী আজকের অবস্থায় এসে কবিতা হবে বিজ্ঞানমুখী। বিশ্বের আধুনিক কবিদের তালিকায় যে নাম গুলো বার বার ধ্বনিত হয়- হেনরি মাতিস, জন মিল্টন, পাবলো পিকাসো, জর্জ ব্রাক, পাবলো নেহরু দা, কোলরিজ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শার্ল বোদলেয়ার, এডগার এলান পো প্রমুখ। সাহিত্যের ক্ষেত্রে- উইলিয়াম নেপোলিয়ন, আন্দেই বেলী, ইভান কেংকার, জোসেফ কনরাড, টি.এস.ইলিয়ট, ইএ ফষ্টার, এইচ-ডি, আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে, ভিক্টর হুগো, ম্যাক্স জ্যাকব, জেমস জয়েস, ফ্রান্স কাফকা, ডি.এইচ.লরেন্স, ইউজিন ওনিল, ফার্নান্দো পিসোয়া, লুইজি পিরানদেলো, এজরা পাউন্ড, ডরোথি রিচার্ডসন, রাইনের মারিয়া রিলকে, গার্ট্রুড স্টেইন, ওয়ারলেস স্টিভেনস, ভার্জেনিয়া উলফ, ডব্লিউ বি. ইয়েটস প্রমুখের নাম।
বিজ্ঞানের একই বিষয়কে প্রত্যেক কবি তার চিন্তার জগতে ভিন্নতা এনে কবিতায় উপস্থাপন করবে। এতে আবেগ, রস, অনুপ্রাস, যমক, বক্রোক্তি, অলংকার, উপমা ভিন্ন  মাত্রায় ভিন্ন রূপ পাবে। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিদিনই বিজ্ঞান অতিক্রম করে যাচ্ছে। তাই বিজ্ঞান যে পর্যন্ত অতিক্রম করেছে সে পর্যন্ত কবিতায় সন্নিবেশিত হয়েছে বা হবে। যা এখনো অজানা তার জন্য স্রষ্টার সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কবিতায় নতুন কিছু সৃষ্টি না হলে বিষয়ভিত্তিক একই কবিতা লিখে লাভ কী ?  পাঠক তো আনন্দ রূপ, রস থেকে বঞ্চিত হবে। তাহলে লিখলে কাদের প্রয়োজনে লিখবে। সমাজের মানুষকে যদি ছুঁয়ে না যায় কবিতা। ধর্মহীনেরও একটা ধর্ম আছে। আর ধর্ম যার নেই সে তো জেনে শুনেই আচারিক ধর্ম ত্যাগ করে। আর ব্যাকরণহীনেরও একটা ব্যকরণ আছে। যার ব্যকরণ নেই তিনি জেনে শুনেই ব্যকরণহীন হয়েছেন। কবি নজরুল তার ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘মানুষকে কবজায় আনিবার জন্য তাহার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁওয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া না তুলিতে পারিলে তাহা দ্বারা কোনো কাজ করানো যায় না, বিশেষ করে আমাদের এই ভাব পাগলা দেশে। আবার বলেছেন-ভাবের দাস হইও না, ভাবকে তোমার দাস করিয়া লও। কর্মে শক্তি আনিবার জন্য ভাব-সাধনা কর। স্পিরিট বা আত্মার শক্তিকে জাগাইয়া তোল, কিন্তু তাই বলিয়া কর্মকে হারাইও না। ...মনে রাখিও তোমার ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে অন্যের প্ররোচনায় নষ্ট করিতে তোমার কোনো অধিকার নাই। তাহা পাপ-মহাপাপ।’ মনকে স্থির করে কাজ করতে হবে। মানুষের প্রতিটি জৈবিক কাজ কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন ইত্যাদির পরমাণু পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার আলোকে এবং পরমাণু বিজ্ঞানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স মনের সাথে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত। আর মন থেকে শুরু করে মনেই ফিরতে হয়। নতুন কিছু করার উদ্দেশ্যে যেভাবে পাঁচতারকা কাজ করেছে; বিজ্ঞান কবিতার আন্দোলনও তেমনি একটি চেতনা এই একবিংশ সাহিত্য বিশ্বে। এ আন্দোলন এখন সময়ের দাবী। ভাল লিখিয়েদের এগিয়ে আসতে হবে। তবেই সফল হবে নতুন কিছু করার এই বিজ্ঞান কবিতার চেতনা।  


(রীনা তালুকদার-বিজ্ঞান কবিতার ভাবনা -প্রবন্ধ গ্রন্থ থেকে)