----------------
            কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’র কবিতা সম্পর্কে বলা হয় তা’ সাধারণ পাঠকের জন্যে নয় – এই লেখা যেন শুধু কবিদের জন্যেই লেখা, তাই তাঁকে কবিদের কবি বলেও অনেকে আখ্যায়িত করেছেন । তাঁর অসম্ভব রকমের মেধা, ধীশক্তি ও অতি উচ্চমার্গের ভাবনার প্রত্যয় তাঁকে সাহিত্যজগতে এই অবস্থানে নিয়ে গেছে ।
              তুলসী লাহিড়ী লিখেছেন, ‘বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অবক্ষয়, নৈরাশ্য, মূল্যবোধের সঙ্কট, প্রেমহীন, ধর্মহীন, নিরাপত্তাহীন অস্তিত্বের মর্মযাতনা এলিয়টের কাব্য কবিতায় বিপন্নতা ও নাস্তির যে ছায়াপাত ঘটিয়েছিল সুধীন্দ্রনাথের কাব্যেও তা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কাব্যে নৈরাশ্য-হতাশা এবং বিচ্ছিন্নতার যে ছবি অঙ্কিত হয়েছে, তা সুধীন্দ্রনাথের কবিভাবনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল’। কুন্তল চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন : ‘ওয়েস্টল্যান্ড কাব্যে রূপকের অন্তরালে শতাব্দীর অবক্ষয়ী ও বিপর্যস্ত রূপের যে চেহারাটি এলিয়ট চিত্রিত করেছিলেন, বন্ধ্যাত্ব, মরুময়তা, শূন্যতা, নাগরিক জীবনের নৈরাশ্য ও বেদনার যে আর্তি তাতে অভিব্যক্ত হয়েছিল, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় সেই এলিয়টের মন ও মননের রূপ নানাভাবে জড়িয়ে আছে। বস্তুতপক্ষে, সুধীন্দ্রনাথের রচনায় যে মরু-ধূসরতা, হতাশা ও নাস্তির বলয়গ্রাস আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তাতে এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ডের বন্ধ্যাভূমির রিক্ততা বিশেষ আভাস বিস্তার করেছে বলে মনে হয়েছে।’
            তবে কবি সুধীন্দ্রনাথের কবিমানসে সবচেয়ে বেশি রেখাপাত করেছে ফরাসি কবি স্টেফান মালার্মের প্রভাব। তিনি বলেছেন: ‘মালার্মে প্রবর্তিত কাব্যাদর্শই আমার অন্বিষ্ট’। মালার্মের অনিকেত মনোভাব এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সুধীন্দ্রনাথকে বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণায় জর্জরিত করেছিল। শুধু তাই নয়, কবিতার ভাবদ্যোতনা, শব্দচয়ন এবং চিত্রকল্প নির্মাণে সুধীন্দ্রনাথ যে বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন মালার্মের কবিতার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান’।

          দীপ্তি ত্রিপাঠী জানাচ্ছেন : ‘মালার্মের নেতিবাদী জীবনদর্শনও সুধীন্দ্রনাথের কাব্যকে প্রভাবিত করেছে। মালার্মের কবিতায় যেমন বারংবার গোরস্থান কবর মৃত্যু ভাঙা জাহাজ অবসাদ নিখিল নাস্তি কথাগুলোর প্রয়োগ দেখা যায় এবং তারা বিষাদ তিক্ততা বহন করে, সুধীন্দ্রনাথেও তেমনি দেখা যায় মরুভূমি নরক শব প্রাবরণী পিশাচ শটিত প্রভৃতি শব্দগুলির । মালার্মের ‘কুসুম’ কবিতায় বৎসরের তুষারপাতের সঙ্গে যুক্ত বিচ্ছিন্ন যে কবি-আত্মার শূন্যতাবোধ-বেদনাবোধ আছে, সুধীনদত্তের ‘কুক্কুট’ কবিতাটিতেও একই আরতি আছে। বলা যায় মালার্মে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত উভয়েই জীবনের বেদীমূলে বিষাদ ও নিষ্ক্রিয়ের পুঞ্জীভূত অঞ্জলি প্রদান করেছেন। বস্তুত, মালার্মের কবিতার প্রভাব সুধীন্দ্রনাথের জীবনে নেতিবাদী ভাবনা জাগ্রত করেছিল। হাইনরিখ হাইনে,ভালেরি, প্রুস্তের কবিতাও সুধীন্দ্রনাথের চেতনাজগতে নৈরাশ্য রূপায়ণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এসব কবি ফ্যাসিবাদী শক্তির হিংস্রতা ও নাৎসীবাদের বর্বরতা এবং বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা দেখে জীবনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হাইনে দেখেছিলেন পৃথিবীতে জীবনের সদর্থক (বিষঃ) কিছু নেই, সুধীন্দ্রনাথও দেখেছেন: ‘বিশ্বজগৎ হিম কুয়াশায় ঢাকা’। নৈরাশ্যভাবনা সুধীন্দ্রনাথ কতকটা পেয়েছিলেন ভালেরির কাব্য পাঠ করে’।

         হৈমন্তী কবিতাটি তাঁর লেখা একটি খুব জনপ্রিয় কবিতা যা তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘অর্কেষ্টা’য়  স্থান পেয়েছে ।কবিতা আসরের কবি ও পাঠকদের জন্যে এই কবিতাটি তুলে দিলাম। এখানেও খেয়াল করলে দেখা যাবে তাঁর সেই চিরায়ত নৈরাশ্যের প্রগাঢ় প্রতিচ্ছায়া ।
----------------------
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’র কবিতা
হৈমন্তী
-----------------------
বৈদেহী বিচিত্র আজি সংকুচিত শিশিরসন্ধ্যায়
প্রচারিল আচম্বিতে অধরার অহেতু আকূতি :
অস্তগামী সবিতার মেঘমুক্ত মাঙ্গলিক দ্যুতি
অনিত্যের দায়ভাগ রেখে গেল রজনীগন্ধায়।।
ধূমায়িত রিক্ত মাঠ, গিরিতট হেমন্তলোহিত,
তরুণতরুণীশূন্য বনবীথি চ্যুত পত্রে ঢাকা,
শৈবালিত স্তব্ধ হ্রদ,নিশাক্রান্ত বিষন্ন বলাকা
ম্লান চেতনারে মোর অকস্মাৎ করেছে মোহিত ।।
নীরব, নশ্বর যারা, অবজ্ঞেয়, অকিঞ্চন যত,
রুচির মায়ায় যেন বিকশিত তাদের মহিমা ;
আমার সঙ্কীর্ণ আত্মা, লঙ্ঘি আজ দর্শনের সীমা,
ছুটেছে দক্ষিনাপথে যাযাবর বিহঙ্গের মতো ।।
সহসা বিস্ময়মৌন উচ্চকন্ঠ বিতর্ক, বিচার,
প্রাণের প্রত্যেক ছিদ্রে পরিপূর্ণ বাঁশরীর সুর :
জানি মুগ্ধ মুহূর্তের অবশেষ নৈরাশে নিষ্ঠুর ;
তবু জীবনের জয় ভাষা মাগে অধরে আমার ।।
যারা ছিল একদিন ;কথা দিয়ে,চ’লে গেছে যারা ;
যাদের আগমবার্তা মিছে ব’লে বুঝেছি নিশ্চয় ;
স্বয়ম্ভূ সংগীতে আজ তাদের চপল পরিচয়
আকস্মিক দুরাশায় থেকে থেকে করিবে ইশারা ।।
ফুটিবে গীতায় মোর দুঃস্থ হাসি, সুখের ক্রন্দন,
দৈনিক দীনতা-দুষ্ট বাঁচিবার উল্লাস কেবল,
নিমেষের আত্মবোধ, নিমেষের অধৈর্য অবল,
অখণ্ড নির্বাণ-ভরা রমণীর তড়িৎ চুম্বন ।।
মোদের ক্ষণিক প্রেম স্থান পাবে ক্ষণিকের গানে,
স্থান পাবে, হে ক্ষণিকা, শ্লথনীবি যৌবন তোমার :
বক্ষের যুগল স্বর্গে ক্ষণতরে দিলে অধিকার ;
আজি আর ফিরিব না শাশ্বতের নিষ্ফল সন্ধানে ।।

-----------------/০/---------------