ইংরেজী fashion ও style শব্দটিকে আমরা অনেকেই গুলিয়ে ফেলি। fashion মূলত কোন বিশেষ সময়ের বিশেষ ঝোঁক বা প্রবনতাকে বুঝায়। এটি অপেক্ষাকৃত ক্ষণস্থায়ী এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে style বলতে একটি নির্দিষ্ট গুণাগুণ সম্পন্ন বিশেষ ধারাকে বুঝায় যা দ্বারা ব্যাক্তি বা গুষ্ঠির সাতন্ত্র প্রকাশ পায়।


আমার আলোচনার বিষয় বস্তু  style শব্দটি নিয়ে। এই ‘style’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘শৈলী’। আবার কোন কোন ভাষাবিজ্ঞানীর মতে ‘রীতি’। কোনটি সঠিক আমি সেই বিতর্কে না গিয়ে ‘শৈলী’ শব্দটি বেছে নিলাম শুধু এর ভাষাগত কাব্যিক ব্যঞ্জনা বেশি মনে হয়েছে বলে। শৈলী নিয়ে নিয়োজিত যে বিজ্ঞান তাই মুলত স্টাইলিস্‌টিকস্‌ বা শৈলী বিজ্ঞান। শিল্প সংস্কৃতির সমস্ত ধারাতেই এই বিজ্ঞানের প্রয়োগ এবং ব্যাপ্তি। খৃষ্টপূর্ব যুগের প্রবাদ পুরুষ এরিস্টটল বলেছিলেন শৈলী হচ্ছে এমন গুণ যা সমস্ত প্রকাশের মধ্যে থাকে।
মানুষ সৃজনশীল এবং বৈচিত্রপ্রিয় প্রাণী। তাই প্রতিটি মানুষের প্রকাশের ভাষায় থাকে এক ধরনের স্বাতন্ত্র। একজন লেখক বা কবির ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন লেখা হলেও কোথাও একটা নিজস্বতা থেকে যায় যা দিয়ে তার প্রকাশভংগীকে চিহ্নিত করা যায়। আবার একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন রচয়িতার লেখা ভিন্ন হয় তাদের নিজস্ব প্রকাশভংগীর কারনেই।তাই বলা যায় প্রায় সব রচয়িতারই নিজস্ব একটা ভাষা নির্ভর পরিচয় আছে যা তার বক্তব্য বা লেখাতে পরিস্ফুট হয়। মুলত প্রত্যেকের অন্তর্নিহিত ব্যক্তিত্বের ছাপ তার লিখনীতে থেকে যায়। যে কোন লেখক বা কবির এই নিজস্বতাই শৈলীবিজ্ঞানের পরিভাষায় style বা শৈলী নামে পরিচিত।


কে কত বৈচিত্রময় এবং ভিন্ন শৈলী গঠন করতে পারেন মূলত তা দিয়েই একজন কবির প্রতিভা বিচার হয়ে থাকে। যারা খুব শক্তিমান কবি বা লেখক তাদের লেখা পড়া মাত্রই আমরা বলে দিতে পারি এটা অমুকের লেখা। রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীত নিজের গন্ডিতে বৈচিত্রময় হওয়া সত্বেও আমরা  শুনামাত্রই অবলীলায় বলে দিতে পারি কোনটা রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীত।এর পেছনে রয়েছে দুই শক্তিমান কবির নিজস্ব শৈলী। এই প্রজন্মের প্রাবাদতুল্য সাহিত্যিক ও নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পিছনেও রয়েছে নিজস্ব শৈলী তৈরীতে তার অনবদ্য পারদর্শিতা। আবার লক্ষ্য করলে দেখবেন শুধু ভাল কথা আর সুর নয় একটা গানকে অন্যমাত্রা দিতে পারেন নিজস্ব গায়কি সম্পন্ন প্রতিভাবান কোন গায়ক বা গায়িকা।


তাই বলা যায় কবিতা সৃষ্টি বা কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য নিজস্ব শৈলী নির্মানের কোন বিকল্প নেই। আমাদের প্রাচ্যদেশের প্রাচীন পন্ডিতরাও শৈলী বিষয়ে সম্যক অবগত এবং সচেতন ছিলেন। তারা বলতেন-রীতি আত্না কাব্য রস। অর্থাৎ রীতি বা শৈলী হল কাব্যের আত্না। প্রসংগত বলা বাহুল্য হবে যে কাব্যে ছন্দ আর রীতি এক বিষয় নয়। ছন্দ হচ্ছে কবিতার স্ট্রাকচার বা কাঠামো। অন্যদিকে শৈলী হচ্ছে একটি কবিতার নিজস্ব প্রকাশ ভংগী। অনেকটা যেমন কোন ইমারত নির্মানে কলাম আর বিম হচ্ছে তার কাঠামো। কিন্তু সেই কলাম-বিম ঠিক রেখেই এক এক স্থপতি এক এক রকম স্থাপনা ডিজাইন করেন।


শৈলী কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবিতায় শৈলী আসতে পারে বিষয় নির্বাচন, ভাষার প্রকরণ, ছন্দের সিলেকশন, শব্দের ব্যবহার বা কাব্যের টেকনিকে। নিজস্ব শৈলী তৈরীর ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার কবিতার যে সকল বৈশিষ্ট না থাকলে তাকে কবিতাই বলা যাবে না এমন কোন বিষয়ের অবতারনা করে সফল হওয়া যাবে না। উদাহরন স্বরূপ বলতে পারি, আপনি প্রচলিত গান বা জীবনমুখী গান যাই লিখুন না কেন আপনাকে অবশ্যই সুর আর তাল মাথায় রেখে লিখতে হবে। ঠিক একইভাবে কবিতায় যত এক্সপেরিমেন্টই করুন না কেন ব্যকরণগত মুল কিছু বিষয় মাথায় রেখে তা করতে হবে।


আসরের কাউকে কাউকে এমন লেখা লিখতে দেখি যা শুধু কবিতার মত করে লেখা। কবিতার বিচার্য বিষয়গুলি সেখানে খুবই উপেক্ষিত যা কাম্য নয়।যা ইচ্ছা তাই লেখার স্বাধীনতা মানেই কিন্তু নিজস্বতা নয়। আপনি চাইলেই যেমন সংগীতের সাত সুরের বাইরে যেতে পারবেন না তেমনি কবিতার ক্ষেত্রেও উচ্চারণগত বিধিমালার বাইরে যাবার সুযোগ নেই। আপনি আমি যা পারি তা হলো এই তাল,ছন্দ,‌লয়, ভাব এবং ভাষা নিয়ে খেলা করতে। শব্দ নিয়ে খেলা করতে। অনেকে জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য ভাবেন আধুনিক কবিরা ছন্দ মেনে লিখেন না।জীবনানন্দ দাশ মুলত ছন্দ না মেনে লিখেছেন তা নয় তিনি ছন্দ ভেঙ্গে লিখেছেন।যাই হোক কাব্যশৈলীর আর একটি লক্ষ্যযোগ্য দিক হলো – কালের সাথে সাথে এর সামগ্রিক রূপ পালটে যাওয়া। মানে নিজস্ব লেখার বৈচিত্র নিয়েও সময়ের দাবীর প্রতি লক্ষ্য রেখে কবিরা কাব্যশৈলী নির্মান করেন। যে কারনে রবীন্দ্রযুগের কোন কবিতার সাথে এখনকার কোন কবিতার মিল না হওয়াই আবশ্যক।


পরিশেষে বলতে চাই কবিতা বা গল্প বা অন্য কিছু যাই লিখি না কেন আমাদের ভাবতে হবে নিজস্ব রীতি বা শৈলী তৈরীর কথা।পূর্বসুরীদের প্রভাব এড়িয়ে সমসাময়িকদের নিজস্বতাকে অতিক্রম করে যুগোপযুগী এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠমন্ডিত লেখার ধারা তৈরী করতে পারাই আমাদের জন্য প্রয়োজন। যদিও তা মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় কেউ সময়কে জয় করতে চাইলে নিজস্ব কাব্যশৈলী তৈরীর কোন বিকল্প নেই।