রাস্তার মোড়ের তালগাছ তিনটি হাতের দক্ষিণে রেখে পৃথিবীর বুকের উপর
ঝুলে আছে যে প্রশস্ত মাঠ। তারপরে যে ছাড়া বাড়িটি সেটি সগন শেখের।
আজ থেকে দুই-তিন বছর আগের ঋণের দায়ে, কোন এক রাতে জীবনকে ভালোবেসে
পালিয়েছে জীবিকার খোঁজে! সেই থেকে একা একখানা বাড়ি শূন্যতা নিয়ে বুকে দিচ্ছে পাড়ি সময়ের নদী।
লোকমুখে ছাড়া বাড়ি – শোক শূণ্যতা অথচ বাড়িটির হৃদয় জুড়ে সগন পরিবারে স্মৃতি। কথা নেই বোবা ভাষা
ভনভন বোলতা – গুল্মের-হিজলের বেড়াতে ঘিরে ঘিরে ঘর হলো সমস্ত বাড়িটি। বাড়ি গেল ঘর হয়ে তাই যেন
মাস্টারবেড ঘরটি।
একদিন দুপুরে ছোমেদের মেয়ে গেল ছাগল চড়াতে হঠাৎ একজোড়া ল্যংটা ভূত দৌড়ে ঢুকল সগন শেখের বাড়ি
তার ঠিক দুই দিন পর গ্রামের বুদ্ধিচাচায় যাচ্ছিল ঐ বাড়ির পাশ দিয়ে, একটা সাদাভূত তারে ঠেলে ফেলে দিল
রাস্তার ঢালে। সেদিন থেকে ভয়ে যাচ্ছে না তো কেউ ঐ দিকে। এবং রটে গেল কান্ডখানা পাড়ায় পাড়ায়
আর নাম হলো – ‘সগইন্যার ভূতের বাড়ি!’
কিছুদিন পর – একদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো – হারিচের ষোড়শী মেয়ে সেজুতি
ফিরছে না ঘর। মা তার খুঁজে খুঁজে একাকার – গ্রামে তখন কুশ্রাব্য গল্পের বাতাস! ঠিক তখন কয়েক জন মিলে
ঢুকে পড়ল সগন শেখের বাড়ির ভিতর – গা ছমছম ভয়ে – আমিও ছিলাম দলে – গল্প থমকে গেল বাতাস উঠল কেঁদে।
সেজুতির লজ্জা নাই চোখ খোলা দায় – রক্তমাখা ঊরু, চোখ খোলা, পলকহীন – আমরা গিয়েছি দাঁড়িয়ে।
তন্দ্রা কেটে গেলে ছুটে যাই কাছে, দেখি নিথর দেহখানা, শরীরে নখের আঁচড়, শুকানো বীর্যের আঁকিবুকি!
ভাষা ভুলে শোকবুকে ফিরে আসি, পিছনে ঘৃর্ণিত সগন শেখের বাড়ি। আর কোন দিন যাই নি তাকাই নি ঐ বাড়ি।
হৃদয়ের ইতিহাসে ঘৃর্ণার ঘর, ঘৃর্ণিত বাড়ি; সগন শেখের বাড়ি। বিশ্বাস করুন, কষ্ট আর ঘৃর্ণা এক হলে মানুষ কখনো ফিরে না সেখানে।।
আজ গ্রাম ছেড়ে আমি রাজধানী শহরে। প্রযুক্তির নাচে যোগাযোগের পৃথিবী হয়েছে গ্রাম – সমস্ত দুনিয়া
এখন একখানা আস্তগ্রাম, দেশগুলো পাড়া – সবাই জেনে যাই সবকিছু; সকলকে। অবাক লাগে – আশ্চর্য!
চারপাশে হাজার হাজার সগন শেখের বাড়ি – তাকাতে পারছি না, ঘৃর্ণায়-লজ্জায় আর ভয়ে। আমার দম আটকে যাচ্ছে, যন্ত্রণায় ফেঁটে যাচ্ছে বুকেব কমল ছাতি। আহ! সমস্ত পৃথিবী আজ সগন শেখের বাড়ি।


                                  - (জোছনার কারাগারে)