আগে আদিম মানুষরা ঈশারায় কথা বলতেন অর্থাৎ ভাবপ্রকাশ করতেন। তখন ভাষার আবিষ্কার হয়নি। আবার আমরা দেখি যে বাচ্চারা কথা না বললেও মা ঠিক বুঝতে পারে সন্তানের ভাব।


শব্দ বা ভাষা নয়, ভাবে আমাদের মন দিতে হবে। আজও কথা না বলেও বডি ল‍্যঙ্গুয়েজ এবং ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দ্বারা আমরা সবসময় কমিউনিকেট করে চলি। তাই শব্দ ছাড়াও সাহিত্য সম্ভব― প্রকৃতি সবসময় গভীর ও মিষ্টি সঙ্গীত গেয়ে চলেছে― আমরা সমসময় তা ধরতে পারি না।  


সাহিত‍্যকে কাগজ-কলম বা টাইপিং কিংবা মুখের আবৃত্তি বা গল্প হতে হবে― এমন দিব‍্যি কে দিয়েছে? যারা বোবা-অন্ধ-কালা তারা কি সাহিত্যের রসাস্বাদনের অধিকারী নন? আবেগানুভূতি আর জ্ঞানের অপূর্ব মিশ্রণই সাহিত্য। ভাষা অবশ্যই ভাবের বাহন। একদম সত্যি কথা। কিন্তু ভাবের কেবলমাত্র একটিই বাহন কি? আগেকার দিনের চ‍্যার্লি চ‍্যাপলিলেন সিনেমা এবং এখনকার মিস্টার বিনের কার্টুন― এগুলোও সাহিত্য― এখানে কথার দরকার হয়নি। এখনকার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বা সাধারণ বাদ‍্য যন্ত্র বাজানো তথা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকেও কিন্তু কোনো শব্দ বা ভাষা নেই― তবুও তা আমাদের আনন্দিত ও একাগ্র করে। ইউটিউবে বা ইন্টারনেটে সার্চ করলেই sign language poetry বা deaf poetry দেখতে পাওয়া যাবে― শব্দ ছাড়া ঈশারার মাধ‍্যমে প্রকাশিত কবিতা।


প্রতিটি আবেগ বা অনুভূতি দিয়ে যেমন এক একটি সাহিত্য লেখা যায়, তেমনি প্রতিটি আবেগ বা অনুভূতিও এক একটি বা অনেকগুলি সাহিত্য। আমরা যে দুশ্চিন্তা করি, খুশি হই বা কাঁদি― এগুলোর প্রতিটিই সাহিত্য― হয়তো অনেক উচ্চমাত্রার বা গোছানো নয়। তাই আমরা ধরতে পারি না কারণ আমরা ততবেশি ক্রিয়েটিভ নই। এগুলোকেই কাজে লাগিয়ে এগুলোর ছাঁচে ভাষাকে ফেলে উচ্চমানের বা সর্বোচ্চ স্তরের বা উৎকৃষ্ট সাহিত্য লেখা হয়। সুতরাং ভাবটাই সাহিত্য, ভাষাটা এর একভাবে প্রকাশ মাত্র। উদাহরণ স্বরূপ― কোনো কবি প্রকৃতির অপরূরা রূপকে দেখে বিভোর হয়ে কিছু লিখলেন― তিনি যা লিখলেন তা প্রকৃতির মধ্যে অলরেডি ছিল― তিনি সেই ভাবটাকে ভাষার মাধ‍্যমে প্রকাশ করে অন‍্যকে সেই সুন্দর আনন্দাস্বাদনের সুযোগ করে দিলেন মাত্র। সাহিত্য হল চিন্তা বা ভাবনার সুসংবদ্ধ কথ‍্য বা লিখিত রূপ। সুসজ্জিত বা সুসংবদ্ধ করাটা সাহিত্য নয়, এটার নাম ক্রিয়েটিভিটি। যাকে সুসংবদ্ধ করা হয় সেই ভাবনা বা চিন্তা হল আবেগের ফল, আবেগ হল ভাবের(wave of understanding) বিস্তৃত রূপ এবং ভাব হল experience বা অনুভূতির ফল। সুতরাং ভাবটাই ভাষার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ ভাবটাই সাহিত্য। ভাবটাকে ভাষা ছাড়াও অন‍্য ভাবে প্রকাশ করা যায়― যেমন নৃত্য। নৃত্য গান নামক সাহিত্যের ঈশারা রূপ। অনেক সময় গান ছাড়াও আমরা আনন্দে নেচে উঠি, এক্ষেত্রে ভাব অর্থাৎ সাহিত্য ভাষা ছাড়াই সরাসরি নৃত‍্যরূপে প্রকাশিত। তাই বলা যায় we don't create literature, rather we discover literature. এখানে মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে সাহিত্যের ব‍্যাখা করা হল।


উপসংহারে এটাই বলা যায়, সাহিত‍্যকে ভাষা বা সুসজ্জিত শব্দগুচ্ছ হিসেবে দেখলে সাহিত্য(এখানে ভাষা) ও ভাব আলাদা এবং সাহিত্য ভাবের servant. সাহিত‍্যকে ভাষা(সুসজ্জিত শব্দগুচ্ছ) ও অন্য রূপে যেমন ঈশারা-নৃত্য ইত্যাদি রূপে দেখলে সাহিত্য হল ভাবের অংশ যে ভাব বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত এবং সর্বোচ্চ স্তরে(গভীরতম প্রদেশে) দেখলে দেখা যায় যা ভাব তাই সাহিত্য― ভাব ছাড়া কিছুই নেই।