"...আছে কোন এমন ভাষা/এমন দুঃখ ক্লান্তিনাশা..." অথচ, আজ অবস্থা এরকম যে যদি আপনি শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন তবে আপনার পাশের বাঙালি ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলাটি তা বুঝতে পারবেন না। আজ মাঝারি ও বড়ো শহরগুলোর "আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা"-র অবস্থা! তবে গ্রামবাংলার মানুষজন বাংলাতেই কথা বলেন।


ভাষার ক্ষেত্রে গভীরতম সত্যটা হল, ভাষার ব‍্যবহার অর্থপূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য। ভাবপ্রকাশ যে বাংলাতেই করতে হবে এমন কোনো দিব‍্যি দেওয়া নেই। থাকলে আজকের এই এত সুন্দর বাংলাভাষা  পেতামও না, আমাদের পূর্বপুরুষদের মাতৃভাষা খটমট সংস্কৃত বা আদিম হিজিবিজি বাংলা বা খুব জোর বাংলা সাধুভাষাতেই আমরা আটকে থাকতাম। সময়ের সাথে ভাষা বা মাতৃভাষা বদলাবে, এই বদলানো আমরা মানি বা নাই মানি চলতেই থাকবে। আর আমরা সবাই জানি যে, যে ভাষা অন‍্য ভাষার শব্দাবলী বেশি গ্রহণ করতে পারে সেই ভাষাই বেশি সমৃদ্ধ ও সতেজ! কিন্তু আমরা বাঙালীরা বিতর্ক সভায় আবেগের বশে এটা মানতে চাই না।


পেশার খাতিরে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় যায়, এটা ভাষার বিবর্তনের অন‍্যতম কারণ। আমি বাঙালি মানে আমি হিন্দিভাষী বা ইংরেজিভাষীর সাথে বাংলাতে কথা বলবো এমনটাতো হতে পারে না, তাহলে ব‍্যবসার ক্ষতি হবে বা চাকরি যাবে। আর আমার কথা(পড়ুন ভাষা) যদি কেউ বুঝতেই না পারলো তবে কথা বলাটা নিরর্থক। আর একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে, মানুষের প্রথম তিনটি দরকারি জিনিস হল, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান; ভাষা রক্ষা করা নয়। যে রাজ‍্যের(পশ্চিমবঙ্গের) প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ মানুষের মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকার নীচে তারা নিজের পরিবারের অন্ন যোগাবে নাকি রবিঠাকুরের গান গাইবে? বাংলাদেশের অবস্থা এর থেকে ভালো কিন্তু তারাও গরীব দেশ, তবে যেহেতু ওইদেশের ভাষা বাংলাই তাই অন্য ভাষায় তাদের কথা বলতে হয়না। নইলে জীবন ও জীবিকার দায়ে তাদেরকেও হিন্দি বা অন্য কোনো ভাষা বলতে হতো।


এবার পড়াশোনায় আসা যাক। যদি বাংলা মাধ্যমের স্কুলে ভালো পড়াশোনা না হয় তবে আমি আমার সন্তানের ভবিষ্যত কেন অন্ধকারে ফেলব? বাস্তবের দাম আবেগের চেয়ে বেশি। কবি বলেছেন, "রূঢ় বাস্তবের দিতে হবে খাঁটি দাম!" আপনার সন্তানের ভবিষ্যত কি আপনি আবেগে ভাসা কয়েকজন বাঙালির হাতে ছেড়ে দিতে চান?


দেশ যেমন সবার কিন্তু দেশটাকে রক্ষার দায়িত্ব সৈনিকদের হাতে ন‍্যস্ত। তেমনি ভাষাটাও সবার আর ভাষার সৈনিক ওই ভাষায় চালিত টিভি, রেডিও আর ওই ভাষার সাহিত্যিকদের হাতে। সাহিত্যিকের চেয়ে টিভি চ্যানেল ও রেডিও চ‍্যানেল বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী সৈনিক আজকের যুগে। সাহিত্য ক'জন পড়ে? আর টিভি ক'জন দেখে? এটা থেকেই এর প্রমাণ হয়। তার ওপর ইউটিউব আর ফেসবুকের খিঁচুড়ি ভাষা খুব দ্রুতই প্রভাব বিস্তার করছে আজকাল।


তবে কি বাংলা ভাষা মরে যাবে? উত্তরটা "হ‍্যাঁ" যদি...


১/ যদি আপনি চান সব বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বাংলা জানা ও বাংলায় দক্ষ বাঙালি হোক।  


২/ যদি আপনি চান সবাই পরিবারের অন্নের কথা না ভেবে ভাষার কথা ভাবুক।


৩/ যদি আপনি চান পিতামাতা সন্তানদের ইংরেজি মাধ‍্যম স্কুলে না পড়াক।


৪/ আর যদি আপনি চান বাংলা ভাষা অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করা বন্ধ করুক। তাহলে সংস্কৃতের মতো বাংলার অবস্থা হবে।


যদি বাঙালিরা এগুলো চান তাহলে জেনে রাখুন "বাংলা" বাঁচবে না, বাঁচতে পারে না। এই জায়গাটাই আমাদের বুঝতে হবে। ওপরের যুক্তিগুলো বাংলা ভাষার শত্রু নয়, বরং ভাষাটাকে গতিশীল রাখতে সাহায্য করে ও ভাষাটাকে দিশা দেয়। কোনো নদীর লক্ষ্য সাগর হওয়া উচিত, সোজা পথে চলা নয়। বাংলা নিয়ে ভাবার সময় এই কথাটা অবশ্যই আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এগোলোকে এড়িয়ে চলতে চাইলে বা এগুলোকে শত্রু ভাবলে ভাষাটাকে রক্ষা করার পথে ভুল পথে চালিত হতে হয়। এড়িয়ে চলা নয় এগুলোর সাহায্য নিয়েই রক্ষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে।


তবে ভাষাটাকে রক্ষা করা যায় কিভাবে এবং কোন সুপারম্যান তা করবেন? এ যেন "বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?" গোছের প্রশ্ন। সে যাইহোক, সরাসরি কাজের কথায় আসা যাক:


১/ যেহেতু এটা মাতৃভাষার প্রশ্ন সেহেতু পিতামাতা বিশেষত মাতাকে দায়িত্ব নিতে হবে। ছেলেমেয়েদের বাংলা মাধ্যমে নাই পড়ানো হোক, ক্ষতি নেই, যেন ছেলেমেয়েদের বাংলাটা সেখানো হয়। ইংরেজি বলতে পারলে বুদ্ধি বা সম্মান বেড়ে যায় না বরং কেবল একটা অতিরিক্ত ভাষায় ভাবপ্রকাশ করা যায় মাত্র। যাতে বাংলা বলতে, পড়তে ও লিখতে পারে সেটা তাদের দেখা উচিত। বাঙালিদের বাড়িতে বাংলায় কথা বলাই শোভা পায়।


২/ সরকারের উচিত বাংলা মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তাই ঘুস নিয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ সর্বপ্রথম বন্ধ করা আবশ্যক।


২.ক/ উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা ভাষার প্রকল্পটা যেন কেবল "হাতেলেখা শিল্প" না হয়ে যায়, এটা দেখতে হবে।


২.খ/ দু'চারটে নোটস মুখস্থ করে যেন কোনো বাংলা সাহিত্যের অনার্সের বিদ‍্যার্থী পাশ করতে না পারে এটা নিশ্চিত করতে হবে। যেন তাদের বিশ্লেষনী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও ভাষায় দক্ষতা অর্জন হয় সেটা মাথায় রাখতে হবে। সিলেবাস ও পরীক্ষা সেইমতো হবে।


৩/ বড়োবড়ো কবিদের ও সাহিত‍্যিকদের ফেসবুকে ও ইউটিউবে আসা উচিত ও লেখা প্রকাশ করা উচিত। ভাষাটাকে সুস্থ রাখতে এটা দরকার।


৪/ যদি আমরা চাই যত কম সংখ্যক সম্ভব বাঙালি হিন্দি কথা বলুক এবং যদি আমরা চাই অন‍্যান‍্য ভাষাভাষীরাও বাংলা বলুক তবে আমাদের সরকারকে রাজ‍্যে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা।


৫/ অশুদ্ধ বা ভাঙাচোরা বাংলায় বলা সকল প্রকার সকল বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। টিভি ও রেডিওর সকল অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও খবর পাঠকদের শুদ্ধ বাংলায় বলা নিশ্চিত করতে হবে। সিনেমা ও সিরিয়ালেও গল্পের প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেন বাংলা ভাষার বিকৃতি না ঘটানো হয় সেটা দেখতে হবে। গায়কদের বাংলার উচ্চারণ সঠিক হওয়া আবশ্যক।


৬/ স্কুলে, কলেজে আলোচনা সভা, বিতর্ক সভা, নিয়মিত ম‍্যাগাজিন ইত‍্যাদির ব‍্যবস্থা করতে হবে।


৭/ সব কথা বাংলায় নাই বলি, অসুবিধা নেই, কিন্তু আমরা বাঙালিরা যতটুকু বাংলা বলবো ততটুকু যেন ঠিকমতো বাংলা বলি এটা মাথায় রেখেই কথা আমাদের বলা উচিত।


এরকম আরো অনেক ব‍্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।


বাংলা ভাষাকে ভুলে কেউ থাকতে পারেন না। প্রবাসী বাঙালিরাও বাংলার চর্চা চালিয়ে যান। আশার কথা শহরের বাঙালিরাও আজ নতুন করে বাংলা ভাষাকে নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। বাংলায় খবর, সিনেমা, গান, ই-বুক ও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁরা মাতৃভাষাকে ভালোবাসেন। তারা ফেসবুকে বাংলায় কমেন্ট করতে ভালোবাসেন। তারা হোয়াটস‍্যাপে বাংলায় হাসির চুটকি বিনিময় করেন।


ভারতের "বন্দেমাতরম্" ও "জনগণমন" দুটি রাস্ট্রীয় সঙ্গীতই বাংলা ভাষায় বিরচিত। ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত একজন বাঙালি কবির রচিত, এটা খুবই গৌরবের। যে ভাষার সাহিত্য এশিয়ায় প্রথম নোবেল নিয়ে আসে সেই ভাষা মরতে পারে না। পৃথিবীতে বিভিন্ন রকম যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ভাষার জন্য কেমন একবারই যুদ্ধ হয়েছে এবং এটা আমাদের বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য। যে ভাষার জন্য দেশভাগ হতে পারে সেই ভাষা মরতে পারে না। যে ভাষার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষিত হতে পারে সেই ভাষা মরতে পারে না। যে ভাষা সাম্প্রতিক অতীতে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্বের মধুরতম ভাষার স্বীকৃতি পায় সেই ভাষা মরতে পারে না। যতদিন গ্রামবাংলার একজনও মানুষ বেঁচে থাকবেন, যতদিন বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে এবং যতদিন শহরের মানুষ বাংলা ভাষা নিয়ে তর্ক বিতর্ক করবেন ততদিন বাংলা বেঁচে থাকবে। যদি কেউ বলে এই মিষ্টি ভাষা মরে যাবে, তবে হয় সে ইচ্ছা করে ভুল বলছে কিংবা সে পাগল।