জীবন সমুদ্রে জলের কিনারে দাঁড়িয়ে আমি একা
গর্জন ভেসে আসে কান পেতে থাকি আনমনে
হঠাৎ বুকের মধ্যে অন্য এক স্রোতের চলার শব্দ শুনি
জীবন-সমুদ্র বয়ে চলে –কে আমি?
অস্পষ্ট গম্ভীর অন্য এক ধ্বনি ফিরে ফিরে আসে
বাল্যকাল ছেড়ে কখন কৈশোরে চলে এসেছিলাম মনে নেই
শক্ত করে ধরা বাবর হাত কখন ছেড়ে দিয়েছিলাম ভুলে গেছি
হঠাৎ একদিন দেখি বাবার হাতের জায়গায় আমার বন্ধুদের হাত।


তারপর ধীরে ধীরে এই শহরকে চিনে নিতে শুরু করি
শহরের বাঁধানো রাস্তা, অচেনা মানুষ ভিড়ে মাখামাখি
বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড, রাতে ফ্লাড লাইটের ঝলসানো আলো।
আমি যখন আসি তখন এই শহরের কেউ জানে না আমি এসেছি
আমার জন্য ফুল ছিটানো হয়নি, এসেছি চুপিসারে
গাড়ির জানালা দিয়ে ব্যকুল হয়ে দেখা চারদিকে বিশাল ব্যস্ততা
কে যেন চেঁচিয়ে যাচ্ছে গাবতলি-ফার্মগেট-গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী।
যেন গ্রামের মাটির ছেলেটা মাটির গন্ধ এই শহরে ঝেড়ে ফেলছি
রোদের দুপরে শালিক যেমন করে গাঁ থেকে পানি ঝেড়ে ফেলে
সেরকম আমি টাটকা স্মৃতিগুলো বিসর্জন দিয়ে দিলাম।


প্রথম প্রথম এ শহর একঘেয়ে লাগতো
মন পড়ে থাকতো ফেলে আসা স্মৃতিগুলিতে
এই শহর শুরুতে তার শিহরণ জাগানো গোপন সৌন্দর্যগুলো
আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল
গভীর রাতে চোখ ধাঁধানো আলো, সায় সায় ছুটে চলা প্রাইভেট কার
সংসদ ভবন, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, শিশু পার্ক, রমনা পার্ক
একে একে ভেসে উঠতে লাগলো ক্যালেন্ডারের ছবির মতো
তারপর ক্রমশ খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলি ছোট ছোট নরকগুলিকেও
ফার্মগেট, কাকরাইল, রমনা পার্ক, হাইকোর্ট, গুলিস্তান, মতিঝিল এইসব।


গভীর রাতের ঢাকায় চোর-ছিনতাইকারীর ভয় নিয়ে হেঁটে বেড়াই
দেখা যায় ফুটপাতে সাজানো অজস্র রাতের সংসার
ভবঘুরে, হিজড়া, দু’একটা পাগলের ইতস্তত হেঁটে বেড়ানো
কাওরান বাজারে শিশু আর কুকুরে গলায় গলায় শুয়ে থাকা
এসব দেখতে দেখতে
আমার আর এই শহরের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে গেল
জেলেরা যেমন সাগর নদীকে, তাঁতিরা যেমন তাঁতকে
সেভাবে এই শহরের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়লাম।
অথচ এক সময় দুপুর ছিল পায়রার ছায়ার পিছনে ছুটে চলা
ভোর ছিল খালুই হাতে নদীর জলে মাছ ধরতে যাওয়া
বেলা হলে বই হাতে দলবেঁধে দুরে স্কুলে হেঁটে যাওয়া
বিকাল বেলায় কখনো ক্রিকেট খেলা, নদীতে নৌকায় চড়া
অথবা অকারণে নদীর ধারে বসে থাকা।


এই শহরে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামে
আমি বিহ্বল হয়ে বৃষ্টি দেখি, আকাশের দিকে তাকাই
আমি কিসের জন্য, কার জন্য প্রতীক্ষা করি এখানে?
আসলে এসব আমার একাকীত্ব, আমার নির্জনতা
এক একদিন আমার চোখে দেখা এ শহর বড়ই অচেনা মনে হয়
গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরি
সমস্ত অন্ধকারের মধ্য থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে
‘প্রতীক্ষায় আছি’। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ব্যকুল হয়ে শোনে
কিসের প্রতীক্ষা, কার জন্য প্রতীক্ষা? উত্তর পাই না।
হয়তো এই আকাশের ওপারে অন্য এক আকাশের
মৃত্যুর পরে অন্য এক জীবনের প্রতীক্ষা।