নদী মাতৃক বাংলার নদী ঘেরা এক জনপদে জীবনের জন্ম
সাগর সীমানার থেকে খুব দূরে না হওয়ায়  
ঝড়, নোনা জলের প্লাবন, অকাল মৃত্যু, প্রতিদিনের দারিদ্রতা, অশিক্ষা,
আধুনিক জীবনের নাপাওয়া উপকরণের সাথে আজন্ম পরিচিত  
জীবনের অঙ্গ ছিল এরা, এদের ছাড়া একটাও সকাল সন্ধ্যা কিছুই হতনা।  


অনেক দূরে; নদীর প্রায় পাড় ঘেঁসে একটা পাঠশালা ছিল,
কারো কারো অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মানত পথের দূরত্ব
শীত গ্রীষ্ম ছিল বন্ধুর মত, মাটির রাস্তা ডেকে বলত আয় আয়
পৌঁছে দেব পাঠশালায়। পাঠশালায় জেনেছিল নদী নাকি ইতিহাস জানে
তার প্রতিদিনের স্রোতে যেমন মাটি ভেসে আসে যায়, তেমনি মানুষের ইতিহাস।  


বুঝত না সে, শুধু অবাক চোখে শুনত
ভাবত ঘরে ফেরার সময়, ভুলেও যেত কয়েক দিনের মধ্যে।
রোজ দেখত নদীর বয়ে চলা, কোন কোন দিন অস্ফুটে জিজ্ঞাস করত
এই নদী তুই কি জানিস রে ? বলতো এখানে মানুষ কবে এসেছিল,
তোর বুকের উপর এই চর, ছোট বড় খাল, ঘাস, ঝোপঝাড়,  
কি করে হয়েছিল, তুই কি আরো অনেক বড় ছিলি ?  নাকি এমনি ।  


নদী, অবিরাম বয়ে যাওয়ার সময়ে কুল কুল করে নিজের ভাষায়
হয়ত কিছু বোলত, বুঝতনা  নদীর ভাষা, বড়রা বুঝত,
আলোচনা করত। বারণ করত নদীর কাছে যেতে বিশেষ বিশেষ সময়ে
বলত নদী নাকি কিছুই রাখেনা, সব ফিরিয়ে দেয়, রেখে যায় নিঃশব্দে
কোথাও না কোথাও, কাছে দূরে। কৈশোরে বুঝেছিল সে কথা,
হাটে যাবার পথে নৌকা ডুবিতে, অনেকটা দূরে নিয়ে গিয়ে
ফিরিয়ে দিয়েছিল জীবনের পায়ের তলায় মাটি।


বড়রা বলতো নদী মানুষের কথা জানে, জীবনের প্রয়োজনে সব দেয়
অবাক হয়ে সে শুনত আর ভাবত, নদীর তো কেবল নোনা জল আছে
ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে কুমীর, কামট, সাপ, হাজার রকম মাছ
আরো কত না দেখা জীব, মৃত পশুর, মানুষের পচে যাওয়া বীভৎস লাশ,
পোড়া কাঠের গুঁড়ি, গাছ গাছালি, আবর্জনার স্তূপ, আরো অনেক কিছু
নির্বিরোধে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে অবিরাম, অজানায়।  


গাঁয়ের মেয়ে বউ কাকা দাদারা তীর ঘেঁসা কোমর জলে
মিহি জাল টেনে টেনে মীন ধরত, কখনো ভরা নদীতে,
কখনো ভাটায়। কেউ জানত না কখন বিপদ আসবে
হয় প্রাণ যাবে অথবা চিরদিনের মত ক্ষত বয়ে  
পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাতে হবে, জীবনের নির্ভিক প্রয়োজনে ।
বোঝা না বোঝার সুক্ষ সময়ের ফাঁক গলে আর্ত চিৎকার
গেল গেল,  তলিয়ে গেল একটা মানুষ নিমেষে,
নির্বিকার বয়ে চলা ইতিহাসের অতলে।
কখনো বা সামান্য একটু জালা, হারিয়ে গেল একটা পা
অথবা কোমরের নিচ থেকে খুবলে নেওয়া অনেকটা মাংস,
নোনা জলটা লাল হয়ে উঠল খানিক, তারপর আর কিছু নেই
কোথাও দেখাও গেলনা সেই হানাদারের, সব শান্ত ।      

তবুও জীবন থেমে থাকেনি, ছেদ পড়েনি নিত্যকার প্রয়োজনে।  
লাল রঙের সুতোর টুকরোর মত,  জল রঙের কাঁচের মত
মীন আলাদা হত ঝিনুকের খোলায় ;  আর একটা গর্তে।
জীবন জেনেছিল লালের দাম বেশী। ভাবত ওই গুলোর গায়ে রক্ত লেগে আছে
যা মিশে আছে নোনাজলে হয়ত অনেক কাল, সময় ধরে।
বড় বড় হাঁড়ি নিয়ে লোক আসত, কিনে নিয়ে যেত লাল মীন,
কাঁচ মীন, সম্মানের একমুঠো অন্ন বা বস্ত্রের প্রয়োজনে
হয়ত বা আরো অনেক অনেক জীবনের প্রতিদিনের জন্যে।  
    
সোনারপুর
০৬/০১/২০১৯