দৃশ্য- ১
বিনয় বাবু আজ আর অফিসে যাবেন না।
সেই সকাল থেকে একনাগাড়ে ঝরে চলেছে।
আকাশটা ঢলে পড়েছে পৃথিবীর বুকে।
নীপা ঘরের গিন্নি।
কোনো কাজে মন লাগে না ওর। কেমন যেন উড়ুঊড়ু ভাব।
আজ দুপুরের মেনু খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর মাছের কালিয়া।
সাত সকালে ভিজে ভিজে বাজার থেকে দেশী রুই কিনে এনেছেন কর্তা।
দিনটা জমে যাবে!
মধ্যাহ্নভোজন শেষ হয়েছে সবে।
ঝোলা বারান্দায় আধ-শোয়া চেয়ারে ‘গল্পগুচ্ছ’ হাতে, চোখে ঢুলু-ঢুলু ভাব।
নীপা ঘরে শুয়ে গুনগুন করে চলেছে, ‘আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে...’।
মিষ্টুটা সারাদিন জ্বালিয়েছে ঠাকুমাকে।
নীভাননীর আষাঢ়ে গল্প শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
নীভাননী মজেছে মেগা সিরিয়ালে।
দৃশ্য- ২
কেষ্ট বনিক সকাল থেকে দোকান খুলে বসে আছে।
একটা কানা কড়িও বেচা-কেনা হয়নি আজ।
টুলে বসে ঢুলছে রতন, একলা কর্মচারী। আজ একটু বিশ্রাম পেয়েছে ও।
কেষ্টর বড় কষ্ট, বসে কাটিয়ে রোজ নেবে ব্যাটা!
মেজাজটা বিগড়ে আছে।
দৃশ্য- ৩
বিজয় সেন, ফিল্ম ডিরেক্টর।
বড় একটা ছবির কাজ হাতে নিয়েছেন। অরিজিন্যাল শ্যুট নিতে চান।
এমন একটা দিনকে কোনো মতেই হাতছাড়া করা চলে না।
ছবির চরিত্রদের ডেকে নিয়েছেন ওভার ফোন।
লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন...
দৃশ্য- ৪
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস।
দুই ধারে কৃষ্ণচূড়ার সারি।
মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সোজা পথ।
ডিপার্টমেন্ট পালিয়ে ছাতা মাথায় হেঁটে চলেছে যুবক-যুবতী।
মাথা দেখা যায় না ওদের।
শুধু শরীরদুটো ঘ্যাঁসাঘেঁসি করে লেগে আছে একে অপরের সঙ্গে।
এমনি একটা প্রণয় দিনের অপেক্ষায় ছিল ওরা।
কত কথাই না জমেছিল বুকের মধ্যে!
আজ অফুরন্ত সময় পেয়েছে।


দৃশ্য- ৫
কালাচাঁদ আজ আর কাজে বেরোতে পারে নি।
রাজমিস্ত্রির সাথে রোজ খাটে ও। দিন আনে দিন খায়।
খুব দরকার ছিল একটা কাজের।
ঘরের চাল ছ্যাঁদা। এখানে ওখানে সরা পেতেছে রূপসা, কালাচাঁদের বিবি।
জামাত, ইমন আর রেসমা ওদের তিন ছেলেমেয়ে। মোট পাঁচটা পেট।
এখনও কামাই করতে শেখে নি ওরা।
কালাচাঁদ আরব গেলে কষ্ট দূরে যাবে।
তিল তিল করে জমানো টাকায় হাঁড়ি চড়াতে মন সায় দেয় না রূপসার।
উপায় কি! মেঘ যেন ফুটো হয়ে গিয়েছে।
এতটুকু বিরাম নাই।
দৃশ্য- ৬
বিশু কৈবর্ত, ভাগচাষী। রায়বাবুদের জমি ভাগে করে।
হালের তাগড়াই বলদ জোড়া নিয়ে রওনা দিয়েছে মাঠে।
মাথায় থামালি, পরণে লাল শালু।
শুখা মরশুমে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসেছিল ও।
আজ বড়ই আনন্দ!
ভারতী ওর বউ।
বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের কৌটায় ভরে দিয়েছে মুড়ি, কলাইসেদ্ধ, গুড়, কাঁচা লঙ্কা আর আস্ত পেঁয়াজ।
আজ সারাদিন লাঙল চষবে।
দৃশ্য- ৭
বিষাণ বোস, সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
বড় একটা আই টি কোম্পানিতে হালে জয়েন করেছে।
সকালে কোনোমতে অফিসে পৌঁছেছিল।
কম্প্যুটারের সামনে বসেই কেটেছে দিনটা।
ফিরতি পথেই বিপত্তি। গোটা শহর জলমগ্ন।
কোথাও এক হাঁটু, কোথাও কোমর-জল।
বন্ধ যান চলাচল।
হাই-ড্রেনগুলোর মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে।
আজ কার কপাল পুড়বে কে জানে!
ইতি মিত্র, স্কুল-টিচার।
বিষাণ ফোনে ওকে জানিয়েছে, ফিরতে দেরি হবে।
শহরের বাইরে একটা ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া নিয়েছে।
লিভ-টুগেদার করে ওরা।
দৃশ্য- ৮
ঝুনি বাগদি জালি হাতে বেরিয়েছিল নাই সকালে।
কোমরে খাড়ুই বাঁধা।
খাড়ুই ভর্তি জিওল মাছ ধরেছে পাউসে।
আজ জিঁইয়ে রাখবে, কাল বাজারে ভাল দর পাবে।
দৃশ্য- ৯
মালঞ্চ আবাসন।
টুপাইরা থাকে পাঁচতলায়। বাবা, মা আর ও।
গ্রামের বাড়িতে আছে ঠাকুরমা আর ঠাকুরদা।
আজ সারাদিন ওদের কথা মনে পড়েছে টুপায়ের।
কাগজের নৌকা গড়ে মনের কথাগুলো ভাসিয়ে দিয়েছে ড্রেনের বয়ে যাওয়া জলে।
মনে আশা, নৌকাগুলো পৌঁছে যাবে দেশের বাড়ি।
দৃশ্য-১০
অঙ্কন মাইতি, নেশায় কবি, পেশায় গৃহশিক্ষক।
লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা লেখে।
পাঠক সমাদরও পেয়েছে।
তা দিয়ে পেট ভরে না, শুধু মন ভরে।
ঘরে বসেই কাটিয়েছে দিনটা।
কবিতা লিখেছে একটা।
অন্তরা ওর জীবনসঙ্গিনী, ওর সব পাগলামির সমর্থক।
আজ কবিতা শুনেই মন ভরাবে দুজনে।