প্রিয় কবি আল মাহমুদের ‘নদীর ভিতরে নদী’ এই নামে একটি কবিতা আছে। তিনি কবি; কবি যখন নদী দেখেন, তিনি সেখানে তখন নদীর মধ্যে উষ্ণ আরও এক নদী খুঁজে পান। তিনি বলেছেন তিতাসের মধ্যে আরেক তিতাসের কথা-
‘তোমার গোসল আমি একদা কি দেখিনি তিতাসে?
মনে পড়ে? শ্মশানঘাটের সেই সিঁড়ি ছুঁয়ে নেমে যাওয়া জল
ডোবায় সে পাদপদ্ম। সফরী পুঁটির ঝাঁক আসে
আঙুল ঠুকরে খেতে। নদী যেন নদীতে পাগল।
নদীরে ভিতরে যেন উষ্ণ এক নদী স্নান করে।
তিতাসের স্বচ্ছজলে প্রক্ষালনে নেমেছে তিতাসই’।
আমি এই লেখার শিরোনামটি হেলাল হাফিজের কবিতা থেকে ধার করেছি। তিনি সেই কবিতায় লিখেছেন,
‘নারী কি নদীর  মতো, নারী কি পুতুল,
নারী কি নীড়ের নাম, টবে ভুল ফুল’।
আসলেই কি নদীর মতো নারী? নাকি শুধু নারী নয়;  নর-নারী সবাই নদীর মতো। মানুষমাত্রই কি নদীর মতো? নদীর সঙ্গে মানুষের তুলনা করেছিলেন লিও টলস্টয়। সাধারণত নারী বলতে পৃথিবীর অন্যতম প্রাণী মানুষের স্ত্রী-বাচকতা নির্দেশক রূপটিকে বোঝানো হয়।সে যাই হোক, নদীর সাথে নারীর অথবা নারীর সাথে নদীর যে যুগলবন্ধিত্ব আমরা দেখি, তা কি কেবল কবিদের রচনায় সীমাবদ্ধ? নাকি বাস্তবিকই এর অন্তমিলের কোনো রহস্য আছে? আমরা দেখি কবি কালিদাস মেঘদূত কাব্যের নদীগুলোর রূপ-ধর্ম-বর্ণনা করেছেন তার সবটাই রমণীসদৃশ। বনবধূ, গ্রামবধূ, পুস্পচয়িকা, পরস্ত্রী, বারাঙ্গনা, নর্তকী, যক্ষনারী, দেবকন্য সবই এসেছে কালিদাসের বর্ণনায়। সেই রমণীরূপ নদীর বর্ণনার অববদ্য অনুবাদ করেছে কবি বুদ্ধদেব বসু-
‘কোনো নদীর ঢেউ রূপসীর ভঙ্গির মতো,
কোনো নদী তার ঘূর্ণিরূপে নাভি দেখাচ্ছে,
কেউ বিরহে কৃশ, কারো বায়ু মিলনোৎসুক প্রিয়ের মতো চাটুকার
কারও বায়ুতে যুবতীর জলকেলির সৌরভ ভেসে আসছে’।
(কালিদাস মেঘদূত, অনুবাদ বুদ্ধদেব বসু)
বাংলা সাহিত্যে নদী যেমন নারীর উপমা, তেমন নদীর উপমা নারী। নদী ও নারীর মধ্যে নানাভাবেই মিল খুঁজে পেয়েছেন চিন্তাবিদেরা। আর তাই নানাভাবে ব্যাখ্যাও করেছেন সেই মিলের অন্তর্নিহিত যুক্তিগুলো। নদী আর নারী নানাভাবে সৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। নদী এবং নারীকে ঘিরে নানা সৃষ্টি ভিন্ন ভিন্ন ফাল্গুধারায় প্রবাহিত হয়েছে। নদী এবং নারী আর্ট বা শিল্পের এক প্রদার অনুসঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে আমাদের সাহিত্য আর গানে-
‘এই পদ্মা এই মেঘনা
এই হাজারো নদীর অববাহিকায়;
এখানে রমনীগুলো নদীর মতো,
নদীও নারীর মতো কথা কয়’!
(গীতিকার/সুরকারঃ আবু জাফর)
আসলে আমরা যাপিত জীবনেও দেখি, কোথায় যেন নদী আর নারীর মধ্যে এক অপূর্ব সাদৃশ্য। নদী যেন নারী আর নারী যেন নদী হয়ে এক অনিন্দ্য সুন্দর রহস্যে আমাদের দোলায়। তাই কবিও নদীর মধ্যে নারী আর নারীর মধ্যে আবিষ্কার করে নদীকে-
‘নদীকে দেখিনি
জলের কিনারে গিয়ে দেখেছি তোমার মুখ।
তোমাকে পাবার জন্য এভাবেই বারবার
নদীকে দেখেছি’।
(প্রতীপচন্দ্র বসু, ভালোবাসা নদী)
নারী শুধু যৌবনা, বৃদ্ধা আর চঞ্চলা কিশোরীই নয়; নদী ও নারীর মিল যেন মাতৃত্বেও। নদী যেমন মায়ের মতো বুকে টেনে নেয়, জল দেয়, স্নেহ দেয়, সিগ্ধ করে তেমনি নারীর মাতৃত্বেও আধুনিক কবি দেখেন নদীকে। নারীত্বে, মাতৃত্বে, সন্তানবতী নারীতে তিনি দেখেন পরিপূর্ণ এক নদীকে, 'মেয়ে, যখন মা হয়ে যায়/আমি তার নাম দিই নদী।' (রমা ঘোষ)
নদী শুধু নারীর প্রতীক হয়ে ওঠেনি নদীর মধ্যে শুধু নারীর বিভিন্ন রূপের ছায়াই দেখেনি কবি সাহিত্যেকরা। নদীর রূপ আকৃতি প্রকৃতি বর্ণনায় নারীর অলংকারকেও ব্যবহার করেছেন। নদী তাই নারীর অলংকারের উপমা হয়েছে-
‘কেউ মনেও করে না কিসে তার উৎপত্তি হইল। শুধু জানে সে একটি নদী। অনেক দূর-পাল্লার পথ বাহিয়া ইহার দুই মুখ মেঘনায় মিশিয়াছে। পল্লীরমণীর কাঁকনের দুই মুখের মধ্যে যেমন একটু ফাঁক থাকে, তিতাসের দুই মুখের মধ্যে রহিয়াছে তেমনি একটুখানি ফাঁক-কিন্তু কাঁকনের মতোই তার বলয়াকৃতি’। (অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিতাস একটি নদীর নাম)
নারী শরীরের বাঁকে নদীর বাঁক আর নদীর বাঁকে নারীর শরীর শুধু মাত্র কবি আর সাহিত্যিকদেরই উদ্বেলিত করেনি। তাদের কলমেই শুধু অঙ্কিত হয়নি নদী আর নারীর বাঁক। বহু চিত্রকরের তুলিও ধন্য করেছে এই নারী আর নদীর অপূর্ব দেহ ভঙ্গিমা আর বক্রিম রেখা। তারাও মুগ্ধতার বিস্ময়ে এই অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি রহস্য তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্য নান্দনিকতায়। সেই অপূর্ব বাঁক আর নান্দনিকতার বিষয়ে পটুয়া কামরুল হাসান তাই বলেন,
‘বাঙালি মেয়েরা সর্বাঙ্গীনভাবে লাবণ্যময়ী। তাদের প্রতিটি ভঙ্গি অনন্য।... একটি মেয়ে কলাবাগানের শব্য দিয়ে কলসি কাঁখে বাড়ি ফিরছে। ডানদিকটা তার একদিকে হেলে আছে। বাঁধা কলাপাতার বা মেয়েটির একদিকে হেলে থাকা সম্পূর্ণ রেখার সৃষ্টি করছে। যা হয়তো নদীর বাঁকে দেখলে মনে হতে পারে’। (সাক্ষাৎকার সাপ্তাহিক বিচিত্রা,১৯৭৪)
নারীর সঙ্গে নদী বা নদীর সঙ্গে নারীর এ মিল শুধু কবিতা আর সাহিত্য সৃষ্টিতে নয়। পুরাণের বহু জায়গায় নদী ও নারী এক হয়ে মিশে আছে। গ্রীক পুরাণের এক পরিচিত নদী টাইরো থেসালি রাজ্যের সালমোনেউসের মেয়ে ছিল এই টাইরো। ভালবাসতেন নদী-দেবতা এনিপিউসকে। এনিপিউসের দেখা পাওয়ার জন্য প্রতিদিন বসে থাকতেন নদীর ধারে। সাগর-দেবতা পোসাইডন ভালোবেসে ফেলেন টাইরোকে। পোসাইডন একদিন নদী-দেবতার রূপ ধরে এলফিউস ও এনিপিউস নদীর মোহনায় নিয়ে যান টাইরোকে। সেখানে গিয়ে পোসাইডন তার ছদ্মবেশ পাল্টে ফেলে তরঙ্গমালায় পরিণত হন। সেই তরঙ্গমালার মধ্যে হারিয়ে যান টাইরো। সৃষ্টি হয় টাইরো নদী।
আবার ইনাকাসের কন্যা আইও শাখা নদীরূপে প্রবাহিত। তার রূপ দেখে মুগ্ধ হন স্বর্গের রাজা জিউস। জিউসও মেঘের রূপ ধারণ করেন মিলিত হোন আইওর সঙ্গে। দুগ্ধবতী গাভীর দুধের মতো সুস্বাদু হয়ে ওঠে তার জল। স্বর্গের দেবী হবার কারণে আইওর নতুন নাম হয় আইসিস গ্রীক পুরাণের আর এক ব্যতিক্রমী নদ দাফনি। দাফনি এক সময়ে ছিল নদী, এক সময়ে সে হয়ে যায় নারীর প্রতিমূর্তি, আবার এক সময়ে পরিণত হয় চিরসবুজ একটি গাছে। জীবনের সঙ্গে নদীর এ এক অসাধারণ তুলনা।
আমরা ইতিহাস উল্টিয়ে দেখি, আবহমান কাল ধরে নদী আর নারীকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য কাব্য কথা গান। বিভিন্ন প্রবাদ প্রবচন সৃষ্টিতেও নদী আর নারী নানাভাবে প্রভাবিত করেছে মানুষকে। লোককৃষ্টির তথা লোক সঙ্গীতের এক অন্যতম প্রধান উৎসভূমি হচ্ছে নদী ও নারী। নদী বা জলধারা হচ্ছে জীবনের প্রধান সঞ্চালক, আর নারী হচ্ছে জন জন্মদাত্রী প্রসূতি। জীবন আর জনপদ ঘিরে পুরুষ যে বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে তা শস্য উর্বরা করে তুলেছে নারী। ফলবতী নারী নিজের রক্তে নিজের ভেতর তিল তিল করে বেড়ে ওঠা ভ্রূণকে মানবশিশুর জন্মে রূপান্তর করে পৃথিবীকে শুনিয়েছে জন্ম আর জীবনের গান। সৃষ্টির আনন্দ আর যন্ত্রণাতে উদ্বেল নারীর সঙ্গে এভাবেই যেন মিলে মিশে গেছে নদী। সত্যি, নারী নদীর চেয়ে রহস্যময়ী।