তারাশঙ্কর যখন জন্ম নিলেন ১৮৯৮ সালে বীরভূমের লাভপুর গ্রামে, তার সাত পূর্বে প্রয়াত হয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগর, চার বছর পূর্বে প্রয়াণ ঘটেছে বঙ্কিমচন্দ্রের এবং রবীন্দ্রনাথ তখন সাহিত্য ও খ্যাতির চুড়ায়। বাংলার রেনেসাঁর স্পর্শ বাধা সত্ত্বেও ঠিক পৌঁছে গেছে তার পূর্ণতায়। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র তের বছর হলো। জাতীয় জীবনে উনিশ শতক তখন বিরাজ করছে অন্তিম প্রহরে। প্রথম জীবনে কবিতা ও নানা ধরনের কিছু নাটক লিখলেও তার প্রতিভার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে গল্প ও উপন্যাসে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমার কলমে বাস্তবতা সত্য হয়েই দেখা দেয় তাতে বাস্তবতার কোমর-বাঁধা ভান নেই, গল্প লিখতে বসে গল্প না লেখাটাকেই যারা বাহাদুরি মনে করেন তুমি যে তাদের দলে নাম লেখাওনি এতে খুশি হয়েছি। লেখায় অকৃত্রিমতাই সবচেয়ে দুরহ।’  


তারাশঙ্কর আজ আমাদের মধ্যে বেঁচে না থাকলেও, বেঁচে রয়েছেন তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। যে সকল সৃষ্টি আজ শুধু তার হয়েই দেখা দেয় না, বরং স্বচিত্রে বিরাজ করছে সমস্ত বাংলা সাহিত্যেয়। উত্তর-শরৎচন্দ্রের যুগের তিনি যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তা আর মেনে নিতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। তার রচিত সাহিত্য আজ কেবল যে দু’বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে তা কিন্তু নয়। বাংলার বাইরেও বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে তার রচিত সাহিত্য আজ আগ্রহের বিষয় হয়ে দেখা দেয়। তার উপন্যাস ও ছোটগল্পে যে দুর্লভ জীবননির্ভর ঘনিষ্ঠতা ও অন্তর্দৃষ্টির চিহ্ন রয়েছে, তা শুধু তাকে বিখ্যাত’ই করেনি, বরং ব্যাপক আর বিস্তৃতভাবে সমৃদ্ধ করেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যকে। তার রচনায় মানববোধের যে চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে, সমসাময়িক দেশকালের ঐতিহাসিক জীবনচিত্র যেভাবে জীবন্ত হয়ে দেখা দেয় তাতে শরৎচন্দ্রকে হারিয়ে সেই দুঃখটা যেন অনেকটা কমে আসে। এ-যেন তার যোগ্য উত্তরসূরীর সাহিত্যিক হয়ে দেখা দেন তিনি।


তারাশঙ্কর, কল্লোলে’র দলে ঠাই পেয়েছিলেন, সেই সময় তার হাত থেকে রচিত হয় বেশ কিছু কবিতা। এভাবে তিনি বেশ কিছুটা পথ চলতে থাকেন, কিন্তু পথিমধ্যে বেশ সচেতন হয়ে উঠেন। নিজেই বুঝতে পারেন প্রতিভা ও বিকাশের বিস্তৃত পথ সম্পর্কে। যে পথের দিক একই ভাবে আমরা দেখতে পাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) মধ্যেও। তারাশঙ্করের মনের মধ্যে বলিষ্ঠ চিত্রে অদ্ভুত কিছু মানুষের চিত্র ও পরিবেশ দেখা দিলেও তা আর স্থির থাকলো না নিজের অশ্রুকোণে। বরং বলা চলে ভাব ও ভাষার এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটে গেল যেন সেই সব চিত্রের মধ্যে দিয়ে। আর সেখান থেকেই আমরা পেলাম কালজয়ী উপন্যাস ও ছোটগল্প।  


তারাশঙ্করের উপন্যাসে বেড়ে উঠা সামন্ততান্ত্রিক ব্যক্তি, জীবন ও সমাজের ছবিটি অপূর্বচিত্রে প্রকাশ পেয়েছে। এ যেন একযুগের অবসান এবং আরও একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটছে। পুরাতন জমিদারী আবহাওয়া চলে যাচ্ছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে নতুন শিল্পপতির দল। এ যেন চোখের সামনে গ্রাম-জনপথ যন্ত্রদানবের কৃপায় রাতারাতি আধা শহরে রূপান্তরিত হচ্ছে। চিমনির ধুপনিশ্বাসে গ্রামের আকাশ ও মাটি যেন মুহূর্তে মলিন হয়ে যাচ্ছে। আবিলতা বাড়ছে, চরিত্র যেন মুহূর্তে বাক নিচ্ছে কোন এক দেখানো পথে, গায়ের সহজ-সরল পথ ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে অজানা কোনো এক যান্ত্রিক পথে। সেই সামাজিক পরিবর্তনের চিত্র তারাশঙ্কর আঁকলেন অপূর্ব দক্ষতার সাথে, উপন্যাস ও ছোটগল্পে। অবশ্য সেই সাথে আমরা এও দেখতে পেলাম ভাঙাচোরা পটভূমিকায় তিনি আবার নবজীবনের চিত্রও এঁকেছেন, নৈরাশ্যবাদী বিষণ্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন নিজের মতো করে। আর একদিকে আমরা স্পষ্ট দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, বীরভূম অঞ্চলের অতি সাধারণ নিম্নবর্গের বেদে, বাজিকর, সাঁওতাল, আউল-বাউল, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক প্রভৃতি রহস্যময় মানুষের সঙ্গে গভীর ভাবে মিশে গেলেন, প্রবেশ করলেন তাদের জটিল আর বৈচিত্র্যময় জীবনের সাথে। তাদের সাথে মিশে তিনি যে জীবনের চিত্র এঁকে আনলেন আমাদের চোখের সামনে, যা এতোদিন অজানা ছিল আমাদের, যে চোখ দিয়ে তিনি দেখলেন, সেই চোখ দিয়ে আমাদেরও তা দেখিয়ে দিলেন। এ যেন কোনো এক জীবনের অজ্ঞাত অভিজ্ঞতার চিত্র। তার ‘রাইকমল’, ‘নীলকণ্ঠ’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’, ‘হাঁসুলি বাকের উপকথা’, কবি, পদচিহ্ন, আরোগ্যনিকেতন ইত্যাদি উপন্যাসে বাংলাদেশের সমগ্র জীবনচিত্র যেন মুহূর্তের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠে। আর রয়েছে অজস্র ছোটগল্প নারী ও নাগিনী, বেদেনী, জলসাঘর, রায়বাড়ি, কামধেনু, ইমারত এগুলো সংখ্যায় যেমন বিপুল বিষয় ও বৈচিত্র্যেয় রয়েছে তার ব্যাপকতা।


আমরা যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাই এই সব লেখায় একদিকে যেমন রয়েছে তার নিজ গ্রামের শৈশবের সেই সব চিত্র যার মধ্যে দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন। সেই সব চিহ্ন বা জনবসতি আজ অধিকাংশ হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে, কিন্তু লেখক তারাশঙ্করের স্মৃতিতে আজও তা গেঁথে রয়েছে। দ্বিতীয় যে ধারা তারাশঙ্কর আমাদের দেখিয়েছেন, সেখানে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনের ইতিহাস। বিলীয়মান সামন্ত্রতন্ত্রের উপর ধনতন্ত্রের অভিঘাত তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। এরই মধ্যে দেখেছেন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সর্বহারার লড়াই। এই মৌল দ্বন্দ্বের ভেতর যে কত উপশ্রেণী বা শাখা শ্রেণী রয়েছে তা আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। বিভিন্ন শ্রেণীর শ্রমজীবী মানুষ, তাতে চাষী বা কলকারখানার কুলিই হোক সবার মধ্যেই নিত্যপরিবর্তনের যে বৈচিত্র্যময়তা আছে তা তিনি দেখেছেন নিজের দু’চোখ দিয়ে। আমাদের দেশে মার্কসবাদের বিস্তারের পূর্বেই তিনি নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছেন শ্রেণীসংগ্রামের ঘাত-প্রতিঘাতের বিভিন্ন দিকগুলো। তিনি এও আমাদের দেখিয়েছেন, সেই সেই মার্কসবাদের তত্ত্বের সাথে মিলে উঠে না তার নিজস্ব চিন্তাধারা। সেই পথে তিনি যে পা বাড়িয়েছেন তা কিন্তু বলা যাবে না। তারাশঙ্করের সমস্ত রচনার দিকে চোখ দিলে আমরা আরও দেখতে পাই, নিজের চিন্তা-চেতনা আর অটল বিশ্বাসের একক আধিপত্য বিরাজ করছে সেখানে। কারণ, সেই ভাবধারা আর চিন্তার দিকগুলো তার মনের সাথেই গেঁথে ছিল আপন হয়ে। তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’ উপন্যাস প্রকাশ পায় ১৯৪০ সালে। যখন তিনি অবস্থান করছেন প্রতিভার মধ্যেগগনে। অতিবাহিত করছেন জীবনের চারদশকের              
বেশি সময়। শ্রেণী সংগ্রামের দ্বন্দ্ব যে কিরূপ নিতে পারে তা তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন এ উপন্যাসে। তার কতটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই বর্তমান সময়ে ? সেই সমাজের কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে ?    


এই রকম অভূতপূর্ব চিত্রঅঙ্কনের সময় তিনি যেন নিজের মধ্যে এমন একটা ধ্যানীরূপ ফুটিয়ে তোলেন, যেন নিমগ্ন রয়েছেন জীবনের গভীর কোনো এক অজানা অতলে। জীবনের বিশালতা ও গভীরতা যেন কোন ভাবেই তাকে ফাঁকি দিতে না পারে সে চেষ্টা করে গেছেন সমস্ত জীবনব্যাপী। মূলত রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বলতে হয়; তার মতো এত দক্ষতার সঙ্গে ছোটগল্পের সীমাবদ্ধ আঙ্গিকের মধ্যে আর কেউ বিশাল-বিচিত্র দক্ষতার সাথে জীবনকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হননি। বিচার-বিশ্লেষণ সাপেক্ষে আমরা এটা বলতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথের গোরা’র পরে যদি কাউকে মহাকাব্যধর্মী উপন্যাসের রচয়িতা বলে চিহ্নিত করতে বলা হয় সেই গৌরব সবার আগে তারাশঙ্করের। কাহিনির বিশাল পটভূমিকা ও আঞ্চলিকতা, চরিত্রের বৈচিত্র্যময় বিন্যাস, ব্যক্তির মনোদ্বন্দ্ব, এবং সমাজ-পরিবেশ ও মূল্যমানের সঙ্গে ব্যক্তি জীবনের স্বাতন্ত্র্যবোধের দ্বন্দ্ব, অনতিক্রান্ত যুগের সঙ্গে চলমান যুগের সংঘাত প্রভৃতি গভীর দিকগুলো তার উপন্যাসে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে তাকে শুধু একজন শ্রেষ্ঠ কথাকার বলেই বিদায় করা যায় না, তিনি গ্রামবাংলার নিপুন ও সাধনার শ্রেষ্ঠ ভাষাকাররূপেই প্রতিভাত হয়েছেন। তারাশঙ্কর, ছোট-বড়, ইতর-ভদ্র, আভিজাত্য ও ভূমিহীন কৃষক-ইত্যাদি সকলের জীবন যেভাবে বাংলা সাহিত্যেয় তুলে ধরেছেন, তা কোনো এক বড় মাপের জীবনশিল্পী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভাবপর নয়। এখানে আমরা দৃঢ়চিত্তে বলতে পারি যে, শরৎচন্দ্র তার রচনায় অবলম্বন করেছিলেন পারিবারিক ও সামাজিক নীতি-দুর্নীতি ঘটিত প্রভাত-প্রতিবেশে বর্ধিত কিছু নর-নারীর ব্যক্তিগত জীবন সমস্যা। তারাশঙ্কর সেই সমস্যা ও সীমার চৌহদ্দি অনেক বাড়িয়ে দিয়ে এঁকেছেন ব্যক্তি-মানুষ-সমাজ-পরিবেশ-শ্রেণী বিন্যাস বৈচিত্র্যময় বিশাল কাঠামোতে। কিন্তু এখানে এও সত্য যে, স্বল্প পরিবেশে শরৎচন্দ্রের বক্তব্য যতটা গভীর ও প্রাণজঞ্জাল হয়ে মনের গভীরে পৌঁছে গেছে, তারাশঙ্কর সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি এগিয়ে গেছেন বিশাল-বিস্তৃত কাঠামোর দিকে, যেখানে ভাষা অনেক সময় খেলা করেছে বাক ত্থেকে বাঁকে। আমরা স্পষ্ট ভাবে এও দেখতে পাই, তার কাহিনি বিন্যাসে কোথাও-কোথাও নেমে আসে গভীর শিথিলতা; চরিত্রগুলোতে ফুটে উঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কল্পনাপ্রসূত কোনো এক অবয়ব। অনেক স্থানে তৈরি হয়েছে গভীর শূন্যতাবোধ ও বিন্যাসের অপূর্ণতার ছায়া। নিজের কোন কোন জনপ্রিয় উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যেকে দিয়েছেন বৈচিত্র্যময়তা।
  
তারাশঙ্কর যখন বাংলা সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করলেন, তখন বাঙালি মধ্যবিত্তের নিশ্চিন্তে জীবনে ফাটল ধরেছে। এ-কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তারাশঙ্করের প্রথম সার্থক গল্প ‘রাইকমল’ ও প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালি-ঘূর্ণি’ ১৯৩১ সালে প্রকাশ পায় একই সাথে। তারও ছয় দশকের বেশি সময় আগে বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির যে জীবন চিত্র প্রকাশ করেছিলেন তার ব্যাপক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও গুনগত পরিবর্তন ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র যখন উপন্যাস লিখতে শুরু করলেন ১৮৬৫ সালে, তখন বাংলার রেনেসাঁর সজীব সময়। তিনি তার শ্রেণীধর্ম অনুযায়ী মুলত অভিজাত মানুষের সুখ-দুঃখের সমস্যা নিয়েই মনোযোগী ছিলেন। তাতে কখনো প্রকাশ পেয়েছে সমকালের সীমানার চিত্র, আবার কখনো ফুটে উঠেছে অতীতের কল্পজীবনের মর্মকথা। কিন্তু সেই মানদণ্ডে অতীত বা বর্তমান যাই বলি না কেন, তিনি উচ্চবিত্ত সমাজের কথাই অভিব্যক্ত করেছিলেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে কখনো বা প্রকাশ পেয়েছিল মহাকাব্যিক বিস্তার, যার উত্থান-পতনে বিস্তার ঘটায় অন্যকারও পথ নির্দেশনা। আসলে বলতে হয় যে, বাঙালির রেনেসাঁসে অভিব্যক্ত হয়েছিল গ্রাম ও শহরের জনজীবনের ব্যাপক বিছিন্নতা, তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে ছিল অসম্ভাব। তাই ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর মতো সমকালীন জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখলেন, এবং তাতে গভীর সফলতা অর্জিত হলেও বঙ্কিমচন্দ্র অনুভব করতেন দূরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্র সমূহের প্লাবিত সমারোহের মধ্যে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল তার নিজস্ব ইতিহাসচেতনা ও ভাষাবোধের নিবিড় মিশ্রণ।


রবীন্দ্রনাথ,  তার প্রথমদিককার উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের অনুবর্তী হয়েও সরে এসেছিলেন জীবনদৃষ্টির নিজস্ব কাঠামোর দিকে। ইতিহাস নির্ভর রাজবাড়ির সমারোহপূর্ণ জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে বিধৃত ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ ও সামাজিক ন্যায়-অন্যায়বোধকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন অনেক বেশি। তারপর তিনি অনিবার্যভাবে প্রবেশ করেছিলেন নরনারীর জটিল জীবনের দিকে। তাই বলতে পারি যে, ‘চোখের বালি’ এজন্যই স্বীকৃত হয়েছে প্রথম আধুনিক উপন্যাস হিসেবে। অবশ্য উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ যে জীবনকে এড়িয়ে গেছেন, তার যথার্থ ব্যবহার করেছেন তার ছোটগল্পে। উত্তর ও পূর্ববঙ্গের জমিদারী দেখাশোনার সুত্রে গত শতকের অনেকটাই কাটিয়েছিলেন গ্রাম্যজীবনের প্রান্তবাসী সাধারণ মানুষের সাথে। কিন্তু এ কথা বলতে হয় যে, তিনি রবীন্দ্রনাথ হয়েও সম্পূর্ণ দূর করতে পারেননি গ্রাম ও শহরের মানসিকতার ভেতরকার বিচ্ছিন্নতাকে। নাগরিক জীবনের একটু বাইরে পা বাড়ালেই বিস্তৃত রয়েছে যে লোকসমাজ তার ভাঙাগড়ার ছবি তাই অনায়ত্তই থেকে গেছে তার অভ্যন্তরে। এ-ভাবনাবোধের ধারাবাহিক থেকে আমরা পেয়েছিলাম উৎকৃষ্ট কিছু মৌলিক ছোটগল্প।  
    
১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই, বীরভূমের লাভপুর গ্রামে এক জমিদার পরিবারে তারাশঙ্করের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে, ব্যক্তিরূপে এবং লেখকরূপে, যা কিছু তিনি হয়ে উঠেছিলেন তার গোড়াপত্তন হয়েছিল তার এই দেশ-কাল-পরিবারের মধ্য থেকে। তার সমস্ত জীবনব্যাপী সাধনায় এই তিনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। এ-নিয়ে তার সাহিত্যজীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও, তারাশঙ্কর নিজেও তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘ধাত্রীদেবতা’ এবং দু’টি স্মৃতিকথা ‘আমার কালের কথা’ ও ‘আমার সাহিত্যজীবন’ সেই সব স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন। এই সব লেখায় পাওয়া যায় তার বহিজীবন ও অন্তজীবনের নানা প্রান্তের দিকগুলো। যে পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল তারা ছিলেন জমিদার। আর সেই জমিদার রক্ষার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা তাদের হাতে ছিল না। অপর পক্ষে, এই জমিদারের অপর যারা শরীক ছিলেন, তারা শুধু জমিদারী আয়ের উপর নির্ভর না করে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকেও অগ্রসর হলেন। বর্ধিষ্ণু গ্রাম লাভপুরে উঠতি বিত্তবান আরও ছিলেন, সংলগ্ন কয়ালখনি অঞ্চল ছিল তাদের জন্য ভাগ্য পরীক্ষার ক্ষেত্র। আধুনিক যুগের এই উদ্যমে অংশগ্রহণ করার মতো ক্ষমতা তারাশঙ্করের বাবার ছিল না। আধুনিক শিক্ষাও তিনি সেভাবে পাননি। সামান্য বিষয়সম্পত্তি ও পারিবারিক বংশগৌরব  ছাড়া আর কোন সম্বল নেই, এই দুঃখ তিনি সর্বদা পোষণ করতেন। তার এই মনের কথা তারাশঙ্কর জানতে পেরেছিলেন পিতার অকাল মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরে, পুরনো একটি ডায়রির পাতা থেকে। সেই দুর্দিনে সংসারের হাল ধরেছিলেন মা ও পিসিমা। পৈত্রিক বিষয়টুকু রক্ষা করে ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে মানুষ করেছিলেন তারা। পিসিমা ছিলেন বাল্যবিধবা, প্রখর ব্যক্তিত্বশালী ও বুদ্ধিমতী। পরলোকগত ভাইয়ের সংসারটিকে ভালোবেসে আগলে রেখেছিলেন তিনি। আর তারাশঙ্করের মা ছিলেন গভীর মনের এক অনন্য মানুষ। পাটনার এক শিক্ষিত পরিবার থেকে বধূরূপে তিনি লাভপুরে এসেছিলেন এবং আপন শিক্ষাদীক্ষা ও মার্জিত রুচিতে পল্লীগ্রামের এই বাড়ির চেহারা বদলে দিয়েছিলেন নিজের রুচিবোধ দ্বারা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই সংসার জীবন তার দীর্ঘ হয়নি। গভীর যত্নে তিনি ছেলেমেয়েদের বড় করতে লাগলেন। বিশেষ করে বলতে হয়, বড় ছেলে তারাশঙ্করের কথা। তাকে তিনি দীক্ষা দিলেন ভিন্নতর মূল্যবোধ ও গভীর চেতনার ধারাবাহিকতায়। খুব কম বয়সে পিতৃহারা হয়েছেন তিনি, এ-ব্যথা কখনো কখনো তাকে নাড়া দিত। স্কুলে পড়া অবস্থায় তারাশঙ্কর যখন সমাজসেবার কাজে নিযুক্ত হলেন, মহামারী বা দৈবদুর্বিপাকে দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলেন দরিদ্র পল্লীতে, মায়ের সম্পূর্ণ সম্মতি নিয়েই তিনি এসব কাজ করতেন।


তখনও লেখক হবার কোন বাসনা তারাশঙ্করের মনে দানা বাঁধেনি। দুটো বিয়ের পদ্য লেখা বা পাড়ার ক্লাবে অভিনয়ের জন্য নাটক লিখে দেওয়া কোন সাহিত্য কর্ম নয়, তা তিনি জানতেন। কিন্তু মনের ভেতর অজান্তেই তিনি যেন প্রস্তুত হচ্ছিলেন অন্যভাবে। প্রথমেই তিনি এ-পর্বে বেঁছে নিলেন নানা প্রকার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা ও পরিচয়ের দ্বারা। তখন পর্যন্ত বলা যেতে পারে, বাংলার অই প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানা আদিম জনবসতির বাস ছিল। এবং জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা বিভিন্ন রকম পেশা বেঁছে নিয়েছিল। সেই সব পেশার মানুষের সাথে খুব দ্রুত মিশে যেতে লাগলেন তারাশঙ্কর। ভিন্ন রুচি, ভিন্ন চেহারার পরিচ্ছন্ন সাঁওতাল বসতি ছিল খুব কাছেই। তার খুব কাছেই ছিল আখড়ার মধ্যে অন্তরীন গীতপ্রিয় মধুরভাষী বৈষ্ণবসমাজ। ডোম ও নানাবিধ পেশার লোকজনের বসতি ছিল গ্রামের মধ্যেই। যাঁদের আদিম চেহারা মাঝে মধ্যে ধরা পড়তো পাড়া প্রতিবেশী লোকদের মধ্যে। তাদের সঙ্গে অন্য সমাজের লোকদের সাথে খুব বেশি চলাফেরা হত না। কিন্তু এখানে বলে রাখি যে, সমাজসেবার সূত্রে তারাশঙ্করের সঙ্গে তাদের একপ্রকার ভাব-বিনিময় হয়ে যেত। কিশোর বয়স থেকেই এই শ্রেণীর মানুষের সাথে তার বেশ মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠে। তখন পর্যন্ত শ্রেণী-স্বার্থ, বৈষম্য মানুষের মধ্যে পৌঁছেনি। তাদের প্রতি তারাশঙ্করের আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না। সেই ভালোবাসা প্রবাহিত ছিল উভয় পক্ষ থেকেই। এবং একথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, তারাশঙ্কর তা আজীবন পেয়েও এসেছেন। এই সব সমাজের মানুষের আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না তার জন্য। তিনি তার সমস্ত ভালোবাসা ও সামাজিক সু-সম্পর্ক দিয়ে পৌঁছে গেছেন সেই সব মানুষের খুব গভীরে। যার চিত্র আমরা দেখতে পাই তার রচিত সমস্ত সাহিত্যেয়। এই সব মেলামেশা ও সামাজিকতার মধ্যে তারাশঙ্কর অর্জন করতে পেরেছিলেন বিশাল এক অভিজ্ঞতা, যেন দিন-দিন সমৃদ্ধি ঘটছে সেই অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।    


লাভপুর থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারাশঙ্কর পড়তে এলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কিন্তু কলেজ জীবন তার আর দীর্ঘ হলো না। কলকাতার জীবনের সাথে তখনও তিনি মানিয়ে নিতে পারেননি। যেন কোন এক অনভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, অজানা পথে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজের অজান্তেই মিশে গিয়েছিলেন গুপ্ত বিপ্লবী দলের কিছু সদস্যদের সাথে। উগ্রপন্থায় তার কোনোদিনই আস্থা ছিল না। সেই সব মানুষদের তিনি ঠিক চিনে উঠতে পারেননি। অপরদিকে, ইংরেজ সরকারের দমননীতি দিন-দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। সন্দেহের চিহ্ন দেখা দিচ্ছে দিকে-দিকে। এই সন্দেহের চিহ্ন থেকে যেন কোনভাবেই বাদ যাচ্ছেন না তারাশঙ্কর নিজেও। অচিরে তিনি গোয়েন্দার নজরে পড়লেন। খুব কম সময়ে ত্যাগ করতে হলো কলকাতা শহর। ফিরে গেলেন লাভপুর গ্রামে। অন্তরীন হয়ে রইলেন সেখানে। কলেজ শিক্ষার পাঠ আর এগোল না, থেমে যেতে হলো ওখানেই। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই যে বাঁধাটি তিনি পেলেন, তা আর শীঘ্র কাটলো না। যার ফলে কলেজ শিক্ষা ওখানেই থেমে গেল। তার কল্লোলীয় বন্ধুদের মতো বিশ্বসাহিত্যের বিদ্যাচর্চা তার জন্য অধরাই থেকে গেল। কলকাতা থেকে প্রত্যাগত তারাশঙ্কর যেন আরও দৃঢ়সংকল্প মনে লেখক হওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়লা খনিতে চাকুরীর ফলে অভিজ্ঞতার দিকটাও অনেকটা বেড়ে গেছে তার।


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতক শেষ হতে চলছে; ইতিমধ্যে কলকাতা শহরে বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে নবযুগের সাহিত্যিকরা এসে গেছেন। কল্লোল, কালিকলম ইত্যাদি পত্রিকা তাদের দিকনির্দেশক হয়ে দেখা দিচ্ছে। রবীন্দ্রপ্রভাবের সর্বব্যাপী ছায়া থেকে তারা বেরোবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠছে। যেন ওই ছায়া থেকে বেরোতে না পারলে তাদের সাহিত্যিক হওয়ার কোন অস্তিত্বই থাকবে না। অরাবীন্দ্রিক বিষয়বস্তুর সন্ধানে তারা কথাসাহিত্যের উপাদান খুঁজছেন শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে। কখনো সেখানে আবার দেখা দিচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালীর দুঃসহ জীবনযাত্রা ফ্রয়েডিয়তত্ত্বে। কিন্তু সেখানে নাগরিক জীবনের বাইরে বঙ্গদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে যে বিচিত্র জীবনধারার হওয়া বইছে সেদিকে তাদের কোন আগ্রহই ছিল না। সেখানেই একদম নতুনতর হয়ে দেখা দেন যেন তারাশঙ্কর।


চার দশকের চেয়েও কিছু বেশি সময় তারাশঙ্করের সাহিত্য জীবন। প্রথম যে গল্পটি লিখে সাহিত্য সমাজে পরিচিত লাভ করেন তা হলো ‘রসকলি’। গল্পটি তিনি লিখেছিলেন প্রবাসী র জন্য। কিন্তু অনেকদিন কেটে গেলেও কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি প্রবাসীর দপ্তর থেকে গল্পটি ফিরিয়ে আনেন, এবং পরবর্তীতে কল্লোল পত্রিকায় দিয়ে আসেন। সমবয়সী হলেও সেই সব লেখকদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে উঠেনি। পরের মাসেই গল্পটি কল্লোলে প্রকাশিত হলো, সঙ্গে পেলেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোট একটি চিঠি ‘আপনি এতদিন চুপ করিয়া ছিলেন কেন ?’ ১৯২৭-২৮ সাল থেকে লেখার এই যে ধারাবাহিকতা শুরু হলো  তা আর থামেনি। কল্লোল সহ কলকাতার অন্য পত্রিকাগুলোতে তার লেখা প্রকাশিত হতে লাগলো। নতুনত্বের জন্য অন্যান্যদের প্রশংসা পেলেন খুব কম সময়ের মধ্যে, এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও। আবার নিন্দিত যে হননি তা কিন্তু বলা যাবে না। ততদিনে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেছেন। তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্যের কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে থেকে সাহিত্যিক খ্যাতি পাওয়া কখনো সম্ভাব নয়। প্রথম উপন্যাস চৈতালি ঘূর্ণি (১৯৩১), যা তিনি নিজ ব্যয়ে প্রকাশিত করেছিলেন। আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। খুব দুঃসময় চলছে, এমন দিনও গেছে যখন তিনি একশো টাকার বিনিময়ে নিজের গ্রন্থস্বত্ব ও বিক্রি করেছেন।  


তারাশঙ্করের প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে। গল্পের নাম হিসেবে পাওয়া যায় ‘মুকুন্দের মজলিস’। বিভিন্নজন আবার ‘সুতোর কুটো’কে তার প্রথম প্রকাশিত গল্প বলে আখ্যায়িত করেছেন। তারাশঙ্করের অধিকাংশ গল্প গ্রন্থকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। এ-ক্ষেত্রে বিশেষ করে নাম করা যায় পূর্ণিমা, কল্লোল, কালিকলম, উত্তরা, ভারতবর্ষ, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, দেশ, আনন্দ বাজার, নতুন পত্রিকা, চতুরঙ্গ, সোনার বাংলা ইত্যাদি পত্রিকাগুলোর। এই ভাবেই তিল-তিল করে তারাশঙ্কর নিজেকে তৈরি করলেন লেখক হিসেবে। শক্ত করে তুললেন নিজের পায়ের তলার মাটি।


তারাশঙ্করের প্রকাশিত গল্পের সংখ্যা ১৯০টি। গল্প গ্রন্থের সংখ্যা ৩৫টি। তিনি সুনির্মিত একটি পথে হেঁটেছেন, তবে নিজের মতো করে এবং তার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বলার কৌশল এবং বিষয় বিন্যাস ছিল অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। যা ছিল এই সমাজের বসবাসকারী মানুষের জীবনচিত্র। সময়ের সাথে সাথে গল্পের বিষয়বস্তু ও অবয়ব কাঠামোরও ব্যাপক পরিবর্তন করেছেন তিনি। যা বাংলা ছোটগল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। খুব কম সময়ে পৌঁছে গেছেন পাঠকের প্রিয় তালিকায়।      


তারাশঙ্করের গল্পগুলোকে রচনাকালানুসারে আমরা তিনভাগে ভাগ করে নিতে পারি। প্রথম পাঁচ বছরে (১৯২৮-১৯৩২) রচিত গল্পগুলোতে দেখতে পাই ধর্ম-প্রেম, সূক্ষ্ম বস্তুবিশ্লেষণ, পরিবেশ ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ততার গভীর সন্নিবেশের দিকগুলো গুরুত্ব পেয়েছে অনেক বেশি। দ্বিতীয় স্তরের (১৯৩৩-১৯৩৭) -এর গল্পগুলোতে দেখতে পাই জমিদারদের অহংকার, গর্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তি, দম্ভ ইত্যাদি দিকগুলো। অপর পাশে সেই সব পতনের কষ্ট ও যন্ত্রণার ছায়া যে অঙ্কিত হয়নি তা বলা যাবে না। শেষ সময়কাল হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি (১৯৩৭-১৯৭১) সময় কালের গল্প গুলোকে। এ-সময় যেমন দেখা দিয়েছে অনেক বিশুদ্ধ গল্প অপরদিকে ত্রুটিযুক্ত গল্প যে নাই তা কিন্তু বলা যাবে না। গল্পের শরীরে অতিকথনের মাত্রা যুক্ত হয়েছে বেশী। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যময়ের চেয়ে পুনরাবৃতির মাত্রা ঘটেছে অনেক বেশী। একই ছায়া যেন ঘুরে-ফিরে দেখা দিচ্ছে নতুনরূপে।  


রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা ছোটগল্পে তারাশঙ্কর গ্রামীণ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এককভাবে, নিজের মতো করে। তিনি তার লেখায় বাউল, ঝুমুর, টম্পা, কীর্তন ইত্যাদির ব্যবহার দ্বারা যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন সাহিত্যকে, ঠিক তদ্রূপ গ্রামীণ সাংস্কৃতির অনেক অচেনা দিকের সন্ধান দিয়েছেন আমাদের। তার লেখায় অনেক গানের ভাষার মমার্থ তেমন গুরুগম্ভীর না হলেও, তা গল্প বা উপন্যাসের অবয়বে মিশে একাকার হয়ে তৈরি করেছে নিজস্ব সুরের ঐকতান। তাই তারাশঙ্করের সাহিত্য কেবলমাত্র স্বকীয় সাহিত্য মূল্যই নয়, লোকজীবনের সাংস্কৃতির ইতিহাস হিসেবেও চিরন্তন মূল্য অসাধারণ শিল্পশৈলীতে রূপায়িত হয়েছে।