ছন্দ মতে অক্ষর- এর আলোচনা
  —আশরাফুল ইসলাম


বাংলা কবিতার ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার-
১/ স্বরবৃত্ত ২/ মাত্রাবৃত্ত ৩/ অক্ষরবৃত্ত৷


স্বরবৃত্ত:-
ছড়া ও গানের ছন্দ হলো স্বরবৃত্ত, ঘনঘন যতি পড়াতে এ ছন্দ তাই দ্রুতলয় ছন্দ অর্থাৎ দ্রুততার সাথে আবৃত্তি করা হয়৷
এই ছন্দে মুক্তাক্ষর বা মুক্তস্বর ১মাত্রা যা অন্য দুই ছন্দের মতো কিন্তু বদ্ধাক্ষর বা বদ্ধস্বরও ১মাত্রা যেটি অন্য দুই ছন্দ থেকে আলাদা৷


মাত্রাবৃত্ত:- মধ্যমলয় ছন্দ৷ এ ছন্দ স্বরবৃত্ত থেকে ধীর, অক্ষরবৃত্ত থেকে দ্রুত অর্থাৎ মধ্যম গতিতে আবৃত্তি করা হয়৷ এই ছন্দে মুক্তাক্ষর ১মাত্রা, বদ্ধাক্ষর ২মাত্রা৷


অক্ষরবৃত্ত:- ধীরলয় ছন্দ৷ এই ছন্দে প্রত্যেক অক্ষরকে টেনে টেনে সময় নিয়ে আবৃত্তি করা হয়৷ অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর ১মাত্রা, বদ্ধাক্ষর শব্দের শুরু ও মধ্যে হলে ১মাত্রা, শেষে হলে ২মাত্রা৷


অক্ষর:- বাগযন্ত্রের সল্পতম প্রয়াসে একবারে শব্দের যে অংশ উচ্চারণ হয়, তাকে অক্ষর (syllable) বলে৷


অক্ষর দুই প্রকার- ১/ মুক্তাক্ষর, ২/ বদ্ধাক্ষর৷


১/ মুক্তাক্ষর(open syllable) মুক্তাক্ষরকে স্বরান্ত অক্ষরও বলা হয়, আমরা মুক্তাক্ষর বলবো৷ মুক্তাক্ষর হলো- যে অক্ষর উচ্চারণে মুখ খোলা থাকে এবং তাকে যতো ইচ্ছা লম্বা করা যায়৷ কেউ মুক্তাক্ষরকে মুক্তদল, কেউ অযুগ্মধ্বনি বলেন৷


২/ বদ্ধাক্ষর(closed syllable) বদ্ধাক্ষরকে ব্যঞ্জনান্ত অক্ষরও বলা হয়, আমরা বদ্ধাক্ষর বলবো৷ বদ্ধাক্ষর হলো- যে অক্ষর উচ্চারণে মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইচ্ছা মতো লম্বা করা যায় না৷ বদ্ধাক্ষরকে কেউ রুদ্ধদল, কেউ যুগ্মধ্বনি বলেন৷


উদাহরণ:-
১/ মুক্তাক্ষর- বাবা, দাদা, নানা, খালা, ফুফু, মা, জননী, হ্যাঁ, ইত্যাদি
এখানে দেখুন- "বা" অক্ষরটি উচ্চারণে মুখ বন্ধ হবে না, খোলাই থাকে আর "বা" অক্ষরকে যতো ইচ্ছা লম্বা করতে পারবেন; এভাবে সবগুলো অক্ষর৷ বা১+বা১=২ ( দুটিই মুক্তাক্ষর), দা১+দা১=২, না+না=২, খা+লা=২, ফু+ফু=২, জ+ন+নী=৩(তিনটি মুক্তাক্ষর)


২/ বদ্ধাক্ষর- আজ, লাজ, কাজ, তাজ, চঞ্চল, ফালগুন, নয়, খায় ইত্যাদি
এখানে দেখুন- "তাজ" দুটি বর্ণ হলেও অক্ষর একটি, উচ্চারণে মুখ বন্ধ হয়ে যায়, যতো খুশি লম্বাও করা যায় না৷ স্ববৃত্তে বদ্ধাক্ষর ১মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ২মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে কখনো ১মাত্রা আবার কখনো ২মাত্রা যা ওপরে আলোচনা করেছি৷
আমরা এখানে বুঝার সুবিধার্থে অক্ষর- এর মাত্রা স্বরবৃত্তের নিয়মে ধরবো বা গুণবো৷


আজ=১ (বদ্ধাক্ষর তাই), লাজ=১, কাজ=১ চঞ্চল= চন১+চল১(দুইটি বদ্ধাক্ষর), "ফালগুন"- ফাল১+গুন১=২ কারণ এখানে ২টি বদ্ধাক্ষর৷


"আজ" ১টি একক বদ্ধাক্ষর৷ স্বরবৃত্তে ১মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ও অক্ষরবৃত্তে ২মাত্রা৷


দুই প্রকার অক্ষরের মিশ্রিত উদাহরণ-
আমার=(আ- মুক্তাক্ষর, মার- বদ্ধাক্ষর)
আ১+মার১=২ স্বরবৃত্তে,
সত্য=(সততো) সত১+তো১=২৷


"আমার" এ শব্দে দুইটি অক্ষর আছে আ+মার৷ স্বরবৃত্তে ২মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ৩মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে ৩মাত্রা৷ নিয়ম অনুযায়ী স্বরবৃত্তে বদ্ধাক্ষর ১ মাত্র৷ মাত্রাবৃত্তে বদ্ধাক্ষর যেখানেই হোক ২মাত্রা৷ অক্ষরবৃত্তে বদ্ধাক্ষর শব্দের প্রথমে ও মধ্যখানে ১মাত্রা, শেষে হলে ২মাত্রা, "আমার" শব্দে বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে আছে তাই ২মাত্রা হবে৷


"সত্য" এ শব্দে দুটি অক্ষর আছে সত+তো৷ স্বরবৃত্তে ২মাত্রা৷ মাত্রাবৃত্তে ৩মাত্রা৷ অক্ষরবৃত্তে ২মাত্রা, কারণ 'সত' বদ্ধাক্ষরটি শব্দের প্রথমে রয়েছে তাই অক্ষরবৃত্তের নিয়ম অনুযায়ী ১মাত্রা৷


অনেকে যুক্তবর্ণকে যুক্তাক্ষর ভেবে ভুল করেন, যেমন- "দ্বন্দ্ব" উচ্চারণ-
(দনদো) দ্বন+দ্ব= ২টি অক্ষর৷ স্বরবৃত্তে ২মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ৩মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে ২মাত্রা৷


শব্দের প্রথমে যুক্তবর্ণ থাকলে মাত্রা গণনায় তা ১ মাত্রা হয় সকল বৃত্ত, শব্দের শেষে বা মাঝেও যদি যুক্তবর্ণ আসে আর তার উচ্চারণ না হয় তবে মাত্রা হিসাবে আসবে না,
আমি এখানে অক্ষরের কথা বলছি না, বলছি বর্ণের কথা৷ আরো কিছু উদাহরণ দেই, যেমন-


স্কুল=১,(বদ্ধাক্ষর)
স্মৃতি=( স্মৃ১+তি১, দুইটি মুক্তাক্ষর)
প্রাণ=১( র-ফলা থাকা সত্বেও এক অক্ষর আর তা বদ্ধাক্ষর)
সত্য=২, য-ফলার উচ্চারণ আছে সে জন্যে,
কিন্তু, ন্যায়=১ য-ফলার পূর্ণ উচ্চারণ নেই আর তা শব্দের প্রথমেও আছে,
ন্যায়- এর পূর্বে একটি বর্ণ যোগ করি-
অন্যায়=অন+নায়( দুইটি বদ্ধাক্ষর হয়ে গেলো তাই ২অক্ষর এবং স্বরবৃত্তে ২মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ৪মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে ৩মাত্রা৷


মাত্রা:-
মাত্রা গণনার জন্য উচ্চারণ শর্ত,
ধ্বনি পরিমাপের একক'কে ছন্দশাস্ত্রে মাত্রা বলে৷