দিবাকর যতই আলো ছড়িয়ে রাখুক সারাটা আকাশব্যাপী,
বেলাশেষে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সেই আকাশেও আঁধার নামে,
ধীরে ধীরে, প্রকাশ্যে। বৃক্ষের শাখায় শাখায় ঝুলে থাকে
যেসব পাকা ফল- আনত, ভূমীমুখি, দোদুল্যমান,
মৃদুমন্দ বাতাসেও ওরা টুপ করে ঝরে পড়ে বেখেয়ালে।


প্রকৃতির রীতিই জীবনের নীতি।
পুরনোরা ভূমিতলে যাবে, নতুনরা ভূমিষ্ঠ হবে।
শব্দরা চলে যাবে, শূন্যতা ঘিরে রবে।
হে ষাটোর্ধ্ব বালক, তবে স্বেচ্ছায় প্রস্তুত হও-
একান্ত, বিবিক্ত, নিঃসঙ্গ, নির্জন জীবনের জন্য!


যতই তুমি উজ্জ্বল তারকা হওনা কেন, তোমার দ্যূতি
এখন দ্রুত ম্লান হয়ে যাবে। থেমে যাবে জীবনের কলরব,
নিভৃতে পড়ে রবে তুমি লোকচক্ষুর অগোচরে। এখন কিভাবে
নির্জন কোণে একেলা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তা শিখে নাও!
কোন ঈর্ষা নয়, অভিযোগ নয়- সবকিছু মেনে নিতে শেখো।


তোমার বিজন ঘরে হঠাৎ আসতে পারে কোন নোটিশ ছাড়াই
প্রাণঘাতী জটিল ব্যাধি। ভারসাম্যহীন, পতিত দেহের ভাঙা হাড়
তোমাকে কষ্ট দিতে পারে আমৃত্যু। অপত্য স্নেহের দাবী নিয়ে
হৃদনালীতে বসতি গড়তে পারে বর্জ্য স্নেহ, কর্কটের অদৃশ্য কীট
কিলবিল করে ছড়িয়ে যেতে পারে যকৃতে, বৃক্কে, মূত্রগ্রন্থিতে।


হে ষাটোর্ধ্ব বালক, তুমি প্রস্তুত হও-
মস্তিষ্ক ক্ষয়ে যাবে, স্মৃতিভম হবে। আর কখনো ফিরে পাবে না
তুমি ব্যাধিহীন জীবন। যতটুকু পার, অনুশীলন কর, ব্যত্যয়হীন।  
যা করে আনন্দ পাও, সেটাই কর। আবার শিশুকালে ফিরে যাবে,
তবে এবারে মাতৃহীন। নার্সনির্ভর শয্যামুখি জীবনের জন্য প্রস্তুত হও!  


এতকাল গড়ে তোলা তোমার সম্পদের মৌবনে আকৃষ্ট হবে মৌলোভী
নানা ভ্রমর। ফন্দি ফিকিরে, মিষ্টি কথায় তোমাকে ভোলাবে অনুক্ষণ।
যতক্ষণ জ্ঞান থাকে, তাদেরে পরিহার করো। জীবনের শেষ পথটুকু চলা  
বড় কষ্টের হয়, অনুজ্জ্বল, অস্পষ্ট দৃষ্টিশক্তি নিয়ে। কোন অভিযোগ নয়,
কোন গর্ব নয়, বিনীত হও; প্রকৃতির রীতিই জীবনের নীতি- মেনে নাও!    


মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০    


পাদটীকাঃ চীনা ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং চিন্তাবিদ Zhou Daxin তার “The Sky Gets Dark, Slowly” নিবন্ধে লিখেছেন, মধ্য বয়সের পর থেকে কিভাবে মানুষ ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে থাকে। ষাটোর্ধ্ব মানুষ কিভাবে বয়স বাড়ার এ প্রক্রিয়াকে সাবলীল মাধুর্যে, শোভন ও মার্জিত আচরণে আত্মস্থ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বয়সে তিনি আমার চেয়ে দুই বছরের বড়, তাই বোধহয় প্রায় সমবয়সী হবার কারণে তার কথাগুলোকে আমি অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পেরেছি। তার এ নিবন্ধটি পড়ার পর, আমি আমার ভাবনাগুলোকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিলাম, মূলতঃ তারই কথাগুলো স্মরণ করে। কবিতাটি তারই প্রতিফলন।  


Zhou Daxin তার আসল নাম ছাড়াও, ‘Pudu’ ছদ্মনামেও লিখে থাকেন। চীনের Henan প্রদেশের Dengzhou এ তিনি একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭০ সালে উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তিনি চীনা গণমুক্তি ফৌযে যোগদান করেছিলেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি দেশব্যপী দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিলেন। খাদ্যাভাব তাকে পীড়িত করেছিল, তাই মূলতঃ বিনামূল্যে খাদ্যলাভের আশায়ই তিনি গণমুক্তি ফৌযে যোগদান করেছিলেন, একথা তিনি তার অনেক লেখায় বলেছেন। সেখানে কিছুকাল কর্মরত থাকার পর ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি তার লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৯৮৫  সালে তিনি Xi’an Institute of Politics থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন এবং Lu Xun Literary Academy তে যোগদান করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি China Writers’ Association এ যোগদান করেন এবং ১৯৯৯ সালে চীনের Henan Literature Academy এর প্রেসিডেন্ট এর পদ অলংকৃত করেন। ২০০৮ সালে তিনি The Scenery of the Lake and the Mountain উপন্যাসের জন্য প্রখ্যাত Mao Dun সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন।