কেমন আছিস বাজান
------
কেমন আছিস বাজান তুই!
কতদিন হয় তোকে দেখি নাই,
আমার ঘরময় তোর পায়ের ছাপ খুঁজে মরি,
পুরনো কাপড়ে তোর গন্ধ খুঁজি,
সেই কবে বাড়ি এসেছিলি
তোর কি ছুটি হয় না বাপ?
তোর ঘরে কত দামী আর চকচকে নতুন জিনিস
সবই বুঝি বাজান,পুরনো আমি ওখানে বেমানান,
এ যুগের মানুষ তোরা, তোদের সাথে আমার কি মেলে!
তাই বড় অসহায় আর অকিঞ্চিৎকর মনে হয় নিজেকে,
তোর অস্বস্তি হয় এমন কিছু আমাকে মানায়!
তাই যেবার বড় মুখ করে নিয়ে গিয়েছিলি
তোর মুখে আমি কেমন জানি কষ্টের ছাপ দেখতে পেতাম।
নিজেই বলেছিলি "মা,ক'টা দিন বাড়ি গিয়ে থাকো,সময় হলে আবার
আসব নিয়ে",
কতদিন গেল, সেই সময় আর হয়ে উঠে না তোর,
আমি না হয় নাই বা গেলাম,বাজান তুই একবার আয়।
তোর মনে আছে সেই ছোটবেলায় তুই মাছ খেতে চাইতি না,
রোজ রোজ তোর ডিম খাওয়া চাই,
চকলেট,আইসক্রিম কত বায়না!
তোর বাবার কষ্ট হত যোগান দিতে,
আমি লাউটা মুলাটা বিক্রি করে তোর শখ মেটাতাম।
আমার মুরগীর ডিম ছিল তোরই জন্য,
বাকিটা বিক্রি করে তোর কাজে লাগবে বলে রেখে দিতাম।
সেই যেবার তুই আমাকে তোর বাপের ভিটেয় রেখে গেলি
আসার সময় পথের দু'পাশে কত খাবারের দোকান,
আমার খুব আমিত্তি খেতে মন চাইছিল।
পাছে তোর রাগ লাগে,ভয়ে বলি নি।
মাঝে মাঝে আমি স্বপ্নে দেখি
আমার বাজান আমার জন্য পাতিল ভর্তি আমিত্তি এনেছে,
চোখ ভরে জল আসে,আমার বাজান মনের কথা পড়তে পারে তো!
ঘুম ভেঙে দেখি আমার খোলা জানালায় হু হু বাতাস বয়ে যায়,
পোষা বিড়াল আমার গা ঘেষে মিঁউ মিঁউ করে,আহ্লাদে।
কোথাও দেখি না তোকে।
বাজান আমি বুড়ো মানুষ,আমার কত কিছুই মনে টানে,
সব কি আমি বলি! নিজের লজ্জায় নিজেই মরি।
আমার জন্য কিছু আনতে হবে না বাপ,
তুই শুধু সময় করে একবার আসিস!
কতদিন তোকে নিজের হাতে পিঠা বানিয়ে পাতে দিই না,
সেই আগের মতন মায়ের আঁচল ধরে পিছু পিছু হাঁটবি
বায়না ধরবি শত শত,দেখ আমি তোর বায়না মেটাতে পারি কিনা!
আমার খালি ঘরদোরে কোনও শব্দ নেই,
তবু আমার কান কেবল ফোনের শব্দ শুনে,
মোবাইলে কোনও নাম্বার থাকে না,তোর ফোন বাজে না।
হয়তো তোর সময় নেই,আমার মত অবসর তুই তো নস,
রাজ্যের কাজ নিয়ে তোর মস্ত জগৎ এখন,
আর একদিন ছিল তোকে নিয়ে আমার সমস্তটা জগৎ।
কখন এত বড় হয়ে গেলি!
আমার চোখের ভাসে কেবল তোর ছোট্টবেলার মুখ আর হাসি।
বাপজান, কতদিন আর বাঁচি
সময় করে একবার আসিস তুই,
কতদিন তোর মুখে মা ডাক শুনি না।
আমার কি আর কিছু লাগে বল্!
যখন তুই আমার পাশে এসে বসবি,বলবি "মা খিদে পেয়েছে
খেতে দাও"
সমস্ত জরা অতিক্রম করে আমি তখন নতুন জীবন ফিরে পাই।
"আমার বাজানের খিদে পেয়েছে"
যেখানে যা কিছু সাধ্য,জড়ো করে দিই,
"খা,বাজান,কত দিন নিজ হাতে তোকে খেতে দিই নি"।
এভাবেই কাটে বুড়ির একাকী দিন,
দিনের পর দিন যায় পথ চেয়ে,
চোখের ছাউনি আরও ঝাপসা হয় চোখের জলে।
বাজান আসে না,বাজান বড় চাকরি করে গো,
তার যে ছুটি নেই,ছুটিতেও তাকে ছুটি কাটাতে ব্যস্ত থাকতে হয়
অন্যসব আয়োজনে।
২৪/০১/২০২০