৫টি গদ্য কবিতা
খাতুনে জান্নাত
.........................
তুমি শুনতে পাও


কী যেন হচ্ছে কোথাও–কোন গোপন সন্ধি– কোন গূঢ় আয়োজন! স্রোতের শেওলায় জড়িয়ে থাকা ইচ্ছে-মাছ; কোথাও অভিন্ন আর্তনাদ, পাথর বা কয়লার গুড়ো ভাবনার চোখে। চিতাবাঘের চামড়া লেপ্টে স্বপ্নে মায়াকণায়। হারিয়ে হারিয়ে স্মৃতির টুকরো ছবি ভেসে উঠে ক্ষত। নিঃস্তব্ধতার ফসিলে অস্পষ্ট শব্দ ও দহন কী লেখে? কোথাও জংলী লতা পায়ে নূপুরের মতো; তুমি কী শুনতে পাও জালের ঝপাৎ ধ্বনিতে জীবনের আয়োজন? শালুকের অভেদ্য আলোক, শামুকের নির্জন অভিসার। ভগ্নতার ফসিল বেয়ে নেমে যায় বাতিওলা পাহাড়ের খাড়াই বেয়ে। সমরূপে শঙ্খপদধ্বনি আর মরা বিড়ালের উৎসব! তুমি কী বুনছো বিরহের মাতমমোড়া সংসারী ছায়াঘর!


কামারের হাঁপর যেন দিনকাল


গলিটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। দু একজন করোনা পরিত্রাণ মাস্ক পরিহীত কাতরায় ‘ অক্সিজেন অক্সিজেন ‘–চুরি হয়ে গেছে হসপিটাল। কামারের হাঁপরের হাওয়া দিনগুলো। বৈজ্ঞানিক ল্যাব সুদখোর মহাজনীয় পানাগার। ভাঙা হাত-পা, ফুলে ওঠা কণ্ঠনালী, ক্লান্ত জরায়ু, হৃৎপিণ্ডের কাতরানি শুনছে না কেউ। বরফ যুগে চাপা উৎসবকাল । কেউ মাখছে না ভোরের ভৈরবী, সাঁঝের ইমন। ঝাঁপ ফেলা রাতের বেহাগ ভুল করে কোয়ারেন্টিনে থাকা দুঃসময়। বিশ্বাস যেন অতিথি পাখি সেও পরে আছে করোনা পোশাক।


সন্ধি


কাচভাঙা সময়ের উরু বেয়ে উঠছি সন্ধির বালুতটে।পাঁজরের ক্ষত, মৃত দিনলিপি, ঠোঁটে প্রাকৃত জনের বিচ্ছেদের গান। আমরা চলছি, যে পথ ভেঙে গেছে হাজার বছরের বাঁক বদলের ফাঁক গলে। কোথাও দলিত জনের আর্তনাদ, কোথাও মেনি বিড়ালের মতো ভিজে যাওয়া উৎসব, নবান্নের পালাগান। কণ্ঠে শীলার মতো বিলাস বৈভব । অচেনা পালক অদল-বদল; ধরা যায় না আসল রঙ ও ভেদ। অচেনা সময় লিখে অচেনা পল্লবিত বৃক্ষ ও নটিনি নদের গান। পাখার শব্দে দূর্বা-শিশির চোখ মোছে, আঙুলের স্পর্শ বাঁচিয়ে রাখার প্রজ্ঞা ও পূণঃর্গঠনের ছাপ ছোট কুঁড়েঘরে; সে ঘরও ভেঙে যায় আম্পান ঝড়ে…


আহরণ


না ঘুমানো প্রসবপ্রসু রাত। নিঃসঙ্গতার বালিশে হেলান দিয়ে অতলছোঁয়া মিহিভাবনা তুমি লিখে নিতে পারো। কৌশলে কেউ কেউ ভেঙে দেয় ইচ্ছে ডানা, চলনের কৃৎকৌশল। তোমার চোখের আর্দ্র আভার মতো স্বচ্ছ আকাশ কোথাও দেখি না। পাতিহাঁস ডানার বিকেলে লাল জলপাই পাতার নূপুর, কড়ি কুড়ুনির জংধরা গীতে শিউলিতলায় কোরাসের হুড়মুড়। শিশুদের সাঁতারের ঝাঁকে ঢেউখেলা গুঁড়িপানা। এসব আনন্দ নিকেতন ধরে হারিয়ে যাওয়া গল্পের মোহনায়! কুঠারের কাব্যহরণের কুহকে বৃক্ষদের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করি। নিপবন ছেড়ে প্রান্তরে খোলা কুমুদিনী সভায় অভিসার ভেলা । নক্ষত্রের ইশারায় পাঠাই বৃক্ষের চিঠি মানসমণ্ডলে; হরিৎ বিকেল গা এলিয়ে হাসে। এই যে পথের সরল সমীকরণ, এই যে হন্যে হয়ে নিজেকে খোঁজা সে তো তোমার ঝিনুক চোখের মায়ার আহরণ ।


শিল্প সময়


তুমি ঠিক কোমল কোমল মেহগনি ফুল! বিকেলের নীরব ওষ্ঠে ফোঁটা ফোঁটা মৌ। কার্বন মোড়ানো সংসার, চালতা-মন আবৃত চোখে আগ্রহী পুঞ্জাক্ষী। ভুলভুলাইয়া ঝড়ে ডুমুরের মতো সৃষ্টি-আদিকূল। যখন সৌন্দর্যের প্রাণপিয়াসীরা দুর্বৃত্তের কামমুকুল; হাতের তালুতে নাচে মণিবাঁধা সাপ। বিষপ্রসবিনী মায়েরা মাঘের থ্যাঁতলানো কোমর জড়িয়ে। এর মাঝে তোমার কথাগুচ্ছ মৌমাছি গুঞ্জনে আহ্লাদী পানসী ঘাটের ভাটিয়ালি। আরো দূরে সর্ষের আলোর মতো সরল মানুষের কুটির জীবন। স্পর্শ করুক বিমূর্ত-মূর্ত ও মুক্তির অনন্ত শ্লোগান। মিছিলের আগেভাগে উজ্জ্বল তরুণীর উড়ু আঁচল মনি সিং, ইলা মিত্র স্মরণ। সংগ্রাম-সাম্যতা জীবনের পাদদেশে রক্তিমাভা। বিবর্তিত হও অটল সেগুন আর মটরশুঁটি মায়াডাল; রঙধনু-কাল শিল্পপায়ে হেঁটে যাক অনাগত আগামীর চোখে। পথ পিছলে না পড়ার দৃঢ়তায় ইস্পাত কঠিন হেনরী হাতুড়ি; ভেঙে দাও চুকবুক লালাধারী বিবশ বিবেক বা বিবেকহীন চুলবুলের ঢেউ খেলা দমবন্ধ পাণ্ডুর সময়।