নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী "কবিতার ক্লাশ" বইয়ে কবিদের উদ্দেশ্যে কবিতায় একটি ভাষণ দিয়েছেন (কবিকঙ্কণের ভাষণ)।  আমার মনে হল কবিতার আসরে আমাদের মত যারা কবিতা লিখি বা লেখেন তাদের জন্য এ ভাষণ খুব প্রাসঙ্গিক।  তাই সকলের মতামত ও আলোচনার জন্য সে ভাষণের কিছুটা উদ্ধৃতি করলাম --  


কবিতা লেখা কি কাজের (বা কর্মের) মধ্যে পড়ে? এই প্রসঙ্গে -


"তেমনি কবিতা লেখা কর্ম যদি হয়,
কবিকেও লোকে কর্মী বলিত নিশ্চয়।
কিন্তু যে কবিতা লেখে, শিশু বৃদ্ধ নারী
সকলেই বলে তাকে 'অকর্মার ধাড়ি'।
আশান্তিতে জ্বলে সদা কবির সংসার,
ভাই বন্ধু সকলেই নিন্দা করে তার।"


কবি হতে চাইলে কি করতে হবে উনি তাও লিখেছেন ----

"ঠিক করো, কবি কিংবা কর্মবীর হবে।
পিতার ধমক, মুদি যাবদের তাড়া,
বন্ধুদের ব্যঙ্গ, গৃহিণীর মুখনাড়া,
কোনোদিকে কিছুমাত্র দৃষ্টি নাহি হেনে,
সবকিছু 'ললাটস্য লিখনং’ জেনে
তবু পদ্য লিখিবার ইচ্ছা যদি হয়
মাঝে-মাঝে দুই ছত্র লিখিবা নিশ্চয়।
নিত্যও লিখিতে পারো, তবে কথা এই,
যত কবি বঙ্গে, তত পাঠক তো নেই।"


মনে হয় উনি আমাদের কবিতার এই আসরে আমরা যারা কবিতা লিখি ও লিখতে চাই তাদেরর কথাও ভেবেছিলেন তখন। আমাদের এখানে পাঠকের থেকে কবির সংখ্যা অনেক অনেক বেশী।


পাঠক কম বলে কি আমরা আক্ষেপ করবো বা কবিতা লেখা বন্ধ করে দেবো? উনি সমাধান দিয়েছেন ...


"আর যদি পাঠকের না করো পরোয়া,
তাহলে উত্তম কথা, সে তো বারো পোয়া।
সকালে লিখিয়ো তবে, দুপুরে লিখিয়ো,
বিকালে লিখিয়ো, শুধু রাত্রে ঘুম দিয়ো।"


উপরের কথাগুলি আমাদের এই আসরের কবিদের জন্য খুবই সত্য বলে মনে হয়।


তিনি আমাদের লেখা কবিতার মান নিয়েও বোধ হয় ভেবেছিলেন। তাই আরো উপদেশ দিয়েছেন -

"কবিকঙ্কণের কথা শেষ হৈল, আর
কথা নাই কিছু, যাও, সকলে এবার
তত পদ্য লেখো বাছা, যত ইচ্ছা হয়,
শুধু এক অনুরোধ, রাখিবা নিশ্চয়।
দৈনিক কাগজে পদ্য নাহি যায় ছাপা—
নিতান্ত সহজ কথা, মনে রেখে বাপা।
সুতরাং লেখো পদ্য হাজারে হাজারে,
কিন্তু তাহা পাঠিয়ো না ‘আনন্দবাজারে’।"


অর্থাৎ দিনরাত সকাল-সন্ধ্যা-রাত-বিরাতে হাজার হাজার কবিতা লিখলেও এ সব কবিতা সত্যি সত্যি কবিতা হয়ে ওঠে কী?