আমার প্রেমের ঠাকুর


মণীষ


ছোট্টবেলার একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি । মামার বাড়ি গেছি । ভোরে ওঠা বরাবরের স্বভাব । মাঠে গিয়ে দেখি ধানক্ষেতের শেষে দিগন্তের রেখা ছুঁয়ে সূর্য উঠছে । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি । পেছনে দাদুমণি । আমি তাকে বললাম, "জানো দাদুমণি আমাদের সূর্যটা তোমাদের মতো নয় । "
দাদু হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়ে বললেন, " দাদা,  তোমার আর আমার একটাই সূর্য । যেটা তোমাদের ওখানে দেখ সেই সেটাই এখানে দেখছ ।" তখনকার মতো মেনে নিলেও মনে নিতে পারিনি ।


আজ ২৫শে বৈশাখ । আজ আমার ঠাকুরের জন্মদিন । দিনটি আমার কাছে স্বাধীনতা দিবসের মত পবিত্র । কারণ এই মানুষটিই প্রথম আমাদের চিন্তা ও চেতনার স্বাধীনতা দিয়েছেন ।
কবির সাহিত্যের বিষয়ে কিছু বলার মত শিক্ষা বা জ্ঞান কিছুই আমার নেই  । সেই ধৃষ্টতা দেখানোর চেষ্টাও করব না ।


কবির সাথে  প্রথম পরিচয় - স্কুল জীবনে পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোন সাহিত্যের বই পড়িনি । আর ঠাকুরের বই বলতে গেলে সেই প্রাথমিকের সহজ পাঠ দুটি ভাগ । এর অবশ্য একটা অন্য কারণও ছিল । সেটি সম্পূর্ণ আর্থসামাজিক । আমাদের মত প্রান্তিক শ্রেণীর  ( বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর । ) পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কোনরকমে একটা স্থায়ী চাকরি জোগাড় করা । সরকারি হলে তো কথাই নেই । বেকার যুবক  (শিক্ষিত হলেও ) সমাজে অবহেলার শিকার । প্রতিটি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে যেহেতু ইংরেজি, গণিত আর বিজ্ঞানের দাপাদাপি তাই সেদিকেই সব ভালোবাসা ।


মাধ্যমিক পর্যন্ত বুঝতে পারিনি বাঙালি তথা ভারতীয়দের জীবনে গুরুদেব কে,কী এবং কেন ।  সত্যি বলতে কি শ্মশ্রু-গুম্ফ শোভিত বৃদ্ধের বেশি কিছু মনে হয়নি । আসলে ওনার এই ছবিটা এত বেশি প্রচলিত ছিল যে ওই ধরণের ভাবনার জন্ম হয়েছিল । এমনকি তিনি যে কখনো যুবক ছিলেন তাও ভাবিনি । এটি অবশ্য মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।


যাইহোক আমার জীবনে তারপর ঘটে গেল এক বিপর্যয় । মনে হয় না ঘটলেই ভাল হত। আজ তাহলে এতকিছু লিখতে হত না । বিপর্যয় বলছি একারণে যে ঘটনার সূত্রপাত ছোট হলেও প্রভাব হল সুদূরপ্রসারী।
তখন স্কুলে একটি কুইজ হয়েছিল । সাহিত্যের একটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল । যথারীতি আমি তার উত্তর দিতে পারিনি এবং হেরে যাই । বাড়িতে ফিরে এলাম কালো মুখ করে । পরদিন শ্রীযুক্ত শৈলেন দাস  (শিক্ষক ) মহাশয় তার নিজের লাইব্রেরীর কার্ড আমাকে দিয়ে দিলেন । প্রথম যে উপন্যাসটি পড়ে ফেললাম সেটি হল আমার ঠাকুরের "শেষের কবিতা "। আমার সাড়ে সর্বনাশের শুরু ।
যাকগে সেসব কথা ।


আজ প্রৌঢ়ত্বের দ্বারে এসে যৎসামান্য যেটুকু বুঝেছি তাতে কিছু মোটা দাগের কথা উঠে এসেছে । একে একে সেগুলো বলছি ।
১>  কবির সৃষ্টির জগৎ যেন একটা মারণ নেশার মহাসমুদ্র । যে একচুমুক দিয়েছে তার তলিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই ।


২> মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সুপুরুষ । এ যুগে জন্মালে যেকোনো সিনেমার নায়ক ম্লান হয়ে যেত ।


৩> মানুষ দু'ধরণের হয়। ফ্যাশনেবল অথবা স্টাইলিস্ট। ফ্যাশনেবল মানুষের কোন নিজস্বতা নেই । যখন বাজারে যেটি চলে সেটিকে অনুকরণ করে মাত্র । কবি মানুষ হিসেবে মোটেও ফ্যাশনেবল নয়। তিনি স্টাইলিস্ট । সবকিছুতেই তার একটা নিজস্ব সিগনেচার আছে । বাকী সবাই সেটা অনুসরণ বা অনুকরণ করে । নিমাই মিশ্রকে বাদ দিলে তিনি মনে হয় বাঙালির প্রথম স্টাইল আইকন । জনপ্রিয়তার শীর্ষে ।
একথা বলার কারণ আছে । যেমন বাঙালির হাতের লেখা । প্রায় সব শিক্ষিত বাঙালি রাবীন্দ্রিক ছাঁদে লিখতে ভালোবাসেন । তাঁর আগে বাঙালি জাতি কিভাবে হরফ লিখত অনেকেই জানেন না । এছাড়া পোশাক এবং নিজের Outlook.  যুবক কবির দাড়িসহ যে ছবিগুলো আমরা দেখি তার অনুকরণ করেনি সংস্কৃতি জগতে এমন বাঙালি আজও খুঁজে পাওয়া ভার ।


৪> সম্ভবত সারা বিশ্বে ইনিই একমাত্র কবি যিনি একটি ভাষাকে তার শৈশবের অবস্থা থেকে হাত ধরে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রায় একক প্রচেষ্টায়। আজ পৃথিবীতে তাই রবীন্দ্রনাথঠাকুর আর বাংলা সাহিত্য প্রায় সমার্থক শব্দ ।
আর কোন ভাষায় হয়তো এরকম একজন সর্বগ্রাসী  ( ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ আর কোন শব্দ এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না ) কবি নেই যিনি একাই নব্বই  । বাকী সবাই মিলে দশ। এটা অবশ্য একান্তই  আমার  মত । পক্ষপাতদুষ্ট হলেও কিছু করার নেই । একটা মানুষের সারাটাজীবন কেটে যাবে অনায়াসে রবীন্দ্রসাগরে  সাঁতার কাটতে ।


৫> তিনি এই দেশের একজন শ্রেষ্ঠ উদ্যোগপতি এবং কর্মসংস্থাপক। একটু ভেবে দেখলে দেখা যাবে যে বিগত প্রায় দেড়শো বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কয়েক লক্ষ মানুষের জন্য অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলেন । সেটা  সিনেমা,  গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটক, আলোচনা, গবেষণা বা ছবি আঁকা যাই হোক না কেন । শুধু তার বই ছাপিয়ে এবং বেচে বাঙালি জাতি তার ব্যবসার দুর্নাম ঘোচাতে চেষ্টা করে । In true letter and spirit "one man industry ".


৭> সময়ের সদ্ব্যবহার । একজন মানুষের পক্ষে একটি জীবনে এতকিছু কি করে করা সম্ভব!  কোনো সুপার হিরোর থেকে কোনও অংশে কম না । বুঝতে পারিনা উনি legend না myth.  সত্যিই কি রক্ত মাংসের মানুষ!


৮> বাঙালি জাতির ইতিহাসে এরকম প্রেমিক পুরুষ আগে কখনো দেখিনি । পরেও হবে কিনা সন্দেহ । ওনাকে বা ওনার মত মানুষকে  মনে মনে প্রেম নিবেদন করেনি এমন বাঙালি  নারী বিরল। নারীদের
কথা  ছেড়েই দিলাম । প্রথম যেদিন ওনার "কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া " গানটা শুনেছিলাম সেদিন আমার পাগল পাগল দশা । মনে হয়েছিল ইস্ সেইযুগে যদি আমার নারীজন্ম হত তাহলে নির্ঘাত আমি কবিকে প্রেম নিবেদন করতাম ।


৯> উনি মনে হচ্ছে সাম্যবাদী না । নতুবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সাহিত্য  সৃষ্টির  জন্য  কিছু বাকি রেখে যেতেন । উনি একাই হিমালয়। ওনাকে দেখার পর আর কিছু নজরে পড়ে না ।


যাইহোক পরিশেষে ফিরে যাই  যেখানে শুরু করেছিলাম । সেইদিন যেমন সূর্যের বিষয়ে  দাদুমণির কথা মেনে নিয়েছিলাম কিন্তু মনে নিইনি  তেমনি আজও মনে হয় কবি হয়তো কবিতাগুলো শুধুমাত্র  আমার জন্য লিখেছেন। কবি শুধুমাত্র আমার একার । আমি কাউকে ভাগ দেব না । কবি যে সবার সেটাই তো আমি আজও মনে নিতে  পারিনা ।


কবি তুমি  আমার প্রাণের ঠাকুর
প্রেমের ঠাকুর, অনুভবের ঠাকুর
একাকীত্বের ঠাকুর, নৈবেদ্যের ঠাকুর
নির্জনে পূজি তোমারে সদা সঙ্গোপনে ।