মূলত আব্বার প্রেরণায়, পত্রিকা পড়ার সূত্রে আম্মার হাত ধরে, উর্দূ কবিতার খর-তটিনীতে অবগাহনের প্রয়াস পেয়েছিলাম। মীর, যওক্ব, গালিব, বাহাদুর শাহ জাফর, মিয়া মোমিন, দাগ, হালি যেনো সেই দরিয়ায় এক এক তীর-ভাঙা ঢেউ। কিন্তু আমি কে? কী আমার পরিচয়? কোথা হতে আসা? কোথায় ফেরা? - এ সকল দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে যার কবিতার মন ও দেহ দগদগে উৎকীর্ণ, তিনি আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল রহঃ (জন্মঃ ৯ নভেম্বর, ১৮৭৭; শিয়ালকোট, পাকিস্তান - মৃত্যুঃ ২১ এপ্রিল, ১৯৩৮; লাহোর, পাকিস্তান)। তিনি উপদেশক। উপদেশ - কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে, যার লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ, যার উপস্থাপনিক অবলম্বন মানব-সাধ্যের সর্বোচ্চ দরদ-মন্ডিত কাব্য-ভাষা। তাঁর এমনি বিপুল সৃষ্টি-সম্ভারের মাঝে উর্দূ কাব্যগ্রন্থ ‘বাঙ্গ-ই-দারা’-র অন্তর্ভুক্ত ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ কবিতা দু’টি বোদ্ধাজনদের কাছে magnum opus হিসেবে বিদিত।


হাঁ, সাধারণ পাঠক উপরোক্ত সকলকে শায়ের বা কবি হিসেবে জানেন। কেউ কেউ বলেন সুফী কবি। আমি বলবো দার্শনিক কবি বলাই যুক্তি-যুক্ত। কেনোনা (দ্বাদশ শতাব্দিতে নিওপ্লেটোনিস্ট মুসলিম দার্শনিকদের দ্বারা বহু-ব্যবহৃত শব্দ) ‘সুফী’ বলতে আজ (একবিংশ শতাব্দিতে) প্রকৃত পক্ষে কী বুঝানো হয় ও লোকে কী বুঝে - তা এক অতি বিতর্কিত বিষয়, যেখানে “ইলমে তাসাউফ”-এর রয়েছে দু’-হাজারেরও বেশী ডেফিনিশন (আহমেদ যাররুখ)।


বিষয় ভিত্তিক ব্যু্ৎপত্তি, আল্লাহ প্রদত্ত এষণা ও পরখ-দক্ষতা ইকবালের সহায়ক ছিলো। ধর্মতত্ত্বের দার্শনিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে গিয়ে তার পূর্বসুরি মুসলিম দার্শনিকেরা যখন নিওপ্লেটোনিক চিন্তা ও বিশ্লেষণের ইসলামী করণে তথৈবচ অবস্থায় ছিলেন, ইমাম গাযযালী (রহঃ) নিজেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার প্রতিকার বিধানের। কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার পূর্বে তাই গাযযালীকে (রহঃ) নিতে হয়েছিলো দর্শন বিদ্যায় সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ (championship)। ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’ ও ‘এহইয়া উলুমুদ্দীন’ সেই সংকল্পেরই ফসল। তেমনি ইকবালের প্রস্তুতিও ছিলো ব্যাপক। যশশূন্য, শৌর্যশূন্য ও স্বপ্নশূন্য জাতিকে ‘খেলাফত আলা মিনহাজুন নাবুয়াত’-এর সোনালী যুগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে তিনি ঈমানী দায়িত্ব জেনেছিলেন।


যুদ্ধে পেশাদার সৈন্যবাহিনীকে পরাস্ত করতে যেমন প্রয়োজন হয় সামরিক প্রশিক্ষণের, রোগ প্রতিষেধের নিমিত্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে যেমন খতিয়ে দেখতে হয় রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহকে, তেমনি ইকবালকে বিশ্ব-মুসলিমের দুর্দশার প্রতিবিধানের জন্য মুসলিম দর্শন, পাশ্চাত্য দর্শন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ঘাটাতে হয়েছে একজন বিশেষজ্ঞের সতর্ক-সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে। তার সামনে ছিলো মুসলিম দার্শনিকদের পরস্পর বিরোধী বিপুল রচনা সম্ভার, আর দার্শনিক কবিদের পারস্য ঘরানার (non-sunni, safavid) কাব্যকুশলতা ও ভাবাবেগ দ্বারা সঞ্চালিত নজম, রুবাইয়্যাত, মসনবী, গযল ও মুসাদ্দাস। দ্বাদশ শতাব্দি থেকে ইকবালের কাল পর্যন্ত দার্শনিক লেখক ও কবিগণ এক অতি ব্যস্থ কাল অতিবাহিত করেছেন ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (unity of oneness)-এর স্বরূপ নিরূপণে, যে দর্শনের স্বপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) পক্ষ থেকে কোন দলীল নেই। আজ বলা হচ্ছে বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। আফসোসের বিষয় - যে অপার শক্তির অপচয় হয়েছিলো জটিল দর্শন চর্চায়, সেই একই শক্তিতে বাগদাদ কেন্দ্রিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা অব্যাহত থাকলে মুসলিম বিজ্ঞানীদের দ্বারা পার্থিব কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক মানোন্নয়নের সমন্বয়ে বিশ্ব-মানবতা সামষ্টিক ভাবে এক উন্নত মানবসভ্যতায় উন্নীত হতে পারতো। ইসলামী আইনবিদ ও ধর্মবেত্তাদের সতর্কবাণী তাদেরকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। এমনি প্রেক্ষাপটে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পথে নিজেকে সম্পূর্ণ সোপর্দ করে ইকবাল এগিয়ে এলেন দর্শনের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে, কবিত্বের উর্দিতে সুসজ্জিত হয়ে। পেশ করলেন ‘খুদি’ দর্শন। তার ‘খুদি’ হলো আত্মশুদ্ধিকে (আখলাক) আত্মশক্তিতে রূপান্তর করতে দৃঢ়সংকল্প মু’মিন বান্দার হৃদয়বৃত্তি (ইখলাস), যে আল্লাহর পথে নিজেকে সম্পূর্ণ সোপর্দ করার মাধ্যমে খলিফাতুল্লাহর (আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের) অবস্থানে সমাসীন দেখতে চায়, যে অবস্থানে পৌঁছার পর ইনসান বিভূষিত হয় ‘ইনসানে কামিল’ (পূর্ণাঙ্গ মানব; model human) হিসেবে, যেরকম ব্যক্তিত্বদেরে দেখা গিয়েছিলো খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ে এবং তৎপরবর্তীকালে, (রাসূল সাঃ কর্তৃক সাক্ষ্য প্রদত্ত) যে কাল ব্যাপৃত ছিলো তাঁর পরে আরো তিনশত বছর।


আল্লামা ইকবালের অমূল্য রচনাবলী হলো ----


আসরার-ই-খুদি (১৯১৫ – ফার্সি কবিতা)
রুমুয-ই-বেখুদি (১৯১৮ - ফার্সি কবিতা)
পায়াম-ই-মাশরিক্ব (১৯২৩ - ফার্সি কবিতা)
বাঙ্গ-ই-দারা (১৯২৪ - উর্দূ কবিতা)
যাবূর-ই-আজাম (১৯২৭ - ফার্সি কবিতা)
জাবিদ নামা (১৯৩২ - ফার্সি কবিতা)
বাল-ই-জিব্রীল (১৯৩৫ – উর্দূ কবিতা)
যারব-ই-কলিম (১৯৩৬ - উর্দূ কবিতা)
আরমাগান-ই-হিজায (১৯৩৮ – ফার্সি কবিতা)
The Development of Metaphysics in Persia (1908 – PhD thesis)
The Reconstruction of Religious Thought in Islam (1930- Lectures)


এ আলোচনার ক্ষুদ্র পরিসরে আর আমার দুর্বল কলমে আল্লামা ইকবালকে পরিস্ফূট করার তেমন অবকাশ নেই। তবু ইকবালের বিচক্ষণতার একটি দিক উল্লেখ না করলেই নয়। খোলাফায়ে রাশেদার ইনসাফ-ভিত্তিক সোনালী যুগের অবসান ত্বরান্বিত করেছিলো যে সকল কারণ তার মধ্যে খুবই গুরুত্বের একটি হলো পরবর্তীকালের শাসকবর্গের দ্বারা মানুষের বাক-স্বাধীনতা খর্ব করে দেয়া। এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়েছে অন্ধ-আনুগত্যের ধারণাকে। বনু উমাইয়া শাসকবর্গ ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে চরম অদৃষ্টবাদিতার যেমন প্রচারক ছিলেন, তেমনি তারাই ছিলেন আমীরের প্রতি আনুগত্যের নামে অন্ধ-আনুগত্যের প্রবর্তক। ফলশ্রুতিতে ইসলামের ইতিহাস হয়েছে বার বার কলঙ্কিত। দিগ্বিজয়ী শক্তি ও সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে সত্তেও মুসলমানেরা নিজেকে আর হারানো ঐতিহ্যে সমাসীন করতে সক্ষম হয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে
ব্যর্থ হলেন দার্শনিকেরা। কালজয়ী প্রতিথযশা দার্শনিক কবিদের রচনায় অন্ধ-আনুগত্য হয়ে উঠল মাকামে মনযিলে পৌঁছার এক অতীব প্রয়োজনীয় উপাদান।


হাফিয বললেন -
                  ‘বা-মি সেজদা রঙীন কুন গরত পীরে মুগান গোয়িদ
                  কে সালিক বেখবর নাবুদজ রাহ ও রোসম মনযিল হা’


অর্থাৎ পীর যদি বলেন তবে জায়নামাযকে রঙীন সিরাজিতে রাঙিয়ে দাও, কেননা পথ-প্রদর্শক কখনো গন্তব্যের পথ ও পদ্ধতির ব্যাপারে ভুল করতে পারেন না।


গালিব বল্লেন -
                 ‘পিলা দে ও’ক সে সাক্বি জো হাম সে নফরত হে
                  পিয়ালা আগর নেহি দেতা না দে শারাব তো দে’


অর্থাৎ হে সাক্বি! তুমি যখন আমাকে যোগ্য ভাবছো না, পদ্ধতি মতো পান পাত্রে ঢেলে দিতে চাওনা তো আমারও সমস্যা নেই। আমার শারাব চাই। তুমি আঁজলাতে ঢেলে পান করালেও আমি সন্তুষ্ট। উল্লেখ্য এখানে শারাব বলতে দ্বীন-ইসলামের  শিক্ষা, কাংখিত ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ, আল্লাহর সন্তুষ্টির কথাই বুঝানো হয়েছে। আর সেই সাফল্য অর্জনের জন্য পদ্ধতিকে বিসর্জন দিতেও তারা প্রস্তুত। প্রয়োজনে অন্ধ-আনুগত্যের পথে চলবেন তবু যদি কার্য সিদ্ধি হয়। কিন্তু আফসোসের সঙ্গে বলতে হয় উপরোক্ত দুই মহান কবির এরকম আবেগ ও প্রচার আল-কোরআন ও হাদীসে রাসূল সমর্থিত ‘চেক এন্ড ব্যালেন্স’ নীতির বিরোধী। খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবীগনের থেকেও এরকম আনুগত্যের কোন সমর্থন মেলেনা।


খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলিফা সাইয়্যেদেনা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) তাঁর প্রথম ভাষণেই ঘোষণা করলেন, ‘আমি যদি ভালো কাজ না করি, আপনারা আমাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া) অর্থাৎ একজন সাধারণ মুসলিমের যদি সত্যপথ থেকে স্খলন ঘটে, তাকে সাবধান ও সতর্ক করা এবং সত্যের উপর ফিরিয়ে আনা যেমন কোরআন নির্দেশিত ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ নীতির অনুসৃতি, তেমনি মুসলিম জাহানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে এই স্খলন ঘটলে তাঁর প্রতিও সেই একই দায়িত্ব পালন করা অধস্তন মু’মিনদের কর্তব্য। ইমাম, আমীর, ওস্তাদ বা পীরের দুস্কৃতিকে দুস্কৃতি না বলে আনুগত্য করে গেলে আল্লাহর আদেশের উল্লংঘনই হয়। একই ভাষণে তিনি আরো বলেন - ‘যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করি ততক্ষণ আপনারা আমার আনুগত্য করবেন। আর যদি আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্য হই তাহলে আমার আনুগত্য করতে আপনারা বাধ্য নন’।  তাঁর এ বক্তব্যে কোরআন পাকে নির্দেশিত ‘উলিল আমর’ (খলিফা, আমীর, ইমাম, পীর, দায়িত্বশীল) - এর প্রতি আনুগত্যের সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। আর হাদীসের কথা - ‘স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির প্রতি কোন আনুগত্য নেই।’


প্রথম খলিফা এরকম বলেছেন - কেননা পবিত্র কোরআনে আনুগত্যের ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন -

          “হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর অনুগত হও ও রাসূলের অনুগত হও এবং
           তোমাদের অন্তর্গত আদেশদাতাগণের; অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন
           বিষয়ে কোন মতবিরোধ হয়, তবে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও -
           যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাকো; এটাই কল্যাণকর
           ও শ্রেষ্ঠতর পরিণতি”।(সূরা আন-নিসাঃ ৫৯)


উপরোক্ত আয়াতে লক্ষণীয় যে,  আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ)-ই হচ্ছেন ইসলামে আইন প্রণয়ণের কর্তৃত্বের অধিকারী। কাজেই সকল ব্যাপারে চূড়ান্ত নির্দেশ ও বিধান পাওয়ার জন্যে সেই আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) দিকেই সরাসরিভাবে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তবে সামষ্টিক কাজের দায়িত্বশীলদের আনুগত্য হবে আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) আনুগত্যের শর্তভিত্তিক। এই কারণে মূল আয়াতে ‘আনুগত্য কর’ কথাটি আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু সামষ্টিক কাজের দায়িত্বশীলদের জন্য নতুন করে ‘আনুগত্য কর’ কথাটি বলা হয়নি। এও বলা হয়েছে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে অধস্তনদের মতবিরোধ হয়ে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে সরাসরি আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।


কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষায় প্রাজ্ঞ-হৃদয় ইকবাল ছিলেন অন্ধ-আনুগত্যের ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন -
                    
                  ‘নিশা পিলা কে গিরানা তো সব কো আ’তা হে
                   মযা তো জব হে কে গিরতোঁ কো থাম লে সাক্বি’


অর্থাৎ জ্ঞান দানের ছলে, প্রেমের ছলে আসক্ত ব্যক্তির পতন ঘটানো তো খুবই সহজ ব্যাপার। কিন্তু সেই সাক্বি, বা ওস্তাদ, বা পীরই প্রকৃত সাহায্যকারী যে পতনোন্মুখ ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে তার পতনকে রুখে দিতে পারে।


চারিদিকে অন্ধ-আনুগত্যের সয়লাব দেখে ইকবাল ক্ষোভ প্রকাশ করেন ---


                   ‘শের মরদোঁ সে হুয়া বেয়শায়ে তাহকিক তাহি
                   রেহ গায়ি সুফি ও মোল্লা কে গোলাম হে সাক্বি’


অর্থাৎ একদা আমীরের সামনে দাঁড়িয়ে তার কাজের জবাবদিহিতা চাইতেন - সেই সিংহ-হৃদয় লোকেদেরে আজ আর কোথাও দেখা যায়না। কল্যাণধর্মী সমাজ বিনির্মাণের জন্য যেখানে আমীর ও অধস্তনদের মধ্যে ক্ষমতার ‘চেক এন্ড ব্যালেন্স’ থাকা অত্যাবশ্যক, সেখানে দুনিয়া জুড়ে মুসলমান অন্ধ-আনুগত্যের বদৌলতে সুফী ও মৌলবী সাহেবদের গোলামে পরিণত হয়েছে।


জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংগঠন ও সাহসের মশাল তখন ইউরোপের হাতে। মুসলিম দেশগুলোর প্রায় সবগুলো অমুসলিম শক্তির দ্বারা হয় শাসিত, নয় তো চারিদিকে শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্বাধীনতার নাভিশ্বাস চলছে। তুরস্কে খেলাফতে ওসমানিয়া তখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে উপনীত। বালকান যুদ্ধে (১৯১২-১৯১৩) লাগাতার পরাজয় টেকাতে সকল প্রতিরোধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ। অনেক আগেই (১৮৫৭) হিন্দুস্তানে মুসলিম শাসনের পতন হয়েছে। গভীর হতাশায় নিমজ্জিত মুসলিম মানসে একটাই প্রশ্ন সেই বদর যুদ্ধের মতো প্রতিশ্রুত গায়েবী সাহায্য কবে আসবে? ইকবালের কাছে সোনালী অতীত ও বর্তমান দুরাবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ অভিযোগ-বান্ধব (শেকায়েত-পসন্দ) মুসলিম-জাতির অবচেতনে বিরাজমান সংশয়াবিষ্টতা, হতাশা, ক্ষোভকে পক্ষান্তরে আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করার ধৃষ্ঠতা বলে মনে হলো। ইকবাল এমন মানসিকতার দাঁতভাঙ্গা প্রতিউত্তর দেয়া কর্তব্য মনে করলেন। সেই সময় সন্ধিক্ষণে, ১৯১১ ইংরেজীতে, লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম’ এর বৈঠকে সর্বপ্রথম তিনি তার কালজয়ী কবিতা ‘শিকওয়া’ আবৃত্তি করলেন। আল্লাহর কাছে বান্দার অভিযোগ সরাসরি কথোপকথনের (dialogical theology) ঢঙে উত্থাপিত হলো। অভিযোগের সার হলো - অমুসলিমরা আল্লাহর সকল নেয়ামত ভোগ করছে। অথচ মুসলিম যারা নামায, রোযা, যিকির করছে এবং আল্লাহর যমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য তলোয়ার ধরলো, তারা আজ বিশ্বজুড়ে দুর্দশার শিকার। এ কেমন বিচার। ‘শিকওয়া’-র বিষয় ও আঙ্গিক অভিনবত্বে মুসলিম পাঠককুল ঝাকুনি খেলেন। স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির অভিযোগ থাকতে পারে কি? - এমন প্রশ্নে তর্কের ঝড় বইলো। কেউ কেউ সূরা ইউসুফের ৮৬নং আয়াত – ‘ইন্নামা আশকু বাস্সি ওয়া হুযনি ইলাল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতার অভিযোগ আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি’ – যা হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর সন্তানদেরকে বলেছিলেন – এর বরাত দিয়ে আল্লাহর কাছে অসহায় বান্দার সরল শেকায়েত বৈধ হিসেবে ব্যাখা দিয়েছেন। আর কেউ কেউ দিলেন সোজা-সাপ্টা ‘কাফের ফতোয়া’। ইকবাল কিছুকাল (দু বছর) নীরবে তার লেখার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলেন। তারপর (১৯১৩) লিখলেন ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ (অভিযোগের উত্তর)। ‘শিকওয়া’-র দ্বারা আল্লাহর প্রতি বান্দার সরাসরি অভিযোগের মতো হৃদয়গ্রাহী ঢঙে মুসলিম-মনে ঘাপটি মেরে থাকা শতাব্দিকালের ক্ষোভকে টেনে-হিঁচড়ে লোক সমুখে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোল্লেন। আর ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’-য় অকাট্য দলীল ও যুক্তির আঘাতে ঐ ভিত্তিহীন অভিযোগগুলোর ব্যবচ্ছেদ-ক্রিয়া সম্পন্ন হলো। ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’- কবিতা দু’টিকে মিলিয়ে পড়া প্রয়োজন। এ পর্যন্ত বোদ্ধা পাঠকদের কাছে কবিতা দুটি একই পরম্পরায় লিখা দুই কবিতা, কিংবা একই কবিতার দুই অবয়ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আল্লাহর প্রতি বান্দার কোন অভিযোগ থাকতে পারে - আল্লামা ইকবাল ছিলেন এমন চিন্তার ঘোর বিরোধী। প্রকৃতপক্ষে ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ লিখে তিনি প্রমাণ করলেন যে, আল্লাহর প্রতি বান্দার কোন অভিযোগ করার ভিত্তি নেই।  মূল পাঠে অভিযোগ ও অভিযোগ-খন্ডনের নমূনা হিসেবে নিম্নের পংক্তিগুলো লক্ষণীয়ঃ


অভিযোগ  ---


        “ক্বহর তো ইয়ে হে কে কাফির কো মিলে হুর ও ক্বসুর
         আওর বে-চারে মুসলমাঁ কো ফক্বত্ব ওয়াদায়ে হুর
         আব ও আলতাফ নেহি, হাম পে ইনায়েত নেহি
         বাত ইয়ে কিয়া হ্যায় কে পেহলি সি মদারাত নেহি?”


        [কেমনে কাফের পায় ভূলোকে জান্নাতি হুরী, প্রতিশ্রুত বালাখানা?
        বেচারা মুসলিম দেখে দিবাস্বপ্ন-ঘোরে সেই হুরীর চিকন গড়ন!
        নেই দয়া, নেই ভালোবাসা, তাহলে গেলো কি ছিড়ে অটুট পুরোনো বাঁধন?
        কেনো মুসলমানের হলো এ সর্বনাশ, আজ নেই কোন মূল্যায়ণ?]


অভিযোগের খন্ডন ---


       “কিয়া কাহাঁ? বহরে মুসলমাঁ হে ফক্বত ওয়াদায়ে হুর
        শিকওয়া বে’জা ভি করে কুই তো লাযিম হে শূর
        আদল হে ফাতির হাস্তি কা আযল সে দস্তুর
        মুসলিম আইয়ে হুয়া কাফির তো মিলে হুর ও ক্বসুর
        তুম মে হুরোঁ কা কুই চাহনে ওয়ালা হি নেহি
        জলওয়া তূর তো মউজুদ হে মূসা হি নেহি”


         [কী বললে? ঐ হুরী প্রাপ্তির ব্যাপারখানি ধৈর্যের ফাঁকা পরাকাষ্ঠা!
‘ফাঁকা’ অভিযোগটি ভুল সর্বৈব, আর বিবেকেরও নয় সম্পূরক;
আযলে নিহিত সত্য যে নীতির ভিত্তি; আমিই সেই নীতির স্রষ্টা;
কাফেরও মুসলিম হলে বালাখানা-হুর প্রতিশ্রুত ন্যায়ের এক ঝলক।
তোমাদের মাঝে প্রতিশ্রুত হুরী ও প্রাসাদ চাওয়ার মতো কেউ নেই;
সিনাই পাহাড় আজো অনির্বাণ; কেবল মূসার (আঃ) মতো আকাংখা নেই।]


ব্যবস্থা পত্র ---


        “আজ ভি হো জো ব্রাহীম কা ইমাঁ পয়দা
         আগ কর্ সাকতি হে আন্দাযে গুলিস্তাঁ পয়দা”


         [আজো হলে ইব্রাহীমের মতো বিশ্বাসের উচ্চকিত জয়ধ্বনি;
         হিংস্র আগুনের শিখা দেখাতে পারতো নয়নাভিরাম প্রদর্শনী!]


        “কী মুহাম্মদ (সাঃ) সে ওয়াফা তূনে তো হাম তেরে হে
         ইয়ে জাহাঁ চীয হে কিয়া লওহ ও কলম তেরে হে”


         [হয়েছো মুহাম্মদের (সাঃ) পথে পথিক তুমি; আমরা তোমার হয়ে গেলাম
         এই পৃথিবী কিছুই নয়; ভাগ্যের ‘কাগজ-কলম’ তোমাকে দিলাম]


প্রচলিত ধারনায় মহাকাব্যে উপস্থাপনিক ঘনঘটা ও রূপক আশ্রিত শব্দরাশির বাগাড়ম্বর থাকবে - সে অর্থে ‘শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া’ কোন মহাকাব্য নয়। কবি সচেতন ভাবে সে রীতি বর্জন করেছেন। কেননা একদা অর্জনের শৌর্য-শিখরে সমাসীন জাতিকে তার  অধঃপতনের দশায় পুনর্জাগরণ ঘটাবার জন্য যে ব্যষ্টি ও সামষ্টিক আত্মজিজ্ঞাসায় বিক্ষত করা দরকার, সেই প্রযত্নে উপস্থাপনা ও রূপকে বাগাড়ম্বর প্রয়াসি হওয়া প্রবঞ্চণার নামান্তর। এজন্য দেখা যায় আজ পর্যন্ত লেখা কোন মহাকাব্যই সংশ্লিষ্ট জাতির মানসগঠনে ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি। স্পষ্টতই এই একই কারণে প্লেটো ছিলেন হোমারের কঠোর সমালোচক। নিঃসন্দেহে ইকবাল এর ব্যতিক্রম। প্রাজ্ঞজনদের কাছে রোগগ্রস্থ মুসলিম জাতির  ডায়াগনসিস হিসেবে ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’-র পাঠ আজোবধি অতীব গুরুত্ববাহী, যেখানে একমাত্র ব্যবস্থাপত্র ‘আল-কোরআন ও সুন্নাহ’। নান্দনিক বিচারে মুসাদ্দাস আঙ্গিকে রচিত এ কবিতা দু’টি বিশ্ব-সাহিত্যে অনন্য সৃষ্টির মর্যাদায় আসীন। উচ্চাঙ্গের ভাষাশৈলী ও হৃদয়গ্রাহিতার কারণে আজো পৃথিবীতে বহুল পঠিত জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থের অন্যতম হলো ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’। উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে আল্লামা ইকবালের পংক্তিগুলো যেমন বিশেষ প্রেরণা যোগিয়েছে, তেমনি গোটা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মানুষের কাছে তার পংক্তিগুলো আজো ভাষা-ধর্ম নির্বিশেষে সমান অর্থবহ।


মুহতারমা উম্মে কুলসুমের যাদুকরী কন্ঠে উচ্চারিত ব্যাপক তোলপাড় তোলা আরবী অনুবাদ ‘হাদীস আল রুহ’ ও জনপ্রিয় ফার্সি অনুবাদের পাশাপাশি বিশ্বের প্রায় সকল ভাষায় কবিতা দুটি অনূদিত হয়েছে যুগ-জিজ্ঞাসার কারণেই। একই কারণে বাংলা ভাষায় অতি জনপ্রিয় ও কম পরিচিত মিলিয়ে চল্লিশ-এর অধিক সংখ্যক কবি এর স্বার্থক অনুবাদ করেছেন। সেই ধারা আজো অব্যাহত আছে।


বর্তমান কালে গুণীজনদের কিছু সংখ্যক, কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ও প্রচার মাধ্যমে আল্লামা ইকবালকে ‘শায়ের-ই-মাশরিক’ (poet of the East; প্রাচ্যের কবি) হিসেবে চিহ্নিত করণের ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য তো হলো কোন বিশেষ ভৌগলিক সীমানায় বা গোষ্ঠী বলয়ে ‘চীন ও আরব হামারা, ইয়ে হিন্দুস্তাঁ হামারা’-র কবির অবস্থান নির্ধারণ যথার্থ হবেনা। পবিত্র কোরআনে যে সর্বাঙ্গীন মুক্তির বাণী বিশ্বমানবতার তরে পেশ করা হয়েছে, তারই অনুসৃতিতে বিশ্বমানবতার পার্থিব ও পরলৌকিক মুক্তির জয়ধ্বনিতে ইকবালের কবিতা সদেরেগ উত্তুঙ্গ। নিজ ভূখন্ডে ‘মুফাখখারে পাকিস্তান’ (পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা), হাকিমুল উম্মাত (জাতির চিকিৎসক), এবং সরকারীভাবে জাতীয় কবির মর্যাদায় আসীন হওয়ার পাশাপাশি জার্মানির হেইডেলবার্গ শহরে তার সম্মানে সড়কের নাম করণ করা হয়েছে Iqbal-Ufer। একই প্রতীতিতে ইউনাইটেড স্টেইটস সুপ্রিম কোর্ট এর এসোসিয়েট জাস্টিস William O. Douglas এর মতো গুণীজনের কাছে ইকবাল-সাহিত্য অভিনন্দিত হয় - Iqbal’s beliefs had “universal appeal” এরকম স্বীকৃতিতে। সোভিয়েত লেখক N. P. Anikoy তার আল্লামা ইকবালের উপর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে বলেন - “[Iqbal is] great for his passionate condemnation of weak will and passiveness, his angry protest against inequality, discrimination and oppression in all forms i.e., economic, social, political, national, racial, religious, etc., his preaching of optimism, an active attitude towards life and man’s high purpose in the world, in a word, he is great for his assertion of the noble ideals and principles of humanism, democracy, peace and friendship among peoples”। একই কারণে ইরান বিপ্লবের প্রাক্কালে বোদ্ধামহলে যেমন তার কবিতা - বিশেষ করে ‘শিকওয়া’ ও ‘জওয়াব-ই-শিকওয়া’ কবিতা দু’টি ও ‘যাবূর-ই-আজাম’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা সমূহ আবৃত্তি হতো, তেমনি তৃনমূল পর্যায়ে - পার্কের ক্ষুদ্র জটলায়, আন্দোলনকারী মানুষের সমাবেশে, রাজপথের মিছিলে তার পংক্তি সমূহের আবৃত্তি ও পংক্তি লেখা ব্যানার-ফেস্টুন ছিলো বিশেষ প্রণোদনা ব্যঞ্জক। একালের চিন্তা-নায়কেরা আল্লামার আপোষহীন চিন্তা-চেতনা দ্বারা সম্যক প্রভাবিত।