জাকির হোসেন। ১২-১৩ বছরের এক শিশু। ১৩ জানুয়ারি, ২০১৫ সাভারের নবীনগরে দুর্র্বৃত্তদের আগুনে পুড়ে যায়। ২৩ জানুয়ারি রাতে হাসপাতালে মৃত্যু। কিন্তু অন্তিম সময়েও বাবা-মা ও স্বজনদের কারো খোঁজ মেলেনি। সেই জাকিরের জন্যে এই শোকগাথা...


এই মৃত্যু উপত্যকায় আমার বাস।
কত মৃত্যুর খবর পাই নিত্য,
অবশ্য সেসব অপমৃত্যুই বলাই শ্রেয়
তবু তোমার মৃত্যু আমাকেও হতাশ করেছে।


লাল-সবুজের যে সত্যকে বুকে বেধে
স্বপ্ন রচি, স্বপ্ন উড়াই
তার বুকে বাণ হেনেছে এ আগুন।


তবু আর যারা অঙ্গার হচ্ছে
তাদের মৃত্যুশয্যা পাশে হয়তো মা
চোখের জলে সন্তানের বুক ভিজিয়ে দিয়েছেন,
বেশেহতের শীতলতাও এর কাছে তুচ্ছ।
হয়তো বাবা বসে মাথায় হাত রেখেছেন
এই ভরসার কাছে মৃত্যু তুচ্ছ!


কিংবা ভাইবোনের প্রাণহীন চাহনি
অথবা সন্তানের, প্রিয়জনের মুখগুলো তাকে ঘিরে ছিল
সেই বা অনন্তের যাত্রীর কাছে কম কি?


তুমি পেলে না কিছুই, এমনকি বাবা-মার খোঁজ পর্যন্ত,
নিশুতি রাতে পোড়া শরীর নিয়ে অভিমানেই
তুমি চলে গেলে ভাই আমার, জাকির।


হয়ত তোমার মৃত্যুর সঙ্গেই মৃত্যুশয্যায় গেলো
গোটা বাংলাদেশ, সরকারযন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এমনকি মানবতাও!


গুপ্ত,বন্দী যারা বাসে আগুনের মহোৎসবে মেতেছে
হয়তো তারাও একদিন মসনদে যাবে,
তোমার লাশের পোড়া গন্ধে একদিন বিদায় নেবে
গণতন্ত্রের আর স্বাধীনতার স্বঘোষিত মালিকরা।
লুঙ্গি পড়ে রাস্তা দাবড়ানো মন্ত্রীশান্ত্রী বা
প্রেসক্লাবে আবাসিক সুবিধাভোগীরা।


কেবল তখন তুমিই রবেনা ভাই,
থাকবেনা তোমার মতো হাজারো দগ্ধ-অর্ধদগ্ধ জাকিরেরা।


বেচে থাকলেও হয়তো তুমিই একদিন হতে
লুঙ্গি পড়া, পিলার নাড়ানো, ঘুমিয়ে পড়া
তথ্য দাতা, রঙ হেডেড মন্ত্রীদের চেয়ে কিংবা
গৃহ আর অফিসবন্দী নেতাদের চেয়ে বড় নেতা।


তুমি হতে সীমান্ত খুলে এসে
রাজপথে মানুষ গুলি করার হুমকিদাতার চেয়েও
উচ্চতর মানবিক কোনো উর্দিধারী।
যে উর্দিধারী লাঠিয়াল গণতন্ত্রের নসিহত
আর নির্বাচনের মেয়াদের বার্তা শোনায়
তার চেয়েও বড় কেউ।
যে কর্তা মানবাধিকারের নামে গণতন্ত্র রক্ষার তারিখ জানায়
তাদের মুখোশ খুলে ফেলাদের কেউ।


যে কলম সৈনিক ক্ষমতার ছায়ায় ঘুরে
আর রাষ্ট্রযন্ত্রের অপশাসনের কীর্তন গেয়ে বেড়ায়
হয়তো হতে তাদের জন্য উদাহরণ
কিংবা প্রবাস বাসের নামে ইতিহাস বিকৃতির খেলায় মত্ত
কারো চেয়েও ভালো কেউ।


অথচ তুমি হলে একটা পোড়া শিশুর লাশ
আর নপুংশক বুদ্ধিজীবীদের কাছে একটা শোরগোলের উপলক্ষ্য
আম জনতার কাছে একটুখানি করুণা
আর মুহূর্তের কষ্টের খবর।
কাগজে-কলমে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমায় পোড়া বেওয়ারিশ লাশ।


তবু আমার কাছে তুমি পুড়ে যাওয়া বাংলাদেশ,
ঘুণে ধরা স্বাধীনতা আর
অন্তসারশূন্য প্রশাসনের উদ্ধত প্রতীক
স্বার্বভৌমত্বের সাবধানবাণী!


তোমারই মতন এই দেশ, এই পতাকা
আর আম জনতার পোড়া যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরের পাশে
এখন নেই বাবা-মা কিংবা স্বজন,
প্রিয় ভাই আমার, জাকির।


ঢাকা, ২৪.০১.২০১৫ইং