আপনারা যদি '৪৭য়ের আগে বাংলা কাব্যসাহিত্য লক্ষ করেন, তাহলে দেখবেন তা ছিল বহুমুখী।রবীন্দ্রনাথ,নজরুল, জীবনানন্দ ও জসীম উদদীন-এ চার জন জনপ্রিয় কবি একই রাজনৈতিক আবহাওয়ার মধ্যে বেড়ে উঠেছিল এবং একই রাজনৈতিক ঘটনাবলি এরা প্রত্যক্ষ করেছিল যেমন বঙ্গভঙ্গ,প্রথম মহা যুদ্ধ,অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দ্বিতীয় মহা যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ,দাঙ্গা ও সর্বশেষ দেশভাগ।আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাকি তিন জনই সমবয়স্ক ছিল। কিন্তু বয়স ও অবস্থার এত সমসাময়িকতা থাকা সত্ত্বেও এরা কেউই রাজনীতিকে এদের সাহিত্যের মূল উপলক্ষ করে নি; বরং দেখবেন তারা তাদের কাব্যচর্চার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে  বেছে নিয়েছে এবং এদের জনপ্রিয়তার কারণও ভিন্ন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ছিল সৌন্দর্যবিলাসী ও হিন্দুভাববাদী, নজরুল ছিল আত্ম-অহংকারী ও অভিমানী, জীবনানন্দ ছিল ভাবুক ও স্মৃতিকাতর, জসীম উদদীন ছিল কাহিনিনির্ভর পল্লীকবি।এখন এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক,ঠিক না? কারণ প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের স্বভাব একইরকমের হয় না,আর তাই সামনের জগতটাও তার কাছে একইভাবে ধরা দেয় না।আবার  মানুষ শুধু রাজনীতি নিয়েও বাঁচে না। তাই এই মানুষদের হাতে যে কবিতা গড়ে উঠবে তাও একইরকম হবে না এবং তেমনটাই আমরা '৪৭য়ের আগে বাংলা কাব্যসাহিত্যে দেখতে পাই। তাই '৪৭য়ের আগের  ধারাটিকে আমি বলবো কাব্যসাহিত্যের স্বাভাবিক স্বভাবজাত ধারা।  


কিন্তু আপনারা যদি '৪৭য়ের পর বাংলা কাব্যসাহিত্য লক্ষ করেন তাহলে দেখবেন তা পুরোপুরি একমুখী।এ সময়ে যে ক'জন কবি পরিচিতি লাভ করেছে যেমন শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক তাদের পরিচিতির মূল কারণই ইতিহাসচেতনা: মূলত ভাষাআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধনির্ভর; কিন্তু  এ চেতনাটা তাৎক্ষণিক উত্তেজনাপ্রসূত এবং তার প্রমাণ হচ্ছে তাদের কবিতার ভাষণশৈলী ও স্থায়িত্ব: আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি/ আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি, স্বাধীনতা তুমি/ রবি ঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান,ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়, এখন যৌবন যার/যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়...ইত্যাদি কবিতাগুলোর যতটুকু গুরুত্ব তা হচ্ছে এদের জ্বালাময়িতা।এর বাইরে কোনো সুচিন্তিত চেতনার প্রতিফলন কবিতাগুলোতে নেই। এখন সকলের এরূপ ইতিহাসঘেষা 'রেটোরিকাল' কবিতা লেখা কি অস্বাভাবিক নয়? মানুষের স্বভাবের প্রকৃতি অনুযায়ী তো এমনটা হয় না। তাহলে কি আমরা বলবো যে এ ধারাটা সম্পূর্ণরূপে সাজানো? আমার মত হচ্ছে '৪৭য়ের পর বাংলা কাব্যসাহিত্য হচ্ছে লোকরণ্জনবাদী সাহিত্য। লেখকরা সেখানে নিজেদের প্রাণশক্তির চাইতে নেতৃবৃন্দের  চাওয়াটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। আর তাই তারা খুব সহজে জনপ্রিয় হয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছে; কিন্তু ইতিহাসের বাইরে অন্যান্য কবিতাগুলো পঠিত হয় নি।