নারীবাদী কবিতা-১

নারীবাদী কবিতা-১
কবি রীনা তালুকদার
প্রকাশনী জাগ্রত সাহিত্য পরিষদ
প্রচ্ছদ শিল্পী রীনা তালুকদার
স্বত্ব ড : মো ইনামূল হক ও লাবন্য নাজ
সর্বশেষ সংস্করণ ২০১৪
বিক্রয় মূল্য ১৮০/-

সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

রীনা তালুকদারের নারীবাদী কবিতা-১
নারীবাদী চেতনার বাক্ পরিবর্তনের ইঙ্গিত
-ডঃ নাসরীন সুলতানা
---------------------

: বন্য যুগে নারীরা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। বন্যযুগের পর আদিম যুগ থেকে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে নারীজাতি হয়ে পড়ে পরাধীন শৃংঙ্খলিত এবং পুরুষের হাতে ক্রীড়নক। সভ্যতা যতো এগোতে থাকে নারী স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা গুলো হতে থাকে সুক্ষ। নারী অধিকার বঞ্চিত হয়ে ঘরে বাইরে শোষিত শাসিত অপমানিত বঞ্চিত লাঞ্ছিত হয়েও সকল দুঃখ যন্ত্রণা নির্যাতন বঞ্চনা সয়েও সভ্যতার অগ্রগতিতে অবদান রাখলেও কখনো তেমনভাবে আলোর পাদ প্রদীপে আসেনি। কিন্তু তাই বলে নারীরা এ অবদমন অবমনন মেনে নেয়নি। নিজের অবস্থান থেকে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছে নানাভাবে। প্রতিবাদী নারীদের এ সোচ্চারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কলম। আমরা দেখি যুগে যুগে দেশে দেশে নারীরা লেখনির মাধ্যমে নারী জাতির দুঃখ দুর্দশা তুলে ধরেছেন এবং নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছেন। এবং এতে করে একজন নারীর মধ্যে তার ব্যক্তি সত্তা জাগরিত হয়েছে। আমরা দেখে আসছি ব্যক্তি সত্তায় নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র বোধ থাকতে নেই। ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ নারীকে অধিকার সচেতন করে তোলে। অধিকার সচেতন নারী তার অধিকার অর্জনেও আদায়ে সর্বদা সোচ্চার ও সচেষ্ট থাকে। অধিকার ভোগে বিঘœ ঘটলেই সেই সব নারীরা হয় প্রতিবাদী এবং তার মধ্যে জেগে ওঠে শ্রেণী চেতনা বোধ। আর এ চেতনাকে সে অন্য নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সচেতন করে তোলে। ফলে সে নারী আত্ম সচেতন হয়ে তার মধ্যে আত্মমর্যাদা বোধ জেগে ওঠে। তখন শুরু হয় অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তখন নারীর সমাজের।
পুরুষরা বা নারীর চারপাশের পুরুষরা যেমন বাবা ভাই প্রেমিক, স্বামী-সহকর্মী এরা নারীর স্বতন্ত্রতায় বিশ্বাস করে না বরং এরা নারীর ব্যক্তি সত্তাকে অবদমিত করে রাখে। আবার এসব পুরুষদের থেকে অন্যদের মধ্যে এ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে এর চর্চা হতে হতে এ বিশ্বাস সমাজে দৃঢ়মূল হয়। এতে নারীর অধিকারও অধিকার আদায়ের পথ সীমিত হয়ে পড়ে। এতে করে নারীরা একান্ত ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া আনন্দ বেদনা থেকে বঞ্চিত হয়। তখন বঞ্চনা থেকে সৃষ্টি হয় আত্মপোলব্ধি। এ আত্মপোলব্ধি থেকে অধিকার সচেতনতা থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং অর্জনে। অধিকার সচেতনতা প্রত্যেকটি নারীর মধ্যে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এ বোধ জাগিয়ে তোলা। কবি রীনা তালুকদারের ‘নারীবাদী কবিতা-১’ কাব্যগ্রন্থে নারীবাদী চেতনার এ বোধ জাগিয়ে তোলার প্রয়াস আমরা দেখতে পাই। নারী স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের এক উচ্চকিত কণ্ট কবি রীনা তালুকদার। তবে ‘নারীবাদী কবিতা-১’ এ চেতনারই প্রকাশ। কবি এ কাব্য গ্রন্থের কবিতা গুলো পাঠে আমাদের যে ধারণা হয়েছে তা হলো যে মানুষ সহ্যাতীত বোধের অধিকারী সৃষ্টি কর্তা তাকে নারী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। নারীর ব্যক্তি ইচ্ছা আকাংঙ্খা কামনা বাসনা চাওয়া পাওয়া সঙ্কোচিত করে তার জীবনকে বিধিবদ্ধ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, নারীর মুক্ত চিন্তার পথ করেছে সীমায়িত। তাছাড়া আমরা দেখি নারীর মুক্ত চিন্তার পথ করেছে সীমাবদ্ধ। তাছাড়া আমরা দেখি নারীর চিন্তা চেতনা কখনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বিশেষ কোনো গোষ্ঠি বা সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে তার আত্মপোলব্ধির পথকে করেছে অবরুদ্ধ। এমন কি কখনো কখনো বিশেষ গোষ্ঠি ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য নানা তৎপরতা চালায়। অথচ ধর্মে বিশেষ কারে ইসলাম ধর্মে পবিত্র আল কোরআনে নারী পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নারী পুরুষের মর্যাদার প্রশ্নে সমতা রক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে দেয়া আছে। সুরা তাওবায় -এর ৭১ নং আয়াতে নারী পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘‘ওয়াল মুমিনূনা ওয়াল মু’মিনা তু বা’দ্বুহুম আওলিয়া -উ ’ বা’ দ্ব’ অর্থাৎ মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারী স্পরপর বন্ধু। নারী পুরুষের সমতা আল কোরানের সূরা আল-ইমরান এ ১৯৫ নং আয়াতে আছে- ‘উদ্বী’উ আমাল’ আমিলিম মিনকুম মিন জাকারিন আও উঞ্জা, বা’দ্বুকুম মিম্বাদ্ব’ অর্থাৎ তোমাদের কর্মনিষ্ঠ নর-নারীর কর্মফল আমি বিনষ্ট করিব না, তোমরা পরস্পর সমান (পৃঃ ৯৯)। উপর্যুক্ত উদ্ধতি থেকে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে নারী পুরুষের সামাজিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। অথচ এক শ্রেণীর পুরুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রেখে তার স্বাধীনতা হরণ করতে চায়। তাদের ধারণা বা মত নারীরা ঘরের বাহির হয়ে পুরুষের সাথে সামাজিকতা করলে ধর্ম বিনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু পবিত্র আল কোরানে স্পষ্ট নারী পুরুষের সামাজিক সম্পর্কের মতো প্রমতির কথাই বলা হয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে সুরা আল ইমরানে ধর্মীয় দৃষ্টিতে নারী পুরুষ পরস্পর সমান। অর্থাৎ অধিকারের প্রশ্নে কোনো উচু নিচু কম বেশি নয়। অথচ এক শ্রেণীর মানুষ বা কোনো কোনো গোষ্ঠি নারীদেরকে পর্দার কথা বলে শিক্ষা সহ নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করে আসছে। তাছাড়া আমাদের সংবিধানে নারী পুরুষের সম অধিকারের আইন রক্ষিত আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টি সমান।
‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’ (অনুচ্ছেদ -২৭)।

সংবিধানের উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদে সকল নাগরিক বলতে নারী পুরুষ উভয়কে বুঝিয়েছে। কাজেই ধর্মে এবং আমাদের সংবিধান তথা আইনে নারী পুরুষের মর্যাদা সমতা এবং অধিকার সমভাবে দেয়া আছে সেখানে নারীকে অবমূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। তবু কতিপয় পুরুষ কিছু কিছু ধর্মান্ধ গোষ্ঠি নারীকে ধর্মের অনুশাসনের কথা বলে তার শিক্ষা, কর্ম সহ নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে লেখনির মাধ্যমে দেশে দেশে যুগে যুগে। এসব লেখনি মাধ্যমের ওঠে আসছে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকারের কথা। নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার সচেতন কবি রীনা তালুকদার। তার নারীবাদী চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটেছে ‘নারীবাদী’ কবিতা-১ কাব্যগ্রন্থে। এ কাব্যগ্রন্থে কবি নারীবাদী চেতনার নানা ভাবনা স্থান পেয়েছে। আরোপিত হয়েছে সমকালীন ভাবনা। একই চেতনামূলক কবিতা হলেও কবির বিষয় ভাবনার বৈচিত্রতা রয়েছে। নারীরা যে নানা রকম বৈষম্যের শিকার তার জন্য স্বয়ং মহান সৃষ্টি কর্তার প্রতি রয়েছে কবির অনুযোগ অভিমান। আর এ রূপ অনুযোগকারী কবিতা গুলো হলো : নারীর মূল্যহীন জীবন, স্বৈরাচার, একিশ্বর, লিঙ্গভেদ। নারীবাদী কবিতাগুলোর মধ্যে পুরুষের ভোগবাদী রূপ উদঘাটিত হয়েছে। উন্মাদ, কৃষ্ণকুমার, অভিনয়, সভ্যতা ফিরে যাচ্ছে, মানুষও নারী, চন্ডীদাস প্রভৃতি কবিতায়। ধর্মের প্রতি বিক্ষুদ্ধ কবিমন : নারীমন, ধর্ম ইত্যাদি কবিতায়। অতৃপ্ত নারীমন : সঙ, বাকরুদ্ধ ভালোবাসা, দীর্ঘশ্বাস, বার্তা, যৌনশীত, নারীর প্রকৃত জীবন। চিত্রমূলক কবিতা : ফলের জীবন, সংখ্যালঘু নয়। নারীর মোহগ্রস্ততা থেকে মুক্তি ঃ ভালোবাসার মৃত্যু, ভালোবাসা পরগাছা। নারীর আত্মবোধন মূলক কবিতা : চাঁদ, সংখ্যালঘু নয়। প্রেমমূলক কবিতা : নাবালক প্রেম, আঘাত, হৃদয় ছুঁয়ে থাকো, নারী হৃদয়ের অনুভূতি: খসড়া, দেবদারুর মর্মরধ্বনি, ভাগরজনী, যৌনশীত, অনাহারী। নারীমুক্তির জয়গানমূলক কবিতা : দুঃখবতী বর্ষা, স্বাধীনতা ঘোমটা পরা, শ্রেণী সংগ্রাম, হারবো না আর, কৃষক, হার-জিৎ, নারী সমাজ। উপর্যুক্ত ভাবধারার কবিতা গুলোতে কবি নারীবাদী চেতনার বহুমাত্রিকতার যে বিশিষ্টগুলো দেখা যায় তা বিশদ আলোচনা করে এর যথার্থতা উপলব্ধি করা যায়। কবি রীনা তালুকদারের উপর্যুক্ত কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো বিষয়ভিত্তিক ভাবে আলোচনা করা যায়।

মহান সৃষ্টি কর্তার প্রতি অনুযোগ :
এ কবিতাগুলো পাঠে দেখা যায় সৃষ্টি জগতে অন্য প্রাণীকূল এবং প্রকৃতি যেখানে অবাধ উন্মুক্ত স্বাধীনতাও বিচরণ করছে সেখানে নারীকে প্রথাবদ্ধ জীবনে প্ররোচিত করা কখনো বাধ্য করা কোনো ব্যক্তি বিশেষ প্রতিষ্ঠান সমাজ বা রাষ্ট্র করছে না বরং জীব জগতের সৃষ্টিকর্তা যাকে বিভিন্ন ধর্মের আল্লাহ, ভগবান, প্রভু, ইশ্বর বলা হয় ; তিনি সীমায়িত গন্ডির মধ্যে নারীকে প্রতিষ্ঠা দেখিয়ে শৃঙ্খলিত করে রেখেছেন। তিনি তো মহান সৃষ্টি কর্তা, তিনি চাইলে নারীকে মুক্ত মানুষরূপে জগতে বিচরণের ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। অথচ তিনি তা করেননি। তাই কবি রীনা তালুকদার নারীবাদী চেতনার উৎকর্ষতা দেখিয়েছেন তার ‘নারীর মূল্যহীন জীবন’ কবিতায়। গতানুগতিক নারীবাদী চেতনায় আমরা নারীর প্রগতির অন্তরায় রূপে পুরুষকে উপস্থাপন এবং নারী পুরুষের অসমতা থাকলেও এখানে জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীকূল; প্রকৃতির সাথে নারীর অবস্থানের প্রশ্ন তোলে সৃষ্টিকর্তার হেয়ালীপনাকে উচ্চকিতভাবে তুলে ধরেছেন কবি। শুধু তাই নয় এ কবিতায় কবি মহান সৃষ্টিকর্তাকে পক্ষপাতদুষ্ট রূপে অভিহিত করেছেন দ্ব্যার্থহীন কণ্ঠে। জগতের সমস্ত চাওয়া পাওয়ার দায় মেটানো যেন শুধু নারীর। তাকে স্ববংসহা রূপে গড়ে তোলাই যেন তার অভিপ্রায় :
সব দুঃখ সইতে পারে বলে কী
নারীর রূপ দিয়েছ প্রভু

উপর্যুক্ত উব্ধৃতিতে থেকে বোঝা যায় নারীরা সংসারের শত জ্বালা যন্ত্রণা হাসিমুখে সয়ে জগতের কার্যভার গ্রহণ করা যেন তার নিয়তি। অথচ তার ব্যক্তিমনের কোনো মূল্য নেই। নেই তার ব্যক্তি স্বাধীনতা। অথচ জগতের উন্নতর প্রাণী নয় পাখি- তারও অবাধ স্বাধীনতা আছে। তার খেয়াল খুশি মতো যথায় তথায় বিচরণের অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করে এবং যথেচ্ছভাবে করতে পারে। বৃক্ষের জীবন বিস্তারে পাখিদের ভূমিকা আছে সেখানে ও সে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে :
পাখি ঠোঁটে বীজ নিয়ে মাইল পথ পেরিয়ে
জন্মায় অচেনা অজায়গায় বনবৃক্ষ
উপর্যুক্ত উদ্ধতিতে বনবৃক্ষ সৃষ্টিতে পাখির ইচ্ছায় মূল্য সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন। অথচ একজনে উর্বর নারী সন্তান জন্ম দিতে পারে না তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মীয় এবং আইনের শৃঙ্খলার বাইরে। অথচ বন্যযুগে একজন নারী স্বাধীনভাবে সন্তান নিতে পারত। পাখির চেয়ে সৃষ্টির সেরা মানুষ তথা নারী কত অসহায় তা কবির বেদনা মথিত কণ্ঠে ধ্বনি হয়েছে। নারী সে যে হোক মাতৃত্বই তার জীবনের পরম কাম্য এবং জীবনের সার্থকতা তা এ কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
শুধু তাই নয়। নিন্মস্তরের প্রাণী পশুরা পর্যন্ত তাদের জন্য সংরক্ষিত বাসভূমি বনজঙ্গল পেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বীর শ্রেষ্ঠ মানুষ তথা নারী তা পারে না। পরিবার সমাজ রাষ্ট্র নারীর চলাফেরাকে সীমায়িত করে রেখেছে। নারীকে নির্দিষ্ট সময় ও কাল মেনে চলতে হয় বা বাধ্য করা হয়। প্রকৃতি সময় সুযোগ মতো অবায়িত হয়। জলের যৌবন কাল হলো বর্ষা। জল যখন যৌবনবতী হয় তখন নদ নদী হাওর-বাওড়, পুকুর এমন কি ডোবার জল পর্যন্ত যৌবন বেগে অবাধ চঞ্চল উন্মুক্ত হয়ে মাঠ-ঘাট-সোনার ফসল ভাসিয়ে দিয়ে দুরন্ত দুর্বার বেগে ছোটে সাগরে গিয়ে মিলিত হয়। কিন্তু একজন নারী যৌবনবতী হলে তাকে চোখ রাঙিয়ে তার চারপাশে নিয়মের প্রাচীর তোলে তার যৌবনকে অবদমিত করে রাখা হয়। নারীর মানবিক আবেদনকে দলিত করা হয়। অথচ নারীকে প্রকৃতির সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু নারীকে প্রকৃতির মতো অবাধ স্বাধীন হিসাবে কেউ দেখতে চায় না। মানতে চায় না। মানুষ না হয় নারীর স্বাধীনতার বিশ্বাস করে না কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তো মহান। তিনি চাইলে সবকিছুই করতে পারেন। তাই কবি সৃষ্টি কর্তার প্রতি সংক্ষুব্ধ মনের প্রকাশ :
তুমিওতো একরোখা ; এক নায়ক শাসক
তোমার ইচ্ছের কাছে নারীর জীবন তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

ডনয়মের নিগড়ে যখন নারী বন্দী তখন কবি মনে প্রশ্ন তাহলে সৃষ্টিকর্তা কি পুরুষ। সৃষ্টিকর্তাকে কবি সুমহান বলে মেনে নিতে পারছেন না। তাই স্রষ্টাকে একরোখা এক নায়ক বলতে দ্বিধাবোধ করেননি।
‘স্বৈরাচার’ কবিতাটি নারীর মূল্যহীন জীবন’ কবিতাটির স্বগোত্রীয় ‘ স্বৈরাচার’ কবিতায় কবি সৃষ্টিকর্তাকে খামখেয়ালী রূপে অভিহিত করেছেন। কেননা তারই সৃষ্টি জগতের প্রতি রয়েছে বৈষ্যমতা। সৃষ্টিকর্তা নয় যেন এক খেলুড়ে। সেই গানের মতো-‘মানুষ বানাইয়া খেলছ যারে লইয়া’। জীবন জগতের প্রতি লক্ষ্য রেখে কবি দেখেছেন স্রষ্টার খেলুড়ে চেহারা। কোথাও তিনি সুখ প্রাচুর্য আনন্দ সৌন্দর্য দিয়েছেন আবার কোথাও শূন্যতা রিক্ততা হাহাকার। কবির ভাষায় :
যেখানে খুশি তৈরী কর স্বর্গোদ্যান
এন চাইলে ফের মরুদ্যান।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে দেখা যায় স্রষ্টা এক নিষ্ঠুর নিয়ন্তা ছাড়া আর কিছুই নয়। কবি স্রষ্টার প্রতি ক্ষুদ্ধ এই কারণে যে, নশ্বর এই পৃথিবীতে তিনি থেকে যাবেন অবিনশ্বর রূপে আর সব সৃষ্টিকর্ম নশ্বর ক্ষণস্থায়ী। কবি জীবন পিয়াসী, জীবন রুয়েছে তার জগতের প্রতি তীব্র মোহ। তাই কবির খেদোক্তি ঃ
নিজে বাঁচো অন্তিম
উপভোগ্য বস্তু দিয়ে
মানুষকে দাও অল্প একটু আয়ূ।

মোহ মায়াময় জগতে অল্প আয়ু নিয়ে জীবন পিয়াসী কবি অতৃপ্ত। সাম্যবাদী কবি সব কিছুতেই চান সমতা। ইশ্বর কি মানুষে। তাই স্রষ্টার একচ্ছত্র ক্ষমতা তিনি মেনে নিতে পারেন না। কবির মতে স্রষ্টার করুণা এবং দয়ালাভের সদা স্তবরত জগতকে ব্যতিব্যস্ত রাখাই যেন তাঁর তৃপ্তি লাভের গরিমায় গর্বিত। এহেন মনোভাব একজন এক নায়কেরই চরিত্র। জগত টাকে যেন তিনি রঙ্গমঞ্চ বানিয়েছেন। সেখানে হাসি কান্নার দোলাচলে জীবন সংস্থাপিত করে লাঞ্ছিত, নিঃগৃহীত চরিত্র সমাবেশ ঘটিয়ে প্রত্যেককে স্ব স্ব চরিত্রে রূপায়িত করে দর্শকরূপে যেন উপভোগ করেন। একই স্রষ্টার মানুষকে ধনী দরিদ্র করে সমাজে বৈষম্য তৈরী করেছেন। তেমনি প্রকৃতি জগতের প্রাণী কূলে কাউকে গানের পাখি কাউকে অলক্ষী পাখি যেমন পেঁচারূপে পাঠিয়েছেন। জীব জগতের প্রতি স্রষ্টার বৈষম্য মূলক আচরণের জন্যে কবি নিরপেক্ষ স্রষ্টার তাগিদ অনুভব করেন।

এ বিশ্বের জন্য এখন প্রয়োজন
নিরাপদ তত্ত্বাবধায়ক ইশ্বর।

স্বৈরাচারী কবিতাটি পাঠ করে আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। তা হলো কবির নিরাশ্যবাদীতা। তার কেবলই অভিযোগ অনুযোগ। কবি মাত্রই হবেন আশাবাদী। তিনি শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে আশার বাণী শোনাবেন এমনটি আমরা আশা করব। কবি নিরপেক্ষ স্রষ্টার আকুতিতে খানিকটা আশার আলো দেখালেন। তবে একথা ঠিক যে, আমাদের সমকালীন সমাজের নানা স্তরে যে চরম বৈষম্য তা কবিকে ভীষণভাবে পীড়িত এবং হতাশা গ্রস্থ করে তোলে এবং তার প্রতিকারের কোনো সম্ভাবনা না দেখে তিনি এর সমর্পণে ইশ্বরের কাছে আত্মসমর্পন করেন। ‘স্বৈরাচারী’ কবিতাটি পাঠ করে আমাদের যে ধারণা হয়েছে তা জগতের সকল প্রাণীর প্রতি কবির মমত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে।
‘একিশ্বর’ কবিতাটিতে কবির মানবতাবোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। কবির এই কবিতায় ঔদ্বাস্তু মানুষের কথা বলা হয়েছে। বিপন্ন মানবতার এক করুন চর্যা এই উদ্বাস্তু জীবন। এসব মানুষের পতাকা, দেশ, ভূখন্ড সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশে মানবেতর জীবন যাপন করে। এ হীনাবস্থা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়ায়। এমনই এক মানব সম্প্রদায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা। উদ্বাস্তু মানুষের কথা ভেবেই কবি একিশ্বর কবিতায় ইশ্বরের সৃষ্টি জগতের প্রতি পক্ষপাত মূলক আচরণের কথা বলেছেন। এ কবিতায় ইশ্বরের দ্বৈত নীতির রূপায়নের কথা ওঠে এসেছে। সৃষ্টিকর্তা মহান দাতা হয়েও দানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন। মানুষ যখন নির্যাতিত লাঞ্ছিত শোষিত হয় এবং তাদের বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে তখন সর্বক্ষম ইশ্বর ঐ শোষিতের পাশে দাঁড়ায় না। শুধু রোহিঙ্গারা নয় পৃথিবী ব্যপী উদ্বাস্তু জীবনের কথা ভেবেই কবি ইশ্বরের প্রতি এরূপ মনোভাব পোষণ করেছেন। তিনি যদি মহান দাতা হতেন তাহলে মানুষকে যুগে যুগে উদ্বাস্তু হতে হতো না। কবির মতে ইশ্বর মহান হলে শাসক গোষ্ঠির চক্রান্ত ভেস্তে দিয়ে নির্যাতিত মানুষের যন্ত্রণা লাঘব করতে পারতেন। ইশ্বরের দান বৈষম্যের কথা কবির কথায় :

দানের তালিকায় বাদ পড়েছে রোহিঙ্গা জীবন
একুল ওকুল কোন কুলেই
নিজ সত্তার দৃঢ় দাবী নেই

উপর্যুক্ত উদ্বৃতির মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু জীবনের করুণ অসহায় দিকটি ফোটে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারের রোহিঙ্গারা বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান। মায়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সরকার ধর্ম এবং ভাষাগত কারণে রোহিঙ্গাদেরকে নির্যাতন করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার শুধু ধর্ম এবং ভাষাগত কারণে রোহিঙ্গাদেরকে স্বীকার করে নিতে পারে না। এমন কি যারা এদেশে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি করে তারাও রোহিঙ্গাদের মেনে নেয়ার কথা বলে না। কবির মতে ইশ্বর তো সর্বদাতা। তিনি তো এর একটা সুরাহা করতে পারে না।

কবি আরো মনে করছেন -ইশ্বর বড় রাজনীতিবিদ। তিনি দান করাকে মহানুভবতার প্রতীক বলে দানকে উৎসাহিত করেন। কিন্তু ধন দেন কৃপণকে। তেমনিভাবে যে অসহায় তাকে মন দেয়, দরিদ্রকে জন দেয় আর যারা কথায় ও কাজে মিল থাকে কোনো ক্ষমতা দেয় না তাদের। নিজের গড়া ভূবনে ইশ্বরের পক্ষপাতিত্বে কবি ক্ষুব্দ :
ইশ্বরও একতরফা চোখে দেখে
কীভাবে বলি তাকে একিশ্বর।
‘লিঙ্গভেদ’ কবিতাটিতে বিশ্ব স্রষ্টার নারী পুরুষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কথা কবি স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন। কবি মাত্রই সত্য ন্যায় এবং সাহসীকতার ধারক ও বাহক। আমরা স্রষ্টাকে নিরাকার বলে মানি। কিন্তু কবির মতে স্রষ্টা পরকালে নারী পুরুষের অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য দেখিয়েছেন। স্বর্গে পূন্যবান পুরুষের জন্য সত্তর জন হুর তার খেদমতে থাকবে আর সেখানে নারীর জন্য শুধু স্বামীর সঙ্গে স্বর্গবাস করার অধিকার লাভ করবে। স্রষ্টার এমন চরম বৈষম্যের প্রতি কবি তীব্র ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে কবির ক্ষোভাবশ : সাহসী উচ্চারণঃ
বিশ্ব স্রষ্টা নারী না পুরুষ ?

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি এবং কবিতাটি পাঠে সত্যিই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে স্রষ্টার কেন এ পক্ষপাতিত্ব পুরুষের প্রতি আর নারীর প্রতি এত কৃপণতা অবহেলা। নারী কি শুধু দিয়েই যাবে সমাজ, সংসারে চিরকালই। নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। মানুষ না হয়ে মানুষকে হিংসা লোভের বশর্বতী হয়ে মানুষকে বঞ্চিত করে কিন্তু স্রষ্টা নিজে যিনি সব হিংসা লোভের উর্ধ্বে তিনি কেন নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন। কবি রীনা তালুকদার তার এ কবিতায় নারী পুরুষের সমতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু মানুষও সমাজের প্রতি নয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার নারী পুরুষের বৈষম্য নীতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
...
ঠকতে হবে শুধু নারীকে।
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে এবং কবিতাটি আলোচনা করে আমরা দেখতে পাই কবি নারীর বঞ্চনার কথা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে কবি মনের ক্ষোভ ও হতাশার কথাই ফুটে উঠেছে। এ থেকে উত্তরণের কোনো আশার বাণী কবি নারী সমাজের জন্য রাখেননি। তবে আশার কথা আমাদের রাষ্ট্রে, সমাজে নারী সংগঠন গুলোর বিভিন্ন সংস্থা নারী পুরুষের সমতার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। নিশ্বয়ই একদিন আমরা এর সফলতা ভোগ করব।
সর্বশেষে লিঙ্গভেদে কবিতাটিতে কবি নারী পুরুষে যে বৈষম্যের কথা বলেছেন তা নারীবাদী চেতনায় নারী পুরুষের বৈষম্যের ধারণা বহুল প্রচলিত। তবু তো সমাজ থেকে এ বৈষম্য দূর হচ্ছে না। তাই কবি যেন আবারো মানুষকে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কলম ধরছেন। নারীর মূল্যহীন জীবন, স্বেরাচারী, একিশ্বর এবং লিঙ্গভেদ কবিতায় কবি নারীর প্রতি পুরুষ বা মানুষের প্রতি মানুষের বঞ্চনার কথা নয় বরং স্রষ্টার সৃষ্টির জগতের প্রতি নিজেই যে বৈষম্য দ্বৈতগীতি এবং পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন তা কবি রীনা তালুকদার তুলে ধরেছেন। কবিতা গুলোতে বঞ্চিতের প্রতি কবির গভীর মমত্ববোধ সহানুভূতি এবং বিশ্বজনীন রূপ প্রতিফলিত হয়েছে।

কবি রীনা তালুকদারের নারীবাদী কবিতাগুলোতে পুরুষের ভোগবাদী রূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। নারীরা চিরকালই পুরুষের কাছে পণ্য। পুরুষ নারীর নিকট নিজেকে ক্রেতারূপে হাজির করে গ্রহীতা রূপে নয়। তাই নারী হয়ে ওঠে পুরুষের কাচে ভোগ্য। কবির এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলন ঘটেছে ‘হুলোবেড়াল, সভ্যতা ফিরে যাচ্ছে, মানুষ ও নারী, উন্মাদ, কৃষ্ণকুমার, অভিনয়, চন্ডীদাস প্রভৃতি কবিতায়। এ কবিতাগুলো আলোচনা করলে এর মধ্য দিয়ে পুরুষের চিরকালীন ভোগবাদী রূপ আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।
‘হুলোবেড়াল’ কবিতাটিতে কবি রূপকের মাধ্যমে এক অসহায় প্রজাপতির অন্যের ঘরে আশ্রয় নেয়ার জন্য এসেও সে প্রজাপতি টিকে তাড়া করছে। ক্লান্ত প্রজাপতি বিশ্বামের সময় পায়নি। দস্যুরূপ হুলো বেড়াল প্রজাপতিটিকে সারা ঘর তাড়া করছে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বলে। এখানে আমরা অসহায় ক্লান্ত প্রজাপতিটিকে নারী এবং কালো হুলো বেড়ালটিকে এক নারীলোভী ভয়ঙ্কর পুরুষ রূপে দেখতে পাই রূপকের আড়ালে। আমাদের সমাজে ঘরে বাইরে কোথাও কোথাও চলছে যৌন নির্যাতন। কালো দস্যু হুলো বিড়াল রূপী কতিপয় পুরুষ ঘরে বাইরে ওঁত পেতে থাকে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ইয়াছমিন যেমন পথে ধর্ষণ এবং হত্যার শিকার হয় তেমনি ধনার্ঢ্য পরিবারে সুরক্ষিত বাড়িতে শাজনীন ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। নারী এ অসহায়ত্বের দিকটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে রূপায়িত হয়েছে হুলো বেড়াল কবিতাটি :
কালছে এক দস্যু হুলো বেড়াল
তাড়া করছে সারাটা ঘর জুড়ে
ধরতে পারলেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে খুবলে খাবে।

তাই এদেরকে পাল্টা আঘাত করতে হবে। ঘরে বাইরে এসব নিঃশব্দচারী হুলো বেড়াল রূপী পুরুষদেরকে প্রতিহত করে নারীদের চারপাশটা নিরাপদ করতে হবে। ‘সভ্যতা ফিরে যাচ্ছে’ কবিতাটিতে কবি নারী লোভী পুরুষকে আদি যুগের আদিম মানুষের সাথে তুলনা করেছেন। আদি মানুষেরা সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি বলে কাঁচা মাংস খেত; কেননা এছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। এতে তাদের রুচির প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক। এসব আদি মানুষের চেয়ে বেশি বন্য সভ্য পৃথিবীতে কতিপয় পুরুষ। কবির মতে এসব পুরুষ ক্ষুধার্ত বন্য প্রাণীর চেয়ে ভয়ঙ্কর। কারণ বন্য প্রাণী শিকার পুড়িয়ে কষ্ট না দিয়ে দ্রুত খেয়ে ফেলে এরাও সভ্য। তাই নারী লোভী কতিপয় পুরুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সভ্যতা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত এখন
নারী মাংশ খেতে পশুরা প্রকাশ্যেই ছৌঁ মারে।

তাই আমরা দেখতে পাই শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞান মানুষকে মানবিক হবার পথ বাতলে দিলেও কিছু মানুষ সেই আদিম যুগের মানুষের চেয়ে অধম রয়ে গেছে। এরা নারীকে শুধু পাশবিক নির্যাতনই করে না, হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। মানুষ রূপী এসব নর পশুদের কথা ভেবেই কবির ব্যথিত উচ্চারণ :
অভ্যাসে আচরণে মানুষ
আবার আদিতে ফিরে যাচ্ছে
একটু একটু করে . . .।

আমরা সমাজে দেখতে পাই কোনো নারীকে গণ ধর্ষণের শিকার হতে। ঘরে বাইরে বাসে এদের উলঙ্গ আদিমতা যা আদিম যুগকে হার মানায়। আদিমতো সভ্য জগতে রয়ে গেছে সেই আদিম যুগের মতোই। দিনাজপুরের ইয়াছমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার মাধ্যমে কবি অত্যন্ত সার্থকভাবে এসব বর্বর সভ্য মানুষের চরিত্র তুলে ধরেছেন।
‘উন্মাদ’ কবিতায় কিশোরীর বাড়ন্ত শরীর দেখে নারী লোভী যুবকের ভোগ প্রবণতা দিকটি উম্মোচিত হয়েছে। এসব যুবকেরা নারী গর্ভের তার অনুরূপ আরেক যুবকের জন্ম দিয়েছে। কবির ঘৃণিত উচ্চারণ :
ওর উশৃঙ্খল হাসিটাও
কোনো কিশোরীর জঠরে জন্ম নেয়।
‘কৃষ্ণকুমার’ কবিতায় পুরুষের ভোগবাদী রূপটি প্রকাশ পেয়েছে। কৈশোর থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত পুরুষের যে নারী দেহের প্রতি লোলুপতার রূপটি অত্যন্ত ক্ষুরধার ভাষায় তুলে ধরেছেন। এ কবিতা পুরুষের প্রকৃত স্বরূপ বিদ্যমান। নারী সম্ভোগের ক্ষেত্রে তারা পাপ পুণ্যের ধার ধারে না। সব বয়সেই তারা যৌবনের মেজাজে থাকে। কবির ভাষায় :
কৈশোর যুব হতে প্রৌঢ়ে নেই অতৃপ্তি
নরম হাতের উষ্ণ স্পর্শে।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে বলা যায় নারীর প্রতি অপ্রেম জণিত দেহ লাভ পুরুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট। এর প্রকাশ আমরা মধ্যযুগের সাহিত্যেও দেখি। ‘চন্ডিদাস’ কবিতাটি ‘কৃষ্ণকুমার’ কবিতারই ভিন্ন আদল। এ কবিতাটি পুরুষের নারী লিপ্সার দিকটি উদঘাটিত হয়েছে। এক সাথে বহু নারীর আসক্তির দিকটি রূপকের মাধ্যমে কবি তুলে ধরেছেন। চন্ডিদাস রূপক চরিত্র। কতিপয় পুরুষ যৌবন কাল থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নারীসঙ্গ কামনা করে। কবিতাটিতে চন্ডিদাসের মাথার চুল পেকে গেছে তবু নারীর দৈহিক সৌন্দর্য দেখে
চন্ডীদাস কালো চশমার ভেতর
রহস্য চোখ লুকিয়ে পৃথিবী দেখে
দেখে তাবৎ রমণীয় খোলা চুল।

শুধু একক কোনো নারী নয় সমগ্র নারীর রূপ দেখা যেন স্থূল মনের পরিচয় ফুটে উঠেছে এ কবিতায়। শুধু বাহ্যিক দেখা নয় চন্ডীদাস রূপী পুরুষ নারী সঙ্গ কামনায় উন্মুক্ত হয়ে ওঠে এবং নারীকে শুধু ফুলের বাইরে কিছু ভাবতে পারে না, চায় না। চন্ডীদাস’ কবিতাটিতে দেখি :
লাল গোলাপও এড়াতে পারে না
সাংগাতিক, ও পাপড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে
ভোগবাদী পুরুষের চরিত্র উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে চমৎকার উপমার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। চন্ডীদাস যৌবন কালে নারীসঙ্গ লাভে বিভোর থাকত। কিন্তু এখন বয়স হওয়াতে নারীসঙ্গ ত্যাগ করার কথা। কিন্তু পক্ককেশী চন্ডীদাস নতর্কী মহলে যায় না কিন্তু আমরা তাকে বিশেষ নারীতে আসক্ত থাকার কথা শুনি। নারীকে বৃদ্ধ চন্ডীদাস সর্বভাবে পাবার অক্ষমতার দিনটি কবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু চন্ডীদাস নারীকে দেখে দেখে নারীসঙ্গ কামনা তার মধ্যে জেগে :
তাই আমরা দেখি কোনো নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে। ঘরে বাইরে বাসে এদের উলঙ্গ আদিমতা আদিম যুগকে হার মানায়। আদিমতা সভ্য জগতে রয়ে গেছে সেই আদিম যুগের মতো। কবি ব্যথাতুর চিত্তে অত্যন্ত সার্থক রূপকের মাধ্যমে এসব বর্বর সভ্য মানুষের চরিত্র তুলে ধরেছেন।
‘কৃষ্ণকুমার’ কবিতাটিতেও পুরুষের ভোগবাদী রূপটি প্রকাশ পেয়েছে। কৈশোর থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত পুরুষের নারী দেহের প্রতি লোলপতার রূপটি কবি অত্যন্ত ক্ষুরধার বাণীতে তুলে ধরেছেন। এ কবিতায় যেন পুরুষের প্রকৃত রূপটি বিদ্যমান। নারী সম্ভোগের ক্ষেত্রে তারা নীতি ধর্মের ধার ধারে না। সব বয়সে তারা যৌবনের মেজাজে থাকে। কবির ভাষায় ঃ
কৈশোর যুব হতে প্রৌঢ়ের নেই অতৃপ্তি
নরম গতরের উষ্ণ স্পর্শে।

উপর্যুক্ত কবিতাংশটুকু থেকে নারী দেহের প্রতি পুরুষের প্রথম আকর্ষণ এ প্রবণতা এদের আজন্ম রোগ হিসাবে পরিগণিত হয়। এসব পুরুষকে কবি শ্রীকৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেবতা শ্রীকান্ত কিশোর বয়সে শ্রী রাধাকে দেখেই তার মধ্যে কামবোধ জেগে ওঠে এবং রাধার দেহ সম্ভোগের মধ্য দিয়ে প্রেমের সূচনা করে। ।

এখন কদম ফুল আর গোলাপ
দেখে দেখে সুখেই দিন কাটে
এ দুটোকে নাকি একেবারেই এড়াতে পারে না।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে চন্ডীদাসরূপী কতিপয় পুরুষের আজন্ম নারী সঙ্গ কামনার দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকারের কথা বলা থাকলেও কতিপয় ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতাও প্রকৃতির অন্তরায় রূপে ধর্মকে ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কখনো কখনো বা কোথাও কোথাও ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর প্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এরা ব্যক্তি স্বাধীনতায় করে হস্তক্ষেপ। সমাজের এ দিকটি কবিকে ক্ষুব্ধ করেছে; ব্যথিত করেছে। প্রকৃতি যেখানে নিজের খেয়াল খুশি মতো নিজের দুঃখ বেদনা লাঘব করতে পারে। কিন্তু নারী মানুষ হয়ে তা পারে না। আকাশের মন ভারী হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে কেঁদে নিজেকে হালকা করতে পারে। কিন্তু নারীর শত দুঃখ কষ্ট-যন্ত্রণা সয়ে তা বুকে চাপা দিয়ে রাখে। ঘর সমাজ ধর্মের ভয়ে শুধু নিজের মনের আগুনে নিজেই পুড়তে হয়। তাছাড়া কবিতাটিতে প্রকৃতি খেয়াল-খুশি মতো যেখানে সেখানে প্রাণ দান করতে পারে। কিন্তু নারী বিশেষ করে বাঙালি নারী খেয়াল খুশি মতো প্রাণ দান করতে পারে না- সমাজ ধর্ম-সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কবিতাটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং ইঙ্গিতবহ। এখানে উর্বর নারীর সন্তান দানের ক্ষমতা থাকলেও তার রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কবির ভাষায় ঃ
বাঙালি নারীর মনের উর্বরতা
সমাজ সিদ্ধ নয়
উপর্যুক্ত উদ্ধতির মধ্য দিয়ে বাঙালি নারীর আশা আকাঙ্খা সমাজের নিগঢ়ে নিস্পেষিত তা অত্যন্ত বাস্তব সম্মত ভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। সমাজ নামক এক অদৃশ্য শক্তি মানবিকভাবে কিভাবে হরণ করে তা কবির ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে উচ্চারিত ঃ
জীর্ণ সমাজ নারীকে দিয়েছে
ধর্মের বেড়ি; নিষিদ্ধ উচ্চারণ।

‘ধর্ম’ কবিতাটিতে মানুষের সাথে মানুষের এবং প্রেম ভালোবাসার প্রতিবন্ধক রূপে চিত্রিত হয়েছে। ভালোবাসা মানব জীবনে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। ভালোবাসা নর-নারীর হৃদয় উদ্যানে যে স্বর্গীয় সুখ রচনা করে কতিপয় মানুষ ধর্মকে সেখানে কী রূপে প্রবেশ করিয়ে সেই সুখের বাগানকে তছনছ করে দেয়। পৃথিবীর প্রথম মানব মানবী আদম হাওয়া স্বর্গ থেকে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে এই মর্ত্যে এসেছে। স্বর্গীয় এই প্রেম পৃথিবীতে এসে পৃথিবীকে মহিমান্বিত করে একে মানবীয় রূপ দান করেছে। কালে কালে এই প্রেম মহান রূপ ধারণ করে পৃথিবীকে রূপময় এবং ছান্দসিক করে তুলে। এরূপ ব্যঞ্জনময় এক অতুলনীয় অনুভূতির কথা আমরা শুনি -
সুশান্তকে ভালোবেসেছি
সুশান্ত আর আমার ধর্ম এক নয়

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে যেন আমরা হৃদয় দিয়ে হৃদয় নেয়ার এক মহোৎসব দেখি। নর-নারীর একে অন্যের প্রতি প্রেম ভালোবাসা হৃদয় থেকে আসে ধর্মে থেকে নয়। তাই কবির উচ্চারণ-
আমি কোনো ধর্মকে ভালোবাসিনি
যাকে ভালবেসেছি; সে একজন মানুষ।

এ বার্তা যেন আমাদের সমাজে, মানব জীবনে এক মহান বাণী রূপে হৃদয় ধর্মের জয় ঘোষিত হয়েছে। ধর্ম হলো মানুষ তার স্রষ্টাকে গভীর উপলব্ধি করার এক সাধন পদ্ধতি যা নির্দিষ্ট আচার নিয়ম দ্বারা চালিত হয়। আর ভালোবাসা নর-নারীর আত্মার মেল বন্ধন। স্রষ্টা যে মানব মানবীকে পৃথিবীতে প্রথম পাঠিয়েছেন তাদের যোগসূত্রের মূলে ছিল প্রেম ভালোবাসা। কাজেই কবির মতে সৃষ্টি কর্তা সব ধর্মের মানুষকে তিনি নিজে সৃষ্টি করেছেন। তাই সৃষ্টির প্রতি সৃষ্টির প্রেম এ এক বৈশ্ব্যিক রূপ। এভাবটি কবিতাটির মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত করে। কবি মহাজাগতিক রূপ আমাদের সামনে তথা এক ধর্মান্ধ গোষ্ঠির কাছে প্রতিভাত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কবির এক অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রেম ভালোবাসা ধর্ম বা সামাজিক বা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে হয় না; হয় হৃদয় থেকে। তাই যুগে যুগে প্রেমের জয় ঘোষিত হয়েছে। রাধাকৃষ্ণ, লাইলী মজনু, শিরি ফরহাদ, রোমিও জুলিয়েট, নদের চাঁদ মহুয়া যেন মানব সংসারে বাণী বাহক। রীনা তালুকদারের ‘ধর্ম’ কবিতাটির মধ্য দিয়ে ভালোবাসার চিরন্তণ রূপ প্রকাশ পেয়েছে। সব শেষে বলা যায় ধর্ম কবিতায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে কবি মানবিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। পৃথিবীতে সকল হিংসা বিদ্বেষ উঁচু নীচুর বিভেদ ঘোচাতে পারে কেবল ভালোবাসা। নারীবাদী কবিতা-১ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো মানবতা বোধের আকর। কবিতাগুলো পাঠে নারী হৃদয়ের অনুভূতি প্রকাশের এক গীতময় করুণালেখ্য অনুভূত হয়। তেমনি ভাব দেখতে পাই - ‘খসড়া খাতা’ কবিতাটিতে। এ কবিতার একজন নারীর ব্যাপ্তিকাল প্রকাশ পেয়েছে। একজন নারীর জীবনে শৈশবের মধুরতার চেয়ে কৈশোরের অনুভবের অনুরূপ মধুরতম হয়ে ওঠে যৌবনের দুরন্ত উদ্দমতায়। জগৎ জীবনের আশা রঙিন স্বপ্নময় হয় যৌবনের দিনগুলোতে। যৌবনের এই দিনগুলো প্রকৃতির নানারূপ বৈচিত্রময়তা নানা আমেজে মনকে আবেগ আবেশের বিহবলতা উন্মন করে রাখে। কবির আবেগময় বিহগলিত হৃদয়ের উচ্ছাসঃ

যৌবনের ব্যপ্তিকাল ষড়ঋতুর ঘূর্ণি

তাই আমরা দেখতে পাই নারীর যৌবনকে নানা ঘরানায়। কখনো বৈশাখের ঘূর্ণি মাতাল হাওয়ার দাপাদাপি, কখনো যৌবন নিজেকে নিজে পোড়ায় চৈত্রের খর রৌদ্রের তপ্তদাহে, আবার হৃদয়কে সিক্ত করে বর্ষার বারি সিঞ্চনে, আবার কবির ভাষায় -
শরতের কাশদুলের কানাকানি
কখনো দুরন্ত যৌবন হেমন্তের প্রশান্তিতে দেহমন ভরে ওঠে। এ যেন ‘মলয়ার বারমাসী’র মতো নারীর যৌবনকাল নানা রাগে ব্যঞ্জনায়িত। কিন্তু আমরা জানি সুরের খেলা এক সময় শেষ হয়-
প্রশান্তির চেয়ে গুমোট মেঘের
দৌরাত্মে জীবন দুর্বিসহ
..........................
হারিয়ে যায় মধুর স্মৃতি।
যৌবনের রঙিন স্বপ্নে বিভোগ থেকে একজন নারী যে জীবনকে সে কামনা করে পেতে যায়। সেখানে শুধু নিকষ বাস্তবতা। সমাজ সংসারে সে যেন তরুপের তাস। তাকে নিয়ে শুধু সবাই লাভের খেলায় জয়ী হতে চায়। নারীর তার নিজের জীবনকে নিয়ে যে আশা স্বপ্ন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের আকাঙ্খা তা যেন অদৃশ্য দৃশ্য নাটাইয়ে পেচানো। তখনই নারী স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙ্গে যেতে থাকে। যৌবনের মাধুর্যের নানা পসরা নিয়ে জীবন পসরা সাজালেও যোগ বিয়োগ ভাগ ফলের হিসাবের খাতাটাই দেখতে পায়। তাও সে খাতা শুধু হিসাব মেলানো। ফলাফল বলে যায় অন্য খাতায়। হিসাব নিকেশ করে শুধু খসড়া খাতা মতো অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে -
জীর্ণ জীবন চাহিদা আধা মিটে তো মিটে না

আসলে উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে শুধু নারীর জীবনই এমন অতৃপ্ত নয়। মানব জীবনটাই যেন অতৃপ্ত। চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকে না অথবা যা পেয়েছি বা পাই তা যেন ঝাঁপসাঁটা জানালার পর্দার মতো। তবু আমরা বলবো অতৃপ্ত মন নিয়ে নতুন জীবনের খোঁজে জগৎ বানাবো হয়ত সেখানে জীবন হবে খসড়া খাতা। নয়তো নবীন লেখকের বইয়ের রঙিন ঝকঝকে মলাট। ‘ভাগ্য রজনী’ কবিতাটি ‘খসড়া খাতা’ কবিতার ভার বহন করে। এ কবিতায় কবির দুর্বল চিত্তের হতাশাগ্রস্থ মনের প্রকাশ ঘটেছে। ভাগ্যের জোরে মানুষ জীবনের কোনো একটা দিকে সফল হতে পারে। কিন্তু সেখানেও থাকে মেধার সুষ্ঠু প্রয়োগ পরিশ্রম। কবির দুর্বল মনের প্রকাশ ঘটেছে এ কবিতায় :
ভালো থাকা মানেই তো
সমঝোতা সমঝোতা খেলা।

এখানে কবির খন্ডিত চিন্তা এবং ভোগবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। আমরা মনে করি সমঝোতা মানে নতজানু বা বিনা অজুহাতে আত্মসমর্পন নয়। সমঝোতা মানে সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা এবং গ্রহণ করা। সংকটে থাকা মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। তবেই তো জীবনযুদ্ধে লিপ্ত থাকা মানুষের জয়। এর অন্যথা হলে জীবনযুদ্ধে পরাস্ত সৈনিকদের ব্যর্থতার গ্লানি আর পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে জীবন হবে মূহ্যমান। যা মানবাত্মার অবমাননারই সামিল। কবি মানে স্বপ্ন দ্রষ্টা। কবি মানব জীবনে পথের দিশারী। কিন্তু এ কবিতায় অধিকার আদায়ে নিরন্তর সংগ্রামে লড়াই থাকা মানব সত্তা চুড়ান্ত লড়াই করে কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছার আগেই যেন ছাড় দিয়ে প্রাপ্ততা লাভের ইচ্ছে ব্যক্ত হয়েছে। আমরা বুঝি ভাগ্য মানে বুঝি কাজের সুযোগ পাওয়া। আর চুড়ান্ত অর্জন হলো ভাগ্যের জয়। এ কবিতায় কবির রণে ভঙ্গ দেয়ার প্রবণতার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। তাকে তার অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠার জন্য সংসার সমুদ্রে নিজের মেধা শ্রম বুদ্ধি দিয়ে নানা প্রতিকূলতা ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে হবে। আর এ অর্জনের মধ্য দিয়ে মানবাত্মার জয় ও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হবে। সে মানুষ হোক নারী বা পুরুষ।
‘ভাগ্যরজনী’ কবিতায় কবির মতে সৃষ্টিকর্তা মানুষের ভাগ্য লিখেন এক বছর পর পর। আর নারীর ভাগ্য প্রতি নিয়ত বদলায়। পুরুষের হাতে থাকে নারীর ভাগ্য। তাই -
বছর ঘুরতে হয় না
মূহূর্তেই বিন্যাস হয়।

সত্যিকার অর্থে আমাদের সমাজ পুরুষ শাসিত সমাজ। তাই ভাগ্য নামক নারীর আশা-আকাঙ্খা বলতে তেমন কিছু থাকে না। পুরুষের চিন্তা চেতনা দ্বারাই নারীর জীবন আবর্তিত হয়। কিন্তু এ থেকে নারীকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারী যদি উপর্যুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে তবে নারীর ভাগ্য বা সৌভাগ্য থাকবে নারীর হাতে। এ কথা যদি কোনো নারী বিশ্বাস করে তবে জীবন সম্পদে তার অনুভূতি হবে ইতিবাচক। যা নারীর জীবনে কল্যাণ বয়ে আনবে। নারীর কল্যাণ তো জগতেরই কল্যাণ সাধন।
আমাদের সমাজে নারী নানা ভাবে বঞ্চিত হয় নারীর এ দিকটি রীনা তালুকদার কবিতায় ওঠে এসেছে। এতে নারীর প্রকৃত জীবন ফুটে উঠেছে। এমনি একটি কবিতা ‘সংখ্যা লঘু নয়’ এ কবিতায় একবিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতা শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও নারীরা যে ব্যক্তি স্বাধীন নয় নানা নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ এবং এ বেড়াজাল ছিন্ন করে স্বমহিমায় নিজের অধিকার আদায় করা; এ দৃপ্ত উচ্চারণ দেখা যায় এ কবিতায়। এ আহবান সমগ্র বিশ্বের নারীর প্রতি।
এ কবিতায় মেয়েদেরকে শৈশব থেকে পর্দা নামক হিজাবে আবৃত করে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সীমিত করে রাখতে চায়। তথাকথিত সুরক্ষার নামে নারীকে গৃহে আবদ্ধ রাখতে চায়। নারীকে বোঝানো হয় মেয়েদের আসল জায়গা সংসার স্বামী-সন্তান। প্রজন্মান্তর হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে নারীকে এ ধারণার মধ্যে আবর্তিত রেখে নারীর স্বাতন্ত্রবোধকে অবদমিত করে নারীকে গৃহে মোহগ্রস্ত করে রাখছে-
সে আদি যুগ থেকে চলছে এখনো
অন্ধ কুসংস্কার স্তাবকতার শিক্ষা
রন্ধণশালাকে তীর্থস্থান মানা।

নারীর অস্তিত্বের অধিকারের প্রশ্নে দ্বিধা সৃষ্টি হয় শৈশব থেকেই। তার চারপাশের সমাজ সংসার অভিভাবক নারীর চিন্তার ক্ষেত্র ও চলার স্বাধীনতা সীমিত করে দেয়। শুধু স্বামী সংসার সন্তান নারীর জীবনের অবলম্বন ও সার্থকতা এ বোধ ও বিলাস নিয়ে নারী বেড়ে ওঠে। ফলে তার চিন্তা শক্তি বহুমাত্রিক না হয়ে এক কেন্দ্রিক হয়। এর ফলে একজন নারী তথা একজন মানুষ তার নিজের সত্তা বিকশিত হবার পথ পায় না এবং নিজের নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সংখ্যা লঘুর পর্যায় নিয়ে। কারণ সারা বিশ্বে সংখ্যা লঘুদেরকে দুর্বল ভাবা হয়। নারীকে ঐ পর্যায়ে নিয়ে যায়। কবি তাই হুশিয়ারী উচ্চারণ :
একবিংশের নারী হবে না গৃহবাসী

তাই এ কবিতায় নারী সমাজকে জেগে উঠার আহবান জানিয়েছেন। সমস্ত বাধা বিপত্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে বিশ্বসময় ছড়িয়ে পড়ার আহবান জানান। কেননা নারীর সংসার সামলানো সহজাত প্রবণতা। এর বাইরে যেতে তাকে উৎসাহিত করতে হবে। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন-‘গৃহিনীরূপে, জননীরূপে মেয়েদের যে কাজ সে তার আপন কাজ সে তার স্বভাবজাত।’ সংসার সামলেও মেয়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কর্ম ক্ষেত্রে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ তার ‘নারী’ প্রবন্ধে নারী সমাজের জয় গান গেয়েছেন। ‘আমাদের দেশের আধুনিক মেয়েদের মন ঘরের সমাজ ছাড়িয়ে প্রতিদিন বিশ্ব সমাজে উত্তীর্ণ হয়েছে।’ তাই নারী আজ নিজ গৃহ ছাড়িয়ে বিশ্ব সমাজে বিচরণ করে। কবির আহবান-
জানিয়ে দাও তেপান্তরে
এ অন্তরীক্ষে নারী সংখ্যালঘু নয়।

নারীর প্রকৃত জীবন ‘ফলের জীবন’ কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। এ কবিতায় নারীর ভাসমান জীবনকে ইঙ্গিত করেছেন। জীবন মানে নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। একজন পুরুষ মানুষকে তার নিজস্ব জায়গা থেকে জীবনকে মোকাবেলা করতে হয়। এ কবিতায় কবি নারীকে পণ্যবাহী জীবনের সাথে তুলনা করেছেন। পণ্য যেমন উৎপাদনকারী থেকে মহাজন থেকে বিক্রেতা এবং সেখান থেকে খরিদদারের হাতে যায়। তেমনি নারী প্রথমে পিতার সংসারে, বিয়ের পর স্বামীর সংসারে পরে ছেলের সংসারে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। কবি এ দিকটির করুণ অবস্থা তুলে ধরেছেন :
বিশ্বের আনাচে কানাচে ফলের মূল্যহীন বাজার
হরেক রঙের ছোট বড় ফলেরা
ক্রয় বিক্রয় খেলার প্রতি নিয়ত কেবল হাত বদলায় ।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে কবির নারী জীবনের প্রকৃত রূপটি তুলে ধরেছেন। বন্য সমাজে নারীরা স্বাধীন ছিল। পশু পালন যুগে থেকে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা সীমিত হতে থাকে এবং তা ক্রমে ক্রমে নারীকে শৃঙ্খলিত করে তোলে। তবে নারী সমাজ এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে। পরিবার, সংসারের বাইরেও তারা নানা কর্মে নিয়োজিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এ কবিতায় কবির নৈরাশ্য বাদীতার সুর ধ্বনিত হয়েছে। ‘ফলের জীবন’ কবিতার ন্যায় ‘দেবদারুর মর্মর ধ্বনি’ কবিতায় নারীর প্রকৃত জীবন ওঠে এসেছে। বৃক্ষ যেমন শান্ত এং নমনীয় নারীও তেমন। নারী শত যন্ত্রণা সয়ে যায় ঠিক বৃক্ষের মতো।
নতমুখি দেবদারু গাছের পাতারা
ঝরে ঝরে পড়ে ...
পায়ে না মাড়িয়ে দেয়া পাতাদের
কান্নার সুর আজও মনে পড়ে
ঝরা পাতা মাড়িয়ে যায় মানুষ। প্রতিবাদ করতে পারে না। পায়ে মাড়ানো পাতার মর্মর ধ্বনি যেন নারীর কান্না। পাতারা যেমন শক্তিমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে না নারীকেও তেমনি। এ কবিতায় কবি নারী শত অত্যাচার অপমান সহ্য করেও সংসারে নিজেকে মানিয়ে নেয়। এখনো আমাদের সমাজে যে মেয়েরা অসহায় এই রূপটি এ কবিতার মাধ্যমে কবি তুলে ধরেছেন।
উপর্যুক্ত কবিতাগুলোতে নারীর প্রকৃত জীবন যেমন ওঠে এসেছে তেমনি কতিপয় কবিতায় নারীর অতৃপ্ত মনের হাহাকার দেখতে পাই। ‘সঙ’ কবিতাটিতে কবির বিশুদ্ধ প্রেমিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। সত্যিকার প্রেমিক মন নিখাদ প্রেমের প্রত্যাশা করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতির নানা বৈচিত্রেএ প্রেমিক মনকে নানা রঙে রাঙিয়ে তোলে। প্রেম পিয়াসী মন যতবার বাঞ্ছিতের কাছে প্রেম প্রত্যাশা করেছে ততো বারই কাঙ্খিত প্রেমের সাড়া পায়নি। পেলেও যেন তা অতৃপ্ত রয়ে গেছে, গভীর আবেগে নিমগ্ন হতে পারেনি। কবির ভাষায়-
ভালবাসতে পারিনি কাউকেই
যারা এসেছিল সবই ছিল সঙ।

‘সঙ’ কবিতায় নিখাদ মনের মানুষকে না পেয়ে কবির প্রেমিক মনের হাহাকার ফুটে ওঠলেও ‘বাকরুদ্ধ’ ভালোবাসা’ কবিতায় প্রেমিক মন বড় অবুঝ। এ কবিতায় প্রেম তার নিজস্ব পথে চলেছে। বাঞ্চিতের কাছ থেকে ভালোবাসা পেলো কি পেলো না কিংবা তা কতটুকু সত্য তা যাচাই না করে পতঙ্গ যেভাবে আগুনে ঝাপিয়ে পড়ে এ কবিতায় ঠিক প্রেমিক মন তাই। এটাই সত্যিকার প্রেমিক মন, প্রেমের ধ্বনি। প্রেম দিয়ে নি:স্ব হওয়াই প্রেমের ধর্ম। অবশেষে -
হাভাতে ভালোবাসা ছাড়া পেয়ে
ডানা তো ভেঙ্গেছেই; সঙ্গে পাজরের হাড়।
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে অবুঝ ভালোবাসা যে কোনো বাধা মানে না তা আমরা বুঝতে পারি। বাধাহীন প্রেম দিগবিদিক চলতে গিয়ে প্রেমের বা প্রেমিকের নাগাল তো পাইনি বরং প্রেমিক মন ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। তাই কবির বেদনাঘন হাহাকার -
কাঁদবারও যো নেই।
ফলে প্রেম বঞ্চিত মনের দীর্ঘশ্বাস আমাদের মনকে ব্যথিত করে। এর কারণ প্রেমিকের মন না বোঝে প্রেমে ঝাপ দেয়া। এরই বোধ আমরা ‘দীর্ঘশ্বাস’ কবিতায় দেখি। এ কবিতায় বাঞ্চিতকে যতটা জেনে ভালোবেসেছে তার চেয়ে বেশি অজানাই রয়ে গেছে। প্রেমিক মন জেনে যতটুকু কষ্ট পেয়েছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেতে চায় যেটুকু জানা হয়নি। সেটুকু জানার অধীরতা। অধরাটুকু জানলে হয়ত আরো কষ্ট পেতো। ভালোবাসা যেন কষ্ট পেতে পেতে নিঃশ্বেষ হয়ে যাবার মধ্যে ভালোবাসার প্রকৃত সুখ। তবু প্রেমিক মন নানাভাবে। সান্তনা লাভ করতে চেষ্টা করে। তাই আবার মনে হয় একেবারে অধরা হলেই যেন ভালো হতো। তাহলে স্বপ্নের মানুষ স্বপ্নে বসবাস করত। স্বপ্নের ভেতরই প্রেম আদান প্রদান করে সুখ পেতো। স্বপ্নের মানুষকে বাস্তবের ভেতর টেনে এনে কষ্ট পেতে হতো না। তারই হাহাকার ধ্বনি হয়েছে -
স্বপ্নভরা চোখে হতো স্বপ্নবাস
জীবন দুর্বিসহ হতো না
হতো না বোঝার কষ্টের দীর্ঘশ্বাস।

এ কবিতায় প্রেমিক মনের ব্যর্থতাই নয় এ যেন নারী জীবনের প্রকৃত প্রেমের রূপ। বোঝে না বোঝে ভালোবাসাই প্রেমের প্রকৃত রূপ ও ধর্ম। চিরন্তণ রূপটি এ কবিতায় মর্মস্পর্শি রূপে চিত্রিত হয়েছে। ‘অনাহারী’ কবিতায় প্রেম বুভুক্ষ মনের পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে কবি প্রেম প্রত্যাশী নারীর হৃদয় বেদনা এবং তদজণিত হাহাকার ফুটে ওঠেছে। প্রেম বুভুক্ষ মন বাঞ্চিতের প্রেম প্রত্যাশায় দিবস রজনী অতিবাহিত করে। কিছু প্রেম লাভে বঞ্চিত মনের দীর্ঘশ্বাস এবং ব্যর্থ যৌবনের করুণ আর্তি -
দুর্বার যৌবন মোহ চোখে
জীবনে এমন অনেক প্রভাত আসে
সদস্য ফোটা শুভ্র ফুলের নির্যাস হয়ে।

তাই মন প্রাণ দেহ প্রেম লাভে সিক্ত হয় জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেতেও ব্যর্থ হয়। তবু প্রেম কাঙালি মন প্রেমানলে জ্বলেও প্রেমেরই ধারায় স্নাত হতে চায় -
স্মৃতিরা সেলাই করে সকল ব্যাকুলতা।
‘যৌনশীত’ কবিতায় যৌবনকে প্রেমিকার কাছে উজাড় করে দিয়ে নারী মনের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেতে চায়। এতে সমাজ সংসারে সে কলংকিত হলেও নিজের খেয়াল খুশি মতো জীবনকে উপভোগ করা অধিকার ও স্বাধীনতা রয়েছে তা এ কবিতার মধ্য দিয়ে স্বাধীনচেতা নারীর মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
নষ্ট মনের বেসুরো চাওয়া
নষ্ট জলের গভীরতায়
ভিজিয়েছো নীল শাড়ীর আঁচল।
উপর্যুক্ত কবিতায় নারীর স্বাধীনভাবে যৌন জীবন উপভোগ করাকে সমাজের দৃষ্টিতে নষ্ট মেয়ে অভিযুক্ত করে। তবে এ কবিতার মধ্য দিয়ে কবির জীবনবাদী দৃষ্টি ভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। কবি রীনা তালুকদার তাঁর নারীবাদী কবিতা-১ শুধু নারীর পারিবারিক সামাজিক জীবনের অসঙ্গতি তুলে ধরেননি। নারীরাও যে কখনো কখনো নিজেদের মোহগ্রস্ততার কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারিবারিক সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এ মোহগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ। মোহগ্রস্ততা থেকে মুক্তির বানী রয়েছে। এ ধারার কবিতায় ‘ভালোবাসা পরগাছা’ কবিতায় পুরুষ মন ভুলানো কথা দিয়ে নারীকে ভালোবাসার মোহে আকৃষ্ট করে। সেটা কখনো নারীর রূপের প্রশংসা করে ভালোবাসা দোহাই দিয়ে নারীর আমিত্বকে কেড়ে নিয়ে নিজের করায়ত্ত্বে নিয়ে আসে। এসব আসলে ভালোবাসার নামে নারীকে ফাঁকি দেয়া তবু নারীকে সেই পুরুষকেই ভালোবাসে -
------------------------------------
নারী তবু তোমাকেই রাখে বুকে আঁকি।
কিন্তু তাই বলে নারী সেই পুরুষকে জন্মান্তরের জন্য মেনে নেয় না। কবি এদের সম্পর্কে মোহগ্রস্ততা থেকে মুক্তির আহবান জানিয়েছে বলেছেন -
নারী জানে না তোমার ভালোবাসা
কেবলই পরগাছা পরগাছা।

ভালোবাসা হচ্ছে মনের বন্ধন; আবার বন্ধনহীন সম্পর্ক। কাজেই ভালোবাসা হচ্ছে পরগাছা। যার কোনো শিকড় নেই তাই অস্তিত্বহীন। কাজেই কোনো নারী এ রকম সম্পর্ক গড়ে নিজের আমিত্বকে যেন হারিয়ে না ফেলে তারই সতর্ক আহবান কবির।
‘ভালোবাসার মৃত্যু’ কবিতায় পুরুষের ভালোবাসাহীন মন নিয়ে কোনো নারীকে ভালোবাসা দেয়া এক ধরনের মানসিক অসুস্থ্যতা ছাড়া কিছুই নয়। পুরুষের এ ধরনের ভালোবাসা একজন প্রেমাকাঙ্খি নারীকে রোগাক্রান্ত করে তুলতে পারে। কবির ভাষায়-
ভালোবাসা ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছো
মনের মাঝে মিলন মধুর খেলা
এ ভালোবাসার আচ্ছন্নতা থেকে
কাংখিত মৃত্যু এলে দুয়ারে
নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারবো।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে এ যেন ভালোবাসা না পুরুষের প্রেম প্রেম খেলা। ভালোবাসার নামে নষ্ট সম্পর্ক কোনো নারীর মেনে নেয়া মানে নিজেকে নিজের কাছে প্রতারিত করা। তাই তথাকথি পুরুষের এসব ভালোবাসা থেকে নিজেকে মুক্ত করা তো ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা করা। কবির মতে উপর্যুক্ত ভালোবাসা একটা রোগাক্রান্ত সময়। এ সময যত দীর্ঘ হবে ততোই হবে ভালোবাসার নামক পবিত্র সম্পর্কের অবমানতা। কবির ভাষায়-
ভালোবাসাকে আমূল হত্যা করতে পারে।
এভাবেই ভালোবাসার মৃত্যু হয়; যা সত্য সুন্দর ও মানবতার অকল্যাণ। নারীই পারে এ মোহগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে এসে তথাকথিত ভালোবাসার মৃত্যু ঘটিয়ে সুন্দরের কল্যাণ বয়ে আনতে। আবার ঊনচল্লিশ বছর চলে গেছে’ কবিতায় কবি যেন ভালোবাসার কাঙাল মনের হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে। কৈশোরের উচ্ছলতা চোখের রঙ লাগা দিনগুলো যেন প্রেম নামক মায়াবী সময় তাকে সেই ঊনচল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু মনে ভালোবাসার জোয়ার যতই বইতে থাকুক এ কবিতায় যেন প্রেমের জোয়ারে প্লাবিত করতে পারে না-
মনের অবাধ্য ভালোবাসার যে জোয়ার
সেভাবে ভালবাসতেই পারিনি
ঊনচল্লিশ বছর চলে গেছে

ভালোবাসা আসলে বাঞ্চিতের কাছে এক প্রকার আত্ম সর্ম্পন। প্রবল ভাবে আত্মকেন্দ্রিক মানুষের পক্ষে ভালোবাসার মোহ যতই থাকুক তা বরং ছড়াতে পারে না। এ কথা যেন কবির উপলব্ধির সত্য ভাষণ। তাছাড়া এ কবিতায় কৈশোরের যে ভালোবাসা মনে দাবা কেটে আছে তা যেন মোছার নয়। তাই যখন ভালোবাসা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মন যেন বর্তমানকে ফেলে সেই সুদূর অতীতের ভালোবাসার মোহে আবিষ্ট হচ্ছে;
সে শ্রী কৃষ্ণ ভালোবাসার সময়ই পায়নি
ঊনচল্লিশ বছর চলে গেছে.. .।

তাই কবির এ কাব্যগ্রন্থে ভালোবাসা নিয়ে দ্বিধা গ্রস্থ মনের পরিচয় ফুটে উঠেছে। কবি রীনা তালুকদার তার গ্রন্থে নারীর আত্মবোধন মূল কবিতায় নারীকে সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে জাগ্রত হবার আহবান জানিয়েছেন। চাঁদ কবিতায় কবি নারীকে স্তুতির মোহগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন। স্তুতি এক ধরনের অসার মনোরঞ্জন। নারীকে স্তুতির বলয়ে আবদ্ধ করে তার মৌলিকতাকে ঢেকে দিয়ে স্বকীয়হীন করে তোলে। স্বাতন্ত্রবোধ যে মানুষের মধ্যে নেই সে মানুষ ক্রমেই অবলম্বন খোঁজে। আত্মশক্তিহীন মানুষকে কবজা করে পরগাছা করা যায় সহজেই। এ ক্ষেত্রে নারীকে তার সৌন্দর্য কমনীয়তা লালিত্যকে চাঁদের মানে তুলনা করে মনোরঞ্জন করা পুরুষের চিরাচরিত ফর্মূলা। চাঁদের যেমন কোনো নিজস্ব আলো নেই। সূর্যের আলোকে আলোকিত হয় তাও রাতের বেলায় দিনের বেলায় সূর্যের আলোতে দৃষ্টির বাইরে থাকে। তেমনি নারীকে স্তাবকতায় মোহগ্রস্ত করে স্বকীয়তা থেকে দূরে রাখতে চায়। চায় পুরুষই হবে নারীর একমাত্র অবলম্বন। তাই কবি নারীকে স্তুতির মোহগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে এসে স্বমহিমায় ঔজ্জ্বল্য হবার আহবান জানিয়েছেন এবং এসবের প্রতিরোধের আহবান জানিয়েছেন-
আর তো যায় না দেয়া সময়
এবার রুখে দিবো সমস্ত নারীসুলভ স্তাবকতা।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে নারীর বন্ধন মুক্তির আহবান। এ আহবান আমরা ‘সংখ্যা লঘু নয়’ কবিতায় দেখতে পাই যা ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে। ‘অবগাহন’ কবিতায় কবির ভিন্ন মাত্রার প্রতিবাদ। এ কবিতায় কবি চিরাচরিত ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে নারীকে আত্মবোধনের এক মহাজাগতিক বাণী দিয়েছেন। নারী সব বয়সেই শুদ্ধতম সৌন্দর্য ময় এবং আকর্ষণীয়। প্রচলিত সামাজিক ধারণা যৌনবতী নারী বলতে সাধারণত রজ:স্বলা নারীকে বুঝায়। তখন নারীকে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে আবেদন দিয়ে মহামূল্যবান করা হয়। কিন্তু এ সময়টা নারীর সন্তান জন্ম দেয়ার সময় ধরা হয়। এর আগে বা পরে নারীর যৌন ক্ষমতা পূর্ণ ও অটুট থাকে। কিছু পুরুষ নারীকে শুধু যৌন ভোগের সামগ্রী মনে করে বলে এদের সম্পর্কে কবির ধিক্কার -
স্ফীত মুখ কার্তিকের কুকুরের হিংস্রতার
চিহ্ন বহন করছে।

নারীকে যদি পুরুষ একেকভাবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসীরূপে যৌন সম্ভোগ করে তাহলে রজ:স্বলা নারীকে যৌবনবতী মনে হবে। আর যদি নারীকে যৌন স্বাধীনতা দেয়া হয় তাহলে নারীর নারীত্বের আবেদন রজ:স্বলা পরে পূর্ণযৌবনবতী আকর্ষণীয় মনে হবে। কবির ভাষায়-
পঞ্চাশোর্ধে
সেই নারী হয়ে ওঠে বিশুদ্ধতম কিশোর
পূর্ণ যৌবনবতী।
উপর্যুক্ত কবিতাংশে নারীর চিরকালীন নারীত্বের জয়গান করেছেন; যা কবির অভিনবত্ব ভাবনা স্থান পেয়েছে। এ কবিতার মধ্য দিয়ে নারীর সত্যিকার দিকটি তুলে ধরে কবি নারীবাদী চেতনার বাক্ পরিবর্তন করেছেন। রীনা তালুকদারের নারীবাদী কবিতাগুলোর মধ্যে নারী মুক্তির জয় গান। দুঃখবর্তী বর্ষা, স্বাধীনতা ঘোমটা পরা, শ্রেণী সংগ্রামের, হারবো না আর, কৃষক, হার-জিৎ, নারী সমাজ, বাতিঘর, দুঃখবতী বর্ষা, কবিতায় প্রেম প্রকৃতি- নারী এক অভিন্ন সত্তারূপে আর্বিভূত। নারীর চলার পথ কণ্ঠকাকীর্ণ। নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে তাকে সংসার যাত্রা পাড়ি দিতে হয়। তাই বলে নারীকে ঠেকে থাকতে নয়, তার পথ চলা হবে বিস্তৃত এবং ব্যাপক। কবির আহবান -
চরণ ফেলো মেঘের ডানায়
নারীর চরণ যথায় তথায়।

যুগে যুগে দেশে দেশে সফল বিপ্লব ও মুক্তির ঝান্ডা উড়িয়েছে তরুণরা। ‘স্বাধীনতা ঘোমটা পরা’ কবিতায় করি রীনা তালুকদার তরুণদের নির্যাতিত নারী সমাজের পাশে দাঁড়িয়ে তথা কথিত স্বাধীনতা নয় তাদের সকল মানবিক মুক্তির সনদ লাভের আহবান জানিয়েছেন। নারীর চিন্তা চেতনার মত প্রকাশের অধিকার হরণ করে তাকে শুধু বাইরের জগতে চলা ফেরার স্বাধীনতা দেয়া প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। নারীর চাই সকল প্রকার স্বাধীনতা ও তা ভোগ করার অধিকার। তাই কবি তরুণদের আহবান জানিয়েছেন -
তারুণ্যের বিশ বসন্তের কণ্ঠ
জেগে ওঠো মুক্তির গানে
ঘোমটা পড়া স্বাধীনতা
মানুষের কাম্য নয়।

তারুণ্য দীপ্ত কণ্ঠে কবির এ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তারুণ্যের জয় গানের মধ্য দিয়ে মানবিক চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটেছে। ‘শ্রেণী সংগ্রাম’ কবিতায় কবি বিশ্বের সকল নারীকে নিজ ঘরের শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্তির আহবান জানিয়েছেন। যুগে যুগে দেশে দেশে সমাজের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রাম করলেও নারী নিজ ঘরেই পরাধীন। নারীর শৃঙ্খল হলো পুরুষ -সেই পুরুষ স্বামী বা পিতা কিংবা ভাই বা প্রেমিক। এ সব পুরুষরা স্নেহ বা ভালোবাসার তোষণে নারীকে শৃঙ্খলিত করে রাখে। তাই স্বাধীনতাকামী নারীদেরকে যুদ্ধ এবং যুদ্ধ জয়ের ঘোষনা নিজ ঘর থেকেই দিতে হবে-
সাম্রাজ্যবাদী প্রভুত্বের ভাঁড়ার থেকে
অথচ প্রতিটি ঘরে জনম জনমের স্বাধীনতার যুদ্ধ
জেগে ওঠো নারী আঁতুড় ঘর থেকে।

‘হারজিৎ’ কবিতায় কবির নারীবাদী চেতনার বাঁক্ পরিবর্তনের অপার সম্ভাবনা। মানুষ হিসাবে সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চায়। কারো করুণা বা দয়া নয় মানুষ হিসাবে তার মেধা মনন ধী-শক্তি রয়েছে-তা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করে যোগ্যতার সাক্ষর রাখতে চায়। সমাজের কাছে বারবার পরাজিত হলেও নারীর রয়েছে জিতবার যোগ্যতা-
ঊষর ভূমিতে ফলবে না ফুল
এমন ভাবনাই ভুলা ক্রান্ত ।

তাই কবি সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে নিজের যোগ্যতা বলে নিজের শক্তি সাহসের প্রমান দিতে চায়-
অমর্যাদারকর জেতার চেয়ে
মর্যাদায় হারতে চাই জীবনকাল।

এভাবে মর্যাদাকর হারতে গিয়ে একদিন জেতার উৎসব করবে নারী নিজ আঙ্গিনায় বিশ্বসভায়। ‘নারী সমাজ’ কবিতায় কবি নারী জাতির প্রতি আত্মপরিচয় নির্ধারণে দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিচয় তুলে ধরেছেন। নারী সমাজ আজও তার পরিচয়-লিঙ্গ পরিচয়ের উর্ধ্বে ওটে মানুষ পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরতে পারেনি। নারী সমাজ নিজেদের অধিকার আন্দোলনের যে সংগ্রাম করেছে। তা কিসের সংগ্রাম বা এতে নারীর অধিকার কতটুকু আদায় হবে তা অনেকে না জেনে সংগ্রাম করে। নিজেকে সাহসিকা, প্রকাশিকা, সেবিকা এসব অভিধায় ভূষিত হয়ে মনে করে নারীর যথেষ্ট অর্জন হয়েছে। তাই কবির আক্ষেপ -
এ জাতীয় শব্দের মাদকতা থেকে মুক্ত হয়নি
কীভাবে আসবে মুক্তি ?

‘কৃষক’ কবিতায় কবি নারীর প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরেছেন। কৃষির রূপকার নারী। কৃষির আবিস্কার বিবর্তনে রয়েছে নারীর শ্রম মেধা মনন। অথচ কালের পরিক্রমায় সেই নারীকে কৃষি থেকে সরিয়ে গৃহস্থালীর গন্ডিবদ্ধ জীবনে এনে নারীর স্বাধীন চিন্তা চেতনা ও কর্ম মেধাকে সীমাবদ্ধ পরিসরে এনে করেছে সীমায়িত। নারীর এই বিপুল কর্মক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে তথাকথিত পুরুষ সমাজ সমাজের পরিবারের রাষ্ট্রের সামগ্রিক চাহিদার যোগানদাতা বলে শ্লাঘা বোধ করছে। কিন্তু সেই সব অহমিক পুরুষ বুঝতে চায় না তার কর্ম উদ্যমতার পিছনে রয়েছে নারী প্রেম-কাম-সেবা। কিন্তু নারীকে সাংসারিক কাজে আবদ্ধ করে রাখলেও সে হাঁস-মুরগি বাড়ীর আশপাশের শাক সবজি-উৎপাদন করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে সংসারে আর্থিক সাশ্রয় করার কথা ‘কৃষক’ কবিতায় অত্যন্ত যুগোপযোগী করে নারীর যথার্থ মূল্যায়ন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
সে কী বদলায়নি দেশের সমাজ
ঘুরায়নি অর্থনীতির চাকা ?

এ কবিতায় কবি নারীরা সাংসারিক কাজে ব্যাপৃত থেকে উৎপাদনে অংশ গ্রহণ করে পরিবার তথা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের দিক প্রতিফলিত করে নারী মূল্যায়ণের দিকটি সচেতন অসচেতন পুরুষ সমাজের নজরে আসবে। এ কবিতার মধ্য দিয়ে কবি নারীর অসীম কর্ম উদ্যম কর্ম ক্ষমতা রয়েছে এবং তার নিজস্ব ক্ষমতা বলে কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নারী বলে তো অবশ্যই মানুষ হিসাবে তার যোগ্যতা কারো সাথে তুলনীয় বিশেষ করে পুরুষের সাথে নয়; তুল্য সে নিজেই নিজের কাছে। এটাই কবিতার বিষয়বস্তু। নারী যে সৃষ্টির প্রথম থেকেই অতুলনীয় তা নারী নিজেকে উপলব্ধি করতে হবে। তবেই অন্যান্য ক্ষেত্রে তার আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হবে। কর্ম হবে সুষ্ঠু এবং কল্যাণকর। ‘কৃষক’ কবিতায় কবি নারীর শ্রেষ্ঠত্বকে আবারো আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। আর এ কবিতার মধ্য দিয়ে কবি নারীবাদী চেতনার বাক্ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কেননা আজ সমাজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি নারীর সমার্থক হিসাবে রয়েছে। নারীকে তার পূর্বের জায়গায় ফিরে পেতে হবে। যখন নারীকে ভাবা হতো শক্তির আধার। এখন নারী শুধু সমাজের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক দিকটি গ্রহণ করে নিজের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে শিক্ষা ও কর্মের অধিকারের সুযোগ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হবার পথ গ্রহণ করতে হবে। নানা দিক থেকে বাধা আসলে সে বাধা অতিক্রম করে নিজের প্রতিভার বিফল ঘটিয়ে নিজের পরিবার, সমাজের, রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে যোগ্য ভাবতে হবে এবং যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। কবির কথায় সেই আদি নারী -
সে কী ছিলো না জাত কৃষক
সেও মানুষ কৃষিকে দিয়েছে
নিজের শ্রম-ঘাম-কাম-আগুন।

ভূমিকা

নারীবাদী কবিতা -১ এই বইতেও বিজ্ঞান করে লেখা কবিতার বই৤

শেয়ার করুন: