সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষকরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে একটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে আমাদের দেশের জনগন মনে মনে কামনা করছেন- বাংলা সাহিত্যে যে কেউ একজন নোবেল পুরস্কার এনে দিক! বিশ্বের বুকে বাংলা সাহিত্যের একটি বিজয়গাঁথা রচিত হোক। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলা সাহিত্যে এখন পর্যন্ত কেউ নোবেল পেলেন না! এটি অবশ্যই চরম দুর্ভাগ্যজনক। কেননা ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি বাংলা সাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ। বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের সাথে তুলনামূলক অগ্রগতি বিবেচনা করলে আমরা যে খুব একটা পিছিয়ে বলা যায় না। বাংলা সাহিত্যে কীর্তিমান মহাপুরুষের সংখ্যাও কোন অংশে কম নয়। এসব  সাহিত্যিকদের মধ্যে কি কেউই নোবেল এর যোগ্য ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন কিন্তু পেলেন না! কেন পেলেন না বা কি করলে পেতেন এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। বিশেষ করে শিল্প সাহিত্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের রীতিমত গবেষণা করা উচিত এ বিষয় নিয়ে। যাহোক, এ বিষয়ে আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- বাংলা সাহিত্য বলতে এই প্রবন্ধটিতে শুধু বাংলাদেশী সাহিত্যিকদের সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম এবং সময়কাল হিসেবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়টি বিবেচনা করা হয়েছে। মূল আলোচনায় ফেরা যাক।


প্রথমত, আমরা যে ভুলটি করি তাহলো আমরা নিজেরাই দেরি করে ফেলি আমাদের সেরা কবি বা সাহিত্যিকদের চিনে নিতে। একটু খেয়াল করে দেখুন আমাদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বিষয়ক পুরস্কারগুলো মরণোত্তর ছাড়া জীবদ্দশায় কজনকে দিতে পেরেছি? এই তথ্যই আমাদের গতিকে জানান দেয়! আমরা জানি,  নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর হয় না। জীবিত কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্ম বা অবদান পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়। তাই আমরা যদি বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার আনতে চাই তবে আমাদেরকেও আমাদের সাহিত্যে অবদান রাখা ব্যক্তিবর্গকে তাদের জীবদ্দশায়ই চিনে নিতে হবে, অন্যদেরকে চিনিয়ে দিতে হবে। তাদেরকে সম্মান, স্বীকৃতি জীবদ্দশায়ই দিতে হবে। এই কাজটি যদি আমরা না করতে পারি তবে বিশ্ব করবে কিভাবে? এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নির্মোহ দৃষ্টিতেই এই সনাক্তকরণ, সম্মান এবং স্বীকৃতি প্রদানের কাজটি আমাদের করতে হবে, কোন ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গিতে আবদ্ধ হওয়া যাবে না- যদি আমাদের লক্ষ্য হয় বাংলা সাহিত্যের বিশ্বজয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো- অনুবাদ।  নোবেল পুরস্কারের জন্য যদিও একজন সাহিত্যিকের সামগ্রিক আবদান বিবেচনা করা হয় তবুও ইংরেজি ভাষার বা ইংরেজিতে অনুদিত সাহিত্যকর্মের মাধ্যমেই তা করা হয়। ওখানে ইংরেজি ভাষার বা্‌ইরে অন্য কোন ভাষার এক্সপার্ট আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা উল্টো কাজ করি- অন্যান্য সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করে পাঠকদের খাওয়াই। এটি অবশ্য দোষের কিছু নয়। তবে কথা হলো অন্যভাষার সাহিত্য নিয়ে আমজনতার বা আমাদের পাঠক শ্রেণীর মধ্যে যাদের আগ্রহ আছে তারা এসব বিদেশী সাহিত্যের ইংরেজি ভার্সনটি পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। আর যদি তারা বাংলাভাষার পাঠক সৃষ্টি করতে চান তাহলে তাদের প্রয়োজনে তারাই তাদের সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদ করবেন। তাই বাংলায় এসব সাহিত্যের অনুবাদ হতে পারে কিন্তু আমাদের যে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিৎ হবে তা হলো, বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায় আনুবাদ করা- এটিই আমাদের কাজ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি কিন্তু নোবেল পেয়েছেন তার -Song Offerings বইটির জন্য যেটি তার গীতাঞ্জলি এর ইংরেজি অনুবাদ। এ নিয়ে নোবেল কমিটির বক্তব্য ছিলো "The Nobel Prize in Literature 1913 was awarded to Rabindranath Tagore "because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West."  তাই ধারণা করা যায়, যারা ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষায় দক্ষ তারা যদি আমাদের বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন তবে অনেক লেখকই হয়তো নোবেল পেতেন। যেমন ধরুন- হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক,  শামসুর রহমান, আল মাহমুদ এই মহান সাহিত্যিকদের ইংরেজি অনুদিত সাহিত্যকর্ম কতটুকু হয়েছিলো তাদের জীবদ্দশায়? যেটুকু অনুবাদ হয় তার মান নিয়েও আবার প্রশ্ন থেকে যায় । সুতরাং বাংলা সাহিত্যে নোবেল আনতে হলে- বাংলা সাহিত্যের মান সম্পন্ন ইংরেজি অনুবাদ আরও অনেক অনেক বাড়াতে হবে।


তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো- বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণ। এক্ষেত্রে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। বাংলা ভাষা এখন বেশ বিস্তৃত। এসব জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দেয়ার সাথে সাথে অন্যভাষার লোকজনের কাছেও বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বাংলা সাহিত্যির আন্তর্জাতিকীরণটি করতে হবে ডিজিটাল উপায়ে। তাই এটিকে একার্থে বাংলা সাহিত্যের ডিজিটালাইজেশনও বলা যায়। সহজলভ্য ডিভাইস ব্যবহার করে যাতে পাঠক সাহিত্যের স্বাদ নিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি করতে আরও বেশি মান সম্পন্ন বহুভাষিক ওয়েবম্যাগ, ওয়েবজিন, সাহিত্যের বিভিন্ন অ্যাপ এবং  অনলাইন পোর্টাল তৈরি করতে হবে। যাহোক বিভিন্ন ভাষায়, প্রধানত ইংরেজি ভাষায় বাংরা সাহিত্যকে উপস্থাপন করতে হবে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধরূপটিকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।


পরিশেষে বলা যায়- বাংলা সাহিত্যের নোবেল অর্জন করতে হলে আমাদের সহিত্যিকদের জীবদ্দশায়ই নির্মোহভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের সৃষ্টিকর্মসমূহকে মান সম্পন্নভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে এবং তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে অবিরত চেস্টা করতে হবে। বলতে গেলে এটি বাংলার জনগণের প্রাণের দাবী শিল্প সাহিত্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে, কারন বাংলাদেশের জনগন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন বিশ্বের বুকে বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালি অবস্থানটি অনন্ত একটি নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বীকৃতি পাক।