অনেক দিন হয়ে গেল। প্রকৃতির সাথে কথা বলা হয় না। কথা বলার জন্যই মনে হয় মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। মনের মাঝে কেমন যেন ঝড় বইছে। ভাবনা গুলো উল্টে পাল্টে, স্মৃতি গুলো এমন ভাবে জটলা পাকিয়েছে যে,কি ভাবে জটলা গুলো ছাড়িয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ে ভাববো বুজতেই পারছিনা।


তাই, ইমরান,রাগীব,ও লাভলীকে নিয়ে ভোরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। ছুটির দিনে আমরা হাঁটতে বের হলাম।
কালো মিচমিচে পিচ ঢালা রাস্তা ধরে হাটঁছিলাম। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। সূর্যটা নীল আকাশের নীচে আলো ফোটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মনটা স্নিগ্ধ হয়ে গেল। ভোরের অপরুপ আলোর দিকে চেয়ে।


দূরে কোথাও শীলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। দক্ষিণা হাওয়ায় হালকা ঠান্ডায় আরামদায়ক অনুভব করছি। এ যে কেমন অনুভূতি লিখে বুঝানো যাবে না। বাস্তবে অনুভব করতে হবে।


(পর্ব-২)
রাস্তার দুধারের আকাশ ছুঁয়া বৃক্ষ গুলোর প্রকৃতির নিয়মে পাতা ঝড়ে, আবার বর্ষার আগমনি শুরু হওয়ার আগেই পাতা বিহীন ডাল গুলো কঁচি পাতায় ভরে যায়।
কঁচি পাতার সমারোহে আমাদের পথ চলা আনন্দদায়ক হয়ে গেল। কঁচি নরম পাতা গুলো মৃদু বাতাসে পত পত করে উড়ছে। পাতা গুলো এতোটাই কঁচি যে, হালকা বাতাসের ভরও যেন বইতে পারছেনা। এই কঁচি পাতার রঙ্গের সুন্দর্যের বর্ণনা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভবনা। এ রং মন ভোলানো, চোখ জুড়ানো। পাতা গুলোয় হাত বুলাতেই যেন নূয়ে পরছে। গা এলিয়ে দিচ্ছে আহলাদে।


আমাদের চোখে পড়লো এমন এক প্রজাতি, চির সবুজ প্রকৃতির। মনে হচ্ছে এই গাছটি কোন ঋতুতে কখনো একেবারে সব পাতা ঝড়িয়ে দেবার স্বভাব তার নেই। গাছটার দিকে তাকাতেই মনটা ভরে গেল। গাছের গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত সবুজ পাতায় ভরে আছে।


আমরা পিচ ঢালা রাস্তা ছেড়ে চন্দ্রিমা উদ্যানে ঢুকে পড়লাম। হাটতে হাটতে শরীরে ক্লান্তি এসে যাওয়ায়, সবুজ ঘাসের উপর কংক্রিটের তৈরী বেন্চে বসে, দুই যুগ আগের সেই চির সবুজ দিন গুলোয় ফিরে গেলাম।
ফাল্গুন চৈত্র মাসে কাঠ ফাটা রোদে রাখালিয়ার বাশির সুরের মুর্ছনার কথা কখনো কি ভুলা যায়? ঘরের বউ ঝিরাও বাড়ীর বাকি বেড়ার ফাঁক দিয়ে, কান উচিয়ে দিয়ে মন মুগ্ধ হয়ে শুনতো রাখালিয়ার বাশির সুর। রাজ কন্যাও সুরের মোহে পরে ঘর ছেরেছে। দাদা দাদীর কাছ থেকে গল্প শুনেছি,তাও ভূলিনি। রাখালিয়া বাশির সুর হয়তো আর কোন দিন শোনা হবে না। তবে!


( পর্ব -৩)
বসন্তের কোকিলের ব্যাকুল করা কুহু কুহু শব্দে মুখরিত হলাম আমরা। চন্দ্রীমা উদ্যান মন কাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এমন মনমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে দেহ মন মাতোয়ারা হয়ে গেল। কোকিলের পিছু নিলাম। এদিক ওদিক খুজতে খুজতে দেখা পেলাম, সুউচ্চ গাছের মগডালে বসে তার রুটিন মাফিক কুহুকুহু ডাকে মুখরিত করে তোলে চন্দ্রীমা উদ্যান।এ ডাকে ব্যাকুলতায় ভরপুর। এ যেন কোন সাথী হারা কোকিল ব্যাকুল কন্ঠে সাথীকে আহ্বান জানাচ্ছে।


এই আকর্ষণ আমাদের মনোযোগ কেরে নেয়। আমরাও খুজতে থাকি তার সাঙ্গীকে। আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, চোখের পলকে কোথায় যে হারিয়ে গেল!
কোন ফাঁকে কোন পাতার আড়ালে চলে গেল টেরই পেলাম না। আমাদের অপেক্ষার পালা শুরু হয়ে গেল।অপেক্ষা করতে করতে মুহুর্তেই আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ হলো। পাশের বাগান থেকে ভেসে আসতে লাগলো তার রাগান্বিত সুর। এই সুরই বলে দিচ্ছে। আমাকে তোমরা খোজার চেষ্টা করো না। কনো লাভ হবে না।এতেই বুঝা যায় কোকিল চতুর ও অলস পাখি। তা না হলে অন্যের বাসায় ডিম পারে!


কোকিলের পিছনে অনেক সময় ব্যায় করে আমরা হাপিয়ে উঠছিলাম। একটু চা হলে ভাল হতো। দুরে একটি টং ঘর দেখতে পেয়ে চায়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। টংয়ের পাশে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে ভ্রমন পিপাসুদের জন্য বসার ব্যাবস্তা করে রেখেছে। চারদিক খোলা মাথার উপর ছাউনি। স্বহস্তে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পরলাম। ঝির ঝির বাতাসে আমাদের দেহ মন আনন্দে উদ্ভাসিত হল।


বিশাল আকাশের নিচে ছোট্ট প্লাস্টিকের ছাউনি। চার পাশে দোলায়িত বৃক্ষগুলো, সবুজে আলোরিত হচ্ছে। বাতাসের সুরে আমরা মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সকালের ভ্রমনের আনন্দ, প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য দারুন উপভোগ্য হলো।


বসন্তের কোন একদিন - ২০১৮।
বেগম সেলিনা খাতুন