আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সচেতন শব্দের প্রয়োগ, সুগঠিত চিত্রকল্প, অর্থময়তা আর ছন্দ-উপমা-উৎপ্রেক্ষার সংমিশ্রণে একটি সুসংবদ্ধ রচনা । কবিতা হওয়া উচিৎ যতটা না দেখা বা শোনার, তার চেয়েও যেন বেশি উপলব্ধির।


কবিতার জগতে অলঙ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অলঙ্কার দুই ধরনের - শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার। অনুপ্রাস, যমক, শেষ, বক্রোক্তি ও পুনরুক্তবদাভ্যাস ইত্যাদি শব্দালঙ্কারের অন্তর্ভূক্ত। কবিতার অলঙ্কার সাস্ত্রে ‘উপমা-উৎপ্রেক্ষা’ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। ‘কবিতার রূপকল্প’ গ্রন্থে সৈয়দ আলী আহসান বলেন, “কাব্য শব্দ বা বাক্য একটি বিশেষ সংহতি এবং ধ্বনিবৃত্তির সাহায্যে বক্তব্যকে মুক্ত করে। যে কৌশল অবলম্বন করে একজন কবি তার বক্তব্যকে বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে প্রকাশ করেন তার মধ্যে উপমা একটি আশ্চর্য কৌশল।” ‘সাহিত্য-বিচার’ গ্রন্থে কবি মোহিতলাল মজুমদার লিখেছেন, “এক বস্তুকে অপর বস্তুর দ্বারা রূপককে ভাবে এবং ভাবকে রূপকে; সাদৃশ্য যোগে ফুটাইয়া তোলার যে কাব্য সৃষ্টি তাহাকেই উপমা বলিতেছি।” জীবনানন্দ দাশ বলেন, ‘উপমাই কবিতা’। সেই আদিযুগ হতে অদ্যাবধি বাংলা কবিতায় দাপটের সাথে উপমা-উৎপেক্ষার প্রয়োগ বিদ্যমান রয়েছে।


‘উপমা’ শব্দটি একটি বিশেষ্য। এর ব্যাকরণগত একটি অর্থ হল তুলনা বা সাদৃশ্য। অলঙ্কারশাস্ত্রগত অর্থ হল এক ধর্মবিশিষ্ট দুই ভিন্নজাতীয় বস্তুর সাদৃশ্য বর্ণনা করা। সাধারণভাবে, একটি নির্দিষ্ট বিশেষ্যবাচক পদসমষ্টি অথবা নির্দিষ্ট দৃশ্যকল্প বা চিত্রকল্প (মনে মনে কল্পিত ছবি বা ভাবচ্ছবি) প্রকাশ করে এমন শব্দগুচ্ছ দিয়ে যদি ভিন্নতর কোনও বিশেষ্যকে বা দৃশ্যকল্প বা চিত্রকল্পকে নির্দেশ করা হয় বা তার ইঙ্গিত প্রকাশ করা হয়; অথবা যদি দুটি ভিন্নতর বিশেষ্যবাচক শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে একইসাথে তুলনা করা হয়, তবে আলঙ্কারিক এই কাজটিকে উপমা শব্দটি দিয়ে প্রকাশ করা হয়।


অন্যদিকে ‘উৎপ্রেক্ষা’ অর্থ হলো উৎকট জ্ঞান বা তুলনা; কখনও তা সংশয় বা মিথ্যা কল্পনা। উৎপ্রেক্ষার নানাবিধ বৈশিষ্ট্য, যেমনঃ (১) উপমান, (২) উপমেয়, (৩) তুলনামূলক শব্দ এবং (৪) সাধারণ ধর্ম। উদাহরণ স্বরূপঃ


‘রোদের রঙ শিশুর গালের মতো লাল’।


এখানে শিশুর গাল - উপমান (যার সাথে তুলনা করা হয়), রোদের রং - উপমেয় (যাকে তুলনা করা হয়), সাধারণ ধর্ম হলো - লাল (যে গুণ, ক্রিয়া বা ধর্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়) এবং তুলনামূলক শব্দ হলা - মতো (এছাড়াও যেন, হেন, মম, ন্যায়, যথা, প্রায়, তুল্য ইত্যাদি শব্দ দ্বারা তুলনামূলক শব্দ প্রকাশ করা হয়)।


তবে উপমায় উক্ত চারটি বৈশিষ্ট্যই একসঙ্গে অপরিহার্য নয়। যেমনঃ


‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোরে’


এখানে শিশুরা - উপমান, বন্যেরা - উপমেয়, সুন্দর - সাধারণ ধর্ম। কিন্তু তুলনামূলক বা সাদৃশ্যবাচক কোনো শব্দ নেই।


উপমা-উৎপ্রেক্ষা কবিতার কেবলমাত্র অলঙ্কার বা ভূষণ নয়, এক শক্তিশালী হাতিয়ার, শরীর বা প্রাণও বটে। উপমা-উৎপ্রেক্ষার শিল্পিত ব্যবহারে কবিতা হয়ে ওঠে লাবণ্যময়, কমনীয় ও আকর্ষণীয়; কবিতাকে দেয় পূর্ণতা। উপমা-উৎপ্রেক্ষা কখনো ইঙ্গিতকে অধিকতর ইঙ্গিতবহ করে তোলে, এতে কবিতার দেহে করে লুকোচুরি খেলা। কখনোবা উপমা-উৎপ্রেক্ষা কবিতাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ করে তোলে, এক চুমুকেই সবাই পায় কবিতার স্বাদ। কোলরিজ বলেন, কবিতা যদি ‘সুন্দরতম শব্দের সুষম বিন্যাস হয় তাহলে কবিতায় উপমা অপরিহার্য।’ কখনও কখনও উপমাই যেন একটি কবিতা।


অনেক কথা অল্প কথায় বলা যখন কবির উদ্দেশ্য হয় তখন উপমা-উৎপ্রেক্ষার যুৎসই নির্বাচন বা প্রয়োগ ভাল কবিতার আবশ্যিক অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। যখনই সহজ কথা সহজ ভাবে বলা কঠিণ হয়, তখন উপমা-উৎপ্রেক্ষা হয়ে উঠে সর্বশেষ করণ। উপমা কবিতার জন্য এক আবশ্যক উপাদান। উপমা-উৎপ্রেক্ষা তাই যুগজীর্ণতা দূর করে কবিতার প্রাচীরে এনেছে নবধারা জল। উপমা-উৎপ্রেক্ষার গুণে কবিতা আজ হয়ে উঠেছে এক অনতিক্রম্য শিল্প।


তবে কোন কোন ক্ষেত্রে উপমা-উৎপ্রেক্ষা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, ফলে কবিতায় শুধু উপমা-উৎপ্রেক্ষা থাকলে চলবে না এর গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। আধুনিক কবিতা নির্মেদ দেহ ধারণে সচেষ্ট। ফলে লক্ষ্য রাখতে হবে উপমা-উৎপ্রেক্ষার বাহুল্য ব্যবহারে কবিতায় যেন স্থূলতা না আনে; কিংবা কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার যেন অসংগত না হয়। উপমা-উৎপ্রেক্ষার অসংগত ব্যবহার কবিতাকে শিল্পের বদলে কারখানার উৎপাদ-বর্জে পরিণত করে।


কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ, উপমা-উৎপ্রেক্ষার কেবলমাত্র সাদৃশ্য অংশ নয় অন্যান্য অংশও পাঠকের মনে উদয় হয়। কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগে অনেকক্ষেত্রে ভীষণ অসতর্কতা পরিলক্ষিত হয়, কয়েকটি উদাহরণ যেমনঃ


“ভোর বেলা পূব আকাশে উদিত গাঢ় হলুদ সূ্র্য” - এর স্থলে


“ভোর বেলা পূব আকাশে উদিত গাঢ় লাল সূ্র্য” - হলে ভাল হতো
কারণ, অভিজ্ঞতায় বলে ভোর বেলা পূব আকাশে সূ্র্য হলুদ হয়না, হয় লাল।


আবার, “তোমার ঠোঁট যেন বরফের মতো উষ্ণ” - না হয়ে


“তোমার ঠোঁট যেন বরফ-ঘরের মতো উষ্ণ”


কিংবা, “তোমার ঠোঁট যেন বরফের মতো শীতল” - হওয়া উচিত।
কারণ, স্বাভাবিক অবস্থায় বরফ শীতল হয়, উষ্ণ হয়না।


আবার যদি বলি, “গোলাপের কাঁটায় বিঁধে সৌরভ নিলো” - এর বদলে


“গোলাপের কাঁটায় বিঁধে ফুল হাতে সে” - বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ
কারণ, গোলাপের সৌরভ দূর থেকে নেয়া যায়, কাঁটায় বিদ্ধ হওয়া লাগে না।