কাব্যের রসঘন ও শ্রুতিমধুর বাক্যে সুশৃঙ্খল ধ্বনিবিন্যাসের ফলে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে বলে ছন্দ।  ( জীবেন্দ্র সিংহরায় )
বলা হয়ে থাকে,সেতারের তার-বন্ধনে যেমন সুরের মুক্তি,সুশৃঙ্খল ছন্দের আঁটুনিতে তেমনি কবিতার প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।


আমাদের ছন্দের ইতিহাস প্রাচীন।খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ৯০০ অবধি চর্যাপদে ব্যবহৃত ছন্দ বাংলাভাষার প্রাচীনতম ছন্দ বলে ধরে নিতে পারি।চর্যার পদগুলি ছিল মূলত:
অন্ত্যমিলযুক্ত এবং গানে ব্যবহার উপযোগী।
একদিন ব্যাধের শরে ক্রৌঞ্চমিথুনের ক্রৌঞ্চ নিহত হলে ক্রৌঞ্চী আর্তস্বরে বিলাপ করছিল,আর তা শুনে রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকির বেদান্ত হৃদয় থেকে যে ছন্দ সকরুণ অভিশাপোক্তি উচ্চারিত হয়, তাই সমগ্র ভারতবর্ষের নিরিখে আদিছন্দ নামে পরিচিত।এই ছন্দের নাম অনুষ্টুপ।
বলা যায়,অনুষ্টুপ বা অনুষ্টুপের প্রসারিত শাখা গায়ত্রী থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতীয় আরো অনেক ভাষার মতো ইংরেজী ভাষায় প্রভাবিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে বাংলায় প্রচলিত ছন্দ- ধারনা।


          বলার অপেক্ষা রাখে না যে,একজন কবির সুক্ষ অনুভূতি বা আবেগই কবিকে কবিতা লিখতে প্রাণিত করে।জোয়ারের জলের সঙ্গে এই আবেগকে তুলনা করতে পারি।যখন জোয়ার আসে এবং তীরে আছড়ে পড়ে  তখন নদীতে জলের যে গতিবেগ তাকে দ্রুত গতি বা দ্রুতলয় বলতে পারি।জোয়ার যখন সম্পূর্ণ তখন জলের বেগ মধ্যমগতির বা মধ্যমলয়ের।আবার যখন  ভাঁটা এগিয়ে আসে, তখন জলের গতি স্তিমিত বা ধীরগতির।এই লয়ের বিভিন্নতা ছন্দকে মূলতঃ তিনভাগে ভাগ করেছে।যথা,স্বরবৃত্ত,মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত।
১.স্বরবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*দ্রুত লয়
*পর্বের আদিতে শ্বাসাঘাত
*পূর্ণপর্ব ৪ মাত্রার
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
  রুদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা
উদাহরণ:
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই


পর্ব বিশ্লেষন করলে পাই,
বাঁশ বাগানের/মাথার উপর/চাঁদ উঠেছে/ওই
মাগো আমার/শোলক বলা/কাজলা দিদি/ কই
এবার ছন্দ বিশ্লেষন করি,
প্রথম চরণ-
বাশ্ =১ বা=১ গা=১ নের্=১          ৪ মাত্রা
মা=১ থার্=১ উ=১ পর্=১            ৪ মাত্রা
চাঁদ্=১ উ=১ ঠে=১ ছে=১             ৪ মাত্রা
ওই=১                                    ১ মাত্রা
                    মোট=  ৪+৪+৪+১
দ্বিতীয় চরণ-
মা=১ গো=১ আ =১মার্=১             ৪ মাত্রা
শো =১ লক্ =১ বা =১ লা =১        ৪ মাত্রা
কাজ্ =১ লা =১  দি =১  দি =১       ৪ মাত্রা
কই =১                                    ১ মাত্রা
                     মোট = ৪+৪+৪+১
২.মাত্রাবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*মধ্যম লয়
*ধ্বনি ঝঙ্কার
*পূর্ণপর্ব ৫,৬,৭ মাত্রার
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
  রুদ্ধাক্ষর  ২ মাত্রা
উদাহরণ:
দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার


পর্ব বিশ্লেষন-
দুর্গম গিরি/কান্তার মরু/ দুস্তর পারা/বার
লঙ্ঘিতে হবে/ রাত্রি নিশীথে/যাত্রীরা হুঁশি/য়ার
ছন্দ বিশ্লেষন-
প্রথম চরণ-
দুর্=২ গম্=২ গি=১ রি=১               ৬ মাত্রা
কান্=২ তার্=২ ম=১ রু=১              ৬ মাত্রা
দুস্ =২ তর্ =২ পা = ১ রা =১          ৬ মাত্রা
বার্ =২                                       ২ মাত্রা
                      মোট=৬+৬+৬+২
দ্বিতীয় চরণ-
লঙ্=২ ঘি =১তে =১ হ =১ বে =১       ৬ মাত্রা
রাত্=২ রি=১ নি=১ শী=১ থে=১         ৬ মাত্রা
যাত্ =২ রী =১ রা =১ হুঁশ্=২             ৬ মাত্রা
( ই) য়ার্=১                                   ২ মাত্রা
                     মোট = ৬+৬+৬+২
৩.অক্ষরবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*ধীর লয়
*চরণের আদ্যন্ত তান
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
   রুদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা, কিন্তু তা শব্দের শেষে
   থাকলে ২ মাত্রা।


উদাহরণ:
মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পূণ্যবান।।


পর্ব বিশ্লেষন-
মহাভারতের কথা/ অমৃত সমান
কাশীরাম দাস কহে /শুনে পুণ্যবান
ছন্দ বিশ্লেষন-
প্রথম চরণ-
ম=১ হা=১ ভা=১ র=১ তের্=২ ক=১ থা =১                                                             ৮ মাত্রা
অম্ =১ ঋ=১ ত=১ স=১ মান্ = ২    
৬ মাত্রা
                         মোট = ৮+৬
দ্বিতীয় চরণ-
কা =১ শী=১ রাম্ =২ দাস্ =২ ক=১ হে =১                                                           ৮ মাত্রা
শু =১ নে =১ পূন্ =১ ণ=১ বান্ =২    
৬ মাত্রা
                         মোট = ৮+৬
লক্ষা করতে হবে, পূন্ এবং বান্ দুটিই রুদ্ধাক্ষর।কিন্তু একটি শব্দের প্রথমে থাকায় ১ মাত্রা এবং অন্যটি শব্দের শেষে থাকায় ২ মাত্রার হয়েছে।
                              
ছন্দ আসলেই এক নদীর মতো।তার প্রবাহ এক জায়গায় স্থির থাকেনা।বিবর্তিত হতে হতে ক্রমশ: সে এগিয়ে চলে।প্রচলিত ছন্দ ভেঙ্গে মধুসূদনের হাত ধরে সেইভাবে সৃষ্টি হয়েছে অমিত্রাক্ষর ছন্দ।এতকাল ছন্দমিল ছিল পদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।অমিত্রাক্ষর ছন্দে সে মিল আর রইল না।মধুসূদন তার বিখ্যাত মেঘনাদ কাব্যটি লিখেছেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে।
তারপর এল পয়ার, চতুর্দশপদী,মুক্তক ইত্যাদি ।


একসময় আসে ফরাসী বিপ্লব।শিল্পমুক্তি আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগল পৃথিবীর তাবৎ শিল্পকর্ম তথা সাহিত্যে।বাংলা কবিতাও তার ব্যতিক্রম হল না।তৎকালীন বিদগ্ধ কবিদের মধ্যে সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত মননের নব্য কবিকূল অনুভব করলেন, কবিতাকে প্রকৃত জীবনধর্মী করে
তুলতে হবে,আর এর জন্য কবিতায় ছন্দমুক্তি অনিবার্য ।এভাবেই আবির্ভাব হলো গদ্যছন্দ।


গদ্যছন্দের বৈশিষ্ট্যগুলি মোটামুটি এইরকম:
ক।  সমগ্র কবিতা হবে পরস্পর ছেদবিচ্ছিন্ন চরণের দ্বারা গঠিত।অর্থাৎ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
খ।   চরণ হবে যথাসম্ভব পর্ববহুত্ব- বর্জিত। না হলে ছন্দমুক্তি সহজ হবে না।
গ।   চরণদৈর্ঘ হবে অর্থানুযায়ী স্বাধীন।
ঘ।   সংযতবাক,প্রগাঢ় অথচ সরল বা মুখকে হবে শব্দবিন্যাস।অর্থাৎ শব্দ হবে স্বাভাবিক ও কৃত্রিমতাশূণ্য।


উদাহরণ :
মাঝে মাঝে সন্ধ্যার জলস্রোতে
অলস সূর্য দেয় এঁকে
গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ
আর আগুন লাগে জলের অন্ধকারে ধুসর ফেনায়।
সেই উজ্জ্বল স্তব্ধতায়
ধোঁয়ার বঙ্কিম বিশ্বাস ঘুরে- ফিরে ঘরে আসে
শীতের দুঃস্বপ্নের মতো।
                                      ( সমর সেন)


এছাড়া,অনেক ছন্দই না বলা রয়ে গেল।আপনার প্রিয় ছন্দটি জানতে কমেন্ট বক্স খোলা রইল।