হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি কবিতার খাতা ! আর তাতেই হুলস্থূল।সময় নষ্ট না করে বিশেষ দল তৈরী করে ফেলল কলকাতা পুলিশ।তন্নতন্ন করে খোঁজা শুরু হল কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায়।শেষ পর্যন্ত এক পুরানো বইয়ের দোকান থেকে উদ্ধার হল কয়েকটি খাতা।কিন্তু তা'ও সব ক'টা নয়।বইয়ের দোকানদারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পৌঁছে গিয়েছিল বইপাড়ার এক মুদিখানার দোকানে।সেখানে তখন, হারানো খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তৈরী ঠোঙায় সর্ষে বিক্রি করছেন ওই মুদিখানার দোকানদার।বলা বাহুল্য,এভাবেই উদ্ধার হয়েছিল কবির প্রথম জীবনের খোয়া যাওয়া পাণ্ডুলিপির কিয়দংশ। তারিখ,১০ ই  সেপ্টেম্বর,১৯৮০ সাল।


কে সেই কবি ? তিনি জীবনানন্দ দাশ।
জন্ম-১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সাল,বরিশালে।পিতা- সত্যানন্দ দাশগুপ্ত
মাতা-কুসুম কুমারী দাশ,
যিনি লিখেছিলেন,'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে'।


তখনও তো তিনি জানতেন না,সে অর্থে না হলেও আরেক মহান ছেলের জন্ম দিয়েছেন তিনি।যদিও তিনি কেন,জীবনানন্দও তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তা জীবৎকালে দেখে যেতে পারেন নি।অবশ্য কবির মৃত্যুর পর যখন দেশব্যাপী তাঁর মৃত্যু শতবর্ষ পালিত হচ্ছে,তখন তিনি বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় আধুনিক কবি।


বুদ্ধদেব বসুর মতে,'জীবনানন্দর অবস্থান রবীন্দ্রনাথের সূর্য মন্ডলের বাইরে।আধুনিক কবিদের মধ্যে একমাত্র জীবনানন্দরই নাম করা যেতে পারে,যিনি নিজের একটি জগৎ সৃষ্টি করতে পেরেছেন।সে জগৎ ঈশ্বরের অনুকরণ নয়,জগতের ব্যাখ্যা নয়,সে জগৎ অনুভূতির আলোছায়ায় তৈরি চেতনার জগৎ'। সে চেতনা তিনি আহরণ করেছেন নিবিড় নির্জন প্রকৃতি থেকে।যে প্রকৃতিকে তিনি ধারন করেছেন,লালন করেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।চোখে প্রেমের মায়া-কাজল পরে কবি যেন বাংলার প্রকৃতিকে দেখেছেন।সে দেখার মধ্যে আছে একটা কোমল মধুর স্পর্শ।অতি তুচ্ছ নগণ্য বস্তুও অসামান্য মহিমায় মন্ডিত হয়ে ওঠে সে ছোঁয়ায়।যেমন,তাঁর 'ঘাস'কবিতাটি :


'কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়
পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;
কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস,-তেমনি সুঘ্রাণ
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে'!


তাঁর প্রেম,প্রেমজ বেদনার মুক্তিও সেই কবিতাতেই।মানসী 'শঙ্খমালা'কে তিনি খুঁজেছেন নক্ষত্রে,কুয়াশায় :


'খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি -- কুয়াশার পাখায়
সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক
জোনাকির দেহ হতে -- খুঁজেছি তোমাকে সেইখানে
ধূসর পেঁচার মতো ডানা মেলে
অঘ্রাণের অন্ধকারে ধানসিঁড়ি নেমে বেয়ে
সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে
তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।'
                                        ( শঙ্খমালা)
কবি কখনো কার্তিকের শস্যভারে নত মাঠের দিকে চেয়ে তাঁর প্রেয়সীকে দেখতে পেয়েছেন,কখনো হাঁসের গায়ের ঘ্রাণে তাঁর হারানো প্রিয়ার কথা মনে হয়েছে:


'হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ-- দু'একটা কল্পনার হাঁস;
মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ'


মানুষও প্রকৃতির অংশ।মানুষকে নিয়ে প্রকৃতিপুঞ্জের নিটোল পরিপূর্ণতা।প্রকৃতি থেকে সে যত দূরে সরে যাচ্ছে,হৃদয়হীন যান্ত্রিকতার আঘাতে তত ছিন্ন ভিন্ন হচ্ছে আমাদের জীবনের শান্তি,প্রেম,সৌন্দর্য ।ময়ূরের সবুজ ডানার মতো আলো ঝলমল ভোরে,সুন্দর এক বাদামি হরিণের মৃত্যুর পরে তাই তাঁর মনে হয়:


'সিগারেট ধোঁয়া,
টেরাকোটা কয়েকটি মানুষের মাথা
এলোমেলো কয়েকটা বন্দুক- হিম- নিরপরাধ ঘুম'
                                          ( শিকার)
আগেই বলেছি,জীবনানন্দর কবিতার বৈশিষ্ট্যই হল,শব্দ স্পর্শ রং রূপ গন্ধের অনুভূতিমুখর বাণী।সে অনুভূতি ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয়,সে কেবল অনুভবের। আরো একটি উদাহরণ:


'আহ্লাদের অবসাদে ভরে আসে আমার শরীর,
চারিদিকে ছায়া- রোদ- ক্ষুদ- কুঁড়া- কার্তিকের ভিড়;
চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে,
এখানে হতেছে স্নিগ্ধ ধান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে
রুপাশালি ধানভরা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ'।


জীবনানন্দর কবিতার আরেক বৈশিষ্ট্য তার উপমা।তাঁর উপমা দিয়ে তিনি কখনো হেঁটেছেন পরাবাস্তবতার পথ ধরে,কখনো ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া জনপদে,আবার কখনো ব্যক্তিবোধের গভীর অতলে।অতীতের সঙ্গে বর্তমানের,অসম্ভবে- সম্ভবের,অবিশ্বাস্য- বিশ্বাসের,গ্রাম- নগরের অদ্ভূত সংমিশ্রণে চিত্রকল্প এঁকে গেছেন তিনি।


'বিদিশা,শ্রাবন্তী আর সিংহল সমুদ্রতীর
ছেড়ে এসে যেই দেখি নাটোরের বনলতা সেন,
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বললেন,
'এতোদিন কোথায় ছিলেন'


শ্রীলঙ্কা থেকে নাটোরে যেমন চলে এসেছেন এক লহমায়,পাখির সাথে মানুষের সেঁতুও এঁকেছেন তেমনই দক্ষতায়।


জীবনানন্দকে বলা হয়ে থাকে শুদ্ধতম কবি।
কেউ তাঁকে বলেছেন 'খাঁটি কবি'। যেমন :
' আকাশ ছড়িয়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে'
আকাশের অন্তহীন নীলিমার দিগন্ত বিস্তৃত প্রসারকে বোঝাতে আকাশ কথাটির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে ।আর তাতেই যেন ছবিটি একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।শব্দের মূল্যবোধের এমন পরিচয় খুব কম বাঙালী কবিই দিয়েছেন।


স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন,'জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে '।'ধূসর পাণ্ডুলিপি পাঠান্তে বলেছিলেন,'তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি।তোমার লেখায় রস আছে,স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে'।


এটা সত্যি,তাঁর অনেক কবিতাই জটিল এবং বিস্ময়কর।'ফিরে এসো সুরঞ্জনা নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে' র অর্থ কি,এ ব্যপারে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল হলেও আমরা এ পঙ্ক্তি নির্মানের কারুকার্যে চমৎকৃত হই।কবিতা বা যে কোন শিল্প যখন টেক্সট,তখন তাঁর ভিতর বিশেষ কোন অর্থ খোঁজার প্রচেষ্টা বাতুলতা মাত্র ।তিনি তাঁর কবিতাকে টেক্সট করে তুলতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর কবিকৃতি তাঁর সময়ের অন্য কবিদের মতো ম্রিয়মান হয়ে যায় নি।বরং তাঁর কবিতার দ্বন্দ- সংঘাত- বৈপরীত্য- জটিলতা পাঠককে আরো উৎসুক করে তুলেছে ক্রমাগত:।


টি এস এলিয়ট বলেছিলেন,'প্রত্যেক প্রধান কবিই তাঁর সৃষ্টি কর্মে এমন কিছু রেখে যান,যা থেকে ভবিষ্যত কবিতার গোড়াপত্তন হতে পারে।' জীবনানন্দ দাশ সে মাপেরই বড় কবি।বলাই যায়,'কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি' রবীন্দ্রনাথের পর কোন পথ দিয়ে যাবে,সে ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বা দিয়ে গেছেন তাঁর অজস্র কবিতায় জীবনানন্দই।
তবুও তাঁকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের অপচেষ্টা আগে হয়েছে,আজও হয় তো কোথাও আত্মঘাতি বাঙালী তা করে চলেছে,না বুঝে।তাঁদের জন্য কবি লিখিত কয়েকটি শব্দই যথেষ্ট,'সকলেই কবি নন,কেউ কেউ কবি'।
আর, মহৎ সৃষ্টি কখনোই শেষ হয় না। তাই জীবনানন্দর জনপ্রিয়তা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর স্তিমিত হয়ে এসেছেন,সেই সব সমালোচকেরাই।১৯৫৪ সালের ২২ শেষ অক্টোবর কলকাতার রাজপথে হঠাৎ এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।সেই ট্রামটিও কিন্তু শেষ রক্ষা পায় নি।এক অগ্নিকাণ্ডে নিজের আগুনে জ্বলে পুড়ে নিজেই একদিন শেষ হয়ে যায় অভিশপ্ত সেই ঘাতক ট্রামটিও।



ঋণ:
আনন্দ বাজার পত্রিকা
কালি ও কলম
আখতার ফারুক
মাসুদ সজীব।