শৈশব থেকেই যখন পারিবারিক সমাজ আমাদের শিখিয়ে দেয় যে শিক্ষার প্রয়োজন কেবল ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই নয়, শিক্ষার প্রয়োজন সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য। তাই ছাত্র জীবনে নানা বিষয়ের মধ্যে আমরা যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে এগিয়ে চলি। এখন আলোচনার বিষয় হলো- পড়াশোনার জন্য এতো গুলো বিষয়ের মধ্যে আমি "কেন বাংলা সাহিত্য বেছে নিয়েছিলাম" ?


আসুন সেই দিনের কথা বলি- আমি যখন নার্সারির গন্ডি পেড়িয়ে উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম ঠিক তখন থেকেই কেন জানি না বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমার এক নিবিড় টান সৃষ্টি হল, যে টানের একমাত্র উৎস ছিল কবিতা। তখন কবি বলতে বুঝতাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, এছাড়াও নকসী কাথার মাঠে কবি জসীমউদ্দীন। বিদ্যালয়ের পঠন পাঠনের রীতি অনুযায়ী রোজই পড়তে হতো তাদের কবিতা। পাশাপাশি ইংরেজিও ভাষায় ও কবিতা পড়তে হত। তবে আমার মন সর্বদা পড়ে থাকতো শুধু রবীন্দ্রনাথে। আমি যখন এই মহান কবিদের সৃষ্টিশীলতার দিকে প্রতিনিয়ত দৃষ্টি রাখতাম তখন নিজের ভেতরই একটা অন্যরকম সুন্দর্য ধরা দিত। আমার সব চাহিদাগুলো তখন যেন পূর্ণতা পেত সেই সুন্দরের সংস্পর্শে। তখন তাদের মতো করেই দু'চার লাইন লেখার চেষ্টা করতাম, যদিও তা কবিতা হতো না, তবুও লিখতাম, কারণ একটা লাইন লিখতে পারলেই আমার ভেতরের মানুষটা সৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করতো। সেই থেকেই শুরু হল মস্তিষ্ক খুড়ে শব্দচাষ।
     কখনো বড়ো বড়ো পত্রিকায় প্রতিষ্ঠিত কবিদের লেখা পড়ে একলা ঘরে পড়ার টেবিলে বসে ভাবতাম, আমার লেখাও যদি কোনো পত্রিকায় ছাপা হতো তবে আনন্দের সীমা থাকতো না। এই আনন্দটা হঠাৎ পেলাম একদিন, যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ি তখন বিদ্যালয়ের বার্ষিক ম্যাগাজিনে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হল। এ আনন্দটা ছিল মায়ের কোলে প্রথম সন্তান আসার মতো। বলা যায় সেই আনন্দ থেকেই পথচলা শুরু। তারপর দেখতে দেখতে যখন মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করলাম তখন পরিবারের স্বপ্ন ছিল আমাদের ছেলেকে মেডিক্যাল নিয়ে পড়াবো। কারণ বাবা নিজে অর্থের অভাবে মেডিক্যাল নিয়ে পড়তে পারেন নি, তাই ওনার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে পড়াবেন। কিন্তু এই খবরটি যখন আমার কাছে এসে পৌছায় তখন আমি মেডিক্যাল নিয়ে পড়তে অস্বীকার করি, কারণ আমি কবিতাকে ভালোবেসেছি, তাই প্রেম ভেঙে যাওয়ার ভয় তখন আমার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছিল। আমার এমন আচরণে বাবা মায়ের বেশ খারাপ লেগেছিল, তবে পরে তারা আবার স্বাভাবিক হয়েছিলেন। এরপর  উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে যখন কলেজে এলাম সেখানে পেলাম পূর্ণ স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শব্দটি এই কারণেই বললাম- স্কুল জীবনে ভালোলাগার বিষয় বাংলা হলেও আমাকে সবগুলো বিষয় নিয়ে সমান গতিতে এগিয়ে যেতে হত। কিন্তু কলেজে এসে আমি শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেলাম। সুযোগ পেলাম বাংলা সাহিত্যকে সঠিক ভাবে জানার। এই বাংলা সাহিত্যের প্রতি প্রথমত পরিবারের অনিচ্ছা ছিল, কিন্তু আজ যখন বাংলা সাহিত্যে মাষ্টারস সম্পূর্ণ করে কবিতা নিয়ে চর্চা করছি, তখন দূর থেকে ভেসে আসা কবি শব্দটিতে আমার থেকে অধিক গর্বিত হন আমার পরিবার। পড়াশোনার জন্য আরও ভালো ভালো বিষয় থাকতেও সেদিন থেকে আজও আমার মাতৃভাষাকে ছাড়তে পারিনি, তাই 'বাংলা সাহিত্য'কেই সেদিন বেছে নিয়েছিলাম'।