“কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত, ব্যপ্ত চরাচর,
যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর।“


হয়ত প্রায় সবাই জানি আলোচ্য কবিতাটি লিখেছিলেন বিখ্যাত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (1812-1859) ।


একটু গভীরে ভাবলেই বুঝতে পারা যায় এই কবিতায় কবি একই সঙ্গে দুটি অর্থ প্রকাশ করেছেন।এক অর্থে তিনি ঈশ্বর বন্দনা করেছেন।ঈশ্বরের আলোতেই যে আসলে সূর্য আলোকিত সে কথার মাধ্যমে ঈশ্বরের বড়ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর অন্য অর্থে তিনি কবি বা লেখক হিসেবে যে কত ক্ষুদ্র তাই বুঝিয়েছেন এই বলে যে তার আলোয় শুধু একটা প্রভাকর পত্রিকাই আলোকিত হয়।


অথবা সেই বহু বিখ্যাত কবিতা


“ শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।“


কবি কি আসলেই শুধু শিশির আর দিঘির গল্প বলেছেন। যে কোন পাঠকই বুঝতে পারেন যে কবি এখানে শিশির আর দিঘি দিয়ে দুটো ভিন্ন চরিত্রকে প্রতিকায়ন করেছেন।


আজকে আমার আলোচ্য বিষয় কবিতায়  “ Abstarction “ বা “ বিমূর্ততা “ এবং এর প্রয়োগ বিষয়ে।
“ বিমূর্ত ” শব্দটা থেকেই আসলে বোঝা যায় এর স্বরুপ কেমন। যা পুরোপুরি মূর্ত নয় আবার অমূর্তও নয়। অর্থাৎ এটা প্রকাশের এমন এক উপায় বা মাধ্যম যেখানে প্রকাশিতব্য বিষয়টি একেবারে খোলাখুলি  প্রকাশ করা হয় নি আবার আপ্রকাশ্যও রাখা হয় নি। এই বিশেষ প্রকাশ ভংগীমায় আসলে কিছু ক্লু রেখে দেয়া হয় যা থেকে পাঠক বা গ্রাহক নিজেই তা তাঁর শ্রুতি, দৃষ্টি ,প্রজ্ঞা ইত্যাদি ক্ষমতা ব্যবহার করে উৎঘাটন করেন। এই বিমূর্ততা আসতে পারে কোন সংকেত, কোন প্রতিক কোন উপমা অথবা সংঘবদ্ধ কোন সুনিপুণ চিত্রকল্পের মাধ্যমে।


কবি যখন লেখেন “ পাখির বাসার মত দুটি চোখ ” তখন আসলে কবি কি শুধু চোখের কথাই বলেন?না তিনি আসলে আরো নিগুঢ় কিছু ম্যাসেজ এই উপমার মধ্যে প্রচ্ছন্ন রেখে দেন যা পাঠককে অন্য কিছু ভাবতে বাধ্য করে।


আবার কবি যখন বলেন, “ আমার চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা।“ পাঠক কি বুঝে নেন এই বার্তা থেকে? খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বৃহৎ একটা প্রেক্ষাপট চলে আসে এই ছোট্ট কথার আড়ালে।


আরো কিছু উদাহরন দেয়া যাক -


“ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় ”  “ পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলাসানো রুটি ”
প্রিয় কবি সুকান্তের বিখ্যাত সৃষ্টি। লক্ষ্য করে দেখুন কেন এত আবেদন এই ছোট্ট লাইন দুটির।


বিমূর্ততার উৎপত্তি হলো কি করে? মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।


আসলে বিমূর্ততা বিষয়টা প্রথম চলে আসে চিত্র শিল্পে। আমরা প্রাচীন কালের চিত্রকর্ম যত দেখি তার বেশির ভাগেই দেখব যে শিল্পিরা সেখানে বাস্তবকে খুব সুন্দর নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। আর নয়ত কল্পনার তুলি দিয়ে রূপ কথার রাজ্য বানিয়েছেন। তখন একেবারে সাধারন মানুষের নিখুঁত ছবি অথবা দেব দেবী আর পরির কল্পিত চিত্র এইসবই ছিলো মুল উপজীব্য। তখন শিল্পিরা ডিটেইলিং এর উপর খুব জোর দিতেন। বর্ণনামূলক ধারায় ছবি আঁকতেন। সেই সময়ের সাহিত্যও ঠিক এই দুই ধারায় বিভক্ত ছিলো।


এই ভাবেই যুগ যুগ চলছিলো। এক সময় ভাল চিত্রকর্মের অনুলিপি বা প্রতিলিপি বানানোর প্রয়োজন দেখা দিলো। এবং সেই চেষ্টা মানুষকে ক্যামেরা আবিস্কারের পথে ধাবিত করলো। বিগত ১১ শতকে মুসলমানদের সুবর্ণ যুগের সময় ইরাকের ইবনে-আল-হেথাম নামক একজন মুসলমান বিজ্ঞানী ও অপটিক্সের বিশেষজ্ঞ প্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার করেন তবে তা ব্যবহার উপযোগিতা পায় নি।পরবর্তিতে ১৬৮৫ সালে জোহান জহান একই ধরণের ক্যামেরা তৈরি করেন। এ সব ক্যামেরা আকারে বিশাল ছিল এবং এতে ছবি সংরক্ষণের কোন ব্যব্স্থা ছিলনা। ১৮১৪ সালে জোসেফ নজারফোর নিয়েপস একটি ক্যামেরা তৈরি করেন যাতে ছবি সংরক্ষণের ব্যব্স্থা সহ ছবির আকৃতির ট্রেস করার ব্যবস্থা ছিল। শিল্পীরা ছবির আকৃতির ট্রেস করার জন্য এই অ্যাবসকুরা ক্যামেরা ব্যবহার করতো। পরে জোসেফ নজারফোর নিয়েপস একটি বিশেস ধরণের কাগজ তৈরি করেন এবং এই কাগজ রূপালী ক্লোরাইডের সাথে লেপন করে দেন। এর উপর আলো পড়লে অস্ধকারের সাথে মিলে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো। এই হালকা সংবেদনশীল কাগজের উপর সৃষ্ট ইমেজ ছিল পৃথিবীর প্রথম ফটোগ্রাফ যা ১৮২৭ সালে আলো ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল।


এমনিতেই শিল্প বিপ্লব মানব সমাজকে ক্রমশ বিজ্ঞা্নমুখী করে তুলছিলো। এই বার এই ফটো তোলার প্রযুক্তি চিত্রকর্মের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করলো। চিত্র শিল্পিরা দেখলেন অনেক নিখুঁত ছবি আঁকার মধ্যে আর কৃতিত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিজ্ঞান মনস্কতার কারনে কল্পিত বিষয় বস্তু মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে। মেধাবী চিত্রশিল্পিরা বিকল্প ভাবতে শুরু করলেন।


সেই ধারবাহিকতায় রিয়েলিজম বা বাস্তবতাবাদকে বাদ দিয়ে প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিস্তার লাভ করলো দুটি শক্তিশালী ধারা ইম্প্রেশনিজম ও এক্সপ্রেশনিজম। ইম্প্রেশনিজমে শিল্পিরা চাইলেন বাস্তবের মধ্যেই শিল্পির নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে দিয়ে কিছু করতে। তাদের গড়া পোট্রেটগুলো তাই শুধুই সুন্দর একটা মডেল না হয়ে,  হয়ে উঠলো দুঃখী বা সুখী বা কুটিল কোন ব্যাক্তির ছবি। প্রকৃতির ছবির মধ্যেও চলে আসলো শিল্পির আবেগ অনুভুতির মিশ্রণ।অন্যদিকে এক্সপ্রেশনিজমে শিল্পিরা আরো একটু আগ বাড়িয়ে পৃথিবী দেখার রংটাকেই বদলে দিলেন। আর ঠিক এই সময় থেকেই বিমূর্ততা আসতে শুরু করে দিলো। পরবর্তীতে আরো কিছু ধারা যেমন ডাডাইজম, কিউবিজম ইত্যাদির হাত ধরে আধুনিক পেইন্টিং হয়ে উঠলো একেবারেই বিমূর্ত।


আর এই বিমূর্ততার ধাক্কা এসে লাগলো সাহিত্যেও। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়লো কবিতায়। কারন একটা গল্প বা উপন্যাসের চেয়ে কবিতায় বিমূর্ততার প্রয়োগ সহজ ছিলো। উপযোগীতাও বেশি ছিলো। তাই কবিরা এই ধারাকে লুফে নিলেন।
উপমা, চিত্রকল্প ইত্যাদির সমার্থক মনে হতে পারে বিমূর্ততাকে। তবে আমার কাছে মনে হয় কবিরা বিমূর্ত ভাবনা উপস্থাপনের জন্যে উপমা বা চিত্রকল্পের দ্বারস্থ হন। বিমূর্ততা এখানে প্রকাশের স্বাতন্ত্র, অন্যদিকে উপমা বা চিত্রকল্প প্রকাশের বাহন। একটা বর্ণনামূলক ধারার কবিতাতেও উপমা বা চিত্রকল্পের ব্যবহার থাকে। খুব সুক্ষ্ণভাবে বুঝে নিতে হবে কোনটি বিমূর্ততা সূচক উপমা বা কাব্য।


আগেই বলেছি এক সময় কবিতা ছিলো বর্ননা প্রধান। আধুনিক যুগে এসে বর্ণনা নির্ভর  প্রচলিত শব্দশিল্প বিমূর্ততার হাত ধরে সংক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করলো। অল্প কথায় অনেক কিছু বলার টেকনিক হচ্ছে এই বিমূর্ততা। পাঠককে একটা পরকল্পিত সুনির্দিষ্ট ধাঁধার মধ্যে ফেলে বিভিন্ন দিক থেকে ভাবানোর শৈল্পিক পন্থা হচ্ছে এই বিমূর্ততা।


অনেকে মনে করে থাকেন বিমূর্ততার সাথে দূর্বোধ্যতার একটা সরাসরি যোগাযোগ আছে। অতি বিমূর্ত প্রকাশ ভাবনাকে দূর্বোধ্য করে তুলতে পারে। যদিও দূর্বোধ্যতা আসলে একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। পাঠক বা গ্রহিতার জ্ঞান ও বিচক্ষনতার উপর অনেকাংশে নির্ভরপশীল। যেমন ধরুন একটা কবিতা হয়ত ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া এক পাঠকের কাছে দূর্বোধ্য মনে হচ্ছে কিন্তু একই কবিতা একজন এম এ পাস পাঠকের কাছে সহজবোধ্য মনে হচ্ছে।


পুরো বিষয়টি আমার নিজস্ব পঠন ও অনুধাবনের সীমাবদ্ধতায় থেকে লেখা। কোন ভুল-ত্রুটি থাকলে সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।


( চলবে...)