প্রতিটি কবিতার জন্ম হয় কবির মানসপটে-কল্পলোকে। সেটাই কবিতার আঁতুড় ঘর,গর্ভ-গৃহ।যা থেকে কবিতা্র পাখি ডানা মেলে ভাবের আকাশে। তারপর সেই উড্ডীন পাখি খোঁজে ভাষার আশ্রয়। ভাষা হলো প্রকাশিত হতে চাওয়া ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যম। যে ভাবনা ছিলো কবির একান্ত নিজস্ব তাই ভাষার অনুকুল আশ্রয় পেয়ে পৌঁছে যায় পাঠকের দরবারে। পাঠকের কানে সেই বাণী পৌঁছে সৃষ্টি হয় এক পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া। অর্থাৎ পাঠকের মননশীলতা এবং সংবেদনশীলতাও একটা কবিতাকে স্বরূপে আবির্ভূত হতে ভূমিকা পালন করে। আর যে কবি যত বেশি সার্বজনীন করে তার ভাবকে উপস্থাপন করতে পারেন তার কবিতা তত বেশি পাঠক প্রিয়তা পেয়ে যায়। মন থেকে মনান্তরে, এমন কি কাল থেকে অন্য কালেও তার কবিতা বয়ে চলে। এক ধরনের অমরত্ব লাভ করে তার সৃষ্টি।


পাঠক মনের কথা কবি গুরুর ভাষায়-


"  তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী,
   অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।
   সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
   সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
   পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে,
   বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।
   মনে করি অমনি সুরে গাই,
   কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
   কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে;
   হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে;
   আমায় তুমি ফেলেছ কোন্ ফাঁদে  "


কবির কল্পনা ভাষার মাধ্যমে কবিতা হয়ে পৌঁছায় পাঠক চিত্তে। সেই অর্থে ভাষার ভূমিকা এখানে ব্যাপক। তাই কবিকে ভাষার বিষয়ে হতে হবে অনেক বেশি সচেতন এবং প্রজ্ঞাবান। যে যে ভাষায় লিখবেন সেই ভাষার প্রকাশ ভঙিমাকে পুরোপুরি আত্নস্থ করতে না পারলে কাব্য চর্চায় সফল হওয়া অধরাই থেকে যাবে।একটা উদাহরণ দেই, -বিখ্যাত একটি ইংরেজী গানের লিরিক  থেকে একটা লাইন নেয়া যাক-


" You raise me up, so I can stand on mountains"


  বাংলায় আক্ষরিক অনুবাদ করলে লিখতে হবে,
" তুমি উর্ধে তুলে ধরো বলে আমি পাহাড়ের উপরেও দাঁড়াতে পারি।"


   কিন্তু পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন এই ভাষা উপরের ইংরেজী বাক্যের অনুরূপ অনুভুতিকে প্রকাশ করতে পারছে না। ঠিক যা প্রকাশ করা প্রয়োজন তা বাংলা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে স্বতন্ত্র কৌশল অবলম্বন করে লিখতে হবে।


“ তুমি পাশে আছো তাই আমি নির্ভয়ে পাহাড় ডিংগাই।“


এর চেয়ে অনেক ভাল অনুবাদ হয়ত করা সম্ভব, সেই বিতর্কে না গিয়েও আমরা বুঝতে পারছি এই বাক্যটি আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অনুভুতি প্রকাশ করছে।


কবিতার ভাষা সৃষ্টি তাই খুব সহজ কোন বিষয় নয়। কাব্যিক ভাষা বলতে ঠিক কি বুঝায় তার সুনির্দিষ্ট কোন সংগা আসলে নেই, কবিকে তার সহজাত প্রতিভা বলেই বুঝে নিতে হবে তা। যে তার পঠনের জগতকে যতটা বিস্তৃত করতে পারবে তার পক্ষে অনুধাবন করা ততটা সহজ হবে বলে আমার ধারনা।


( চলবে...)