বর্তমান শতাব্দীর সাহিত্যের যে কয়েকটি বিশেষায়িত ধারা মুল ধারায় প্রভাব বিস্তার করেছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে “Magic realism “ বা “জাদুবাস্তবতাবাদ”। কেউ কেউ আবার লিখেন “যাদু পরাবস্তবতাবাদ”।


জাদুবাস্তবতাবাদ বিষয়ে প্রথম যিনি কথা বলেছেন তিনি ফ্রানৎস রোহ। একজন জার্মান চিত্রকলা বিষয়ক  সমালোচক।তিনি ১৯২৫ সালে ‘এক্সপ্রেসিওজমুস : মাগ্রিশের রেয়ালিজমুস : প্রোবলেমে ডের নয়েস্টেন অয়রোপেইশেন মালেরাই’ অর্থাৎ ‘এক্সপ্রেশনিজমের পর ম্যাজিক রিয়ালিজম : নবীন ইউরোপীয় চিত্রকলার সমস্যাবলী’ বইতে এ কথার প্রথম সূত্রপাত করেন।
যাদু আর বাস্তবতা দুটি ভিন্নধর্মী বিষয় হওয়া সত্বেও এই দুটি বিষয় এক হয়ে সাহিত্য বা শিল্পে এক অভিনব মাত্রা যোগ করেছে।
যাদুবাস্তবতাবাদের সঙ্গা দিতে গিয়ে সমালোচক ম্যাথিউ স্ট্রেচার বলেন - "What happens when a highly detailed, realistic setting is invaded by something too strange to believe"


এ সম্পর্কে ম্যাক্সিকান সাহিত্য সমালোচক লুই লীল বলেছেন, ‘আপনি যদি ব্যাখ্যা করতে পারেন এটি কি, তাহলে তা জাদুবাস্তবতাই নয়।’ অর্থাৎ জাদুবাস্তবতা এমন এক বিষয় যা ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। কেননা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা এমন এক রীতি যা সবসময় দ্ব্যর্থক এবং বিভ্রান্তিকর। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, লেখায় উপস্থাপিত ঘটনাটি ঘটবে জাদুর মতো, মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু যারা অনুভব করবেন; তারা এমন কিছু পাবেন, যা থেকে বোঝা যাবে তার মূলে একটি গভীর সত্য রয়েছে। যেখানে কোন প্রশ্নের অবকাশ নেই বরং এটি একটি চরম বাস্তবতা।


ল্যাটিন এমেরিকান লেখক আলোহা কার্পেন্তিতার বলেন “ জাদুবাস্তবতা পাঠকের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত জিনিসের গল্প নিয়ে আসে।“


আর জাদুবাস্তবতার গডফাদার বলা হয় যাকে সেই গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছেন
“ আমরা যে বাস্তবকে দেখি, তার পেছনে যে ধারনাটা আছে সেটাই জাদুবাস্তবতা।“
বাস্তব আর ফ্যান্টাসির যুগপদ সম্মিলনেই হয় সার্থক জাদুবাস্তবতা। এটি পাঠক মনে এমন এক অনুভুতি সঞ্চার করে যেন মনে হয় যে কোন কিছুই ঘটা সম্ভব।


আর এক সমালোচক লিন্ডসে মুর এর মতে জাদুবাস্তবতা স্বাভাবিক ও আধুনিক পৃথিবীর মানুষ আর সমাজের বুস্তুনিষ্ঠ বর্ণনার প্রেক্ষাপটে স্থাপিত। রূপকথা, মিথ বা অন্য ফ্যান্টাসি থেকে এখানেই জাদুবাস্ততার পার্থক্য। সার্থক জাদুবাস্তবতায় এমনকি কোনটি জাদু আর কোনটি বাস্তবতা তা নিয়ে এক সংশয় দোলায় পড়ে যান পাঠক।


আলবার্তো রাইওর মতে “জাদুবাস্তবতায় জাদু শব্দের আরেকটি অর্থ  বিস্ময়কর যা বাস্তবতাকে বিশেষভাবে প্রতিপন্ন করে, বাস্তবতাকে বিকৃত বা প্রতিস্থাপন করে না।“


জাদুবাস্তববাদের বৈশিষ্ট্যগুলিকে প্রায়শই অলৌকিক, অতিপ্রাকৃত, পরাবাস্তব এবং ফ্যান্টাসি, কখনো কখনো রহস্যময়তার সঙ্গে একাকার করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে যেটি বিস্ময়কর তা হলো কোনো রচনার কোন অংশটিতে স্পষ্টভাবে জাদুবাস্ততাবাদ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে, সে সম্পর্কে এর কোনো কোনো আলোচক যে যে দৃষ্টান্ত হাজির করেন, তাতে জাদুবাস্তববাদের বদলে রহস্য, অলৌকিক পরিস্থিতি, ভূত-প্রেত, জ্বিন-পরিদের সহাবস্থান এবং চমকই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে কাকে বলে জাদুবাস্তববাদ, কোন কোন লক্ষণের আলোকে সেটি চিহ্নিত করা যাবে– সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়নের অভাব চোখে পড়ে।


‘জাদুবাস্তবতা’ (Magic Reality)  আর জাদুবাস্তবতাবাদ ( Magic realism) দুটোর ভেতরে পার্থক্য আছে। জাদুবাস্তবতাকে উপস্থাপন করার একটি শৈল্পিক প্রয়াস হলো জাদুবাস্তববাদ।


সমকালীন বিশিষ্ট ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও সমালোচক-গবেষক ডেভিড লজের মতে, যখন কোনো অন্তর্নিহিত বিষয়কে কার্যকরভাবে উপস্থাপনের জন্য বাস্তববাদী আখ্যানের ভেতরে বিস্ময়কর বা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে তাকেই জাদুবাস্তববাদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।


জাদুবাস্তববাদের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল লেখক মার্কেসের বক্তব্য এবং রোহ-র বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি,অবিশ্বাস্য ও গতানুগতিকতার মিশ্রণে আমাদের দেখবার বিষয় বাস্তবতার ভেতরে জাদু তৈরি হচ্ছে, নাকি জাদুর ভেতরে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের মতে, দ্বিতীয়টি জাদুবাস্তববাদের শর্ত নয়, তাহলে জাদুবাস্তবতার সঙ্গে রূপকথার তেমন কোনো তফাৎ থাকে না।রূপকথায় জাদুর ভেতরে প্রসঙ্গত বাস্তব পরিস্থিতি হাজির হয়, আর জাদুবাস্তবতাবাদে বাস্তবতার ভেতরে জাদু তৈরি হয়। রূপকথা অসম্ভবকে সম্ভব করে; আর জাদুবাস্তবতাবাদে সম্ভবকেই অসম্ভব করে, কিন্তু সেটা সঙ্গে সঙ্গেই সম্ভবের দিকেই ফিরে আসে, কারণ এর অন্তর্নিহিত সত্যের কারণে তা প্রশ্নাতিতভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে । ফ্রানৎস রোহ জাদুবাস্তববাদকে দেখেছেন চিত্রকলার বিবেচনায়। এটি–


১. পরিমিতিবোধ ও তীক্ষ্ণ লক্ষ্যবিন্দু সম্পন্ন; কল্পদৃষ্টি(ভিশান) হবে ভাবালুতামুক্ত এবং আবেগহীন।
২. শিল্পী দৃষ্টি দেবেন দৈনন্দিন, তুচ্ছ, গুরুত্বহীন বিষয়ে;  কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই উপস্থাপন করবেন অস্বস্তিকর বিষয়াদি।
৩. একটি স্থির, ঘনবদ্ধ কাঠামো, যেটা প্রায়শই হতে পারে শ্বাসরুদ্ধকর, কাচে ঘেরা জায়গার মতো, এতে গতিশীলতার চেয়ে স্থিতিশীলতাই বেশি শ্রেয় হবে।
৪. আগের অঙ্কন পদ্ধতির কোনো চিহ্ন এখানে থাকবে না, এই চিত্রকলা অন্য সমস্ত রকমের হস্তশিল্প থেকে মুক্ত।
৫. এবং এতে চূড়ান্তভাবে আছে বস্তুজগতের সঙ্গে এক নতুন আধ্যাত্মিক সম্পর্ক।


বাংলা সাহিত্যে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত অনেকেই ম্যাজিক রিয়েলিজমের উপস্থাপনা করেছেন। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত বই বাস্তবের কুহক আর কুহকের বাস্তব-এ ম্যাজিক রিয়েলিজমের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বলেন, ‘(উপন্যাসের) গড়ন যতই আঁটসাঁট আর সংযত হোক না কেন, এখানে কোনো একটি মাত্র আখ্যান সরলরেখা ধরে এগোয়নি। সেই অর্থে নেই তার সূচনা, মধ্যবর্তী সংঘাত ও জটিল গোলকধাঁধা, এবং তারপরে সব ধাঁধা, হেঁয়ালি ও সংঘর্ষের নিরসন – অর্থাৎ কোনো একটি মাত্র প্রশ্ন তাতে নেই।’ ভূত-প্রেত, দত্যি-দানো – সবকিছুই অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে মিশে গেছে।এই জাদুবাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়েলিজমের বাস্তবতা আমাদের থেকে ভিন্ন মানুষের বিশ্বে রচিত একটি আরোপিত চিমত্মার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, এর প্রচেষ্টা আমাদেরই বিশ্বকে কখনো আমাদের ছোটবেলার চোখ দিয়ে দেখানো, কখনো বা অন্যের চোখ দিয়ে দেখানো। গভীর পাঠ করতে গেলে কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আমরা লক্ষ করি ম্যাজিক রিয়েলিজমের


১. অতি অদ্ভুত একটি ম্যাজিক বা বেশ কিছু ম্যাজিকের সমষ্টি – এই মূল বৈশিষ্ট্য গোটা গল্পটিকে ধরে রাখে – গল্পের শিরদাঁড়া বলা চলে।
২. এরই পাশাপাশি চলবে এক বাস্তব – অধিকাংশ সময়েই এই বাস্তব হবে তীব্র এবং অস্বসিত্মকর। কখনো কখনো এই বাস্তবের আপেক্ষিক তীব্রতা মুখ্য হয়ে ওঠে এবং এখানেই পার্থক্য হয়ে যায় অলীক পরাবাস্তবের (ম্যাজিক রিয়েলিজম) সঙ্গে সুররিয়ালিজম বা সাধারণ কল্পকাহিনির।
৩. এই দুই বাস্তবের টানাপড়েনে পাঠক বিহবল হন; কিন্তু তাঁরা বুঝতে বা আরো সহজ করে বললে অনুভব করতে পারেন এই বাস্তব আর পরাবাস্তবের নৈকট্য অথবা সময়বিশেষে এমনকি একই বিন্দুতে মিলন।


জাদুবাস্তবতা বাস্তবতাবহির্ভূত কোনো মতবাদ নয়, যেমন নয় পরাবাস্তববাদও। বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে বা আশ্রয় করেই এর শাখা-প্রশাখায় ভ্রমণ করতে হয় কল্পনাকে সঙ্গে নিয়ে। পাঠক যা কল্পনায় আনতে পারেন না লেখক তা লেখায় প্রয়োগ করেন। তবে জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে প্রয়োগ ঘটার ফলে পাঠক তা পাঠ করে মহা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় এবং এ ঘোর কাটতে তার দীর্ঘ সময় লাগে। ঘোরের মধ্যে ফেলানোর কৃতিত্ব হচ্ছে লেখকের। অর্থাৎ লেখক কত গুছিয়ে, কত ঢঙে, কত বিচিত্র ভঙ্গিতে গল্প বলতে পারেন। পাশাপাশি লেখকের অসাধারণ ভাষা ক্ষমতাও থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে মার্কেজ সফল হয়েছেন বলে তাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ 'স্টোরিটেলার' বলা হয়ে থাকে।


এটা সত্য, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক জাদুবাস্তবতার নিপুণ কারিগর বিশ্বসেরা গল্পকথক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। তার নিষ্ঠা আর সাধনার মাধ্যমে শুধু স্প্যানিশ ভাষা নয়, বিশ্ব সাহিত্যে শ্রেষ্ঠতম লেখকদের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছেন এ মহান কথাশিল্পী। শৈশবেই মার্কেজের মধ্যে চিত্রশিল্পী গায়ক ও লেখক হওয়ার মতো প্রতিভার আভাস দেখা যায়। এর যে কোনো একটিকে তিনি পেশা হিসেবে নিতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হলেন সাংবাদিক ও কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক। তিনি কল্পনাকে বাস্তবতার মোড়কে আবদ্ধ করে কোটি কোটি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। তিনি সামান্য বিষয়কে অসামান্য করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার অসাধারণ মেধা ও দক্ষতা দিয়ে। এ অসীম ক্ষমতা বিশ্বের খুব কম লেখকের মধ্যেই রয়েছে। তাই তিনি হচ্ছেন লেখকদের লেখক।


আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের কয়েকজন লেখক তাদের গল্প উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ ঘটান, তবে তারা মার্কেজ দ্বারা প্রভাবিত। তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা দেশজ পটভূমিতে এর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। পরবর্তীতে আনিসুল হক সহ আরো অনেক লেখক কবিও এই ধারায় সাহিত্য সৃজনে ব্রতি হয়েছেন।
জাদুবাস্তবতাবাদ আধুনিক সাহিত্যের অনেক বড় একটি অধ্যায়। অল্প পরিসরে বলা প্রায় দুঃসাধ্য। আমার এই ক্ষুদ্র লেখাটি ঠিক মৌলিক কোন প্রবন্ধও নয়। অনেকগুলি অনলাইন আর্টিকেল থেকে সংগৃহিত তথ্যকে পাঠকের উপযোগী করে সাজিয়ে নিয়েছি মাত্র। এই সামাণ্য লেখাটি পাঠ করে যদি আসরের কবিদের মধ্যে জাদুবাস্তবতাবাদ নিয়ে কিছুটা হলেও আগ্রহ সৃষ্টি হয় তাহলেই আমি খুশি।


তথ্যসূত্রঃ
১) উকিপিডিয়া
২) http://archive.banglatribune.com/news/show/108586/
৩) http://www.dailyjanakantha.com/details/article/301892/জাদুবাস্তবতার-কথা
৪) http://shilpo-shahitto.blogspot.com/2014/11/blog-post_32.html
৫) https://www.kaliokalam.com/খোয়াবনামায়-ম্যাজিক-রিয়েল