৪৬.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লিখতে অনুরোধ করা হয়েছে কবিতাটিতে l কবিতাটি উত্তম পুরুষে লেখা হয়েছে l নায়িকার নাম অনুল্লেখিত l তার বর্ননা পাচ্ছি l গায়ের রঙ তার কালো l রূপসী নয়, পড়াশোনায় বিদূষী নয় l পণের জোরে তার বিয়ে হয় l শ্বশুর বাড়ীতে সারাদিন খেটে মরে l তার গায়ের রঙের জন্য গঞ্জনা শুনতে হয় l রোজ এইভাবে মরে গিয়েও সে বেঁচে থাকে l কিন্তু স্বামী তার মারা যায় পথ দুর্ঘটনায়, যখন নায়িকার বয়স মাত্র বাইশ বছর l অপয়া, অলক্ষী, কালো মেয়ের ঠাঁই হলো বাবার ঘরে। বাবাও থাকেন না এরপর বেশিদিন l মা ও মেয়েকে দাদা বৌদির কাছে দিন রাত অবিরাম গঞ্জনা শুনতে হয় l এই গঞ্জনা শাপে বর হয় l মেয়েটি বুঝতে পারে, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ভাগ্য তাকে পথ দেখায় l  চেষ্টাচরিত্র করে স্কুলে চাকরি পায় l সঙ্গে দুই চারটা​ গানের টিউশনি l অর্থনৈতিক সমস্যাকে জয় করে সে l
বেশ ভালো ভাবেই কাটে কিছু দিন। কিন্তু মা গত হন l
মা ছিল তার শেষ সম্বল l এখন তার সম্বল শুভ্রতার প্রতীক সাদা শাড়ি l এই শুভ্র পবিত্রতা তার চোখ প্রস্ফুটিত করে l তার সৌন্দর্যে,  আনন্দবোধে সে মুক্তির আকুলতা অনুভব করে l মাত্র বাইশ বছর বয়স তার l এই বয়সে জীবনের একটা পর্ব সে দেখেছে যা তার পক্ষে তেমন সুখকর হয় নি l এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি l রবি ঠাকুরের কাছে কবিতার নায়িকার অনুরোধ, এই রসদটুকুর ভিত্তিতে রবি কবি তার শক্তিশালী কলমে সেই কালো, সাধারন মেয়ের জীবনের বাকি অংশের গল্প লিখুন, যা সেই কালো মেয়েকে বাঁচিয়ে তুলবে, তাকে জীবনের অর্থ শেখাবে, যার ভিত্তিতে সে জীবনের বাকি পথ গৌরবের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে পাড়ি দিবে l


রবি ঠাকুর "সাধারণ মেয়ে" নামে বাস্তবিকই একটি কবিতা লিখেছেন l সেই কবিতার নায়িকা, মালতী যার নাম, অনুরূপ পরিস্থিতিতে কথাসাহিত্যিক শরৎ বাবুকে অনুরোধ করেছেন একটি সাধারন মেয়ের গল্প লেখার জন্য l মালতীর বিয়ে হয় না l সে নরেশ নামে একজনের সঙ্গে প্রেমসম্পর্কে আবদ্ধ হয় l কিন্তু পড়াশোনার জন্য বিদেশে গিয়ে নরেশ ইউরোপিয়ান সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন l মালতী হীনমন্যতা বোধে কষ্ট পান l তিনি বুঝতে পারেন কোনো যোগ্যতাতেই তিনি বিদেশীনি ঐ মহিলাদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না l এই হারের জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি শরৎবাবুকে অনুরোধ করছেন তিনি এক সাধারন মেয়ের গল্প লিখুন যেখানে তার মতো পরিস্থিতির মেয়ে শিক্ষায়, যোগ্যতায়, সম্মানে, মর্যাদায় যেন নরেশকে ছাড়িয়ে যায় l গল্পের সেই মেয়ে সব বাধাকে জয় করবে, বিশ্ববন্দিত হবে l বাস্তবে এটা কঠিন l কিন্তু কল্পনায়, গল্পে তো এটা মামুলি ব্যাপার l শুধু একটা কালির আঁচড় প্রয়োজন, যদি থাকে লেখক, কবির চিন্তার উদারতা l


দুটি কবিতার বিষয়বস্তু প্রায় সমধর্মী l যেটা ইঙ্গিত করা হয়েছে, আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের একটু দাবিয়ে রাখার মানসিকতা আছে l নারীরা এটা চান না l এটা আরোপিত l তারা সমান যোগ্যতায় সমান মর্যাদায় এই সমাজে চলতে চান l বাস্তবের যে সব নারী সমাজে এই সমবিকাশের সুযোগ পান না তাদের হয়েই সওয়াল করেছেন উভয় কবি l
সুন্দর কবিতার জন্য কবিকে অভিনন্দন l