সালটা দু’হাজার বার
ভাইফোঁটার কয়েক টা দিন বাকী আরও
লোকাল ট্রেনে নিত্যযাত্রীদের আড্ডা জমেছে
রোজকার নিয়মে।আড্ডা আর অ্যাজেন্ডা এই
দুটো শব্দ একসাথে যেন একেবারে বেমানান
তাই প্রসঙ্গ একের পর এক উঠতে থাকে নানান।
এভাবে একসময় উঠল ভাইফোঁটা।নানা মুনির
নানা অভিজ্ঞতা,প্রকট হল আড্ডার মধ্যমণি
মহিম বাবুর অজ্ঞতা।কিছুক্ষণ পর কানাই বলল,
‘’মহিম দা,তুমি যেন ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছ!
কী ব্যাপার ভাই!’’নিতাই ও বলল,’’আমিও তখন
থেকে লক্ষ্য করছি,মহিমদা কেমন চুপসে আছে’’
মহিম শুকনো হাসি হেসে বলে,’’আমি কেন......’’
নিতাই বলে,’’তবে তোমার চখে জল কেন?তোমার
কোনো বোন বা দিদি নেই?’’


মহিম শান্ত গলায় বলে, ‘’জানিস,
আমার তিন তিন টে দিদি ছিল, আমাকে পাবার
মোহে মেজো আর সেজো কে জন্মের আগে
মরতে হয়েছে মায়ের গর্ভে; আর আমার বয়স
যখন তিন,বড়দিদির বয়স সবে আট পেরিয়েছে,
আমার মা আর সে এক সাথে পুড়েছে আগুনে
বাবা যদিও আমার ভালো চাইতে করেনি দেরি
টুক্টুকে নতুন মা এনে দিয়েছে পরের ফাগুনে।
আমি যখন বুঝতে শিখেছি ভাইফোঁটার মানে
দিদা আমায় কেঁদে কেঁদে সব বলেছে কানে কানে।‘’


সেদিনের আড্ডায় আর নতুন করে প্রান আসেনি
মহিম যদিও পরে হালকা ভাবে কয়েকবার বলেছে,
’’আরে যমের দোরে কেও কোনদিন কাঁটা দেয়নি
তাতেই তো দিব্বি কাটিয়ে দিলাম তেতাল্লিশ টা
গোটা শীত,গ্রীষ্ম,বর্ষা,যমের উপর আমার অগাধ
ভর্সা,তোরা এসব বিষয়ে কেন নিচ্ছিস এমন চাপ।‘’
তবু,যে যার গন্তব্যে নেমে গেছে চুপচাপ।


ভাইফোঁটার পরের দিন,কম্পাটমেন্টে সবাই হাজির;
স্বপ্নদহে ক্রসিং, তাই রোজকার মত ট্রেন থেমেছে
হঠাৎ করে পাশের মহিলা কামরা থেকে হুড়মুড়িয়ে
শাঁক বাজাতে বাজাতে উঠে এলেন কয়েক জন মহিলা,
কিছু বুঝে উঠার আগেই সজোরে মন্ত্র বলতে বলতে
তাঁরা একে একে মহিম বাবুকে ফোঁটা দিলেন,মুখে
তুলে দিলেন মিষ্টি আর জল,হাতে দিলেন পাঁচ ফল।
মহিম বাবুর চোখে আঝোর ধারায় ঝরছে শুধু জল।


সেই থেকে চলে আসছে লোকাল ট্রেনে ভাইফোঁটা।
মহিম বাবুও বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন কন্যাভ্রূণ
বাঁচাও মঞ্চ।তাঁদের কথা ‘ভায়েদের যমের দুয়ারে
কাঁটা দিতে বোনদের তো বাঁচাতে হবে তাই কাঁটা
দিতে হবে মানুষের অজ্ঞতা আর লোভের দুয়ারে।