সৌখিন কবিদের মিলন চক্র-এ অংশগ্রহণের জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছি, শরীর এমনভাবে তাপাক্রান্ত হলো যে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে বইমেলায় পৌছবো! ঢাকায় টাউন সার্ভিস বাসে চলাফেরা কোনোদিনও পছন্দের নয় বলে নিজের ভাংগাচোরা হোন্ডাকেই শেষমেশ সঙ্গী করতে হলো।

টানা কয়েক দিনের লাগাতার ভাইরাল জ্বরের তোড়ে শরীর একটু ম্রিয়মান, এলোপ্যাথিক ট্যাবলেট আর অকটেন যথাক্রমে আমার এবং হোন্ডার শরীরে নিয়ে রওয়ানা দিয়ে দিলাম।  

ইতোপূর্বে এভাবে কোনোদিন কখনো কোনো সাহিত্য মহলে পা ফেলিনি বলে কেন জানিনে মনের মধ্যে এক অজানা অনুভূতি ভর ক'রে ছিল। তারপর'ও কবিবন্ধু কবির হুমায়ূন এবং অনিরুদ্ধ বুলবুল যেন সুদূরে মাইলফলকের মত ইশারা করে আমাকে ডেকে যাচ্ছিল গন্তব্যে গিয়ে পৌছানোর জন্যে।

এক্সট্রা গার্ডলক ছাড়াই হোন্ডা দোয়েল চত্বরের মোড়ে ফেলে রেখে দ্রুত পায়ে চলে এলাম বাংলা একাডেমির প্রবেশদ্বারে। প্রথমেই ধরা খেলাম পুলিশের হাতে ব্যাগ সার্চের সময়। বেরোবে না বেরোবে একটা প্রমাণসাইজের এন্টিকাটার বেরোলো আমার ব্যাগ থেকে। দরকারী স্টেশনারির সাথে এটা ব্যাগেই ছিল। মেলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো আমার। বেরিয়ে এসে ব্যাগ ভালো করে আপত্তিকর জিনিসমুক্ত করে আবার ঢুকলাম। এবার ছাড়া পেলাম।

নজরুল মঞ্চের বামপাশেই দেখতে পেলাম কবিবন্ধু কবির হুমায়ূনকে। শারীরিকভাবে তাকে আমি কখনো দেখিনি, শুধু বাংলা-কবিতার প্রোফাইল ফটো স্মরণ করে তাকে চিনতে পেলাম। আমাকে দেখে, নাম শুনে বন্ধুকবি বসা থেকে উঠে একটু মুখ তুলে আমাকে এমন করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন মনে হলো সমস্ত বইমেলা আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। বুকের মধ্যে তখন কেমন যেন এক রহস্যময় অনুভূতির বুদবুদ  উঠতে শুরু করেছে, সমস্ত শরীরে ফ্রি ভেলোসিটির ইম্প্যাক্ট...

পাশেই দাড়ানো মানুষটিকে তখনও খেয়াল ক'রে ওঠা হয়নি... আমাকে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে বললেন তিনি কে ধারণা করতে, বেশি বেগ পেতে হলো না, আলিঙ্গন থেকেই কবিবন্ধুর কন্ঠে শুনতে পেলাম তিনি অনিরুদ্ধ বুলবুল...! আমি ভালো করে কবি অনিরুদ্ধ বুলবুল কে আর একবার দেখে নিয়ে দ্বিতীয়বার জড়িয়ে ধরলাম। ইনিই সেই মানুষ যার অজস্র মনমাতাল করা অনুপ্রেরণা পেয়ে এসেছি এতদিন ধরে আমার কবিতার পাতায় পাতায়...

একের পর এক পরিচিত হতে শুরু করলাম সেই সব সর্বকবিবন্ধুদের সঙ্গে যাদের লেখা প্রতিনিয়তই পড়ে পড়ে শিক্ষিত হয়ে উঠছি - রুনা লায়লা, ফয়েজউল্লাহ রবি, মোঃ মনিরুল ইসলাম (মনির), আব্দুল্লাহ আল-নিটাব খাঁন, মোহম্মদ মনিরুজ্জামান, মোঃ নুরুল ইসলাম, মলয় গাঙ্গুলী, রবিউল হাসান সহ অন্যান্য সকলের সাথেই।

আগেই ভেবে রেখেছিলাম কবিবন্ধু শিমুল শুভ্রকে ইমোতে কানেক্ট করবো, পেয়ে গেলাম যথাসময়েও। কবিবন্ধু কবির হুমায়ূনসহ আরো উপস্থিত সকলের সাথে কথা বলার সুযোগও করে দিলাম যথারীতি। উনি মধ্যপ্রাচ্যে থেকেও যেন সকলের প্রাণে প্রাণে রয়েছেন বলেই অনুভূত হলো। অনেক কৃতজ্ঞতা ও সাথে আফসোস প্রকাশ করলেন কবিবন্ধু শিমুল শুভ্র আমাদের কবি মিলন চক্রে সংঘবদ্ধ হতে দেখেশুনে।

সকলেই এবার শতকবির শত কবিতা নিয়ে সংকলিত 'কাব্য শতদল' এবং কবিবন্ধু অনিরুদ্ধ বুলবুল এর কাব্যগ্রন্থ সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট বইয়ের স্টলের দিকে পা বাড়ালাম। সেখানে আমাদের সাথে যোগ দিলেন কবি হাফিজুর রহমান চৌধুরী সহ আরো অনেকেই। আমরা সকলেই কবি পলক রহমান এবং কোলকাতার কবি রুমা চৌধুরী যৌথ কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন পর্বে কবিবন্ধু কবির হুমায়ূনের অত্যন্ত মনোগ্রাহী শুভেচ্ছা বক্তব্য উপভোগ করলাম যা 'মাই টিভি' ক্যামেরায় রেকর্ড করা হলো।

এরপর সকলে মিলে কাব্য শতদল এর প্রাপ্তিস্থান 'ম্যাগনাম ওপাস' এ এসে আমাদের অনেকেরই প্রথম গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত সংকলিত কবিতার বই কাব্য শতদল সংগ্রহ করলাম। আমার কবিতা কাব্য শতদল-এ আছে শুনে কবিবন্ধু মোঃ মনিরুল ইসলাম (মনির) আমাকে তার সংগৃহিত কাব্য শতদল-এ আমার অটোগ্রাফ চাইলে মন সত্যিই পুলকিত হয়ে উঠলো... দিলাম জীবনের সর্বপ্রথম অটোগ্রাফ যদিও তা সংকলন কাব্যগ্রন্থে...!!! উদ্যমী কবি শিমুল শুভ্র ও কবিবন্ধু অনিরুদ্ধ বুলবুল-এর প্রয়াসে এই অনাবিল আনন্দও আমার ভাগ্যে লেখা ছিল...!

এক এক করে অনেকেই বিদায় নিয়ে চলে গেলেও কবিবন্ধু আব্দুল্লাহ আল-নিটাব খাঁন আমাদের কয়েকজনকে চা খাওয়াবেন বলে আবদার করলেন। বিনাবাক্য ব্যয়ে আমরা সে আবদার মেনে নিয়ে টিএসসির মোড় পার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভবনের প্রবেশ গেটে এসে আবার একত্রিত হলাম। এখানে আমরা শেষমেশ উপস্থিত ছিলাম মাত্র কয়েকজন। সর্বকবিবন্ধু কবির হুমায়ূন, অনিরুদ্ধ বুলবুল, রুনা লায়লা, মোহম্মদ মনিরুজ্জামান, আব্দুল্লাহ আল-নিটাব খাঁন, ফয়েজউল্লাহ রবি, মোঃ মনিরুল ইসলাম (মনির) এবং আমি। কয়েকটা অচল ফুঁচকা আর ঘটি চানাচুর মুখে দিতে দিতে কবিবন্ধু অনিরুদ্ধ বুলবুল শোনালেন তার কবি হয়ে ওঠার কাব্য...

অজস্র মানুষের কোলাহল মাঝেও কবিবন্ধুর কথাগুলো যেন আমার প্রাণে ছড়িয়ে দিল এক পরম আবেশ, যেন এ কথা আমি শুনবো বলেই তার পিছু নিয়েছিলাম, ক্ষণে ক্ষনেই মনে হলো আমি এইখানে আছি শুধু এই আকাঙ্খিত কথাগুলো শুনবো বলেই। মুখোমুখি বসে আছেন কবিবন্ধু কবীর হুমায়ূন এবং অনিরুদ্ধ বুলবুল আর মাঝে আমি। কবি অনিরুদ্ধ বুলবুল সোৎসারিত ও সৃষ্ট কাব্যের সংজ্ঞায়ন ক'রে কবিবন্ধু কবীর হুমায়ূন এবং নিজের স্থানিক তুলনা করে দিলেন তাতেই যেন দুজনের সমস্ত কবি-চারিত্রিক আবহ প্রতিভাত হয়ে উঠলো আমার কাছে।

আরো আরো কিছুটা সময় যেন কাটাতে পারলে উত্তম হতো কবিবন্ধুদের সাথে, কথা হতো, আবৃত্তি হতে পারতো কিন্তু বাসায় ফেরার তাড়া থাকায় উঠতেই হলো এমন আসর ছেড়ে। কেন জানিনে কবিবন্ধুদের সাথে বুক মেলানোতে এক অসম্ভব যাদু ছিল...! সকলকেই ছেড়ে এলাম সেখানে পূনর্মিলনের প্রতিজ্ঞা করে...

টিএসসি মোড় পেরিয়ে দোয়েল চত্তরের দিকে পা বাড়ালাম। পথে অনেকের সাথেই দেখা হলো কিন্তু কেউই পরিচিত নয়, পরিচিত মানুষগুলোকে যে ফেলে এলাম পেছনে... এই আবার হঠাৎ একা হয়ে যাওয়াটা যেন তাৎক্ষণিকভাবে কেমন লাগলো। সবারই কী আমার মত হয়? হয়েছে!?

দোয়েল চত্বরে এসে একটু চা খেতে ইচ্ছে হলো। দৃষ্টির সীমানায় কোন চায়ের দোকান বা ফেরিওয়ালা চোখে পড়লো না। খোঁজাখুঁজি করতে করতে কার্জন হলের সামনের ফুটপাথে দেখা মিলল এক চা ফেরিওয়ালার। দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতেই নজরে আসলো একটি তরুণী মেয়ে ফুটপাথের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে, পরনে ময়লা কাপড়, চুল রুক্ষ আলুথালু...

এমন করে বসে থাকতে দেখিনি এমন বয়সের মেয়েকে কখনও, কয়েকবার তাকালাম মেয়েটার দিকে। ও বুঝতে পারছে আমি লক্ষ্য করছি... চোখাচোখি হলো...অবিশ্বাসের আভাস তার শুখনো চোখে... কত কত ভাবনা হঠাৎ করে মনে ভীড় জমাতে শুরু করে দিল... আমার এমন চোখ চাওয়ায় ও কী মনে করলো, কোথা থেকে এসেছে এই মেয়েটি যাকে বইমেলাতে দেখা কোনো মেয়ের সাথে মেলানো যায় না, ওর মাথায় ফুলের টায়রা পরালে কেমন লাগতো, বাসন্তি শাড়িতে তাকে কেমন দেখাতো, ওর প্রেমিকের সাথে কিভাবে বইমেলায় হাটতো, পায়ে একটু আলতা পরলে কেমন লাগতো... এইসব ভাবছি আর কবিবন্ধু কবীর হুমায়ূন ও অনিরুদ্ধ বুলবুলকে পাশেই দাঁড় করিয়ে রেখেছি... কীভাবে এই মেয়ের অবস্থা এই হলো, এই কথা কবিবন্ধুদ্বয়কে জানাতে চাইতে চেয়ে দেখি আমার পাশে কেউ নেই...!

আর কালক্ষেপণ না করে মেয়েটির হাতে কটা টাকা দিয়ে অধিজাগতিক ভাবনা থেকে মুক্ত করে নিলাম নিজেকে। পিছন ফিরে আর একবারও তাকিয়ে দেখিনি কিন্তু মনে হলো যেন ভর সন্ধ্যেবেলায়ও আমার বসন্ত দেখা হয়ে গেলো, মেয়েটির কৃতজ্ঞতায় চিক্‌ চিক্‌ করা চোখদুটো চোখে ভাসছিল খুব...

এসেছিলাম সৌখিন কবিদের মিলন চক্র-এ, মিলিত হলাম প্রাণে প্রাণে, কবিতে কবিতে, কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায়, যাবার বেলায়'ও মিলন হয়ে গেলো তবে এক অচিন পাখির সাথে যাকে দেখে বসন্ত দেখা হয়ে গেল, 'বসন্ত আনন্দ'ও পাওয়া হলো... এক কথায়, সব ক্ষতি লাভ হয়ে গেলো...!

মোটরসাইকেল সাই সাই চালিয়ে চলেছি উত্তরার পথে, মনের মধ্যে তখন একটা গান বার বার গুঞ্জরিত হতে থাকলো ---

"চঞ্চল মন আমার শোনে না কথা / ঘুরিয়া বেড়ায় ঐ আকাশের গায় / বিদেশির সনে দিন কাটাই বৃথাই..."



~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
উত্তরা ঢাকা
বাংলাদেশ
১৯/০২/২০১৭