(১) কবিতা শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্য নয়, সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের ব‍্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য। আত্মোন্নতিই মানব জীবনের লক্ষ্য। প্রথম প্রথম ব‍্যক্তিগত জীবন আর কাব‍্যজীবন পৃথক হওয়া দরকার, যখন যাকে সময় দেবেন তখন তাকেই; নইলে চিন্তার চোটে মাথা পাগল হবার জোগাড় হয়। এটা কিছুদিন অভ‍্যাসের পর নিজের থেকেই জীবনের priority মতো মন কাজ করে। কবিতা লিখতে লিখতেই আত্মমন্থন হয়, যা গভীরের জ্ঞানকে বাইরে আনে আর আত্মবিকাশ ঘটায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় বড়ো বড়ো কবিদের ব‍্যক্তিত্ব খুব শক্তিশালী এবং তাদের মাথাও সুস্থ, যেমন-- রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শঙ্খ ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন, বাল্মীকি, ব‍্যাসদেব, সেক্সপিয়র প্রমুখ। যাদের মনের বা চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই তারা বড়ো হতে পারেন না। অপরিণতরা নাম বা পয়সার জন্য লেখেন, প্রথম প্রথম এটা ঠিক আছে কিন্তু ধীরে ধীরে এর বাইরে আসতে হবে, না হলে প্রতিভার বিকাশ হবে না, আর উচ্চস্তরের কবিতাও আসবে না; শুধুমাত্র কয়েকজন অবুঝ পাবলিকের মনভোলানো দাস হয়ে কবি রয়ে যাবেন। কবিদের শুধুমাত্র কবিতায় ফোকাস করা উচিত, কবিতা ভালো লিখলে-- না চাইলেও খ‍্যাতি ও টাকা আসবে। তবে একটা বাস্তব কথা, শুধুমাত্র কবিতা লিখে আজকের যুগে সংসার চালানো যায় না, আর তাই অন‍্যের দেখে নিজের "লেভেল" ও "standard" ছোট না করাই ভালো। নিজের কবিতাকে বেড়া দিতে হবে, যত্ন করতে হবে। কবিতার ভাবে ও কথায় বেড়া দেওয়ার মাধ‍্যমে প্রকারান্তরে কবি নিজের thought process-এ বেড়া দেন, যা অজান্তেই কবির আত্মবিকাশ ঘটায়।


(২) আবার অনেক কবি বলেন, তারা নাকি নিজেদের জন্য লিখেন। খুব খুব ভালো কথা। কিন্তু তা যখন প্রকাশ করা হয় বা পোস্ট করা হয় তখন তা আর কবির একার থাকে না। তাই দায়িত্বজ্ঞানহীন লেখা পোস্ট করার আগে তাদের চিন্তা করা উচিত। তলে তলে প্রশংসা চাওয়া আর ওপরে ওপরে বড়ো বড়ো কথা বলা! আপনার প্রকাশিত কবিতা পড়ে কারোর যদি কিছু লাভ নাই হল, শুধু বেচারা পাঠকের সময়নষ্ট হল আর আপনার সামান্য কিছু আয় হল তো এসব কবিতা প্রকাশ করা একপ্রকার বৃথা। ভগবানের যেমন তৃতীয় নেত্র আছে তেমনি সমাজেরও তৃতীয় নেত্র আছে, আর কবিই হলেন সমাজের তৃতীয় নেত্র। তাই ভালোভাবে দেখা উচিত যেন তৃতীয় নেত্রের অপপ্রয়োগ না হয়। তাই কবিতা শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্য নয়, সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের প্রগতিতে যোগদান করার জন্য। অবশ্যই কবির মনখুলে হৃদয়ের কথা বলার অধিকার আছে কিন্তু তা যেন মানবতাকে আঘাত দিয়ে না হয়। মানুষের গভীর বিশ্বাসে আঘাত করার অধিকারও কবির আছে তবে বন্দুক ধরার আগে কবিকে বাঁদর থেকে মানুষ হতে হবে এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে কাজ করতে হবে। আবার যারা ভয় করেন তারা বড়ো কবি হতে পারেন না। সমাজের বাজের প্রতিবাদ করতে না পারলে কিসের কবি?


(৩) কবিতা আনন্দের জন্য, সৃষ্টির মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ ও বিতরণ করার জন্য। হাজার হোক কবিতা একপ্রকার আর্ট। তাই তা আর্টয়ের মতোই হওয়া উচিত। যা তা লিখলেই আর্ট হয়না। মানছি একতাল কাদামাটিও আর্ট কিন্তু যখন তার প্রয়োগ সঠিক জায়গায় কিংবা সঠিকভাবে হয় কেবল তখনই।


(৪) কবিতা নির্মাণের জন্য নয়, কবিতা সৃষ্টির জন্য। একক্ষেত্রে সৃষ্টি সৃষ্টিরই জন‍্য, তখন যখন কবি পথ প্রদর্শন করেন। নতুন দিশা দেখান। দিশা শুধুমাত্র নতুন হলেই হয়না, তা সঠিক হওয়াও বাঞ্ছনীয়। বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে জিনিসটা বোঝা যাক, যেমন ধরুন ফুলের বদলে কেউ পুঁটিমাছের মালা গেঁথেছে, এটা সৃষ্টি না সৃষ্টিছাড়া? পা দিয়ে খাবার হওয়া খুবই নতুন জিনিস কিন্তু এটা কে কি সৃষ্টি বলা যায় নাকি অপসৃষ্টি?


ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, কবিতায় থাকুন আর নিজের কবিতাকে আরও ভালো করতে থাকুন।।