রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর দাম্পত্য জীবন পূর্ণতা লাভ ক’রে গাজিপুরের নিভৃত নিবাসে, জোড়াসাঁকো, শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আর শান্তিনিকেতনের অতিথি হ’য়ে বসবাসকালে। রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর ৫ সন্তান। প্রথম সন্তান বেলা বা মাধুরীলতা (১৮৮৬-১৯১৮), দ্বিতীয় সন্তান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮৮-১৯৬১), তৃতীয় সন্তান রানী বা রেণুকা (১৮৯১- ?), চতুর্থ সন্তান মীরা বা অতসীলতা (১৮৯৪-১৯৬৯) সর্বশেষ সন্তান শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৯৪-?)। ১৮৮৮ সালে, বিবাহের প্রায় চার বছর পর; রবীন্দ্রনাথ স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা বেলাকে নিয়ে সর্বপ্রথম ঠাকুর পরিবারের সুবিশাল জোড়াসাঁকোর বাড়ির বাইরে নিভৃত নিবাসে দাম্পত্য জীবনের আনন্দ অনুভব করার সুযোগ পান। এই প্রথম স্ত্রী মৃণালিনী দেবী; স্বামী রবীন্দ্রনাথকে আপনার ক’রে পেলেন। ‘মানসী’ কাব্যের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ গাজিপুর বসবাসের স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, ‘বাল্যকাল থেকে পশ্চিম-ভারত আমার কাছে রোম্যান্টিক কল্পনার বিষয় ছিল। এইখানেই নিরবচ্ছিন্নকাল বিদেশিদের সঙ্গে এ দেশের সংযোগ ও সংঘর্ষ ঘটে এসেছে। বহু শতাব্দী ধরে এইখানেই ইতিহাসের বিপুল পটভূমিকায় বহু সাম্রাজ্যের উত্থান পতন এবং নব নব ঐশ্বর্যের বিকাশ ও বিলয় আপন বিচিত্র বর্ণের ছবির ধারা অঙ্কিত করে চলেছে। অনেকদিন ইচ্ছা করেছি এই পশ্চিম-ভারতের কোনো এক জায়গায় আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের বিরাট বিক্ষুব্ধ অতীত যুগের স্পর্শলাভ করব মনের মধ্যে। অবশেষে এক সময়ে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হলুম। এত দেশ থাকতে কেন যে গাজিপুর বেছে নিয়েছিলুম তার দুটো কারণ আছে। শুনেছিলুম গাজিপুরে আছে গলাপের ক্ষেত। আমি যেন মনের মধ্যে গোলাপবিলাসী সিরাজের ছবি এঁকে নিয়েছিলুম। তারই মোহ আমাকে প্রবল ভাবে টেনেছিল। সেখানে গিয়ে দেখলুম ব্যবসাদারের গোলাপের ক্ষেত, এখানে বুলবুলের আমন্ত্রণ নেই, কবিরও নেই। হারিয়ে গেল সেই ছবি। অপর পক্ষে, গাজিপুরে মহিমান্বিত প্রাচীন ইতিহাসের স্বাক্ষর কোথাও বড়ো রেখায় ছাপ দেয় নি। আমার চোখে এর চেহারা ঠেকল সাদা-কাপড় পরা বিধবার মতো, সেও কোনো বড়ো ঘরের ঘরণী নয়। তবু গাজিপুরেই রয়ে গেলুম, তার একটা কারণ এখানে ছিলেন আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় গগনচন্দ্র রায়, আফিম বিভাগের একজন বড়ো কর্মচারী। এখানে আমার সমস্ত ব্যবস্থা সহজ হল তারই সাহায্যে। একখানা বড়ো বাংলো পাওয়া গেল। সেখানে যবের ছোলার শর্ষের খেত; দূর থেকে  দেখা যায় গঙ্গার জলধারা, গুণটানা নৌকো চলেছে মন্থর গতিতে। বাড়ির সংলগ্ন অনেকখানি জমি অনাদৃত, বাংলাদেশরে মাটি হলে জঙ্গল হয়ে উঠত। এখান থেকে পুবে চলছে নিস্তব্ধ মধ্যাহ্ন কল কল শব্দ। গোলাপ-চাঁপার ঘন পল্লব  থেকে কোকিলের ডাক আসত রৌদ্রতপ্ত প্রহরের ক্লান্ত হাওয়ায়। পশ্চিম কোণে প্রাচীন একটা মহানিম গাছ, তার বিস্তীর্ণ  ছায়াতলে বসবার জায়গা। সাদা ধুলোর  রাস্তা চলেছে বাড়ির গা ঘেঁষে, দূরে দেখা যায় খোলার-চালওয়ালা পল্লী। গাজিপুর আগ্রা-দিল্লীর সমকক্ষ নয়। সিরাজ-সমরখন্দের সঙ্গেও এর তুলনা হয় না; তবুও মন নিমগ্ন হল অক্ষুন্ন অবকাশের মধ্যে। আমার গানে আমি বলেছি, আমি সুদূরের পিয়াসী।’  


তাদের মাঝে মুক্তি শুধু মনের দিক থেকেই আসেনি। এসেছে দাম্পত্য জীবনেও। একান্নবর্তী পরিবারের দশের ইচ্ছা বোঝাই করা কঠিন জীবন থেকে যেন মুক্তি পেল তাদের জীবন। কেবল কাব্য রচনার মধ্যে নয়; তাদের সংসার জীবনেও নতুন পর্বের  সূচনা পেল। রবীন্দ্রনাথ, গাজিপুরের বহু স্মৃতি পরোক্ষ ভাবে নৌকাডুবি উপন্যাসে লিখে গেছেন। এই নৌকাডুবি  উপন্যাসটি  ১৮৮৯ সালে শিলাইদহে বান্ধবী অমলা দাশ ও বলেন্দ্রনাথ সহ; মৃণালিনী দেবী পদ্মার চরে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। এই হারিয়ে যাওয়া চিত্র রবীন্দ্রনাথ ছিন্নপত্রাবলী’তে ধ’রে রেখেছেন। গাজিপুরে; রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী দেবীকে  ইংরেজি শিক্ষার জন্য সাময়িক ভাবে একজন বিদেশী নারীকে নিয়োগ করেছিলেন। এ কথা আমরা পুনশ্চের ‘স্মৃতি’ কবিতায় জানতে পারি। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ, গাজিপুরে বসবাসের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে কবিতা ও গানে তা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ গাজিপুরের স্মৃতি য়ুরোপ যাত্রীর ডায়রী’তে তা লিখে রেখেছেন আপন মহিমায়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৮৫) রচিত রবীন্দ্রজীবনী’তে। এ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তিনি বলেন, ‘এইবার ইচ্ছা হইল ‘পশ্চিমের কোনো রমণীয় স্থানে তিনি একটি নিভৃত কবিকুঞ্জ রচনা করিয়া জীবনটিকে সৌন্দর্যের স্রোতে ভরা কবিত্বের হাওয়ার মধ্যে ভাসাইয়া দেন।’ এই উদ্দেশ্যে ১২৯৪ সালের শেষ দিকে তিনি সপরিবারে গাজিপুর গিয়া বাস করিতে  মনস্ত করিলেন। এত জায়গা থাকিতে গাজিপুর কেন তাহার পছন্দ হইল, সে-সম্বন্ধে কবি স্বয়ং কৈফিয়ত দিয়েছেন। ‘বাল্যকাল  থেকে পশ্চিম ভারত আমার কাছে রোম্যান্টিক কল্পনার বিষয় ছিল।...অনেকদিন ইচ্ছা করেছি এই পশ্চিম ভারতের কোনো এক জায়গায় আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের বিরাট বিক্ষুব্ধ অতীত যুগের স্পর্শলাভ করব মনের মধ্যে।...শুনেছিলুম গাজিপুরে আছে গোলাপের খেত।...তারি মোহ আমাকে প্রবলভাবে টেনেছিল।’ রবীন্দ্রনাথের পরিবার বলিতে এখনও বুঝায় পত্নী মৃণালিনী দেবী ও শিশু কন্যা বেলা। এই সংসার লইয়া কবি চলিলেন উত্তরপ্রদেশের রোম্যান্টিক শহরে কবি-জীবনযাপন অভিলাষে।  ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলপথের দিলদারনগরে বেলা প্রায় দেড়টার সময় নামিতে হয়; খর রোদে ভাজা ভাজা হইয়া তপ্ত বালি পার হইয়া অল্পবয়স্কা স্ত্রী ও শিশুকে লইয়া তাড়িঘাটের ট্রেনে উঠিলেন। তাড়িঘাটে গঙ্গা পার হইতে হইল ষ্টীমারযোগে। গাজিপুরঘাট শহরের ধারে। ঘোড়ার গাড়ি বিহারের প্রাচীন শহরের গলিখুঁজি ছাড়াইয়া সাহেবপাড়ায় একটি ভাড়া করা বাংলা- বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিল। রোম্যান্টিক পশ্চিমভারতের শহরে আসিলেন এইভাবে। গাজিপুর আসিয়া রবীন্দ্রনাথের বিশেষ এক মিত্র লাভ হইল, কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন। দেবেন্দ্রনাথ, তাহার স্মৃতি প্রবন্ধে লিখিতেছেন, ‘একদিন শুনিলাম কবিবর রবীন্দ্রনাথ গাজিপুরে আসিয়াছেন। রবিবাবু আমার ‘ফুলবালা’ (১৮৮০) ও ‘ঊর্মিলা’ (১৮৮১) কাব্যের পক্ষাপাতী ছিলেন ও আমার ‘নির্ঝরিণী’ (১৮৮১) কাব্যের ‘আঁখির মিলন’ কবিতা তাহাঁর বড়ই ভাল লাগিয়াছিল। তাহাঁর সহিত সাক্ষাৎ সম্বন্ধে আলাপ না থাকিলেও, পত্রের দ্বারায় পরিচয় ছিল। তিনি আমার ‘ঊর্মিলা’ (১৮৮১) কাব্যের সম্বন্ধে আমায় লিখিয়াছিলেন, ‘ইহাতে স্থানে স্থানে কল্পনার খাঁটি রত্ন বসানো হইয়াছে।’...ইত্যাদি। গাজিপুরে অবস্থানকালে রবিবাবুর  সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। ...আমার অপ্রকাশিত কবিতাগুলি রবিবাবুকে শুনাইতাম- তিনি আনন্দিত হইয়া শুনিতেন। তিনিও আপনার অপ্রকাশিত নূতন কবিতাগুলি শুনাইতেন। আমি হর্ষ-বিহ্বল হইয়া শুনিতাম।’
গাজিপুরে পৌঁছিয়া কলিকাতায়  প্রিয়নাথ সেনকে (২ বৈশাখ, ১২৯৫) লিখিতেছেন, ‘নববর্ষের কোলাকুলি গ্রহণ কর। যদি কোনো সুযোগে একবার এ দিকে আসতে পার তা হলে দিনকতক সম্মিলন রস সম্ভোগ করা যায়। এখানে বই, বিজনতা এবং বন্ধু আছে এর মধ্যে কোনটা যদি লোভনীয় জ্ঞান কর ত বিলম্ব করবার  আবশ্যক নেই।’ কিন্তু প্রিয়নাথকে কবি কোনো দিন মথুর সেনের সংকীর্ণ গলির পুরাতন বাড়ি হইতে বাহির করিয়া কোথাও আনিতে পারেন নাই। পশ্চিম ভারতের প্রাচীন শহরে যে স্বপ্ন লইয়া বাস করিতে গিয়াছিলেন, সে স্বপ্ন ভাঙিতে বেশিক্ষণ লাগে নাই। ‘সেখানে গিয়া দেখলুম ব্যবসাদারের গোলাপের খেত, এখানে বুলবুলের আমন্ত্রণ নেই, কবিরও নেই। হারিয়ে গেল সেই ছবি। তবু গাজিপুরেই রয়ে গেলুম, তার একটা কারণ এখানে ছিলেন আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় গগনচন্দ্র রায়, আফিম বিভাগের একজন বড় কর্মচারী। এখানে বড় বাংলা পাওয়া গেল, ধারেও বটে, কিন্তু গঙ্গার ধারেও নয়। প্রায় মাইল খানেক চর পড়ে গেছে, সেখানে যবের ছোলার শর্ষের খেত; দূর থেকে দেখা যায় গঙ্গার জলধারা, গুণটানা নৌকা চলেছে মন্থর গতিতে। বাড়ির সংলগ্ন অনেকখানি জমি অনাদৃত, বাংলাদেশের মাটি হলে জঙ্গল হয়ে উঠত। ইদারা থেকে পুর চলছে নিস্তব্ধ মধ্যাহর্নে কলকল শব্দে। গোলকচাঁপার  ঘনপল্লব থেকে কোকিলের ডাক আসত রৌদ্রতপ্ত প্রহরের ক্লান্ত হাওয়ায়। পশ্চিম কোণে প্রাচীন একটা মহানিম গাছ, তার  বিস্তীর্ণ ছায়া তলে বসবার জায়গা। শাদা ধুলোর রাস্তা চলেছে বাড়ির গা ঘেঁষে, দূরে দেখা যায় খোলার চাল-ওয়ালা পল্লী।’ মানসীর কতকগুলি কবিতার মধ্যে এই স্থানিক শোভার বর্ণনা বেশ পরিস্ফুট হইয়াছে। সপরিবারে এই গাজিপুরে বাসটা রবীন্দ্রনাথের জীবনে একটি বিশেষ পর্ব ও ঘটনা বলিয়া আমরা মনে করি। এতকাল জোড়াসাঁকোর বিশাল পুরীতে স্ত্রী ও কন্যা লইয়া বৃহৎ ঠাকুরপরিবারের ক্ষুদ্র অংশ রূপে বাস করিয়াছেন, অথবা জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর শাসনাধীন সুব্যবস্থিত গৃহশৃঙ্খলার মধ্যে আদরে যত্নে  লালিত হইয়াছেন। কিন্তু স্বামীকে আপনার সংসারে, নিজের মত করিয়া, কেবল নিজের করিয়া পাইবার যে আকাঙ্ক্ষা নারীর পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক, তাহা পত্নী মৃণালিনী দেবীর সংসারজীবনে এই প্রথম ঘটিল; রবীন্দ্রনাথ ও যৌবনের পরিপূর্ণতার মধ্যে স্ত্রীকে পাইলেন সঙ্গিনীরূপে, প্রেয়সীরূপে- ‘আশা দিয়ে ভাষা দিয়ে তাহে ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলি মানস-প্রতিমা।’ গাজিপুরের অক্ষুণ্ণ অবসরের মধ্যে কবির মন নিমগ্ন হইল। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমার গানে আমি বলেছি, আমি সুদূরের পিয়াসী। পরিচিত সংসার থেকে এখানে আমি সেই দূরত্বের দ্বারা বেষ্টিত হলুম, অভ্যাসের স্থূলহস্থাবলেপ দূর হবামাত্র মুক্তি এলো মনোরাজ্যে। এই আবহাওয়ায় আমার কাব্যরচনার একটা নতুন পর্ব আপনি প্রকাশ পেল। নতুন আবেষ্টনে এই কবিতাগুলি সহসা যেন নবদেহ ধারণ করল। পূর্ববর্তী ‘কড়ি ও কোমল’ এর সঙ্গে এর বিশেষ মিল পাওয়া যাবে না। আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নতুন শক্তি দিতে পেরেছি। ‘মানসী’তেই  ছন্দের নানা খেয়াল দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। কবির সঙ্গে যেন একজন শিল্পী এসে যোগ দিল।’ জীবনের এই নব অভিজ্ঞতায় সৃষ্টির বিচিত্র রহস্যকে সম্ভোগ করিবার সুযোগ ও অবসর মিলিল। নৈব্যক্তিক রসের সাধনা প্রেমের লীলা বাস্তব জগতে সম্পূর্ণ হয়না। দৈনন্দিন জীবনের প্রেম দৈনন্দিন সাংসারিক ঘাত-প্রতিঘাতে ম্লান হয়। নারীহৃদয়ে কত বিচিত্রসাধ, কত ইন্দ্রধনু লীলাখেলা উঠে, অস্ত যায়। কবি দার্শনিকের ন্যায় অনুভব করেন, শিল্পীর চোখে দেখেন, প্রকাশ করেন কবির ভাষায়।
গাজিপুরে বাসকালে কবি আটাশটি কবিতা লেখেন ১২৯৫ সালের ১১ বৈশাখ হতে ২৩ আষাঢ়ের মধ্যে। এইগুলিকেই আমরা ‘মানসী’র কেন্দ্রগত কবিতা বলিব, কারণ রবীন্দ্রনাথ যখনই ‘মানসী’র কথা বলিয়াছেন তখনই গাজিপুর বাসকালে রচিত কবিতার কথাই উল্লেখ করিয়াছেন। এইগুলির মধ্যে কবির মানসলোকের যথার্থ সন্ধান পাওয়া যায়- ইহাতে কাল্পনিকতা কম, বৃহতের নিকট অমোঘের কাছে  আত্মসমর্পণের একটি ভাব সুস্পষ্ট। মাঘোৎসবের সময়ে যে রচনা ‘নাথ হে, প্রেমপথে সব বাধা ভাঙিয়া দাও’- সেই সুর  দেখা যায় কয়েকটি কবিতায়- আত্মনিবেদন ও আত্মনির্ভরের ভাব সেখানে খুব স্পষ্ট। তাহার দ্বারা কাব্যের রসধারা ব্যাহত হইয়াছে কি না তাহা গভীরভাবে বিচার্যও। দুঃসাহসিক কল্পনা তীব্র আবেগের অভাবে কবিতাকে দুর্বল করিয়া দেয়। ‘জীবন মধ্যাহ্নে’র  ‘তাই আজ বার বার ধাই তব পানে’, ‘ওহে তুমি নিখিলনির্ভর’ প্রভৃতি কথা বিশুদ্ধ কাব্যের বিষয় নহে। ‘শূন্য গৃহে’, নিষ্ঠুর সৃষ্টি’ কবিতাতেও এই অসহায় আত্মনিবেদনের ভাব বেশ স্পষ্ট। বিশ বৎসরের যুবক প্রমথ চৌধুরী ঠিকই ধরিয়াছিলেন যে, despair ও resignation কবিতাগুলির একটি বৈশিষ্ট্য। আমরা এতক্ষণ কবি রবীন্দ্রনাথের মানসলোকের বিচিত্র অনুভূতির সন্ধানে তাহাঁর কাব্য বলাকার ছায়াহীন পথ বাহিয়া চলিয়াছিলাম। কিন্তু মানুষ রবীন্দ্রনাথকেও দেখা দরকার, যাহার ভিতর দিয়া কাব্য বলাকার অশ্রুত কাকলি অরূপের বাণীরূপে প্রকাশ পাইতেছে। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি, রবীন্দ্রনাথের জীবনে গাজিপুর বাস পর্বটা একটি বিশেষ ঘটনা, তাহার কারণও বলিয়াছি। গাজিপুরে  যে বরাবর ছিলেন তাহা নহে, বোধ হয় বার-দুই কলকাতায় যান। একবার গিয়া সুরেন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা  দেবীকে আনেন, আষাঢ়ের শেষাশেষি ৭ জুলাই, ১৮৮৮, তাহাদের পুনরায় রাখিয়া আসেন ও শ্রাবণ মাসে ন-দিদি স্বর্ণকুমারীকে লইয়া পুনরায় ফিরিয়া আসেন।’                                        
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমি যখন গাজিপুরে থাকতুম তখন ইংরেজরা মনে করত, আমোদ-প্রমোদ খেলা ও সঙ্গ অভাবে আমি বুঝিভারি ম্রিয়মাণ হয়ে আছি। তাই আমাকে ক্রমাগত নিমন্ত্রণ করত এবং ক্লাবের মেম্বার হবার জন্য অনুরোধ করত। আমি যে ঘরের কোণে  সন্ধ্যাবেলায় আলোটি জ্বেলে আমার আপনার লোক নিয়ে কত সুখে থাকতুম তা তারা বুঝতে পারত না। একজন মেয়ে ডাক্তার আমাদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করে যখন দেখে অপরিষ্কার ছোট ঘর, ছোট জানালা, ময়লা বিছানা, মাটির প্রদীপ, দড়ি বাঁধা মশারি, আর্ট স্টুডিয়োর রংলেপা ছবি, তখন সে মনে করে-কী সর্বনাশ ! কী ভয়ানক কষ্টের জীবন। এদের পুরুষরা কী স্বার্থপর ! স্ত্রীলোকদের জন্তুর মত করে রেখেছে। জানে  না আমাদের দশাই এই। আমাদের কৌচ কার্পেট কেদারা নেই। কিন্তু তবু আমাদের দয়ামায়া ভালবাসা আছে। কৌচ কেদারা তোমরা এত ভালবাসা যে স্ত্রী-পুত্র না হলেও চলে। আরামটি তোমাদের আগে, তারপরে তোমাদের ভালবাসা। আমাদের ভালবাসা নিতান্তই আবশ্যক, তারপরে আরাম থাক না থাক। স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২) ‘গাজিপুর যাত্রা’তে; রবীন্দ্রনাথ ও তার নিজের যাত্রার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘অবশেষে গাড়ী যখন একটি বাগানের মধ্যে দিয়ে ঢুকে এক বড় বাংলোর কাছে থামিল, বেলু রাণীর টুকটুকে মুখখানি ফুলের মত আমাদের চোখে ফুটিয়া উঠিল, তাহার হাত ধরিয়া আমার ভ্রাতৃজায়া যখন বারান্দায় অগ্রসর হইয়া দাঁড়াইলেন-তখন পথশ্রান্তিও ভুলিয়া গেলাম।’ ইন্দিরা দেবী, তার ‘রবীন্দ্রস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ তাদেরও কিছুদিনের জন্য গাজিপুরে যাবার আমন্ত্রণ করেছিলেন। সেই সময় জ্যোতিন্দ্রনাথ ও সরলা দেবী গাজিপুরে ছিলেন।’ এই গাজিপুরেই কাদম্বরী দেবীর দেওয়া উপহার সোনার আংটিও তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন। রবীন্দ্রজীবনকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর কবি দম্পতির গাজিপুরে বাস প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘স্বামীকে আপনার সংসারে, নিজের মত করিয়া, কেবল নিজের করিয়া পাইবার আকাঙ্ক্ষা নারীর পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক, তাহা পত্নী মৃণালিনী দেবীর সংসার জীবনে এই প্রথম ঘটিল, রবীন্দ্রনাথও যৌবনের পরিপূর্ণতার মধ্যে স্ত্রীকে পাইলেন সঙ্গিনীরূপে, প্রেয়সীরূপে।’  
গাজিপুরে রবীন্দ্র-মৃণালিনীর সংসার জীবনে যেমন নতুন পর্বের শুরু হয়েছিল; তেমনি কবির কবিতাতেও সে সময় নতুনত্বের  হওয়া এসে তাঁদের হৃদয়ে লেগেছিল। ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে এই প্রথম নানা রকম ছন্দের প্রকাশ হতে লাগলো এবং রোম্যান্টিক কবি হয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যেন একজন শিল্পী স্রষ্টা এসে যোগ দিল। এই শিল্পী ও স্রষ্টা কবি রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৮ সালে বৈশাখে গাজিপুরে মহানিম গাছের তলায় বসে ‘সংশয়ের আবেগের’ মধ্যে ঈশ্বরের সৃষ্টি অসম্পূর্ণ গ্রাম্য বালিকা বধূকে (মানসী) রোম্যান্টিক কবি কল্পনায় সৃষ্টি করলেন অসম্পূর্ণ মানসীরূপে- ‘আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, তাতে ভালবাসা দিয়ে, গড়ে তুলি মানসী প্রতিমা। রবীন্দ্রনাথ এই অসম্পূর্ণ মানসীকে সৃষ্টি করে ক্রমে সম্পূর্ণ করতে পারবেন কি না এই আশঙ্কাও কবির মনে দেখা দিয়েছিল। তাই কবি প্রমথ চৌধুরীকে লিখিত চিঠিপত্রের পঞ্চম খণ্ডে মানসীর সৃষ্টি ও কবি মনের সংশয় সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘আমি ভালবাসি অনেককেই কিন্তু মানসীতে যাকে খাড়া করেছি সে মানসেই আছে- সে Artist-এর হাতে রচিত ঈশ্বরের অসম্পূর্ণ প্রতিমা, ক্রমে সম্পূর্ণ হবে কী ? কবি ভালোবাসেন অনেককেই অর্থাৎ,কবিরা ভালোলাগে অনেককেই (ভালোলাগা-পশ্চিম–যাত্রীর ডায়ারি, পৃষ্ঠা ৫৭৭) কিন্তু অনেকের মধ্যে কবি যাকে ভালোবাসেন তাঁকে মানসীতে এনে উপস্থিত করেছেন। সে স্রষ্টা ও  শিল্পী কবির  প্রথম যৌবনের ভালোবাসা দিয়ে রচিত, ঈশ্বরের অসম্পূর্ণ  ক্ষুদ্র মানবী (বধূ মানসী ১৮৮৮ সাল, বৈশাখ)। যা ক্রমে বহু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছিল ‘কল্যাণী’ নারীরূপে ‘ক্ষণিকা’তে ১৯০০ সালে, শেষ যৌবনের অকালবসন্তের আষাঢ়ে শিলাইদহে। প্রমথ চৌধুরীকে, ‘মানসী’ সম্বন্ধে নিজের মনের কথা বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, ‘ওর আসল সত্য কথাটুকু হচ্ছে এই যে মানুষ কি চায় তা কিছু জানে না এক ঘটি জল চায় কি আধ খানা বেল চায় জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে না,- আমি এমন অবস্থায় মনের সঙ্গে আপোষে বোঝাপড়া করে কল্পনার কল্পবৃক্ষের মায়াফল পাড়বার চেষ্টা করছি।’ রবীন্দ্রনাথ, এ-সম্পর্কে আরও বলেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি নিজের রচনা ও নিজের মন সম্বন্ধে সমালোচনা করা ভারি কঠিন। আমার চরিত্রের কোনখানে সেই কেন্দ্রস্থল আছে যেখানে গিয়ে আমার সমস্তটার একটা মানে পাওয়া যায়। ‘কড়ি ও কোমলে’র সমালোচনায় আশু যখন বলেছিলেন জীবনের প্রতি দৃঢ় আসক্তিই আমার কবিত্বের মূলমন্ত্র, তখন হঠাৎ একবার মনে হয়েছিল হতেও পারে তাতে করে পরিস্ফুট হয় বটে। কিন্তু এখন আর মনে হয় না আমার মধ্যে বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব চলছে।’ তার মানে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ছিলেন সেই প্রথম যৌবনের অচেনা নারী; যাকে নিয়ে তিনি সুখ-স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকেই ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি করলেন অসম্পূর্ণ মানসীরূপে। এই অসম্পূর্ণ  মানসীকে নিয়েই কবির মনভাবনার সুত্রপাত। ‘দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে/ বোঝাতে নারে আপনায়।’ (নর-নারী, সোনার তরি)। কবি এই অচেনা অপরিচিত, শান্ত, আবেগহীন, কবির বিপরীত চরিত্রের গ্রাম্যবালিকা বধূকে বুঝতে পারতেন না বলেই নিজের মনের সঙ্গে আপোষে বোঝাপড়া করে কল্পনার কল্পবৃক্ষের মায়াফল পাড়বার চেষ্টা করেছেন। ‘কড়ি ও কোমলে’র আদিরসাত্মক কবিতাগুলিতে কবি নিজের প্রবল আসক্তির কথাই কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন; কিন্তু ‘মানসী’তে কবির মধ্যে দুটো বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে রয়েছে কবির ভালোবাসা সম্বন্ধে ‘সংশয়ের আবেগ’ ভালোবাস কি না বাস বুঝিতে পারি নে,/ তাই কাছে থাকি।’ আবার অন্যদিকে নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা- ‘সৌন্দর্যসম্পদ মাঝে বসি/ কে জানিত কাঁদিছে বাসনা।/ ভিক্ষা ভিক্ষা সব ঠাই-তবে আর কোথা জাই/ ভিখারিনী হল যদি কোমল-বাসনা।’ কবির এই দুই বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে মানসীর ‘ধ্যান’ কবিতার জন্ম; যা স্মরণ পরবর্তীকালে মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ধ্যানের মাধ্যমে মহীয়সী নারীর চরিত্রের দেখা দিল। ‘অধরা মাধুরী ধরা পড়িয়াছে/ এ মোর ছন্দ বন্ধনে।’ আর ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থে কবি তাঁকে ‘উৎসর্গ’ করে দেন বিশ্বের কাছে-‘জানি না তোমার নাম/ তোমারেই সঁপিলাম/ আমার ধ্যানের ধনখানি।’ কবি মনের এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বের কথা প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন। কবি মনের এই মানসিক দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছিল শেষ যৌবনের ‘ক্ষণিকা’তে; এবং সেই সঙ্গে কবির অসম্পূর্ণ ‘মানসী’-ও ক্রমে সম্পূর্ণ হলেন কল্যাণী নারীর পূর্ণ রূপ নিয়ে ‘ক্ষণিকা’তে ১৯০০ সালে। এই কল্যাণী- শ্যামলী নারীই ছিলেন কবির কাব্যভাবনার শেষ যাত্রী, অথবা নীলবসন পরিহিতা শেষ কাব্যলক্ষ্মী ‘সজলনীল জলদ-বরণ/ বসনখানি গায়ে।/ তোমার তবে হবে গো ঠাই/এসো, এসো নায়ে।’ যার আবির্ভাব ‘ক্ষণিকা’তে কবির শেষ যৌবনের অকালবসন্তের আষাঢ়ে, শিলাইদহে। এই কারণেই ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থ কবির সবচেয়ে প্রিয় কাব্যগ্রন্থ; এবং নীল বা কালো রং কবির সকল রসের ধারা (মংপুতে  রবীন্দ্রনাথ)। ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের প্রথমদিকের ২৮টি কবিতা লেখা হয়েছে কবি কল্পনার রোম্যান্টিক শহর গাজিপুরে। আর শেষ ভাগে লেখা হয়েছে সমুদ্রের উপর ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি’তে। তাই সেই সময়ে (১৮৮৮-১৮৯০) সালে গাজিপুরে; কবির মনের গতি প্রকৃতি নির্ণয়ে এই ডায়ারি, চিঠিপত্র অনেক মূল্যবান হ’য়ে দেখা দেয়। গাজিপুর থেকে ফিরে আসার পর ১৮৮৯ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পুত্র-কন্যাসহ শিলাইদহের কুঠিবাড়ি ও পদ্মাবক্ষের ‘পদ্মবটে’ মৃণালিনী দেবী কিছুদিনের জন্য বাস করেছিলেন; যেখানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ-ও ছিলেন। পরবর্তীকালে এই শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে বাস; বাগানের পুকুর ঘাট ও স্নানরতা ষোল বছরের রন্ধন পটীয়সী মৃণালিনী দেবী ও রোম্যান্টিক কবি রবীন্দ্রনাথ সেই সব  স্মৃতিচারনা করে ধরে রেখেছেন বীথিকার ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতাতে। যেখানে কবি পূর্বের মতোই মৃণালিনী দেবীকে নানা রকম মিষ্টির ফরমাস দিচ্ছেন। আর মৃণালিনী দেবী হিসাবের খাতা ও ফেলে যাওয়া আধুলির প্রতি নির্দেশ করে কালের ও মৃণালিনী দেবীর আর্থিক সংগতি ও হিসাবি মনোভাবের ছবি এঁকেছেন। কবি তাঁর শেষ জীবনের দিকে; তাঁর প্রিয় স্থান শিলাইদহে কিছু দিনের জন্য থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বার্ধক্য হেতু তিনি শিলাইদহের কুঠিবাড়ির পরিবর্তে গঙ্গার ধারে ‘পদ্ম বোটে’ চন্দননগরে বাস করে চিঠির মাধ্যমে অতীতের স্মৃতিচারণা করেছেন। শিলাইদহে ‘পদ্ম বোটে’ কিছুদিন থাকার পর কয়েক মাসের জন্য, ১৮৯০সালের আগস্ট-নভেম্বরের দিকে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার বিলেত যাত্রা করেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ত্রিশ। যাবার পথে সমুদ্রের উপর ‘শ্যাম’ জাহাজে লেখেন ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি’। যৌবনে লিখিত এই ডায়ারিটিই কবির একমাত্র ডায়ারি ; যেখানে গৃহপ্রিয় যুবক রবীন্দ্রনাথ আপন সংসার ছেড়ে দূর বিদেশে যাবার বিচ্ছেদ-বিরহ, বেদনা ও সূর্যাস্তের দৃশ্যের সঙ্গে মৃণালিনী দেবীর উদ্দেশে একটি অসম্পূর্ণ কবিতা লেখা হয়-‘এমন মধুর করে তুমি ভাবিতে পারো না মোরে’-এবং তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার উল্লাস ও আনন্দ এবং সেই সময়ের মনোভাব এবং হঠাৎ  মনের পরিবর্তন; এ-সমস্তই রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণরূপে তাঁর স্মৃতিময় এই ডায়ারিতে লিখে গেছেন। কলকাতায় ফিরে আসার ছয় মাস পর, ১৮৯২ সালের ১৭ নভেম্বর তারিখে, মৃণালিনী দেবী, ইন্দিরা দেবীর সঙ্গে সোলাপুর যাত্রা করেন। এই যাত্রা পথের বিবরণ রবীন্দ্রনাথ ‘ছিন্নপত্রে’ ইন্দিরা দেবীকে  লিখে শেষাংশে প্রিয়জনের সঙ্গ লাভ করবার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাই প্রকাশ করেন , ‘আজ সকালবেলা উঠে অবধি আমি মনে মনে তোদের গাড়ির জানালার পাশে বসে তোদের সঙ্গে রেলের দুই পার্শ্বের রৌদ্রজ্জ্বল চিত্রগুলি দেখে যাবার চেষ্টা করছি।’ মৃণালিনী দেবী সোলাপুরে বেশি দিন ছিলেন না। কারণ, কোনো পারিবারিক কারণে মৃণালিনী দেবী সোলাপুরে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। তা ছাড়া জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ছিলেন সেই সময়ের বিদুষী, সুন্দরী, পাশ্চাত্যভাবাপন্ন আধুনিক প্রগতিশীল প্রথম আই ছি এস। আর অপর পক্ষে মৃণালিনী দেবী ছিলেন স্নেহ-মমতায় ভরা বাংলাদেশের গ্রাম্যবালিকা। এই চরিত্রগত পার্থক্যের জন্য তাঁদের জীবনধারাতেও ছিল ব্যাপক পার্থক্য। তাই মানসিক কারণে মৃণালিনী দেবী সোলাপুরে বেশি দিন থাকতে চাইলেন না। তিনি কলকাতায় ফিরে আসার জন্য রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন। মৃণালিনী দেবীর এই সিদ্ধান্তের  জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘তোমরা আসচ এক হিসাবে আমার ভালই হয়েছে। আমার শরীরটা তেমন ভালো নেই, সেই জন্য তোমাদের কাছে পাবার জন্য প্রায়ই মনে মনে ইচ্ছে করত। আমি বেশ জানি যতদিন তোমরা সোলাপুর থাকবে ততদিন তোমাদের পক্ষে ভালো হবে। ছেলেরা অনেকটা শুধরে এবং শিখে এবং ভালো হয়ে আসবে এই রকম আমি খুব আশা করেছিলুম। জোড়াসাঁকোর বৃহৎ পরিবারের মধ্যে একমাত্র মৃণালিনী দেবীর এই ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তনের জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অনেক সময় অনেক কথা বলেছেন। অস্থির ভাবাপন্ন চরিত্রের রবীন্দ্রনাথের জন্য মৃণালিনী দেবী স্থির ভাবে কোথাও বসবাস করতে পারেননি। মৃণালিনী দেবীকে বিভিন্ন পরিবেশের মধ্যে থেকে সংসার করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১ সালের  কোন এক চিঠিতে মৃণালিনী দেবীকে লিখেছেন, ‘আজ আমার প্রবাস ঠিক এক মাস হল। আমি দেখেছি যদি কাজের ভিড় থাকে তা হলে আমি কোনমতে এক মাস কাল বিদেশে কাটিয়ে দিতে পারি। তাঁর পর থেকে বাড়ির দিকে মন টানতে  থাকে।’                                                                  
এই শিলাইদহে থাকাকালীন ১২৯৯ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের মাঝামাঝি রবীন্দ্রনাথ উড়িষ্যা যাত্রা করেন। ২৮ অগ্রহায়ণ মৃণালিনী দেবীকে লিখেছেন, ‘চেষ্টা করব উড়িষ্যায় যদি আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি। সে জায়গাটা ভারি স্বাস্থ্যকর। আমি বাবা মহাশয়কে আমার ইচ্ছা কতকটা জানিয়ে রেখেচি তিনিও কতকটা বুঝেছেন-আর দুই একবার বললে কিছু ফল হতে পারে- কিন্তু আগে থাকতে বেশি আশা করে বস না।’ রবীন্দ্রনাথের এই আশা পূর্ণ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ, মৃণালিনী দেবীকে নিয়ে ভবিষ্যতে ইউরোপ যাবার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু মৃণালিনী দেবী জীবিতকালে সে ইচ্ছা আর কোনো দিন পূর্ণ হয়ে উঠে নি। পুরীতে, মৃণালিনী দেবীর পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গি হলেন বলেন্দ্রনাথ। কটকে, রবীন্দ্রনাথ বিহারীলাল গুপ্তের বাসায় উঠেন। স্ত্রীকে লেখা একটি চিঠিতে বিহারীলাল গুপ্ত, তাঁর পরিবার ও তাঁদের বাড়িতে নিজেদের জীবনযাত্রার একটি সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘Mrs Gupta ভারি নিরুপায় গোছের মেয়ে-তিনি কিছুই গুছিয়ে গাছিয়ে করে কর্মে নিতে পারেন না-বিহারীবাবু অনেকটা আমার মত ধাত আছে দেখলুম। তিনি সকল বিষয়েই ভারি ব্যস্ত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েন। কেবল আমার মত খুঁৎ খুঁৎ খিট খিট করেন না-সেটা তাঁর স্ত্রীর পক্ষে একটা মহা সুবিধে। আমাদের এমন যত্ন করেন- ঠিক যেন ঘরের লোকের মত- খুব যে আদর দেখিয়ে ব্যস্ত করে তোলা হা নয়- আমরা আমাদের ঘরে সমস্ত দিন যা খুশি তাই করতে সময় পাই। এমনকি বলুকেও অনেকটা বাগিয়ে আনতে পেরেছেন-সে বেচারা যদিও এখনও ক্রমাগত মাথা নিচু করে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়া একদম বন্ধ করেছে। ওরা যা খেতে বলেন তাতেই মাথা নাড়ে। ভাগ্যি ওরা দুজনে মিলে অনেক পীড়াপীড়ি করেন তাই মুখে দুটি অন্ন ওঠে। নইলে এতদিনে শুকিয়ে যেত।’ ১৮৯৩ সালের অপর আর এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ, মৃণালিনী দেবীকে কটক থেকে পুরী যাবার বর্ণনা লিখেছেন, ‘আজ এগোরাটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরোতে হবে। আজ রাত্তির পথের মধ্যে একটা ডাকবাংলায় কাটাতে হবে, তারপর কাল বোধহয় সন্ধের মধ্যে পুরীতে গিয়ে পৌঁছতে পারব। Mrs Gupta এবং তার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যাচ্ছেন, সে জন্য বিস্তর জিনিসপত্র বোচকা বুঁচকি গরুর গাড়ি বোঝাই হয়ে চলেছে।’ পুরীর সমুদ্রের চিত্র রবীন্দ্রনাথের ভালো লেগেছিল। তাই তিনি সপরিবারে বাস করবেন বলে বহু আশা করে সমুদ্রতীরে একটি বাড়ি কিনেছিলেন- কবির এই বাড়িটিকে ঘিরে যৌবনে যে সুখ-স্বপ্নের ছবি  দেখেছিলেন, ঋণের দায়ে বাড়ি বিক্রির জন্য কবির সেই সুখ-স্বপ্নও ভেঙে গেল। তাই কবি পূরবীর ‘আশা’ কবিতায় কবির সেই আশাভঙ্গের কাহিনি লিখে গেছেন।


রবীন্দ্রনাথের ছিল ঘর এবং ঘরের বাহিরের প্রতি আকর্ষণ। তাই কবির মানস জগৎ ও বস্তু জগৎ-এই দুয়ের মধ্যে সমান বন্ধনে আবদ্ধ; যা তাঁর যৌবনের কাব্যগ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই রবীন্দ্রকাব্যেয় দেখা যায় দুইটি ধারার নারী চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে কবির প্রেম ও দুইটি ধারায় প্রবাহিত বয়ে চলেছে। ভালোলাগার ধারা ও ভালোবাসার ধারা যার পরিপূর্ণরূপে   বিশ্লেষণ রয়েছে ‘পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারিতে’ ১৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯২৫ সালে। ‘উর্বশী’ ও ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’-এই দুই কবিতায় দুই ধরনের নারী চরিত্রের বিশ্লেষণ করে দুই ধারার প্রেমের কথা লিখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই দুই ধারার প্রেম এবং দুই প্রকৃতির নারীকে নিয়েই কবির কাব্যগ্রন্থ শেষ হয়েছে। ‘চিত্রার’ ভূমিকায় তাই রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘বাইরে যার প্রকাশ সে বহু, অন্তরে যার প্রকাশ সে একা। এই দুই ধারার প্রবাহেই কাব্য সম্পূর্ণ হয়। জগতে বিচিত্ররূপিণী আর অন্তরে একাকিনী কবির কাছে  দুইই সত্য, আকাশ এবং ভূতলকে নিয়ে ধরণী যেমন সত্য।’ কবির যৌবনের কবিতাগুলিতে আকাশচারিণী ও ভূতলবাসিনী, কাল্পনিক ও বাস্তব-এই দুই প্রকৃতির নারীকে নিয়েই কবির সংশয়িত প্রেমের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ছবিগুলি ভালভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কখনও, রবীন্দ্রনাথ বাস্তব জীবনের ভালবাসায় নিমগ্ন হয়ে একাকিনী ভূতলবাসিনী অগৌরবা কবিসৃষ্ট অসম্পূর্ণ  কল্পলোকের মানসীর বন্দনা করেছেন। আবার কখনও উদাসীন কবি অসম্পূর্ণ মানসীকে ভুলে গিয়ে কল্পনায় বিচিত্ররূপিণী, আধুনিক, বিদুষী নারীদের বন্দনা করে দূর অতীতের পুরাতন সহচরী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু স্মৃতিকে এবং কৈশোরের প্রথমা প্রিয়া আন্নাতড়খড়কে স্মরণ করেছেন মনের গভীর থেকে। আবার কখনোও একান্ত স্নেহভাজন নারীকে নিজের স্বপ্নময় মনের আভাস দিয়ে প্রকৃতি প্রেমের বর্ণনা দিয়েছেন ছিন্নপত্রে। যৌবনের রোম্যান্টিক কবি এই সংশয়িত প্রেমের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের                            
মধ্যে, শেষ যৌবনে বাস্তব প্রেমে স্থিতিলাভ করে অসম্পূর্ণ মানসীকে সম্পূর্ণ করলেন কল্যাণী নারীরূপে অকাল বসন্তের ক্ষণিকাতে। শৈশবে কাদম্বরী দেবী কবির হাত দেখে ‘তোমার স্বভাব/প্রেমের লক্ষণে দীন’-বলে যে ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন; শেষ যৌবনে ‘ক্ষণিকা’য় কবি তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে একটিমাত্র কাব্যলক্ষ্মী রূপে মৃণালিনী দেবীকে বরণ করে একনিষ্ঠ প্রেমিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন-‘পরশের সত্য পুরস্কার/ভাঙ্গিয়া দিয়াছ দোষ মিথ্যা সে নিন্দার।’ এই শ্যামলী নারীই ছিলেন কবির কাব্যতরণীর শেষ যাত্রী, যিনি কবির বসন্তরাতে দৈবক্রমে অথবা অকস্মাৎ কবির পাশে এসেছিলেন- ‘হে রমণী ক্ষণকাল আসি মোর পাশে/চিত্ত ভরি দিলে সেই রহস্য আভাসে।’ ‘ক্ষণিকা’তে পরিপূর্ণ প্রেমের উপলব্ধির পরই কবির আধ্যাত্মিক সত্তার বিকাশ হয়েছিল ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থে; কারণ একমাত্র প্রেমের দ্বারাই পৃথিবীর কল্যাণ সম্ভাব। কবির জীবন ও কাব্যে এটাই একমাত্র পালা। সীমার মধ্যে অসীমের মিলন সাধনের পালা-যা প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে স্মরণ কাব্যগ্রন্থে লিখে গেছেন।


রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর সংসার জীবনের চিত্র পাওয়া যায় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবির কথা’, হেমলতা দেবীর ‘সংসারী রবীন্দ্রনাথ’, ঊর্মিলা দেবীর ‘কবি প্রিয়া’ ও রথীন্দ্রনাথের ‘পিতৃস্মৃতি’ গ্রন্থে। প্রত্যেকটি গ্রন্থেই সুবিন্যাস্ত ভাবে তু’লে ধরা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর কথা।  


সন্তানদের সাথে মৃণালিনীর সম্পর্ক ছিল মধুর। যে যেখানেই থাকুক না কেন সর্বদা তাঁদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। ১৮৯৩-এর মে মাসে কন্যা মাধুরীলতাকে কোনো এক চিঠিতে লিখেন, ‘বাবা মহাশয়, আপনার চিঠি পেয়েছি। আপনাদের যদি আসা মত হয় তা হলে আষাঢ় মাস থেকে এখানে আসবেন-এ মাসটা সেইখানেই থাকবেন। আমরা সব ভাল আছি। আপনারা সকলে কেমন আছেন লিখবেন। বাবা মহাশয়ের জন্য কচু এর নেবু যদি পারেন তাহলে পাঠিয়ে দিবেন। দিদিমাকে বলবেন যে রবিবার দিন অরুর একটি মেয়ে হয়েছে তারা সকলে ভাল আছে। আর তাঁকে বলবেন যে এখানে আসতে তিনি ওখানে থাকলে সেরে উঠতে পারবেন না। আমার প্রণাম জানিবেন।’    


ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করতেন মার সাথে। মৃণালিনী দেবীকে লেখা কোনো এক চিঠিতে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলেন, ‘মা, তোমার চিঠি কাল পেলুম। নিতুদাদার কাছে প্রায়ই যাই। বোলপুর থেকে তেল, কদমা, খেলনা কিনে এনেছি। ওল পেলুম না। আজ সার্কাস দেখতে যাব। কাল বিসর্জন হবে। কাল দেখতে যাব বলে আজ সেটা পড়ে রাখলুম। শুক্রবারে সব জিনিস কিনতে যাব। শনিবারে বিবিদিদির জন্মদিন। বেলা যদি কিছু দেয় ও শীঘ্র পাঠিয়ে দিক। নীদ্দার কাল রাত্তিরে ঘাম হয়ে জ্বর ছেড়ে গিয়েছিল। আজ সকালে ১০০। অন্যদিন ১০১ হয়। প্রতাপবাবুই দেখছেন। আজ সুহৃদকে দিয়ে examine করবার কথা ছিল। তিনি এখন আসেননি। সাহেব কাল যাবে। সুশী বৌঠান চিঠি লেখেননা কেন ? তাঁর উকুন হয়েছে বলে বোধ হয় খুব ব্যস্ত থাকেন তাই লেখা হয় না। আমরা সব ভাল। তোমরা কেমন আছ লিখ ?’        


হেমলতা দেবী, মৃণালিনী দেবীর অনাড়ম্বরপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘কবিপত্নী স্বভাবত অতিরিক্ত সাজসজ্জার আদৌ অনুরাগী ছিলেন না, গয়না পড়তেন নিতান্ত সামান্য। বড় ঘরের বৌ তাঁর তুলনায় তিনি সাধারণ বেশেই থাকতে ভালোবাসতেন। উপরন্ত কবির রুচির প্রভাব তাঁকে আরও সাদাসিধে করে তুলেছিল। বিলাস বর্জন উপকরণ বর্জন একমাত্র বুলি ছিল সে সময় কবির, মুখে মেয়েদের কৃত্রিম উপায় অবলম্বনে রূপসৃষ্টি, চোখ ধাঁধানো রঙ বেরঙের প্রজাপতি প্যাটানে সাজসজ্জা ও অলঙ্কার বহুলতার আড়ম্বরের প্রতি ধিক্কার দিতেন। রবীন্দ্রনাথ তখন প্রতি কথায় বলতেন, অসভ্য দেশের মানুষরাই মুখ চিত্তির করে। মুখে রঙ মেখে মেয়েরা  কি অসভ্য দেশের মানুষ সাজতে চায়। আমাদের ধরাধরিতে একদিন কবিপত্নী কানে দুটো দুল ঝোলানো বীরবৌলি পরেছিলেন, হঠাৎ কবি আসে পড়েন সেই ঘরে, কবির প্রবেশ মাত্র লজ্জা পেয়ে  তিনি দুই কানে দুই হাত চাপ দিলেন। টানাটানি করে আমরা হাত নামাতে পারলাম না কিছুতেই। তিনি এত কম গয়না ব্যবহার করতেন যে দুটি বীরবৌলি কানে পরেই লজ্জা পেলেন খুব বেশি। সমবয়সী বৌদের সাজতে বলতেন কিন্তু নিজে সাজবেন না এই ছিল তার প্রতিজ্ঞা।’ তাই আবার দেখতে পাই ঊর্মিলা দাশ যখন বলেন, ‘কবির একটা দোষ ছিল,  সিঁড়ি থেকে সুউচ্চ কণ্ঠে ছোট বৌ ছোট বৌ করে ডাকতে ডাকতে উঠতেন। আমার ভারি মজা লাগত শুনে, তাই বোধ হয় আজও মনে হয়।’


মৃণালিনী দেবী কেবল মাত্র যে, রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তা কিন্তু নয়। স্বামীর খাবার-দাবারের প্রতি তাঁর ছিল কড়া নজর। লেখার ঝোঁক চাপলে রবীন্দ্রনাথ খাওয়া-দাওয়া এক প্রকার ছেড়েই দিতেন। এই নিয়ে খুব রাগা-রাগি করতেন কবি পত্নী; কিন্তু তাতে কোন ফল হত না। হেমলতা দেবী, এ-সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে রবীন্দ্রনাথের স্বল্পাহার মাঝে মাঝে কবি পত্নীকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিত। বাড়াবাড়ি দেখে যখন আত্মীয়স্বজনরা মৃণালিনী দেবীর কাছে উৎকণ্ঠা  প্রকাশ করতেন তখন কবি পত্নী বলতেন, ‘তোমরা চেন না, বললে জেদ আরও বাড়বে, না খেয়ে দুর্বল হয়ে সিঁড়ি উঠতে মাথা ঘুরে পড়ুক আগে তারপর নিজেই শিখবেন। কারো শেখানো কথা শুনবার মানুষ তো উনি নন।’ মৃণালিনী দেবীর এই কথা সত্য পরিণত হয়েছিল।


পরবর্তীকালে; শিলাইদহ বাসের কিছু-কিছু স্মৃতি কবি কন্যা বেলার, রবীন্দ্রনাথকে লিখিত চিঠিপত্রে, মৃণালিনী দেবী ও প্রিয়নাথ সেনকে লিখিত কবির চিঠিতে, আশ্রমের রূপ ও বিকাশে, মীরা  দেবী ও রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায়, ছোট গল্পে, উপন্যাস ও ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের বহু কবিতায়; যা মোহিতচন্দ্র সেন সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থে ‘লীলা’ নামে তিকাল; যা পরবর্তীকালে কবি শিলাইদহকে লীলালোকের লীলাক্ষেত্র বলে পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারিতে উল্লেখ করেছেন। এ-সম্পর্কে রথীন্দ্রনাথ আবার বলেন, ‘শিলাইদহে আমরা যে পরিবেশের মধ্যে এসে বাস করতে লাগলাম, কলিকাতার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনধারার থেকে  তা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের বাড়ি খোলা মাঠের মধ্যে, খরসেদপুর গ্রাম, কাছারি বাড়ি বা শিলাইদহের ঘাট থেকে বেশ খানিকটা তফাতে। বাবা-মা, ও আমরা পাঁচ ভাইবোন বাড়িতে থাকি। আমার ছোট বোন রানী ও মীরা আর ছোট ভাই শমী তখন নিতান্ত শিশু। এই নির্জনতার মধ্যে দিদি আর আমি, বাবা-মাকে যেন আরও কাছাকাছি পেলুম। বাবা তখন আমাদের দুজনকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য বিশেষভাবে মনোযোগ দিলেন।’ কুঠিবাড়িতে, রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনী দেবীর পারিবারিক জীবনের সন্ধ্যাবেলাটি কিভাবে কাটাতেন, তারই একটা দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মার্কটোয়েনের অনুরাগিণী ছিলেন মৃণালিনী দেবী। তাই রবীন্দ্রনাথ, প্রিয়নাথ সেনকে চয়েস ওয়ারকস অব মার্কটোয়েন ও মার্কটোয়েনস লাইব্রেরী অব হিউমার বই দু’খানি পাঠিয়ে দেবার জন্য শিলাইদহ থেকে চিঠি লিখেছেন, ‘কেননা সায়াহ্নে পরিজন মণ্ডলীকে চতুর্দিকে আকৃষ্ট করে দীপালোকে একটা কিছু পড়ে শোনাতে হয়। পরীক্ষা করে দেখলুম মার্কটোয়েনের হাস্যরস আমার আপাত্য কলত্রের কাছে  সর্বাপেক্ষা কৌতুকজনক বোধ হয়- বিশেষতঃ বেলা ও বেলার মা অত্যন্ত আমোদ পান।’ গৃহসক্ত কবি ১০ আগস্ট, ১৯০০ সালে প্রিয়নাথ সেনকে শিলাইদহ থেকে নিজের সম্বন্ধে পরিহাস করে লিখলেন-‘শিলাইদহের ঘাটে যখন ফিরলেম তখন চতুর্দশীর চাঁদ মধ্য গগনে। আমার সেই জ্যোৎস্নাজড়িত নদীটি স্মিত বিষণ্ণ হাস্যে বললেন, আমাদের সেই কলহংসমুখর নির্জন বালুতটে  বহু শরতের মৌন মিলন সুখ। একেবারে বিস্মৃত হয়ে তুমি এখন ডাঙার মথুরায় রাজত্ব করতে গেছ ! আমি তার একটি অক্ষর জবাব দিতে পারলুম না-একেবারে নির্বোধের মত নিঃশব্দে চৌকিটিতে বসে রইলুম।’ অপর আর এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘এখন ঘরের দিকে মন টানিতেছে এখন সকল রকমেরই দোকানপাট বন্ধ করিয়া বাড়ি পৌছাতে পারলে বাঁচি, সেখানকার সন্ধ্যাদীপশিখা কেবলি চোখে পরিতেছে।’ তাই ‘ক্ষণিকা’র সমাপ্তি কবিতায় লিখেছেন-‘তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ আলোকে তুমি আর আমি একা।’ অর্থাৎ, শেষ যৌবনে তাঁরা জোড়াসাঁকোর বৃহৎ পরিবারের বাইরে শিলাইদহে এসে দু’জনে একা হলেন। আবার কলকাতার জনবহুল পথে গাড়ির মধ্যে বসে দূর শিলাইদহের কথা ভাবেন, কবি পত্নী-পুত্র-কন্যার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন, তখন চিঠিতে লেখেন-‘বিকেলের দিকে যখন শরীরটা শ্রান্ত হয়ে আসে তখন স্বভাবতই তোমাদের দিকে মনটা চলে যায়-তখন গাড়ি হয়তো কলকাতার জনারণ্যের মধ্যে ছুটছে আর আমার চিন্তা শিলাইদহের ঘর ক’খানার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ কবি কন্যা বেলার চিঠিতে শিলাইদহ থেকে মৃণালিনী দেবী, দিদিমা দাক্ষায়ণী দেবী ও ভাইবোনদের বহুকথা রবীন্দ্রনাথকে জানাতেন। তাঁর চিঠিতে শিলাইদহের সাংসারিক জীবনের বহু তথ্য পাওয়া যায়। ভাসুর পুত্র নীতীন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথ, মৃণালিনী দেবীর খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁরাও মাঝে মাঝে কাকীমার কাছে শিলাইদহে এসে থাকতেন সে কথাও বেলার চিঠিতে জানা যায়। তাছাড়াও শিলাইদহে থাকাকালীন বলেন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ‘বলাই’ গল্পটি রচনা করেন। এই শিলাইদহে বাসকালে কবি মেয়েদের জন্য নদীর ধারে একটি স্নানাগার নির্মাণ করেছিলেন; যেখানে তাঁরা ঘাটে বসে গল্পও করতে পারতেন, আবার স্নানও করতে পারতেন। এই স্নানাগারের কথা রথীন্দ্রনাথ ও মীরা দেবীর স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী তাঁর স্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কয়েকটি বিশেষ জায়গার সঙ্গে রবিকাকার তখনকার কালের গান রচনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একবার দার্জিলিঙ বেড়াতে গিয়ে এক ঝাঁক গান নিয়ে এলেন, ‘বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে’ ইত্যাদি। আবার দেখা যায় শিলাইদহের বোটে বসে হয়তো আর এক ঝাঁক গান রচনা করলেন।’ এই সংগীত, বিশেষভাবে প্রেমনির্ভর সংগীতগুলো তিনি রচনা করেছেন স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর উদ্দেশ্যে। এই হিসেবে দেখা যায়, কবি কেন মহাকাব্যের পরিবর্তে গান লিখে বিশ্ববাসীর ‘ক্ষতিপূরণ’ (ক্ষণিকা-১৩০৭ বঙ্গাব্দ) করে দিলেন। সেই কথাটাও ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘ক্ষতিপূরণ’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন। নগেন্দ্র গুপ্ত ‘প্রবাসী’তে বঙ্কিমচন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র (১২৯১ বঙ্গাব্দ/ ভাদ্র-আশ্বিন) কবিকে মহাকাব্য লিখিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।’ কবিরও মনে মনে মহাকাব্য রচনা করবার সংকল্প ছিল। কিন্তু হরিণনয়না নারীর কাঁকনের মাধুর্যময় শব্দের চিত্রটি কবির কল্পনাকে বিনাশ করে  মহাকাব্যের পরিবর্তে হাজার গানে রূপান্তরিত করে দিল। প্রথম যৌবনে রবীন্দ্রনাথের গানের আসর বসত পার্ক ষ্ট্রীটের  সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে। সেই সময় ইন্দিরা দেবী ছিলেন তাঁর গান সংরক্ষণকারী ও উৎসাহ দেওয়া একমাত্র নারী। [মঙ্গল গীত-কড়ি ও কোমল, য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি, পৃষ্ঠা ৪৪৩]। কিন্তু আবার যদি ফিরে তাকাই দেখতে পাব, ১৮৯৬ সালে ব্যবসায়ে লোকসানের দরুন আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে কবির যখন গানের আসর ভেঙে গেল, (গীতহীন-চৈতালি, চৈত্র ১০-১৩০২); তখন জোড়াসাঁকোর বাড়ির তেতলার ছাদে ও শিলাইদহের  বোটে নতুন করে অমলা দাশ, মৃণালিনী দেবী ও অন্যান্যদের নিয়ে কবির নিভৃত গানের আসর গ’ড়ে উঠল। পুত্র রথীন্দ্রনাথ এ-সম্বন্ধে পিতৃস্মৃতিতে লিখেছেন, ‘ সন্ধ্যা হতে ছাদের মজলিসে দাদাদের সঙ্গে বাবাও এসে কখনো কখনো বসতেন। তখন গান জমে উঠত। বাবাই বেশি গাইতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেয়ে যেতে তাঁর শ্রান্তি বোধ হত না। মাঝে মাঝে দিদিদের গাইতে বলতেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি ছিল সেজ জ্যাঠামহাশয়ের ছোট মেয়ে অভিদির গলা। বাবার খুব আশা ছিল বড় হয়ে তিনি অপূর্ব গাইয়ে হবেন। কিন্তু বাবার আশা পূর্ণ হল না, অল্প বয়সেই অভিদির মৃত্যু হয়। কত রকম গানই না হত সেই ছাদের উপরে। গানের এর চেয়ে উপযোগী পরিবেশ বা মিলবে কোথায়। এক প্রাচীন শিশুগাছ ছাদ ছাড়িয়ে উঠেছে। দিনান্তে বসন্তের মৃদু বাতাস থেকে থেকে কেঁপে উঠছে তাঁর কচি পাতা। চাদের ঝাপসা আলো অপূর্ব মায়াজাল বিস্তার করছে সেই সন্ধ্যা আসরে। হঠাৎ কবি গেয়ে উঠলেন- ‘চিত্ত পিপাসিত রে/ গীত সুধার তরে।’ গানের ফোয়ারা খুলে গেল। কখনো বা ইমনের মিঠে সুরে ধরলেন- ‘তুমি আমারি, তুমি আমারি/ মম অসীম-গগন-বিহারী কবি গানের পর গান গেয়ে চলেছেন। গানের সুরধনী নেমে এল  আমাদের জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদের উপর। প্রতিদিনই এই রকম গান চলত। কত রাত পর্যন্ত তা আমরা শিশুরা জানতে পেতুম না, গানের আসর ভাঙবার অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়তুম।


এই সময় নতুন গান বাঁধবার জন্য বাবাকে উৎসাহিত করেছিলেন অমলাদিদি, চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী। মায়ের সঙ্গে তাঁর খুব ভাব হয়েছিল। অমলাদিদিকে মা এত স্নেহ করতেন যে আমাদের বাড়িতে নিজের কাছে এনে রাখলেন। তাঁর গান গাইবার ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে বাবা তাকে রাধিকা গোস্বামীর কাছে হিন্দি গান শিখতে দিলেন। অল্পদিনেই ওস্তাদি অনেক গান শিখে দিলেন। অমলাদিদির গলা যেমন অনায়াসে খাদে খেলত তেমনি চড়াতে উঠত। তাঁর গলার উপযোগী গান বাবা রচনা করতে লাগলেন। অমলাদিদি গাইবেন বলে যে গানগুলি তখন বাঁধা হয়েছিল তার মধ্যে একটা দুটো মনে পড়ে, যেমন- চিরসখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না। এ পরবাসে রবে কে হায়...। কে বসিলে আজি হৃদয়াসনে ভুবনেশ্বর প্রভু। আমার অনুমান এই গানগুলির সুর রাধিকাবাবুর কাছ থেকে বাবা নিয়েছিলেন। অমলাদিদি আসবার পর সান্ধা মজলিশে তাঁকেই বেশি গাইতে হত। কবি প্রিয়াতে ঊর্মিলা দেবী লিখেছেন-‘তখনকার দিনে তিনি গান রচনা করতেন একেবারে সুর কথা একসঙ্গে। বড় বারান্দায় পায়চারি করতে করতে যেই শেষ হল অমনি চিৎকার আরম্ভ করলেন, অমলা ও অমলা, শীগগির এসে শিখে নাও, এক্ষুনি ভুলে জাব কিন্তু। কবি প্রিয়া হাসতেন খুব, এমন মানুষ আর কখনো দেখেছ, অমলা, নিজের দেওয়া সুর নিজে ভুলে যায় ? কবি অমনি বলতেন’ অসাধারণ মানুষের সবই অসাধারণ হয় ছোট বৌ চিনলে না তো ?’                                                                                                              


আবার রথীন্দ্রনাথের ‘পিতৃস্মৃতি’তে শিলাইদহের বোটে কবির নিভৃতে গানের আসর সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘লেখার ফাঁকে ফাঁকে যখন বাবাকে গানে পেয়ে বসত অমলাদিদিকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন। দিনের বেলায় অমলাদিদি মাগের সঙ্গে রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সন্ধে হলেই, অন্য সব কাজ ফেলে গান শোনবার জন্য সবাই সমবেত হতেন। মাঝিরা জালি বোটটা বজরার গায়ে বেঁধে দিয়ে যেত। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে জানালা দিয়ে টপকে সেই বোটটাতে গিয়ে বসতুম। সুরেনদাদার  হাতে এসরাজ থাকত। জালি বোট খুলে মাঝদরিয়ায় নিয়ে গিয়ে নোঙর ফেলে রাখা হত। তার পর শুরু হত গান-পালা  করে বাবা ও অমলাদিদি গানের পর গান গাইতে থাকতেন। আকাশের সীমান্ত পর্যন্ত অবারিত জলরাশি, গানের সুরগুলি তার উপর দিয়ে ঢেউ খেলিয়ে গিয়ে কোন সুদুরে যেন মিলিয়ে যেত, আবার ওপারের গাছগুলোর ধাক্কা খেয়ে তার মৃদু প্রতিধ্বনি আমাদের কাছে ফিরে আস্ত। ক্রমে রাত্রি গভীর হলে চারিদিকে নিঝুম হয়ে আসত। নৌকা চলাচল তখন বন্ধ। বোটের গায়ে থেকে থেকে ঢেউগুলি আশে লাগছে এবং কুলকুল শব্দ করে স্রোতের  সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলো পড়ে নদীর জল কোথাও ঝিকিমিকি করে ওঠে। কখনো দু-একটা জেলে ভিঙ্গিয়ে মাঝিরা ভাটিয়ালি সুরে দাঁড় ফেলার তালে তালে গান গাইতে গাইতে চলে যায়। গানের আসর ভাঙবার আগেই আমি মা’র কোলে ঘুমিয়ে পড়তুম। সে সব রাত আজ  স্বপ্নের মত মনে হয়, কিন্তু আজও যখন- ‘বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে।’ ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’, ‘তুমি আমার সাধের সাধনা’, প্রভৃতি গান শুনি, সেই সব রাত্রির কথা মনে পড়ে যায়- যে রাত্রে গানের সুর জলের কলধ্বনি ও ফুরফুরে দক্ষিণের হাওয়ার সঙ্গে এক হয়ে যেত, যে রাত্রে চাঁদের আলোর বন্যায় নদীর জলে ও নদীর চরে অপূর্ব এক ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করত। গানের এমন মনোরম পরিবেশ আর কোথাও পাওয়া যাবে ?’


কবিও তার লীলালোকের লীলাক্ষেত্র পদ্মার ধারে শিলাইদহে থাকাকালীন, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত মোহময়ী রাত্রিতে পদ্মানদীর মাঝ দরিয়ায়র বোটে বসে নিভৃতে গানের আসরে; যৌবনের সংসার সঙ্গিনীকে যে গান শোনাতেন, সেই সব রাত্রির আসরের সঙ্গিনীদের উদ্দেশ্য পরবর্তীকালে নিঃসঙ্গ বিরহী কবি পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারিতে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন- এ কথাটার এতক্ষণ ধরে আলোচনা করছি এই জন্য যে, যে লীলালোকে জীবনযাত্রা শুরু করেছিলুম যে লীলাক্ষেত্র জীবনের প্রথম অংশ অনেকটা কেটে গেল, সেইখানটায় জীবনের উপসংহার করবার উদ্বেগ কিচুকাল থেকেই মনের মধ্যে একটা মন কেমন করার হাওয়া বইচে। একদা পদ্মার ধারে আকাশের পারে সংসারের পথে যারা আমার সঙ্গী ছিল (মৃণালিনী দেবী ও অমলাদাশ) তারা বলছে, সে দিনের পালা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি, বিদায়ের গোধূলি বেলায় সেই আরম্ভের কথাগুলি সাঙ্গ করে যেতে হবে। সেই জন্যই সকালবেলাকার রজনীগন্ধা  হয়ে তার গন্ধের দূত পাঠাচ্ছে। বলছে তোমার খ্যাতি তমাকে না টানুক, তোমার কৃতী তোমাকে না বাঁধুক, তোমার গান তোমাকে পথের পথিক করে তোমাকে শেষ যাত্রার রওনা করে দিক।’ তাই স্মরণ কবিতায় নিঃসঙ্গ বিরহী কবি মৃণালিনী দেবীর উদ্দেশে পরম সত্য কথাটাই লিখেছেন-, ‘দাড়ায়েছ সংগীতের শতদল দলে/মানসসরসী আজি তব পদতলে।’  


উনবিংশ শতাব্দীর শেষ কয়েক বছর পদ্মাতীরে শিলাইদহের নির্জন কুঠিবাড়িতে কবি সপরিবারে বাস করেন এবং এই শিলাইদহ কবিকে অজস্র কাব্য ও গানের প্রেরণা দিয়েছে। এখানেই বাসকালে মৃণালিনী দেবী দুইটি বিষয়ে কবির সাথে আক্মত হতে পারেনি। প্রথমটি সুরেন্দ্রনাথ বলেন্দ্রনাথ সহ কবি যে ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন তাতে মৃণালিনী দেবীর খুব আপত্তি ছিল। কারণ, মৃণালিনী দেবী কবিকে খুব ভালই বুঝতেন যে, রবীন্দ্রনাথের সর্ব বিষয়ে শ্রেষ্ঠতা অর্জন করলেও তিনি কখনোও ‘ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ’ হতে পারবেন না। একদা মৃণালিনী দেবীর এই আশঙ্কা সত্য পরিণত হয়েছিল। হেমলতা দেবী লিখেছেন, ‘অনেক সময় কবি আদর্শের টানে নানা সময়ে নানা ভাবে নিজেকে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে মনে কোন দ্বিধা রাখতেন না। আদর্শপ্রবণতা তাকে কোথায় কখন কোন সংকটে জড়িয়ে ফেলে এ ভাবনা কবিপত্নীর মনে থাকত। কবিও কবির পরিবার অভিন্ন, কবি বিপন্ন হলে পরিবারটিও বিপন্ন হাওয়া স্বাভাবিক।’ শেষ পর্যন্ত কবি এই ব্যবসায়ে লোকসান দিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই সমস্ত ঋণের ভার তিনি একাই বহন করেছিলেন; যদিও কবির এই দায় একার নয়। এই আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে মৃণালিনী দেবীকে সংসার পরিচালনা করতে হত। তা ছাড়া আর্থিক লোকসানের দরুন জোড়াসাঁকোতে আত্মীয়স্বজনেরও অনেক অসন্তোষ মৃণালিনী দেবীকে সহ্য করতে হয়েছিল যার কিছু কিছু আভাস ছিন্নপত্রে কবির চিঠিতে ধরা পড়ে। এই সব পত্রে ক্ষুব্ধ মৃণালিনী দেবীকে চিঠি লিখে কবি সান্তনা দিয়েছেন। ১৮৯৮ সালের জুন মাসের চিঠিতে মৃণালিনী  দেবীকে শান্তচিত্তে সমস্ত ঘটনাকে বরণ করে নেবার উপদেশ দিয়ে পত্নীর মানসিক অশান্তি দূর করবার অভিপ্রায় লিখেছেন। রবীন্দ্র জীবনের এই দুঃসময়ের অলিখিত কাহিনি তিনি চিত্রা, চৈতালি ও কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ‘দুঃসময়’ (চিত্রা, কল্পনা) ব্যাঘাত, স্বর্গ হইতে বিদায়, সান্তনা (চিত্রা), যাত্রী, কাব্য, গীতহীন স্বার্থ, মৌন, বিদায় (চৈতালি), ঝড়ের দিনে ও হতভাগ্যের গানের মধ্যে চিহ্নিত করে বর্ষশেষ করেছেন। কবি সাংসারিক জীবনের দুঃখ, বেদনা, স্বার্থ, দ্বেষ, অশান্তিকে জয় করেছেন প্রেমমন্ত্র দিয়ে উদার মঙ্গল মন্ত্র দিয়ে। চৈতালি কাব্যেয় কবির এই চিন্তাধারা ও আদর্শের সংঘাত যৌবনের বহু কবিতায় ও মৃণালিনী দেবীকে লেখা কবিতায় ধরা পড়ে। ‘চিত্রা’ ও তার পরবর্তী কালে কবির দুঃসময় আরম্ভ হয়ে গেছে। তার জমানো সেই গানের আসর আর নেই। এই দুঃসময়ে কবির পূজারিণী-কল্যাণী ও প্রেয়সী নারীই তো ছিলেন ঋণগ্রস্ত কবির একমাত্র সহায়। ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ কবিতায় কল্যাণী গৃহলক্ষ্মীর উদ্দেশ্যয় লিখেছেন, ‘সুদিনে দুর্দিনে কল্যাণ কঙ্কণ করে,/ সীমন্ত সীমায় মঙ্গল সিন্দুর বিন্দু,/ গৃহলক্ষ্মী দুঃখে সুখে পূর্ণিমার ইন্দু/ সংসারের সমুদ্র শিয়রে।’ কবি আবার লিখেছেন, ‘আমার ঘাড়ে মস্ত দেনা ছিল, সে দেনা সম্পূর্ণ স্বকৃত নয় কিন্তু দায় একলারই। সে সময় অনুমান কড়া হয় এ দেনার পরিমাণ লক্ষ টাকার ও অধিক হবে। অর্থের এত অভাব ছিল যে আজ জগৎব্যাপী দুঃসময়েও কল্পনা করা যায় না, আর সে কথা কোন কালেও তা জানবে না। কোন ইতিহাসেও তা লিখিত হবে না।’ মংপুতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ তোমাদের এখনকার মত আমরা এত বড় মানুষ ছিলাম না। এখন তো তোমাদের দেখি কিছুতেই কুলোয় না। আমার বরাদ্দ ছিল ২০০ কী ২৫০ টাকা, তাই এনে ছোট বউকে দিয়ে দিতুম,ব্যস। তিনি যা খুশি করতেন, সংসার চালাতেন। আমায় সেদিকে কখনো কিছু ভাবতে হত না।’ কবি হঠাৎ ব্যবসা আরম্ভ করলেন কেন ? সেই কারণটাও ‘ছিন্নপত্রে’ লিখে গেছেন। কষ্টই আমাদের আত্মার, আমাদের প্রেমের, আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদের একমাত্র মূল্য। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের এমন সঙ্গতি নেই যে কারও দুঃখ দূর করতে পারি, সেই জন্য টাকা করা কাজটাকে ছোট মনে হয় না। যদি আমাদের এই ব্যবসায়ে কিছু টাকা সংগ্রহ করে উঠতে পারি তা হলে অনেক মনের আক্ষেপ মেটাতে পারব-এই মেটিরিয়াল পৃথিবীতে কেবলমাত্র কামনার দ্বারা ভালোবাসার দ্বারা কারও দুঃখ দূর করা যায় না।’ অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথ মনে মনে এই কামনাই করেছিলেন যে, ব্যবসায়ে কিছু টাকা হলে মৃণালিনী দেবীকে সুখে স্বচ্ছন্দে রাখতে পারবেন, কারণ এই মেটিরিয়াল জগতে কেবলমাত্র কামনার দ্বারা ভালোবাসার দ্বারা তো আর আর্থিক কষ্ট দূর করা যায় না! তাই মৃণালিনী দেবীর আপত্তি সত্ত্বেও টাকা করে তাঁকে সুখী করবার জন্য এই ব্যবসা আরম্ভ করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে মৃণালিনী দেবীকেই সমস্ত ঋণের বোঝা একা আমৃত্যু বহন করে কবিকেই ‘কৃতার্থ’ কবি ‘কৃতজ্ঞ’ (পূরবী) চিত্তে শিলাইদহে লিখলেন, ‘তুমি আছ একা সজল নয়নে/ দাঁড়ায়ে দুয়ার ধরি।/চোখে ঘুম নাই, কথা নাই মুখে,/ ভীত পাখি সম এলে মোর বুকে-/আছে আছে বিধি,/এখনও অনেক/রয়েছে বাকি।/আমারও ভাগ্যে ঘটেনি/সকলি ফাঁকি।’ মৃণালিনী দেবীর প্রবল বিরোধিতার ফলেই শিলাইদহের পরিবর্তে শান্তিনিকেতনে এসে কবি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে লাগলেন। কারণ, কলকাতা থেকে বহু দূরে শিলাইদহে মৃণালিনী দেবীর পক্ষে এবং ছেলেমেয়েদের শিক্ষা বা অন্যান্য অসুবিধার জন্য স্থায়ীভাবে বসবাস করা অত্যন্ত অসুবিধাজনক স্থান। এই কারণে বাস্তববাদী। দৃঢ় চরিত্রের মৃণালিনী দেবী স্থায়ীভাবে শিলাইদহে বাস করতে রাজি হননি। কিন্তু শান্তিনিকেতনে বসবাস করতে তার কোন আপত্তি ছিল না। এবং যথেষ্ট অসুবিধা সত্ত্বেও বহু বাধা বিঘ্ন ও আত্মীয়স্বজনের বিরোধিতা ও বিদ্যালয় সম্পর্কে বিদ্রুপের মধ্যে কবিকে মৃণালিনী দেবী সর্বান্তকরণে বিদ্যালয়ের জন্য সাহায্য করেছিলেন, কারণ তার বিবেচনায় কলকাতার কাছে শান্তিনিকেতনই কবির বিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষে আদর্শ স্থান। মৃণালিনী দেবীর শিলাইদহ বসবাস সম্পর্কে এই বিরোধিতা ও চোখের জলের কাহিনী রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে উল্লেখ্য আছে। মৃণালিনী দেবীর এই মনোভাব ও চরিত্রগত দৃঢ়তার কাছে রবীন্দ্রনাথকে হার মানতে হল। রবীন্দ্রনাথকে বাধ্য হয়ে শিলাইদহ থেকে চলে আসতে হল। কবির উপর অখণ্ড প্রতাপ ছিল মৃণালিনী দেবী। সে কথা রবীন্দ্রনাথের নিজের উক্তিতেই ধরা পড়ে, ‘মেয়েরা পরাধীন হয়েও পুরুষের উপর কর্তৃত্ব করার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে।’ বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে লিখেছেন, ‘বেলা অনেক হল। এখন নাইতে খেতে যাওয়া যাক। নইলে নির্দোষী নিরপরাধী তুমি সুদ্ধু গৃহিণীর বিদ্বেষের ভাগী হবে।’...’তুমি তো আমাকে কলকাতায় যাবার জন্য লিখেচ-আমিও অনেকদিন যাব যাব করছি- কিন্তু প্লেগের ভয়ে গৃহিণী যেতে দিচ্ছে না। আমাদের জোড়াসাঁকো বাড়িতেই দুজন মেথরের প্লেগ হয়েছে, এ-অবস্থায় কোন জরুরী কাজের অজর দেখিয়ে যে ছুটি আমি পাব এমন আশামাত্র নেই। চেষ্টা করে অবশেষে ক্ষান্ত হয়েছি।’ মৃণালিনী দেবীকে উপেক্ষা করার সাহস যে কবির ছিল না তার নিদর্শন ওই চিঠিগুলো এবং কবির প্রিয় শিলাইদহ ছেড়ে শান্তিনিকেতনে বসবাস। মৃণালিনী দেবীর অনমনীয় মনোভাব ও দূরদর্শীতার জন্য আজ শান্তিনিকেতন বিশ্বের দরবারে আপম মহিমায় উজ্জ্বল হ’য়ে রয়েছে আর আমরাও কবির প্রিয় শিলাইদহের পরিবর্তে কলকাতার কাছে শান্তি নিকেতনকে পেলাম আপন করে। ক্ষিতিমোহন সেনকে কবি মৃণালিনী দেবী সম্পর্কে প্রসঙ্গে বলেন, ‘আশ্রমের কাজে আত্মসমর্পণ করব ভাবলাম। তখন আমার আত্মীয়স্বজন সবাই প্রতিকূল। সকলকে এড়িয়ে চলে এলাম শান্তিনিকেতনে। সঙ্গে এল দৈন্য ও অর্থাভাব। সেবা ও উপযুক্ত পথ্যের অভাবে আমরা অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমার পত্নী তখন তার গায়ের গয়না বিক্রয় করা অর্থ নিয়ে এখানে এলেন ও ঐকান্তিক সেবায় আমাদের সারিয়ে তুললেন। কিন্তু কয়েকদিন পড়ে তিনি মারা গেলেন। আশ্রমের জন্য এই প্রথম বলি। নারীর এই বলিকে একদিন স্বীকার করতেই হবে। কাজেই এই দাবি একদিন এখানে স্বীকৃত হবেই। হয়তো একদিন নারীদের জন্যই এই আশ্রম উৎসর্গীকৃত হবে।’ কবি এই কথা কবিতার মধ্যে প্রকাশ করেছেন এইভাবে, ‘বধূ যেমন সত্য করে আপনাকে,/সত্য করে জানায়,/যখন প্রাণে জাগে তার প্রেম,/যখন দুঃখকে পারে সে গলার হার করতে/যখন দৈন্যকে দেয় সে মহিমা,/যখন মৃত্যুতে ঘটে না তার অসমাপ্তি।’ অর্থাৎ, কবি এই বলে আশা করেছিলেন যে, মৃণালিনী দেবীকে দেশবাসী যথার্থ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে শান্তিনিকেতনে নারীদের উদ্দেশেই উৎসর্গীকৃত হবেন। কবির উপর যেমন অখণ্ড প্রতাপ ছিল মৃণালিনী দেবীর, ঠিক তেমনি ছিল শ্বশুর দেবেন্দ্রনাথের প্রতি অপরিসীম ভক্তি ও শ্রদ্ধা যা তার জীবন পথের আলো হয়ে তাঁকে পথ দেখিয়ে দিত। মহর্ষিদেবেরও এই ছোট পুত্রবধূটির প্রতি স্নেহের অন্ত ছিল না। যুবক রবীন্দ্রনাথের কোন কাজ মৃণালিনী দেবীর অপছন্দ হ’লে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আদর্শ এবং তার অপছন্দের কথা ব’লে রবীন্দ্রনাথকে সেই কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করতেন। রবীন্দ্রনাথও পত্নীকে বেশ সমীহ করতেন। ব্যক্তিগতভাবে মৃণালিনী দেবী ছিলেন কল্পনাপ্রবণ, ধীরস্থির এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ। ঠিক যেন রবীন্দ্রচরিত্রের বিপরীতমুখী মানুষ ছিলেন মৃণালিনী দেবী। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যেয় মৃণালিনী দেবীকে ‘অচেনা’ (ক্ষণিকা, ছিন্নপত্র ১৩০) বা বিদেশিনী নারী বলে সম্বোধন করে দুইজনের চরিত্রগত প্রভেদ ক’রে তার কথা   লিখে গেছেন বৈচিত্র্যময় ভাষায়। চিঠিপত্রের মাধ্যমে রোম্যান্টিক প্রেমিক রবীন্দ্রনাথকে যেন খুঁজে পাওয়া যায়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে রাগ-অনুরাগ, ভালোবাসা, মান-অভিমানের অজস্র পরিচয় যেন ফুটে উঠে চিঠি পত্রের পাতায় পাতায়। শুধু চিঠিপত্রে  কেন তিনি যে রোম্যান্টিক ছিলেন মৃণালিনীর উদ্দেশে লিখিত কবিতাগুলির মধ্যেও তার নিদর্শন রয়েছে। কবির মনে এই রোমান্সের ছোঁয়া আছে বলেই আপন পরিবারের বাইরে গেলে কবি তাঁর পত্নীর চিঠির জন্য ব্যাকুল হ’য়ে ওঠেন। বিবাহের ন’বছর পরে, ১৮৯২ সালে সাহাজাদপুর থেকে কবি মৃণালিনী দেবীকে লিখেছেন, ‘তোমাদের মত এতো অকৃতজ্ঞ আমি দেখি নি। পাছে তোমাদের চিঠি পেতে একদিন দেরি হয় বলে কোথাও যাত্রা করবার সময় আমি একদিনে উপরি উপরি তিনটি চিঠি লিখেছি। তুমি যদি হপ্তায় নিয়মিত দু’খানা করে চিঠিও লিখতে তাহলেও আমি যথেষ্ট পুরস্কার জ্ঞান করতুম।’ বিয়ের সতের বছর পরও কবির হৃদয়ে সেই একই ব্যাকুলতা। তার চিঠির মধ্যে কবির ছিল নীরব আসক্তি। যৌবনে, রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী দেবীর চিঠির জন্য কেন উন্মুখ হয়ে থাকতেন তা ‘কড়ি ও কোমল’-এর ‘বিরহীর পত্রে’ ও ‘ছিন্ন পত্রে’ প্রকাশ ক’রে গেছেন। স্বপ্ন প্রিয় মানুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু স্বপ্ন দেখতেন খুবই কম। একবার মাত্র কাদম্বরী দেবীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তা আবার প্রকাশ করেছেন মৃণালিনী দেবীর কাছে। মৃণালিনী দেবী তা আবার শুনতে চান অনেক আগ্রহ নিয়ে। মৃণালিনী দেবীর চিঠির মধ্যে কবি খুঁজে পেতেন অসামান্য সুখ। তাই অপেক্ষায় থাকতেন তার চিঠির জন্য। আর সেই চিঠি না পেলে রবীন্দ্রনাথ অস্থির বোধ করতেন। কখনো কখনো দেখতেন দুঃস্বপ্ন। সেই সব স্বপ্নের কথা য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি, ছিন্নপত্র ও বিভিন্ন চিঠিপত্রে লিখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই সব স্বপ্নের কথা উল্লেখ্ করেছেন বাইশ সংখ্যক চিঠিতে, মৃণালিনী দেবীকে লিখেছেন, ‘কাল রাত্রে সমস্ত রাত ধরে স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি আমার উপর রাগ করে আছ এবং কি সব নিয়ে আমাকে বকচ। যখন স্বপ্ন বই নয় তখন সুস্বপ্ন দেখলেই হয়-সংসারে জাগ্রত অবস্থায় সত্যকার ঝঞ্জাট বহন করে এনে তাহলে তো আর পারা যায় না। সেই স্বপ্নের রেশ নিয়ে আজ সকালেও মনটা কি রকম খারাপ হয়েছিল।’ মৃণালিনী দেবীর চরিত্রের মধ্যে এমন একটা শক্তি ছিল যা রবীন্দ্রনাথ কখনো অবহেলা করতে পারেননি। আবার কখনো দেখা গিয়েছে তাঁর মধ্যে এমন একটা আবেগহীনতা ছিল যা রবীন্দ্রনাথকে পীড়িত করত। মৃণালিনী দেবীর আবেগহীনতা অনেকটা তাঁর অভিমানের জন্য তৈরি ছিল। মৃণালিনী দেবীর অভিমানের জন্যই তাঁর যৌবন কাহিনী বা ঘটনা রচনা করে কবির জীবনকে সার্থক করতে পারেননি। শুধুই তিনি লিখে গেছেন, তাই রবীন্দ্রনাথ চিরকালের জন্য আমাদের কাছে অজানা হয়েই রইলেন। রবীন্দ্রনাথ আবার যখন বলেন, ‘মৃত্যুর গ্রন্থি থেকে ছিনিয়ে ছিনিয়ে/ যে উদ্ধার করে জীবনকে/ সেই রুদ্র মানবের আত্মপরিচয়ে বঞ্চিত/ ক্ষীণ পাণ্ডুর আমি/ অপরিস্ফুটতার অসম্মান নিয়ে যাচ্ছি চলে।’ মৃণালিনী দেবী ছিলেন ধীর, স্থির, গম্ভীর ও দৃঢ় চরিত্রের নারী। এই দৃঢ় চরিত্রের জন্যই কবিকে শিলাইদহ বসবাসের পরিবর্তে শান্তিনিকেতনে বাস করতে হয়েছিল। মৃণালিনী অনেকটা মৃদুভাষী ছিলেন। কারণ হিসেবে দেখা যায়, মৃণালিনী দেবী বিয়ের পরও অনেকদিন কম কথা বলতেন; এবং যতটুকু বলতেন তার বেশির ভাগই চোখের ভাষা দিয়েই বোঝানোর চেষ্টা করতেন। তাই রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এই ব্যাপারটি তিনি বলেন, ‘ভাষা যার জানা ছিল নাকো/ আঁখি যার কয়েছিল কথা/’। এই কথাগুলো রবীন্দ্রনাথ বহুবার উচ্চারণ করেছেন মৃণালিনী দেবী সম্পর্কে; এবং বিশেষত লিখে গেছেন মানসীর মৌন ভাষা, পরিশেষের অন্তর্হিতা ও শেষ লেখা পাঁচ সংখ্যক কবিতায়। সর্বোপরি, তিনি কোনদিনই গাঠছড়ার বাঁধন দিয়ে, বিবাহিত জীবনের অধিকার দাবি করে কবিকে সংসারের মধ্যে আটকে রাখেননি। এ-সম্পর্কে মনে পড়ে  রবীন্দ্রনাথের ‘আপনার অধিকার নীরবে নির্মম করে/রেখেছিলে সংসারে সবার পশ্চাতে হেলা ভরে।’ চলমান এই সংসারে গুরুভার খুব অল্প বয়স থেকেই একাই বহন করে ঋণভারে জর্জরিত কবিকে সাংসারিক চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে রেখেছিলেন পত্নী মৃণালিনী দেবী। কবির এই স্বাধীন চিন্তায় সাহায্য করেছিলেন মৃণালিনী দেবী; এ-ব্যাপার থেকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। রবীন্দ্রনাথের এই চলমান চিন্তাকে কখনো ম্লান হ’তে দেননি মৃণালিনী দেবী। তাই এই স্বাধীনতা কবিকে সাধ্যাতীত ভাবে মুক্ত করে রেখেছিল। এ-কথা রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধার সঙ্গে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘রথীদের পড়াতে গিয়েই তো শান্তিনিকেতনের শুরু হল। তখন অবশ্য তিনি ছিলেন এবং যোগও  দিয়েছিলেন আমার কাজে। এখনকার ছেলেমেয়েদের মত আমরা তত খুঁতখুঁতে ছিলুম না। আধুনিক ভাবে আমাদের বিবাহ হয়নি তো, তাতে কিছুই আসে যায়নি। একটা গভীর শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল।’ রবীন্দ্র রচিত সাহিত্যেয় এই বিশেষ চিত্রটি পাওয়া যায় ক্ষণে-ক্ষণে; যার মধ্যে পাওয়া যাবে মৃণালিনী দেবীর রূপ ও চরিত্রের প্রতিফলন। মৃণালিনী দেবীর অনমনীয় মনোভাবের ফলে বাধ্য হ’য়ে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের পরিবর্তে  জোড়াসাঁকোতে ফিরে আসেন। এ-ছাড়াও এই ফিরে আসার আর একটি কারণ ছিল, প্রথমা কন্যা বেলার বিবাহের কথা হচ্ছিল। পরে শান্তিনিকেতনে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। জোড়াসাঁকোতে বসবাসকালীন সময়ে ১৯০১ সালের ১৫ই জুন তিনি বেলার বিবাহ দেন। এবং এর কিছু পরে ১৯০১ সালের ৯ আগস্ট; রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় কন্যা রেণুকারও বিবাহ ঠিক করেন। যদিও এগারো বছরের রেণুকার বিবাহে মৃণালিনী দেবীর খুব বেশি আগ্রহ ছিল না; তবুও তিনি রবীন্দ্রনাথের কথায় সায় দিয়ে তিনদিনের মধ্যেয় রেণুকার বিবাহ ঠিক করেন। বেলার চিঠির মধ্যে দিয়ে জানতে পারি যে, তখনকার দিনের বিখ্যাত চিত্রকর শশীকুমার সেনের বিদেশিনী পত্নীর সঙ্গে মৃণালিনী দেবী সাক্ষাৎ করেছিলেন, এবং সাথে বেলাও তখন উপস্থিত ছিলেন। এই সময় ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ হয়, এবং তারই উৎসাহে গোটা কয়েক ছাত্র নিয়ে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। শিলাইদহে কবি যে আদর্শ নিয়ে বিদ্যালয়ের সূত্রপাত করেছিলেন; এই আশ্রম তারই পূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মহর্ষি পরিবারের মধ্য সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যেমন সম্পর্ক ছিল, তেমনি দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ পরিবারের মৃণালিনী দেবীর সম্পর্ক ছিল বেশ চমৎকার। এই ব্যাপারটি মৃণালিনী দেবীকে বেশ আনন্দ দেয়। তাঁর এই আনন্দ সুকুমার হালদারকে লেখা চিঠিতে প্রকাশ পায় এভাবে, ‘কারণ সুশীলা, সুধী, কৃতী, দিনু, নলিনী এখানে আছে, আমাদের দলটি বেশ জমেছে। আবার প্রিয় বান্ধবী অমলা দাশকে  খুব আনন্দের সঙ্গে তাঁর আশ্রয় দেখে যেতে চিঠি লিখলেন, ‘অমলা আমার আশ্রয় একবার দেখে যেও’। অমলা দাশ উত্তরে লিখলেন, ‘দেখব বই কি, আপনার আশ্রমে আমার জন্য একটু স্থান রাখবেন কি ? যদি কোনদিন অন্য কোনখানে স্থান না পাই আপনার কাছে যাব।’ মৃণালিনী দেবী বান্ধবিকে লিখলেন, ‘তুমি কখনো বিশ্বাস কর আমার কাছে  তোমার স্থান হবে না ? মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুতে অমলা দাশের সেই স্বপ্ন চিরদিনের জন্য ভেঙে গেল। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছু পূর্বে একবার রবীন্দ্র- মৃণালিনী আর দ্বিজেন্দ্র- হেমলতার যৌথ সংসার গড়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনের কুঠি বাড়িতে। হেমলতা দেবী সেই ঘটনা সম্পর্কে লিখলেন, ‘গৃহস্থলীর ভার থাকত কবি পত্নীর হাতে, আর গৃহকর্মে সাহায্য করার ভার আমার। সংসারেরে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ, ব্যয়ের হিসাব রাখার ভার আমার স্বামীর। খাওয়া হত চমৎকার, কবি পত্নীর রান্নার ও মিষ্টান্নাদি  প্রস্তুতের বিরাম ছিল না একদিন। কবি থেকে থেকে পত্নীকে বলতেন, নীচে বসে লিখতে লিখতে রোজ শুনি, চাই ঘি, চাই সুজি, চিনি চিড়ে ময়দা মিষ্টি তৈরি হবে। যত চাচ্ছ তত পাচ্ছ, মজা হয়েছে খুব। আমার স্বামীর নাম করে বলতেন’ সে তো কখনো বলবে না। যত চাইবে ততই দেবে। তাঁর মত কর্তা আর তোমার মত গিন্নি হলেই হয়েছে আর কি, দুদিনেই ফতুর।’ কবি পত্নী ভাশুর পুত্রের নাম করে বলতেন, ‘সে সংসার বোঝে, তাঁর সঙ্গে কাজ করে সুখ, তোমার এদিকে নজর দেওয়া কেন।’ কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী, শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন মৃণালিনী দেবী কিভাবে তাঁর পিসিমাকে নিয়ে সন্ধ্যাকালীন অবসর কাটাতেন তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘আর একটা ছবি মনে পড়ে। শান্তিনিকেতনের দোতলায় গাড়ীবারান্দার ছাতে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। মার হাতে একটা ইংরেজি নভেল। তাঁর থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিদিমাকে পড়ে শুনাচ্ছেন। মার  চোখ মুখ স্পষ্ট কিছু মনে নেই, শুধু একটা অবয়ব। গল্প শোনার লোভে বোধ হয় তাঁদের গল্পের আসরে কখনো গিয়ে বসেছি। তাই বইটার একটা মেয়ের নাম কি করে যে মনের মধ্যে গেঁথে থেকে গিয়েছিল খুব আশ্চর্য লাগে। আমার যখন ইস্টলিনের  রোমান্সে আকৃষ্ট হবার বয়স নয়, তবু বোধহয় মার গল্প বলার ধরণে তাঁর কণ্ঠস্বরে যে বেদনা ফুটে উঠত তাতে আমার তখনকার শিশুমনে একটা অজানা বেদনার ছাপ রেখে গিয়েছিল। তাই Barbara নামটা মনে ছিল।’ রবীন্দ্রনাথ মংপুতে বলেছেন, ‘প্রথম যখন শান্তিনিকেতন হল তখন তো অন্যরকমই ছিল। তখন আতিথ্যর আয়োজন অনেক সামান্য ছিল। কিন্তু সে ছিল হৃদয়ের আতিথ্য। আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাঁদের মোট ঘাড়ে করে আনত।’  


রবীন্দ্রনাথের সাথে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় গ’ড়ে তুলতে হাত মেলালেন মৃণালিনী দেবী নিজেও। রবীন্দ্রনাথের এই বিদ্যালয় নিয়ে নিজের বাড়ির লোকদের থেকে অনেক বিদ্রূপ আর বিরুদ্ধতা সহ্য করতে হয়েছিল মৃণালিনী দেবীকেও। তবুও বিদ্যালয়ের কাজে যখনই অর্থের অভাব দেখা দিয়েছে; নিজের গায়ের গয়না বিক্রি করে রবীন্দ্রনাথকে অর্থের যোগান দিয়েছেন মৃণালিনী দেবী। রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এই ভাবে শেষ পর্যন্ত হাতে সামান্য কয়েকগাছা চুরি ও গলায় একটি চেন ছাড়া মার কোনো গয়না অবশিষ্ট্য থাকলো না। মা পেয়েছিলেন প্রচুর গয়না। বিবাহের উপহার ছাড়াও শাশুড়ির পুরানো আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের খরচ যোগাতে সব শেষ হয়ে গেল।’    

আশ্রম প্রতিষ্ঠার সময় কবির বিশেষ অর্থকষ্ট ছিল। ঋণগ্রস্ত হয়ে তিনি বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করতেন। পুরীস্থিত পাকাবাড়ি এই সময়ে তিনি আশ্রম রক্ষনার্থ বিক্রয় করেছিলেন। অলংকার বিক্রয় করে মৃণালিনী দেবী বিদ্যালয়ের পরিচালনায় কবির সহায়তা করেন।  


শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের জন্য এত ত্যাগ স্বীকারের কথা রবীন্দ্রনাথও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছেন, ‘তখন অবশ্য তিনি ছিলেন এবং যোগও দিয়েছিলেন আমার কাজে। এখানকার ছেলেমেয়েদের মত আমরা অত খুঁতখুঁতে ছিলুম না। আধুনিক ভাবে আমাদের বিবাহ হয়নি তো, তাতে কিছুই এসে যায়নি। একটা গভীর শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল। তিনি তো চেয়েছিলেন আমার শান্তিনিকতনের কাজে সঙ্গিনী হবার। বিশেষ করে ইদানীং অর্থাৎ শেষের দিকে তাঁর একান্ত আগ্রহ হয়েছিল আমার কাজ করবার। কিন্তু সে তো হলো না, অল্প পরেই তাঁর সেই ভয়ানক অসুখ হল। এর পিছনে যে কি পরিশ্রম আছে তাতো জানো না, কি দুঃখের সে সব দিন গেছে যখন ছোট বউ-এর গয়না পর্যন্ত নিতে হয়েছে। চারিদিকে ঋণ বেড়ে চলেছে, ঘর থেকে খাইয়ে পরিয়ে ছেলে যোগাড় করেছি, কেউ ছেলে তো দেবেই না, গাড়ি ভাড়া করে অন্যকে বারণ করে আসবে। এই রকম সাহায্যই স্বদেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছি। আর তখন চলছে একটির পর একটি মৃত্যুশোক, সে দুঃখের ইতিহাস সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে গেছে। লোকে জানে উনি সৌখিন বড়লোক। সম্পূর্ণ নিঃসম্বল হয়েছিলুম, আমার সংসারে কিছুমাত্রা বাবুয়ানা ছিল না। ছোট বৌকেও অনেক ভার সইতে হয়েছে। জানি সে কথা তিনি মনে করতেন না।’ বিদ্যালয় স্থাপনের পর ছাত্রদের মধ্যে থাকবেন বলে শান্তিনিকেতনের  বর্তমান লাইব্রেরি বাড়ির একপাশের একটি ঘরে কবি বাস করেছেন অনেকদিন, খেতেন ছাত্রদের খাওয়ার সারে বসে-একসঙ্গে একই খাদ্য। মৃণালিনী দেবীকেও আশ্রমের কাজে খুব পরিশ্রম করতে হয়েছিল। বিদ্যালয়ের নিয়মানুসারে ছাত্রদের করণীয় সকল বিষয় তিনি কর্তব্য মনে করতেন। ছাত্রদের তত্ত্বাবধানের কাজও তিনি করতেন। সেই সাথে তাঁদের অন্যান্য ব্যাপারগুলোর প্রতি তিনি কঠোর খেয়াল রাখতেন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় আশ্রমে যোগ দেবার পূর্বে এক আত্মীয়ের নিকট শুনেছিলেন যে, ‘আশ্রমের অধ্যাপকগণ ও বালকেরা যে প্রকার সুখে বাস করেন বাবুদের ভাগ্যেও তাহা সম্ভাব হয় না। রথীন্দ্রনাথের মনস্বিনী জননী প্রতিদিনই আশ্রমবাসীদের জন্য নিজের মনের মত নানা রকম খাদ্যর ব্যবস্থা করেন। কখনো সেদিকে কোন প্রকার ত্রুটি হয়নি। ইন্দিরা দেবীও লিখেছেন, ‘শান্তিনিকেতনে থাকার সময় আশ্রমের ছেলেদের জন্য আগুন তাতে রেঁধে রেঁধেই কাকিমার শেষ অসুখের সূত্রপাত হয়।’ অর্থকষ্ট, বসবাসের কষ্ট, ছাড়াও সে সময়ে শান্তিনিকেতনে সুপানীয় ও অনন্যা অসুবিধা ছিল খুবই প্রবল ভাবে, এতে কবির শারীরিক অবস্থার অনেক অবনতি ঘটে। মৃণালিনী দেবী তাঁর গয়না বিক্রি করা অর্থ নিয়ে এলেন এবং ঐকান্তিক সেবায়  তাঁদের সারিয়ে তুললেন। বিদ্যালয়ের জন্য এই কঠোর পরিশ্রমের ফলে অচিরেই কবিপত্নী অসুস্থ্ হ’য়ে পড়েন। অসুখ যখন খুব বাড়াবাড়ি তখন তাঁকে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হল। রথীন্দ্রনাথ ‘পিতৃস্মৃতি’তে লিখলেন, ‘বাবা তখন কলকাতায়, দাদা দ্বিপেন্দ্রনাথকে লিখলেন মাকে নিয়ে কলকাতায় আসতে। বোলপুর থেকে কলকাতায় মাকে নিয়ে সেই যে যাওয়া, আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে আছে।’